ধূলিসাৎ ✓ এই গল্পের গল্পকার মাননীয় প্রবীর কুমার চৌধুরী মহাশয়
ধূলিসাৎ
প্রবীর কুমার চৌধুরী
অরিন্দম চক্রবর্তী ছিলেন এক উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইতিহাস পড়াতেন। ছাত্রদের কাছে তিনি শুধু শিক্ষক নন, পথপ্রদর্শকও ছিলেন। স্ত্রী মধুমিতা, বৃদ্ধা মা আর একমাত্র ছেলে অর্ণবকে নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার। সংসারে বিলাসিতা ছিল না, কিন্তু ছিল শান্তি, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
অরিন্দমবাবু বিশ্বাস করতেন, সততা আর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি বছরের পর বছর স্কুলে পড়িয়েছেন। অসংখ্য ছাত্র তাঁর হাত ধরে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ সরকারি কর্মচারী। তাঁদের সাফল্যই ছিল তাঁর গর্ব।
কিন্তু একদিন আচমকাই সবকিছু বদলে গেল। চাকরি সংক্রান্ত একটি জটিলতায় তাঁর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠল। কোনো অন্যায় না করেও তিনি অনিশ্চয়তার অন্ধকারে তলিয়ে গেলেন। মাসের পর মাস বেতন বন্ধ হয়ে রইল। স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো। শুরু হলো দপ্তরে দপ্তরে ঘোরা, কাগজপত্র জোগাড় করা, আবেদন লেখা আর অপেক্ষা।
প্রথমে সংসারের সামান্য সঞ্চযয়ে খরচ চললো । তারপর স্ত্রীর গয়না বিক্রি করতে হলো। বৃদ্ধা মায়ের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেল। অর্ণবের কোচিং ছাড়াতে হলো। সংসারের প্রতিটি দিন যেন এক একটি যুদ্ধ হয়ে উঠল।
অর্থের অভাবের চেয়েও বেশি কষ্ট দিত অপমান। যে মানুষটিকে সবাই সম্মান করত, তিনি আজ পরিচিত মানুষের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেকেই সান্ত্বনা দিত, কিন্তু সমস্যার সমাধান কেউ করতে পারত না।
ক্রমে অরিন্দমবাবু ভেতর থেকে ভেঙে পড়তে লাগলেন। রাতের পর রাত ঘুম হতো না। চিন্তা আর দুশ্চিন্তায় তাঁর শরীর দুর্বল হয়ে পড়ল। একদিন আদালত থেকে ফেরার পথে হঠাৎ বুক চেপে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁকে আর বাঁচানো গেল না।
অরিন্দমবাবুর মৃত্যুর পর সংসার যেন এক মুহূর্তে অনাথ হয়ে গেল। মধুমিতা সেলাইয়ের কাজ শুরু করলেন। অর্ণব পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন পড়াতে লাগল। কিন্তু অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে ছেলেটির অনেক স্বপ্নই মাঝপথে থেমে গেল। আজ স্নাতক অর্ণব ডেলিভারি বয়।
আজও ঘরের আলমারিতে অরিন্দমবাবুর ব্যবহৃত চশমা, কলম আর কিছু পুরোনো খাতা যত্ন করে রাখা আছে। সেগুলো দেখলেই মধুমিতার চোখ ভিজে ওঠে। তিনি ভাবেন, যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে দিয়েছেন, তাঁর নিজের সংসারটিই কেন এমন নির্মম পরিণতির শিকার হলো?
সময় এগিয়ে যায়, মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু একটি সুখী পরিবারের ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ার এই গল্প, তাদের অশ্রু আর অপূর্ণ স্বপ্নের ইতিহাস – কখনও মুছে যায় না। শুধু নীরবে সাক্ষী হয়ে থাকে একটি খালি চেয়ার, কিছু পুরোনো বই, আর এক শিক্ষকের অসমাপ্ত জীবন।
লেখক: প্রবীর কুমার চৌধুরী

অসাধারণ ও মানসম্মত এ পত্রিকাটির উত্তরোত্তর উৎকর্ষতা ও প্রচার বৃদ্ধি হোক।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা