file 00000000a1f0720b94a45c8a13155ae3

গরু, ধর্মীয় অনুভূতি ও সম্প্রীতির ভারত- শ্যামল মণ্ডল

Spread the love

গরু, ধর্মীয় অনুভূতি ও সম্প্রীতির ভারত

– শ্যামল মণ্ডল

ভারতবর্ষের শক্তি তার বৈচিত্র্যের মধ্যে নিহিত। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। এই বহুত্ববাদী ঐতিহ্যই ভারতের প্রকৃত পরিচয়। তবে কখনও কখনও কিছু বিষয় নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়, যার মধ্যে গরু ও গোহত্যার প্রশ্ন অন্যতম।
হিন্দুধর্মে গরু অত্যন্ত শ্রদ্ধার প্রতীক। বহু হিন্দুর কাছে গরু কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং মাতৃত্ব, সেবা, কৃষিভিত্তিক জীবিকা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। গ্রামের অর্থনীতি, কৃষিকাজ এবং দুগ্ধ উৎপাদনের সঙ্গে গরুর সম্পর্ক হাজার বছরের পুরোনো। তাই গরুর প্রতি শ্রদ্ধা অনেক হিন্দুর ধর্মীয় ও আবেগগত বিশ্বাসের একটি অংশ।
অন্যদিকে মুসলিম সমাজের খাদ্যসংস্কৃতি ভিন্ন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পরম্পরার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। ইসলামে গরুর মাংস ভক্ষণ বৈধ হলেও তা বাধ্যতামূলক নয়। একজন মুসলমান গরুর মাংস খেতে পারেন, আবার নাও খেতে পারেন। বাস্তবে ভারতসহ বিশ্বের বহু মুসলিম ব্যক্তিগত, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কারণে গরুর মাংস এড়িয়ে চলেন।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় খাদ্যাভ্যাস মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের একমাত্র মাপকাঠি নয়। একজন মানুষের চরিত্র, মানবিকতা, দেশপ্রেম, প্রতিবেশীর প্রতি আচরণ কিংবা সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ তার খাদ্যতালিকার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন অনেক মুসলিম ব্যক্তি, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতা ও সামাজিক সংগঠনের বক্তব্য শোনা যায়, যেখানে তাঁরা গরুকে ঘিরে হিন্দু সমাজের অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন। কেউ কেউ গোহত্যা বন্ধ বা সীমিত করার পক্ষেও মত প্রকাশ করেছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, যদি একটি বিষয়ে সংযম প্রদর্শন করে সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বিশ্বাস আরও শক্তিশালী করা যায়, তাহলে সেই পথ বিবেচনা করা যেতে পারে।
অবশ্য সম্প্রীতির দায়িত্ব একতরফা নয়। যেমন মুসলিম সমাজ যদি হিন্দুদের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখায়, তেমনি হিন্দু সমাজেরও উচিত মুসলমানদের মর্যাদা, অধিকার এবং বিশ্বাসকে সম্মান করা। প্রকৃত সম্প্রীতি তখনই গড়ে ওঠে যখন উভয় পক্ষ একে অপরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয়।
ভারতের ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে হিন্দু ও মুসলমান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সাহিত্য-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও দেখা যায় একজন হিন্দু প্রতিবেশী মুসলমানের অসুস্থতায় হাসপাতালে ছুটে যান, আবার একজন মুসলমান বন্ধু হিন্দুর সুখ-দুঃখে পাশে থাকেন। মানবিক সম্পর্কের এই বন্ধনই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
গরু নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্ন মত থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু মতভেদ কখনও বিদ্বেষের কারণ হওয়া উচিত নয়। বরং মতভেদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার মধ্যেই সভ্যতার পরিচয় নিহিত। কোনো সম্প্রদায়কে সামগ্রিকভাবে বিচার করা বা ঘৃণার চোখে দেখা সমস্যার সমাধান নয়; বরং তা নতুন বিভাজনের জন্ম দেয়।
আজকের ভারতের প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ; বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতা; বিভাজন নয়, ঐক্য। যদি আমরা একে অপরের ধর্মীয় অনুভূতিকে সম্মান করতে শিখি, যদি মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিই, তাহলে গরু বা অন্য কোনো বিষয় কখনও মানুষের মধ্যে স্থায়ী দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারবে না।
পরিশেষে বলা যায়, সম্প্রীতির ভিত্তি কোনো একক খাদ্যাভ্যাস বা সামাজিক রীতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না। সম্প্রীতির ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা, সহনশীলতা এবং সহাবস্থানের ইচ্ছা। ভারতের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে তখনই, যখন বিভিন্ন বিশ্বাসের মানুষ নিজেদের ভিন্নতা বজায় রেখেও একে অপরকে সম্মান করে একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলবেন।
(সমাপ্ত)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রম্যরচনা: বাংলায় ✓ অরবিন্দ সরকার

Ridendick Mitro

কবিতা ঃ নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ ও নবাব আলীবর্দী খাঁ ঋদেনদিক মিত্রো ( ভারত )

নদীর বয়স বাড়ে না ✓শুভ্রনীল ধর নীল-ই 

চিরন্তন অনুসন্ধান! ✍️কনককান্তি মজুমদার