কাতরাসের নীলকন্ঠবাসিনী মন্দির (লিলোরী মন্দির)
*****************
(ভ্রমণগদ্য)
রাজকুমার সরকার
——————-
কাতরাসের লিলোরী মন্দিরের পুজো কবে থেকে হচ্ছে?
অনেকের প্রশ্ন। কিভাবে মন্দির স্থাপনা হোলো?
জানার কৌতুহল থাকা স্বাভাবিক।আমার বাবা তখন বাঘমারা সার্কেল অফিসের বড়বাবু।বাঘমারা যেতাম বাবার কাছে মাঝে মাঝে ঠিক কাতরাসের লিলোরী মন্দিরের পাশ দিয়েই। তখন লিলোরী মন্দিরের এত প্রচার-প্রসার বা চাকচিক্য ছিল না।মন্দির ছিল।ছিল দু একটি পুজো সামগ্রীর দোকান।আজ থেকে তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা।তখন ধানবাদে বাসে চেপে হীরক রোড ধরে কাতরাসকে বাঁদিকে রেখে বাঘমারা যেতাম এবং মন্দিরের কথা শুনতাম লোকমুখে। গেছিলাম তখন বেশ কয়েকবার। দিন বদলেছে।মন্দিরের নাম, প্রচার-প্রসার হয়েছে।গজিয়ে ওঠেছে অজস্র ধর্মশালা, দোকান, হোটেল ইত্যাদি।এখন লিলোরী মন্দিরের পরিচিতি সকল মানুষের কাছে। আজ অজানা নয়।প্রতিদিন বিয়ে হচ্ছে।প্রতিদিন পুজো হচ্ছে।প্রতিদিন ছাগ বলি হচ্ছে।প্রতিদিন গাড়ি পুজো হচ্ছে।
এবার একটু পিছন ফিরে যাই। মা লিলোরী কাতরাস রাজ পরিবারের কূলদেবী।কাতরাসের রাজপরিবারের দেবী।কাতরাসগড়ের রাজাদের পূর্বসূরীরা মধ্য প্রদেশের রিওয়া অঞ্চল থেকে গিরিডি জেলার পালগঞ্জে আসেন তারপর আরও কিছু জায়গায় অবস্থান করেন।রাজগঞ্জের কাছে লক্ষ্মণপুর মৌজার গঙ্গাপুরেও তাঁরা থাকেন। গঙ্গাপ্রসাদ সিংহ এর নামে গঙ্গাপুর।সেখানে লিলোরী মন্দির আছে এবং অদ্যাবধি পুজো হয়।পরে তাঁরা কাতরাসগড়ে আসেন। মা লিলোরী’র পুজো কাতরাসে রাজা পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহ (তেরো প্রজন্ম) থেকে হচ্ছে। মা লিলোরীর স্থাপক এবং প্রথম পূজক তৎকালীন রাজা স্বর্গীয় সুজান সিংহ। স্বর্গীয় সুজান সিংহ এর আগের পূর্ব সূরীরা দেবী চঞ্চালিনী নামে পুজো করতো। এখন বর্তমানে মা লিলোরীর পুজো হচ্ছে। বিশেষ কার্যসিদ্ধির জন্য পুজো করতে হলে রাজপরিবারের অনুমতি নিয়ে পুজো করা যেতে পারে। পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহ রাজপরিবারের ৪৩তম প্রজন্ম। পূর্ণেন্দু নারায়ণের ১৩ প্রজন্মের আগে তাঁরা পরেশনাথ পাহাড়ের আশে পাশে থাকতেন। সেখান থেকেই কাতরাস আসেন।
একদিন মা স্বপ্ন দেন রাজা সুজান সিংহ কে; মা বলেন- শোন্, আমি কতরী নদীর মায়া ডুবনী’তে আছি। তুই আমাকে প্রতিষ্ঠা কর। আর শোন্, আমার পুজো করবে কামদেব ব্যানার্জী। স্বপ্ন দেখতে দেখতে রাজা সুজান সিংহ মা’কে বলেন মা আমি কামদেবকে পাব কোথায়?
