IMG 20260620 WA0000

যে শূন্যতায় বৃষ্টি নামে ✍️ শুভ্রনীল ধর (নীল-ই)

Spread the love

যে শূন্যতায় বৃষ্টি নামে

IMG 20260620 WA0000
✍️ শুভ্রনীল ধর (নীল-ই)

(এই লেখা তাদের কাছে পৌঁছে যাক, ভালোবেসে যারা বলতে পারেনি। যারা ভালোবাসার কাছে পৌঁছতে পারেনি…)
আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসটা পড়ে চয়ন জানলার ধারে এসে দাঁড়াল। সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার। বাড়ির সামনের বকুলগাছটা কুয়াশার আবছা পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। উত্তরের হাওয়া বারবার এসে তার ডালপালাগুলো নাড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, বৃষ্টি নামার আগে প্রকৃতি একটু থেমে গেছে।
আর কয়েক মাস পর এই বাড়িটাও থাকবে না।

প্রায় একশো বছরের পুরোনো বাড়ি। লাল মেঝে, কাঠের জানলা, লম্বা বারান্দা আর মাঝখানে বড় উঠোন। একসময় এই বাড়িতেই ছিল একান্নবর্তী পরিবারের প্রাণ। দুর্গাপুজোর সময় উঠোনে পা ফেলার জায়গা থাকত না। কাকাদের আড্ডা, পিসিদের গল্প, ভাইবোনদের হইচই, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মশলার গন্ধ—সব মিলিয়ে বাড়িটা যেন নিজেই একটা পৃথিবী ছিল।
তারপর একে একে সবাই চলে গেল।
কেউ চাকরির জন্য, কেউ সংসারের জন্য, কেউ জীবনের প্রয়োজনে। এখন সেই একই উঠোনে দাঁড়ালে শুধু হাওয়ার শব্দ শোনা যায়।
সাত দিনের ছুটি নিয়ে ফিরেছে চয়ন। হাতে অনেক কাজ—জমিজমার কাগজপত্র, প্রোমোটারের সঙ্গে আলোচনা, বাড়ি ভাঙার প্রস্তুতি। তবু কাজের চেয়ে বেশি সময় সে কাটিয়ে দিচ্ছে বাড়িটার সঙ্গে। বিদায়ের আগে মানুষ বোধহয় জিনিস নয়, সময়কে ছুঁয়ে দেখতে চায়।
ধীরে ধীরে উঠোনে নেমে এল সে।
বকুলগাছটার নীচে এসে দাঁড়াতেই মনে পড়ে গেল এক গ্রীষ্মের বিকেল। খেলতে গিয়ে হাঁটু ছড়িয়ে ফেলেছিল। কান্না করতে করতে বাড়ি ফিরতেই মা তাকে কোলে বসিয়ে হলুদ মেখে দিয়েছিলেন। তারপর ফুঁ দিতে দিতে বলেছিলেন—
“এই দেখ, ব্যথাটা উড়ে গেল।”
আজ এত বছর পরে দাঁড়িয়ে চয়নের মনে হয়, পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের উপস্থিতিই ওষুধের মতো।
হাওয়ায় ভেসে এল বকুলফুলের গন্ধ।
গন্ধটা অদ্ভুতভাবে আরেকটা মুখ ফিরিয়ে আনল।
তোর্সা।
কলেজের লাইব্রেরিতে প্রথম আলাপ। তারপর বন্ধুত্ব। তারপর ভালোবাসা। খুব সাধারণ একটা ভালোবাসা, যেখানে বড় কোনো দাবি ছিল না। ছিল শুধু একসঙ্গে পথ চলার স্বপ্ন।
এক বর্ষার দুপুরে কলেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তোর্সা মুঠোভর্তি বকুলফুল তার হাতে দিয়ে বলেছিল—
“জানো, এই ফুলের গন্ধটা তোমার মতো।”
“কী রকম?”
“খেয়াল না করলেও থাকে। কিন্তু হঠাৎ না থাকলে বুঝতে পারা যায়।” সেদিন কথাটা বুঝতে পারেনি চয়ন।
আজ ও বোঝে, ভীষণ রকম ভাবে বোঝে। আকাশের মুখ আরো ভারী করে এলো।
ঘরে ফিরে মায়ের ঘরের দরজা খুলতেই যেন সময় থেমে গেল। টেবিলের ওপর চশমা, দেওয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার, আলমারিতে ভাঁজ করে রাখা শাড়ি—সব আছে। শুধু মানুষটা নেই।
একটা শাড়ি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে।
মনে হলো, কাপড় নয়, কোনো এক বিকেলের আলো ছুঁয়ে আছে তার হাতে।
চাকরির পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়ত সে। মা ঘুমোতেন না। দুধ গরম করে এনে বলতেন—
“আর একটু পড়। তুই পারবি।”
এখন বুঝতে পারে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্বাসগুলো অনেক সময় মায়েরা নিঃশব্দে বুকে করে নিয়ে হাঁটেন।
মায়ের শেষ অসুস্থতার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে উঠল। তখন সে বেকার। স্বপ্ন ছিল, সামর্থ্য ছিল না। ডাক্তার আরও কিছু পরীক্ষা করতে বলেছিলেন, কিন্তু সব ইচ্ছের দাম মেটানোর ক্ষমতা তার ছিল না।
কয়েক দিনের জ্বর,কিছু উৎকণ্ঠার রাত,তারপর হাসপাতালের সাদা বিছানায় সবকিছু থেমে গেল।
প্রথম বেতন দিয়ে মাকে একটা নীল পাড়ের শাড়ি কিনে দেওয়ার কথা ছিল,প্রথম বেতন এসেছিল,শাড়িটা আর কেনা হয়নি।এই না-পাওয়াটুকু আজও তার সঙ্গে রয়ে গেছে।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে,টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ পড়ছে। সেই শব্দের ভেতর আবার ভেসে উঠল তোর্সার মুখ।
মায়ের শেষ অসুস্থতার সময় সে শেষবারের মতো হাসপাতালে এসেছিল। সবার অগোচরে,চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল।তারপর দরজার কাছে গিয়ে থেমে বলেছিল—
“আমাদের মধ্যে ভালোবাসার অভাব ছিল না, চয়ন।”
চয়ন চুপ করে ছিল।

“অভাব ছিল শুধু সময়ের।”
একটু থেমে সে মৃদু হেসেছিল।
“তুমি হয়তো একটু আগে প্রতিষ্ঠিত হতে পারতে, কিংবা আমি একটু কম ধনী বাড়িতে জন্মাতে পারতাম।”
হাসিটা চোখ পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
চয়ন সেদিন প্রথম বুঝেছিল, কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায় না—শুধু অসম্ভব হয়ে যায়।
তারপর অনেক বছর কেটে গেছে।
আজ সে প্রতিষ্ঠিত,কেন্দ্রীয় সরকারের একজন অফিসার।
যে স্বপ্নের জন্য একসময় অসংখ্য রাত জেগেছে, সেই স্বপ্ন আজ বাস্তব।
তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, জীবনের কিছু জয় অসম্পূর্ণ। জীবনে গন্তব্যে পৌঁছে দেখা যায়, যাদের হাত ধরে পথ চলা শুরু হয়েছিল, তারা আর সেখানে নেই।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে,বৃষ্টি আরও জোরে পড়ছে,চয়ন ধীরে ধীরে ছাদে উঠে এল,চারদিক ঝাপসা। দূরের গাছপালা, মাটির সোদা গন্ধ, ভেজা ছাদ, কুয়াশা আর বৃষ্টির রেখাগুলো একাকার হয়ে গেছে।
মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রইল সে। ভেজা মাটির গন্ধের সঙ্গে কোথা থেকে যেন মিশে গেল মায়ের গন্ধ, বকুলের গন্ধ, বৃষ্টির ফোঁটার ভেতর যেন অনুভব করলো তোর্সাকে প্রথম ছোঁয়ার মুহূর্তকে,আর সেই মুহূর্তে মনে হলো, এই বাড়িটাও যেন তার সঙ্গে কথা বলছে,এই উঠোনেই তার শৈশব পড়ে আছে,এই বারান্দাতেই মায়ের অপেক্ষা,এই ঘরগুলোর মধ্যেই তোর্সার জন্য লেখা না-পাঠানো কবিতাগুলো।
বাড়িটা ভেঙে যাবে।
কিন্তু সত্যিই কি সবকিছু ভেঙে যাবে?
মনে হলো, হারিয়ে যাওয়া মানুষরা আসলে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।
তারা থেকে যায় কোনো পুরোনো শাড়ির ভাঁজে, বকুলফুলের গন্ধে, কিংবা হঠাৎ নেমে আসা এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে।
চয়নের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল,বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিলে একাকার হয়ে গেলো।
সেই মুহূর্তে তার মনে হলো, শূন্যতা মানে কিছু না থাকা নয়।
শূন্যতা মানে এমন কিছু থাকা, যা সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায় না, অথচ আর কোনোদিন ফিরে আসে নাবৃষ্টি তখনও পড়ছে,পুরোনো বাড়িটার গায়ে,বকুলগাছটার পাতায়,ভেজা উঠোনে।
মনে হলো, বিদায়ের আগে বাড়িটাও যেন একবার নিঃশব্দে কেঁদে নিচ্ছে,চয়ন চোখ বন্ধ করল।
কিছু মানুষ আমাদের জীবনে থেকে যায় অনুপস্থিত হয়েই। আর সেই অনুপস্থিতির আরেক নাম—স্মৃতি, আর স্মৃতির গভীরতম নামই হয়তো—শূন্যতা, সব স্বপ্নগুলো সত্যি করে জীবনে পেলেও ঠিক কতটুকু না পাওয়াকে ‘ শূন্যতা ‘ বলে?!

 

লেখক পরিচিতি

 

শুভ্রনীল ধর (নীল-ই):

পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাটানগরে তাঁর বেড়ে ওঠা। মফস্বল জীবনের অভিজ্ঞতা, মানুষের সুখ-দুঃখ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রান্তিক জীবনের বাস্তবতা তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য।

 

পেশাগত ব্যস্ততার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে তিনি পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম ও সংলগ্ন অঞ্চলের শবর, ভূমিজ ও লোধা সম্প্রদায়ের শিক্ষা, খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এই মানবিক অভিজ্ঞতাগুলি তাঁর সাহিত্যচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

 

কলেজ জীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু। প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করে চলেছেন। গল্প, প্রবন্ধ ও অনুভূতিনির্ভর গদ্যে মানুষের অন্তর্জগৎ, স্মৃতি, ভালোবাসা, বেদনা ও জীবনের অপূর্ণতার সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ বারবার ফিরে আসে। সাহিত্যপাঠ তাঁর নেশা, আর লেখালেখি তাঁর আত্মপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।

 

মফস্বলের মাটি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং গভীর মানবিক বোধ তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রধান শক্তি। ‘নীল-ই’ নামেই সাহিত্যজগতে তিনি অধিক পরিচিত।

2 Comments

  1. জ্যোতি কাকু বলতেন, জীবন বড় সুন্দর।একটা মানুষ জীবনে সব হারিয়েও এই কথা টা এমন ভাবে বলতেন যে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করতো ভীষণ।
    হারানো তো সবার জীবনেই! কিন্তু পাওয়া না পাওয়ায় হিসেবের বাইরে যদি প্রাপ্তির খাতায় নিজেকে খুঁজি তবে আজও অনুভব করি যে জীবন সুন্দর।
    ছেলেবেলা নেই, সহজ যাপন নেই, জ্যোতি কাকুও নেই আর, তবু সেই কণ্ঠ টা আজও কানে বাজে, যখন ই থিতু হই, কেউ যেন বলে যায়, জয়ী, জীবন বড্ড অদ্ভুত কিন্তু ভীষণ সুন্দর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

💬 Chat on WhatsApp
Notice: ob_end_flush(): Failed to send buffer of zlib output compression (0) in /home/kabyapot/public_html/wp-includes/functions.php on line 5493