হোমওয়ার্ক কমিটি ও ল্যাজেগোবরে সমাচার
কলমে: আভিরূপ ভট্টাচার্য

সেদিন স্কুলের পেছনে এক নিমগাছের তলায় গম্ভীর মিটিং বসেছে। একদিকে বসে আছেন প্রফেসর বেগুন উচিংড়ে। তিনি চোখে তিন জোড়া চশমা পরেন; এক জোড়া দিয়ে সামনের লোক দেখেন, এক জোড়া দিয়ে পেছনের অতীত দেখেন, আর শেষ জোড়াটা রাখা থাকে ডাবের জল মাপার জন্য। তাঁর মাথায় উচিংড়ের মতো অ্যান্টেনা, আর নাকটা ঠিক একটা টসটসে বেগুনের মতো ঝুলছে। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য হলো—কেন একটা গোল আলু যে আসলে গোল নয়, তা দশ পাতার জ্যামিতিক উপপাদ্য দিয়ে প্রমাণ করা।
উল্টোদিকে তড়পাচ্ছেন শ্রী হাবুলচন্দ্র ঘাড়ত্যাড়া। এককালে ‘সূর্য আসলে জোনাকি পোকার চেয়েও ছোট’—এই হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে তাঁর ঘাড় সাতাশ ডিগ্রি বেঁকে যায়, সেই থেকে তিনি কমিটির বিদ্রোহী সদস্য। তাঁর দাবি, হোমওয়ার্ক হলো বিড়ালের ভাষা শেখার পথে একমাত্র বাধা।
মিটিং শুরু হতে দেরি হলো, কারণ ঘাড়ত্যাড়া মহাশয় দরজা দিয়ে না ঢুকে জানলার ফোকর দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। তাঁর দাবি, “সোজা পথে বুদ্ধি কমে যায়।“ শেষে একটা দেশলাই কাঠি দিয়ে দেয়াল খুঁড়ে তিনি ভেতরে এলেন। তাঁর কাঁধের ব্যাগটা এতই ভারী যে বসার আগেই চেয়ারটা আর্তনাদ করে ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গেল। উপায় না দেখে তিনি সিলিং ফ্যান ধরে ঝুলে পড়লেন।
ঝুলন্ত অবস্থাতেই ঘাড়ত্যাড়া চেঁচিয়ে বললেন, “উচিংড়ে সাহেব! হোমওয়ার্ক বন্ধ করুন! বাচ্চারা বিড়ালের ‘ম্যাঁও’ আর আরশোলার ‘টিকটিক’ শোনার সময় পাচ্ছে না। বিড়ালের ভাষায় উচ্চশিক্ষা না নিলে দেশ রসাতলে যাবে!”
উচিংড়ে বিরক্ত হয়ে বললেন, “বিড়ালের ভাষা দিয়ে হবেটা কী? ওরা কি আর লজারিদম জানে?”
অমনি ঘরের কোণ থেকে একটা ছ’ফুটের হুলো বিড়াল টাই পরে বেরিয়ে এল। গম্ভীর স্বরে বলল, “আমরা কি ফালতু? আমাদের ব্যাকরণ জানলে তো জিলিপি ভাজতে সুবিধা হতো!” এই বলেই সে একটা দেশলাই বাক্সের ভেতর ঢুকে বিচ্ছিরি সুরে গান গাইতে লাগল।
উচিংড়ে রেগে বললেন, “থামো! ঘাড়ত্যাড়া, তোমার ওই দলিলগুলো বের করো তো দেখি।“
ঘাড়ত্যাড়া ব্যাগ থেকে বের করতে লাগলেন একের পর এক জিনিস—ছাঁটা পেন্সিল, তিনটে নেড়ি কুকুর, এক ডজন নীলকণ্ঠ পাখি, এমনকি জ্যান্ত দুটো হনুমান! কিন্তু কাগজ আর বেরোয় না। হনুমান দুটো বেরিয়েই ঘাড়ত্যাড়াকে তাদের পূর্বপুরুষ ভেবে এমন খামচি দিল যে তাঁর বাঁকা ঘাড়টা উল্টোদিকে ঘুরে গেল।
পুরো ঘরে তখন বিড়ালের গান, কুকুরের ঘেউ-ঘেউ আর হনুমানের কিচিরমিচিরে এক ল্যাজেগোবরে অবস্থা! প্রফেসর উচিংড়ে তাঁর তিন জোড়া চশমা খুলে জানলা দিয়ে লাফ দিলেন, আর হাবুলচন্দ্র ঘাড়ত্যাড়া হনুমানদের পিঠে চড়ে আকাশের দিকে দৌড় লাগালেন। কমিটিও শেষ, হোমওয়ার্কও শেষ—মাঠে পড়ে রইল শুধু একটা আধখাওয়া বেগুন আর একটা তেরচা জ্যামিতি বক্স।
**********************************
লেখক পরিচিতি:
অভিরূপ ভট্টাচার্য একজন নবীন ও প্রতিভাবান লেখক। বর্তমানে তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ছোটবেলা থেকেই গল্প, সাহিত্য ও কল্পনার জগৎ তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। বই পড়ার পাশাপাশি নিজেও নতুন নতুন গল্প লিখতে ভালোবাসেন। সহজ ভাষায় মজার ও কল্পনাপ্রবণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অল্প বয়সেই সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। এটি তাঁর প্রকাশের উদ্দেশ্যে পাঠানো প্রথম গল্প, এবং তিনি ভবিষ্যতে আরও সুন্দর ও সৃষ্টিশীল লেখার মাধ্যমে পাঠকদের মন জয় করতে চান।
অসাধারণ ও মানসম্মত এ পত্রিকাটির উত্তরোত্তর উৎকর্ষতা ও প্রচার বৃদ্ধি হোক।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা