মোহময়ী সুন্দরী মাইথন
************

রাজকুমার সরকার
**************
মোহময়ী মাইথন।
ঝাড়খণ্ডের অন্যতম জলাধার। না, জলাধার বললে একটু সেকেলে সেকেলে লাগবে ‘ড্যাম’ বললেই ভালো লাগে।কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যভাষার শব্দগুলি ভালো লাগে বা চলন বেশি হয়েই যায় এবং তা সুন্দর লাগে।
মোদ্দা কথায় আসি। কোথায় মাইথন? মাইথনে কি কি আছে?
কিসের আকর্ষণে মানুষ ছুটে আসেন মাইথনে?
শীতের মরসুমে এত পর্যটক কেন আসেন মাইথনে?
মাইথন নাম কিভাবে হোলো?
মাইথন নাম এসেছে মাতার থান থেকে। থান অর্থে স্থান। অর্থাৎ মাই কি থান, সেখান থেকেই মাইথন।
সাধারণত দেখবেন ভারতবর্ষের অধিকাংশ ড্যাম-এ জলকে বেঁধে রাখে। গুটিকয়েক গেট থাকে।
(দরজা বললে সেকেলে শোনাবে)
মাইথনের ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যতিক্রম। সামনেই কল্যাণেশ্বরী মন্দির। পাঁচশো বছর আগে রাজা কল্যাণ সিংহ এই মন্দির তৈরি করেন। শোনা যায় এক ব্রাহ্মণ পাশের জলাশয়ে অলঙ্কার পরা দুটি হাত দেখতে পেয়ে রাজাকে খবর দিয়েছিলেন। রাজা পরে স্বপ্ন পান এবং দেবীকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন। কল্যাণেশ্বরী মন্দিরে পুজো দেওয়া ও আশে পাশে ঘুরে দেখা মাইথন সফরের সাথে সাথে বাড়তি পাওনা। অদূরেই পাহাড়ের উপর অমরনাথ শিবের মন্দির।মাইথন ড্যামের মধ্যে চারটি দ্বীপ। অধিকাংশ মানুষ বা পর্যটকের মুখে মুখে দুটি দ্বীপের নাম শোনা যায়-১।সবুজ দ্বীপ ২।মঙ্গল দ্বীপ আরও দুটি দ্বীপ রয়েছে নাম – চামচ দ্বীপ ও ঝালমুড়ি দ্বীপ। কেন এমন নাম?
কে রাখলো এই নাম?
কেনই বা এরকম নাম?
অনেক অনুসন্ধান করেও আমি বিফল হলাম। যাকগে।তবে নাম তো নামই হয়? এখনও বহন করে চলেছে সবাই এই নতুন নাম দেওয়া দ্বীপের নাম। তাহলে মাইথনে চারটি দ্বীপ আছে।দ্বীপের নামগুলি হোলো-সবুজদ্বীপ,
মঙ্গল দ্বীপ,চামচ দ্বীপ ও ঝালমুড়ি দ্বীপ। মাইথন যেতে গেলে দুটি রুট বেশি জনপ্রিয় একটি
এন.এইচ. ১৯ ধরে আরেকটি ট্রেন ধরে।
নিকটতম রেলস্টেশন কুমারডুবি। ঝাড়খণ্ডের শেষ রেলস্টেশন। ধানবাদ থেকে মাইথনের দূরত্ব ৪৮ কিলোমিটার, আসানসোল থেকে মাইথনের দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার। তারপর পশ্চিমবঙ্গের সীমানা। সীমানা ভাগ করছে বরাকর নদী আর বরাকর নদীর উপরেই গড়ে উঠেছে মাইথন জলাধার (ড্যাম)
মাইথন ড্যাম এর উদ্দেশ্য-বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন। ১৯৫৭ সালে বরাকর নদীর উপর এই ড্যামটি হয়। উদ্বোধন করেন ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ড সীমান্তে ১৫৭১২ ফিট লম্বা কংক্রিটের বাঁধ গড়ে উঠেছে বরাকর নদীতে। মাইথন একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট। রয়েছে বোটিং এর ব্যবস্থা। টিকিট কেটে অনায়াসেই ঘুরে দেখতে পারেন বিভিন্ন দ্বীপ। বিভিন্ন দ্বীপের দূরত্ব ভিন্ন ভিন্ন। স্বাভাবিকভাবেই রেট ভিন্ন ভিন্ন। আপনার যেমন বাজেট তেমন ঘুরতে পারেন। স্পীড বোটে চাপলেই জ্যাকেট পরে চাপতে হবে। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে। আট শত, এক হাজার, এমন কি দু হাজার বাইশ শত লাগতে পারে।দূরত্ব ও সময় অনুযায়ী রেট।ড্যাম বাদ দিয়ে মনের সুখে যেখানে সেখান ছবি তুলতে পারবেন।রিল বানাতে পারেন। ব্লগাররা নিয়মিত আসেন মাইথন। রয়েছে পার্ক।ঘুরে ঘুরে দেখে পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পারেন প্রাণভরে। প্রেমিক প্রেমিকারা আপন খেয়ালে ঘোরাফেরা করছেন ইতিউতি।মনোরম
নিরিবিলি সবুজ ঘেরা প্রান্তর কার না ভালো লাগে…ড্যাম এর নীচের দিকে মাছ চাষ হচ্ছে। ঘুরে আসতেই পারেন। ড্যাম সংলগ্ন প্রচুর ফার্স্ট ফুডের দোকান, হোটেল, চা এর দোকান। ডাবের জল খেতে পারেন। মনে রাখবেন ড্যাম এ ফটো তোলা নিষেধ।
মাইথনের অন্যতম আকর্ষণ মজুমদার নিবাস। পাঠক-পাঠিকাদের জন্য মজুমদার নিবাসের কিছু কথা রাখছি।
পর্যটকদের কাছে ডিভিসি মাইথনের অন্যতম আকর্ষণ জলে ঘেরা দ্বীপের উপর গড়ে ওঠা মজুমদার নিবাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই গেস্ট হাউসের পরিষেবা এবার বেসরকারি হাতে তুলে দিল ডিভিসি। আগেই সেখানকার ক্যান্টিন পরিষেবা বেসরকারি হাতে ছিল, এবার আবাসিকদের যাবতীয় স্বাচ্ছন্দ্যের দায়িত্বও বেসরকারি হাতে গেল। এতে এখানে ঘুরতে এসে থেকে যাওয়া পর্যটকেরা আরও উন্নত এবং আধুনিক পরিষেবা পাবেন বলে ডিভিসি কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেছেন।
আপাতত চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে দু বছরের জন্য মুগমা বিল্ডার্স নামক এক ঠিকা সংস্থা এই দায়িত্ব পেয়েছে টেন্ডারের মাধ্যমে। মজুমদার নিবাসে আবাসিকদের যাবতীয় পরিষেবা দেওয়ার জন্য ডিভিসি কর্তৃপক্ষ তাদের ৭৪ লক্ষ টাকা দেবেন। তবে ডিভিসির এই পদক্ষেপকে স্থানীয় শ্রমিক সংগঠনগুলি সংস্থার বেসরকারিকরণের উদ্যোগ বলে দাগিয়ে দিলেও ডিভিসি মাইথনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার সুখময় নায়েক বলেন এই উদ্যোগ কোনভাবেই বেসরকারিকরণের প্রচেষ্টা নয়। তিনি বলেন আগের মতই মজুমদার নিবাসের বুকিং ডিভিসির পোর্টালের মাধ্যমেই হচ্ছে, বুকিং বাবদ দেয় অর্থ ডিভিসির কোষাগারেই জমা পড়ছে। এর সমস্ত প্রকার নিয়ন্ত্রণ ডিভিসির হাতেই থাকবে। এমনকি ডিভিসি কর্তৃপক্ষের যাবতীয় নিয়ম মেনেই দায়িত্বপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থা মজুমদার নিবাসে পরিষেবা দেবে বলেও তিনি জানান। শ্রী নায়েক বলেন ঘরের ভাড়া, খাবার দাবারের দর, গেস্ট হাউসের রক্ষণাবেক্ষণ সমস্ত কিছুই ডিভিসি নিয়ন্ত্রণ করবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকা সংস্থা শুধুমাত্র মজুমদার নিবাসে আসা আবাসিকদের যত্ন-আত্তি স্বাচ্ছন্দ্যের দিকটি দেখবেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবেন এবং এজন্য ডিভিসি তাদের টেন্ডার অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করবে। ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শ্রী নায়েক আরও বলেন, এই সিদ্ধান্ত সরকারি স্তর থেকেই নেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র এখানকার পরিষেবাকে আরো আধুনিক করার জন্যই। এই পদক্ষেপকে তিনি বেসরকারিকরণ বলে মনে করছেন না উল্লেখ করে বলেন ডিভিসির নিজস্ব চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীর সংখ্যা খুবই কমে গেছে, সেক্ষেত্রে মজুমদার নিবাসের মত অত্যাধুনিক একটি গেস্ট হাউসের পরিষেবা আবাসিকদের স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী বজায় রাখা বিশেষ অসুবিধার হয়ে পড়ছিল। সেই অসুবিধা দূর করতেই এই সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন একসময় ১৬ জন কর্মী মজুমদার নিবাসের দেখভাল করতেন, কিন্তু এখন তা বাড়িয়ে ১৯ জন করা হয়েছে। তিনি বলেন আগের মতই ডিভিসির বুকিং পোর্টাল – ডব্লুডব্লুডব্লুডটডিভিসিডটওআরজি-র মাধ্যমে যে কেউ মজুমদার নিবাসে থাকার জন্য বুকিং করতে পারেন।
উল্লেখ্য, ডিভিসির প্রথম চেয়ারম্যান (১৯৪৮-৫৪) এস এন মজুমদার (আই সি এস)- এর নামাঙ্কিত মজুমদার নিবাস মাইথনের অনন্য প্রকৃতির মাঝে গড়ে উঠেছে গত শতাব্দীর ষাটের দশকের প্রথম দিকেই। প্রথমে এর নাম জনতা নিবাস থাকলেও পরবর্তী সময়ে যেমন থাকার জন্য ব্যবস্থাপত্র বেড়েছে তেমনই নামেরও পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৮৮ সালের ৭ জুলাই নবনির্মিত এই গেস্ট হাউসের নামকরণ শ্রীমজুমদারের নামে করা হয় তৎকালীন ডিভিসির চেয়ারম্যান এ ঘটকের উদ্যোগে। এখন মজুমদার নিবাসে প্রায় ১৭ টি ডবল বেডেড রুম, ৪ টি স্যুট, অত্যাধুনিক কনফারেন্স হল, ডাইনিং হল সহ বিশাল পরিকাঠামো আছে। লোহার সাঁকো দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে জলে ঘেরা দ্বীপের উপর অবস্থিত এই গেস্ট হাউসে পৌঁছাতে হয়। চারিদিকে জল এবং দূরে সবুজ গাছে ঘেরা ছোট বড় পাহাড় আবাসিকদের এখানে থাকার আনন্দকে দ্বিগুণ করে তোলে। মাইথন ঘুরতে এসে মজুমদার নিবাসে দিনযাপন পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। এখানকার “কল্যাণী” “মহারাজ” “শালিমার” ইত্যাদি নামাঙ্কিত স্যুটগুলিতে দেশের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি থেকেছেন, এখনও সরকারি উচ্চ পদাধিকারী বা খ্যাতনামা ব্যক্তিরা এইসব ঘরে থাকার জন্য উন্মুখ হন। ঝাড়খন্ড পশ্চিমবঙ্গের বহু সরকারি স্তরের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও এখানে আয়োজিত হয়।জনসাধারণের অবগতির জন্য তথ্য মূলক সংবাদটি রাখলাম [‘প্রান্তভূমি’ এর ১৯-এ এপ্রিল,২০২৬ খবর]
কিভাবে যাবেন:
হাওড়া থেকে ব্ল্যাক ডায়মন্ড এক্সপ্রেস বা কোলফিল্ড এক্সপ্রেস ধরে আসানসোল আসুন। সেখান থেকে বাসে মাইথন আসা যায়। দূরত্ব ২৪ কিলোমিটার।প্রাইভেট গাড়ি নিয়েও আসতে পারেন।
পশ্চিম দিক থেকে যাঁরা আসবেন তাঁরা প্রথমে ধানবাদ আসুন। ধানবাদ থেকে এন.এইচ. ১৯ ধরে নিরসা, কুমারডুবি হয়ে আসতে পারেন। ট্রেনে ধানবাদ থেকে কুমারডুবি আসতে হবে। সেখান থেকে টেম্পু টোটো ধরে কালীপাহাড়ি হয়ে মাইথন। দূরত্ব মাত্র নয় কিলোমিটার।
কোথায় থাকবেন: মাইথনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পর্যটনের ট্যুরিস্ট লজ আছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ইয়ুথ হোস্টেল আছে।ফরেস্ট বিভাগের রেস্ট হাউস আছে এবং ডি ভি সি এর মজুমদার নিবাস আছে।তাছাড়া কুমারডুবিতে থাকতে চাইলে হোটেল এবং ধর্মশালা পাবেন।
অসাধারণ ও মানসম্মত এ পত্রিকাটির উত্তরোত্তর উৎকর্ষতা ও প্রচার বৃদ্ধি হোক।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা