এক পুনর্জন্ম
রোকেয়া ইসলাম
আজ পহেলা বৈশাখ—শহরের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ দিনগুলোর একটি।
এই শব্দের মাঝেও এক ধরনের শূন্যতা ছুঁয়ে থাকে রিয়াদকে।
রিয়াদ একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী। প্রতিদিন তার সকাল শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে, শেষ হয় ক্লান্ত চোখে মোবাইল স্ক্রল করতে করতে।
ক্লান্ত হয়ে যায় বিনোদন বলতে রিয়াদের ভেতরে যে আকুলতা ফেসবুকে তা অনুপস্থিত। বিভিন্ন গ্রুপে কিভাবে যেন এড হয়ে যায়।
বিরক্তিকর ভিডিও। বেশিরভাগ পোশাক বিক্রি আর রান্না খাওয়ার ভিডিও। মানুষের খাওয়াও বিনোদন হতে পারে? কি হাড়হাভাতের মতো উপস্থাপন প্রধান মৌলিক চাহিদাকে।
কে কি উপহার দিলো কোন বাসার নিমন্ত্রণের টেবিলকে উপস্থাপন। কোনটাই ওকে টানে না। সেক্সুয়াল ভিডিও বেশিক্ষণ দেখলে ক্লান্ত শরীরটা রি রি করে ওঠে।
পৃথিবী হাতের মুঠোয় হলে তবুও মানুষের রুচির বারটা বেজে তেরটায় ঝুলছে।
কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পরে।
যন্ত্রে ঘুম ভাঙে যন্ত্রে ঘুমায়।
জীবনটা যেন একটা যান্ত্রিক বৃত্ত—ঘুরছে, কিন্তু কোথাও পৌঁছাচ্ছে না।
আজ ছুটি।
তবু অ্যালার্ম ছাড়া তার ঘুম ভাঙলো ভোরেই।
আজ বাইরে বের হবে না, ভেবে বালিশ চেপে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। অন্য ছুটিরদিনগুলো চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলে কাজ হয়, আজ হচ্ছে না, ভেতরটাকে আজ বাইরে টানছে।
নগরের পহেলা বৈশাখ রিয়াদকে টানে না, এই প্রাণের স্পন্দনের উৎসবকেও পূঁজিবাদীদের অক্টোপাসের আওতায় প্রাণহীন মনে হয়। বাথরুম থেকে গোসল সেরে বের হতেই ভেতরের টানটা জোর পায়।
রথী ওকে সুন্দর একটা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছে মিলিয়ে একটা শাড়িও কিনেছে।
রথী আর রিয়াদ একই ডিপার্টমেন্ট কাজ করে। শ্যমাঙ্গিনীর একটা অতীত আছে, অফিসে বিষয়টা ওপেন সিক্রেটের মতো। রিয়াদ কোনদিন কাউকে জিজ্ঞেস করেনি তবে ওর কানে এসেছে রথীকেও কখনও জিজ্ঞেস করেনি।
বিষয়টায় রিয়াদের কোন আগ্রহ নেই, ওর নিজেরও তো একটা অতীত আছে।
ও পুরুষ বলে বিষয়টা চাপা পরে আছে অথবা কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেনা।
রথীর জন্য রিয়াদের ভেতরে আকাশে ভেসে যাওয়া তুলোট মেঘের মতো একটা অধরা বিষয় টের পায়।
রথী ওর ব্যক্তিত্বের জন্য পছন্দ করে।
কি ভেবে এবার শাড়ি পাঞ্জাবি কিনেছে রিয়াদ এটা জানে না।
অনিচ্ছায় পাঞ্জাবি পরে আয়নায় দাঁড়িয়ে মনটা ফুরফুরে হয়ে যায়।
শহরটা আজ অন্যরকম। পিচঢালা কালো রাজপথে কংক্রিটের দেয়ালগুলোতে আজ লাল সাদার আধিক্যে আরো রঙের উজ্জ্বলতা যা ঠিক রঙ নয়, সোঁদাগন্ধের অনুভূতি। অথচ ওর সকালটা শুরু হয়েছিল নিরবতায়। ভেতরের নিরবতা এখন সুর তুলছে বাইরের আনন্দময় পৃথিবীর প্রাণ ছোঁয়া বাদ্যে। কি মায়াময় বাদ্য। তবুও রিয়াদের ভেতরে চিনচিনে চোরা স্রোত থাকে বিষন্নতার বেহালা বেহাগে।
বাইরে বের হয়ে অনুভব করলো, হাওয়ার ভেতর একটা গন্ধ আছে।
গন্ধটা এই প্রাণহীন শহরের নয়—এটা ওর গ্রামের, মাটির, শেকড়ের।
রাস্তায় আনন্দময় মানুষের ঢল।
কারো মুখে আলপনা, কারো হাতে মুখোশ, কেউবা লাল-পাঞ্জাবিতে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছালো এক পুরোনো বইয়ের দোকানের সামনে।পুরোনো বইয়ের দোকানে এমনিতেই নির্ধারিত ক্রেতা আজ একেবারেই ক্রেতাহীন
এই দোকানটা আধুনিক শহরের সাথে বেমানান—ধুলোমাখা, পুরোনো, অথচ গভীর।
দোকানের ভেতরে ঢুকতেই এক বৃদ্ধ তাকালো তার দিকে।
চোখে অদ্ভুত এক স্থিরতা।
—“কি খুঁজছেন।
রিয়াদ থমকে গেলো। সে কি কিছু খুঁজছে?
রিয়াদ বইপত্র ঘাটতে থাকে
বৃদ্ধ মৃদু হাসলো।
একটা পুরোনো খাতা এগিয়ে দিলো তার দিকে।
—“এখানে হয়তো কিছু পাবেন।
খাতাটা খুলতেই রিয়াদ দেখলো—এটা কোনো সাধারণ খাতা নয়।
এটা যেন শহরের হারিয়ে যাওয়া গল্পের ভাণ্ডার।
এক জায়গায় এসে তার চোখ আটকে গেলো।
“শহর মানুষকে বড় করে না, মানুষ শহরকে বড় করে—
কিন্তু একসময় মানুষ নিজেই হারিয়ে যায় নিজের বানানো বড় শহরের ভিড়ে।”
রিয়াদের বুকের ভেতর কিছু একটা নড়ে উঠলো।
এই শহরে সে শুধু বেঁচে আছে, জীবিত নয়।
বাইরে তখন মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে।
ঢাকের শব্দ, মুখোশের উল্লাস, মানুষের উন্মাদনা—সবকিছু একসাথে মিশে এক অদ্ভুত চেতনা তৈরি করছে।
রিয়াদ দোকান থেকে বেরিয়ে এলো।
তার চোখে এখন অন্যরকম আলো।
সে ভিড়ের দিকে এগিয়ে গেলো—প্রথমবারের মতো, পালানোর জন্য নয়, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য।
একটা ছোট ছেলে তার হাতে একটা মুখোশ ধরিয়ে দিলো।
রিয়াদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মুখোশটার দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে সেটি মুখে পরলো।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—মুখোশ পরার পরই সে নিজেকে সবচেয়ে সত্য মনে করলো।
মুখোশ পরার সাথে সাথে দেখতে পায় রথী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শোভাযাত্রা থেকে বের হয়ে রথীর পাশে দাঁড়ায়, ওকেও মুখোশ পরিয়ে দেয়।
দুজনের চোখ হাসে। দুজনে বুঝতে পারে
এতদিন যার যার বুকের ভেতর মাতৃজঠর থেকে পাওয়া মুখটা আসল মুখ।
প্রতিদিন বিদেশি সাবান লোসনে বিভিন্নজনের সাথে আচরণে মুখোশ তৈরি করে নিয়েছিলো নিজের মতো করে।
আজ ওরা মুখোশের আড়ালে বুকের ভেতরের মুখটাকে প্রবলভাবে টের পায়।
ঢাকের তালে তালে, মানুষের ভিড়ে, রঙের উল্লাসে—রিয়াদ হঠাৎ অনুভব করলো, তার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে যাচ্ছে।
আর সেই ভাঙনের ভেতর থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন কিছু।
একটা নতুন বোধ।
একটা নতুন জীবন।
শহরটা আজ শুধু উৎসব করছে না,
শহরটা আজ পুনর্জন্ম নিচ্ছে।
এই পুনর্জন্মের ভেতর, রিয়াদও খুঁজে পেলো হারিয়ে যাওয়া নিজেকে।
রথীর ডানহাতটা টেনে নেয় নিজের দুহাতের করতলে পরম মমতায়…
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা
একজন লেখক এর সব থেকে বড় প্রাপ্তি তার লেখা যদি পাঠক দের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে, যদি তাদের হৃদয়ে সেই…