বিজয়া দশমীতে বাঙালির বদল
✍️ সম্পাদকীয় কলমে — শ্যামল মণ্ডল
দশ দিনের আনন্দ, আলোর উৎসব ও মিলনের পর আসে বিজয়া দশমী—বাঙালির আবেগঘন এক অনন্য দিন। এই দিনে দেবী দুর্গা ফিরে যান কৈলাসে, আর আমরা ফিরে যাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আগের মতোই সেই মানুষ রইলাম, যারা বিজয়াকে শুধু বিদায়ের নয়, আত্মজাগরণের দিন বলে মানত?
এক সময় বিজয়া মানে ছিল — পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে প্রণাম, আলিঙ্গন, মিষ্টিমুখ আর শুভেচ্ছা বিনিময়। বয়োজ্যেষ্ঠের আশীর্বাদ, কনিষ্ঠের প্রণাম, আর মায়ের বিদায়ে চোখের কোণে জল। তাতে ছিল অন্তরের যোগাযোগ, হৃদয়ের উষ্ণতা।
আজ সেই চিত্র পাল্টেছে। এখন বিজয়া মানে হোয়াটসঅ্যাপে “Happy Bijoya”, ফেসবুকে status, ইনস্টাগ্রামে সেলফি আর ইমোজিতে ভরা আবেগ। হাতে সন্দেশ নয়, হাতে স্মার্টফোন। চোখে নয় কান্না, স্ক্রিনে হাসি। সময় বদলেছে—মানুষের যোগাযোগ বাস্তব থেকে ভার্চুয়ালে সরে গেছে।
এই পরিবর্তনকে আমরা কেবল ‘অভ্যাসের পরিবর্তন’ বলে উড়িয়ে দিতে পারি না। কারণ এটি বাঙালির সমাজচেতনা ও সংস্কৃতির রূপান্তর। যে সমাজ একদিন মা দুর্গার বিদায়ে অশ্রু ফেলত, আজ সে সমাজ ব্যস্ত প্যান্ডেল রেটিং আর বিজয়া অফারে। একদিকে উন্নত প্রযুক্তির আলো, অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের উষ্ণতা ও সামাজিক সংহতি।
তবে এই বদলের মধ্যেও রয়েছে আশা। আধুনিক বাঙালি এখন স্বনির্ভর, চিন্তাশীল ও বিশ্বমানবতার নাগরিক। বিশেষ করে নারীরা—যারা একসময় শুধু ‘মায়ের প্রতিমা’ ছিলেন, আজ তারা নিজেরাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্গার রূপে লড়ছেন। এই রূপান্তরই সময়ের সবচেয়ে বড় বিজয়া।
অতএব, বিজয়া দশমীর এই পরিবর্তনকে আমরা একপাক্ষিকভাবে দুঃখের চোখে দেখব না। বরং এটিকে দেখব বাঙালির সংস্কৃতির বিবর্তন হিসেবে—যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা পাশাপাশি হাঁটছে। শুধু প্রয়োজন, ডিজিটালের ভেতরেও যেন মানবিকতার সুর অটুট থাকে।
শেষমেশ বলা যায় —
> দেবী ফিরে যান কৈলাসে, কিন্তু প্রতি বছর তিনি ফিরে আসেন আমাদের মননে।
বিজয়া দশমী তাই কেবল বিদায় নয়, এক নতুন আত্মজাগরণের সূচনা।
