ঈশ্বর, নৈতিকতা ও মানুষের দায়িত্ব

– শ্যামল মণ্ডল
মানুষের জীবনে ঈশ্বরের ধারণা চিরন্তন। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা প্রশ্ন, সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ এক অদৃশ্য শক্তির ওপর ভরসা খুঁজে পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো জীবনের দুর্ঘটনা, অন্যায় বা অপরাধের জন্য কি সত্যিই ঈশ্বর দায়ী? নাকি এর পেছনে রয়েছে মানুষের নিজের কাজ, চিন্তা ও সিদ্ধান্ত?
প্রথমেই বলা যায়, পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া অধিকাংশ দুর্ঘটনা ও অন্যায়ের সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা থাকে। অসাবধানতা, লোভ, ক্রোধ, হিংসা এইসব মানবিক দুর্বলতাই অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদি প্রতিটি ঘটনার জন্য ঈশ্বরকে দায়ী করা হয়, তবে মানুষের নিজস্ব দায়িত্ববোধ হারিয়ে যাবে। তখন মানুষ নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে সবকিছু ভাগ্য বা ঈশ্বরের ওপর চাপিয়ে দেবে।
অনেকেই বিশ্বাস করেন ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষের অন্তরে বিরাজ করেন। কিন্তু যদি সত্যিই তা হতো, তাহলে সমাজে চোর, ডাকাত, গুণ্ডা বা অপরাধীর অস্তিত্ব থাকত না। কেউ অন্যায় করার সাহস পেত না। বাস্তবে আমরা দেখি, মানুষ প্রায়ই নিজের স্বার্থের জন্য অন্যায় পথ বেছে নেয়। এখানেই স্পষ্ট হয় যে, ঈশ্বরের উপস্থিতি থাকলেও তা মানুষকে বাধ্য করে না; মানুষ নিজেই নিজের পথ নির্বাচন করে।
এই প্রসঙ্গে স্বাধীন ইচ্ছার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে চিন্তা করার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং নিজের জীবন গড়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এই স্বাধীনতাই তাকে মহান করে তুলতে পারে, আবার পতনের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। তাই ভালো-মন্দের দায়ভার শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের ওপরই বর্তায়।
আইন-আদালতের প্রয়োজনীয়তাও এখানেই। যদি প্রত্যেক মানুষ নিজের অন্তরের নৈতিকতা মেনে চলত, তবে সমাজে কোনো শৃঙ্খলা রক্ষার বাহ্যিক ব্যবস্থা দরকার হতো না। কিন্তু যেহেতু সবাই তা করে না, তাই অন্যায় রোধ করতে আইন ও শাস্তির ব্যবস্থা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এটি মানুষের দুর্বলতারই প্রতিফলন।
তবে শুধুমাত্র আইন দিয়ে সমাজকে সঠিক পথে রাখা যায় না। প্রকৃত পরিবর্তন আসে মানুষের ভেতর থেকে। নৈতিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ গুণগুলো অর্জন করতে হয় নিজস্ব চেষ্টায়। ঈশ্বরের নামে শপথ নেওয়া সহজ, কিন্তু সেই শপথ অনুযায়ী জীবনযাপন করাই আসল চ্যালেঞ্জ। নিজের চরিত্রকে গড়ে তোলা, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকাই একজন প্রকৃত মানুষের পরিচয়।
স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন “মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া যায়”। তাঁর মতে, মানুষের সেবাই ঈশ্বরের সেবা। এই ধারণা আমাদের শেখায় যে, ঈশ্বরকে খুঁজতে দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং নিজের আচরণ ও কর্মের মধ্যেই তাঁকে উপলব্ধি করা যায়।
সবশেষে বলা যায়, ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিশ্বাস থাকুক বা না থাকুক, মানুষের নৈতিক দায়িত্ব থেকে কেউ মুক্ত নয়। অন্যায় করে ঈশ্বরের ওপর দোষ চাপানো বা তাঁর নামে শপথ নিয়ে নিজের ভুল ঢাকার চেষ্টা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা এবং নিজেকে সৎ ও মানবিক করে তোলা।
আসুন আমরা নতুন বছরে নতুন শপথে এগিয়ে চলি—নিজেকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি, ন্যায় ও সততার পথে অবিচল থাকি।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা
একজন লেখক এর সব থেকে বড় প্রাপ্তি তার লেখা যদি পাঠক দের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে, যদি তাদের হৃদয়ে সেই…