শোন্ কামদেব থাকে পশ্চিম বর্ধমানের সোদপুর গ্রামে। ও আমার পরম ভক্ত। আবার ওদিকে কামদেবকেও মা স্বপ্ন দেন তুই কাতরাসের মায়াডুবনী’তে আমাকে পাবি। তুই আমার পুজো করবি। কামদেব বলেন মা আমি বুঝবো কি করে কোথায় তুমি আছো?
তোর কোনো চিন্তা নেই। রাজা সুজান সিংহ তোকে আসবে নিতে। কামদেব মায়াডুবনীতে গিয়ে জলে নেমে দেবীকে পান। প্রথমে ভৈরব মন্দিরে মাকে স্থাপনা করা হয়। পরে মা লিলোরীর মন্দির হয় যা বর্তমানে পুজো হচ্ছে। কামদেব ব্যানার্জীর বংশধরেরা বংশানুক্রমিকভাবে পুজো করে আসছে।
ধানবাদ জেলা শহর থেকে কুড়ি বাইশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লিলোরী মন্দির। বাস অটো টোটোতে যাওয়া যায়।নিকটবর্তী রেলস্টেশন নিচিতপুর। নিচিতপুর রেলস্টেশনে নেমে লিলোরী যাওয়া যায়। রাজার ঘরের লোক প্রথমে পুজো করেন তারপর সকলের জন্য মন্দির খোলা থাকে সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছ’টা পর্যন্ত। নিয়মিত বিবাহ হয়ে থাকে। যদিও প্রচুর ধর্মশালা রয়েছে তবুও আগে ভাগেই বুক করে রাখতে হয় বিয়ের সময়।চুনরি বেঁধে সবাই মানসিক করেন দেবীকে। কার্যসিদ্ধি হয়ে গেলে এসে চুনরি খুলে যায় মন্দিরে এসে।পৈতা,উপনয়ণ,মাথামুণ্ডণ, গাড়ি পুজো সবই হয়। নবরাত্রির সময় নয় দিন ধরে বিশেষ পুজো হয়। নবমীর দিন ৪০০/৫০০ছাগ বলি হয়। এমনিতে প্রতিদিন চল্লিশ পঞ্চাশটি ছাগ বলি হয়। মন্দিরের কাছেই রয়েছে প্রচুর পুজো সামগ্রীর দোকান। ফুল, বেলপাতা থেকে শুরু করে নারিকেল, মিঠাই, বাতাসা সহ যাবতীয় পুজো সামগ্রীর জিনিস পাওয়া যায়।
বর্তমানে পূর্ণেন্দু নারায়ণ সিংহ এর ছেলে চন্দ্রনাথ সিংহ মন্দিরের সেবাইত। চন্দ্রনাথের যমজ দুই পুত্র বিশাল সিংহ (বড়) ও অভিষেক সিংহ (ছোট)। তারা এখন তাদের পদবী সিংহদেও লিখছেন। রাজপরিবারের সবাই এখন কাতরাসগড়ে থাকেন না। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিবারের সকলে এদিকে সেদিকে রয়েছেন এমনকি কেউ কেউ লণ্ডনে’ও থাকেন তবে হ্যাঁ তাঁরা যে যেখানেই থাকুন না কেন শারদীয়া পুজোর সময় ও বাসন্তী দুর্গাপুজোর সময় সকলেই তাঁরা কাতরাসগড়ে মিলিত হন।
তথ্যসূত্র:-
সুকুমার ব্যানার্জী
মহাদেব চ্যাটার্জী
সিন্টু মুখার্জী
একাধিকবার ক্ষেত্র গবেষণা
কাশীনাথ সিং ‘কাতরাসী’
জ্যোতি কাকু বলতেন, জীবন বড় সুন্দর।একটা মানুষ জীবনে সব হারিয়েও এই কথা টা এমন ভাবে বলতেন যে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে…
Khub sundor lekha ta. Ami aga-gorai tomar lekhar fan dada. Ei vabei chalie jao.
অসাধারণ ও মানসম্মত এ পত্রিকাটির উত্তরোত্তর উৎকর্ষতা ও প্রচার বৃদ্ধি হোক।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