ঝলসানো হৃদয়
– হান্নান বিশ্বাস
জয়িতার সাথে তমালের কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়ে যায় একটা শপিং মলে। তমালের গ্রাম শহর থেকে কিছুটা দুরে। জয়িতা অন্য জেলার বাসিন্দা। তমালের গ্রামে জয়িতার মাসির বাড়ি। সেই সূত্রে ব্যঙালোরে নার্সিং করার সময় তাদের পরিচয় ঘটে। শপিং মলে বাজার করে মাসির বাড়ি যাওয়ার কথা জয়িতার। তমাল একটু ঘুরতে বেরিয়ে ছিল। শপিং মলের পাশে একটি চায়ের দোকানে বসেছিল তমাল। শপিং মলে ঢোকার মুখে কাউন্টারে কাঁধের ব্যাগটি রাখতে গিয়ে তমালের চোখে চোখ পড়ে জয়িতার।
তমালঃ- আরে! জয়িতা তুমি? এখানে কোথায়?কখন এলে বাড়ি থেকে?অনেক দিন ধরে তোমার তো কোন খোঁজা পাওয়া যায় না। ব্যাঙ্গালোর থেকে আসার পর আর তোমাকে ফোনে পাইনি।
জয়িতাঃ- জানো তমাল; নার্সিং ট্রেনিং শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমার মোবাইল সহ ব্যাগ ছিনতাই হয়ে যায়। জি আর পি অফিসে একটা জি ডি ও করি। কিন্তু আজও কোন হদিস মিলছে না।
তমালঃ- ও হো! আমার ছোট মামার শালা বাবু তো ঐ অফিসের স্টাফ। আগে যদি জানতাম! আমি তো বারবার তোমার মোবাইলে কল করলে সুইচ স্টপ বলছে।
আমি…. তো ভাবছিলাম অন্যকিছু।
জয়িতাঃ-কি বলতে চাইছো তুমি?
তমালঃ- ও কিছু না।
জয়িতাঃ-মানে!
তমালঃ- তুমি তো আমার নম্বরে অন্যকোনো ভাবেও ফোন করতে পারতে।
জয়িতাঃ- মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ালো। মুখে কিছুই বলল না। কারণ তমালের ফোন নং তার মনে ছিল না। এমনকি ডাইরীতেও লেখা ছিল না।
তমালঃ- কি হল? কিছু বলছ না যে। আমি কিছু ভুল বললাম।
জয়িতাঃ-না।
তমালঃ- তবে কি অনধিকার চর্চা করছি?
জয়িতাঃ-না। জয়িতা প্রসঙ্গ এড়ানোর চেষ্টা করে। কারণ তার কাছে তমালের নং ছিলনা। তার জন্য লজ্জা বোধ হচ্ছিল তার।থাকনা তমাল ওসব কথা। সময় করে তোমাকে সব বলব। হাতে সময় থাকলে মলে ঢুকতে পারি কি?
তমালঃ- অফকোর্স। তুমি আমার এলাকায় এসেছ,আর আমি সময় দেবনা তা কি হয়? বল কি বাজার করবে?
জয়িতাঃ- এই মাসির জন্য শাড়ি,সায়া, ব্লাউজ। ফুটফুটে বাচ্চাটার জন্য একটা কিছু। আর……..।
তমালঃ- আর মেসোমশাইয়ের জন্য শার্ট প্যান্ট; তাইতো?
জয়িতাঃ- ঘাড় নেড়ে সাই দিল। কারণ এসময় তার খচ করে একটা কথা মনে পড়ে যায়। তমাল কে নিয়ে অনেক ঘুরেছে। বহু কেনা কাটাও করেছে। তাই তাকে একটা টি শার্ট কিনে দেওয়ার ইচ্ছা ও অঙ্গিকারও করেছিল।হয়ে ওঠেনি। তমালের ওসব মনে নেই।
দুজনেঃ- পছন্দ করে মাসির জন্য শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ এবং মেসোমশাইয়ের জন্য শার্ট-প্যান্ট আর পুঁচকের জন্য ….কিনলো।
তমালঃ- এবার চলো।
জয়িতাঃ-আর একটু থামো।
‘তোমার জন্য কিছু?,বলল তমাল।
‘না গো না বলেই, ঝোলানো টি শার্ট গুলো দেখতে থাকলো, জয়িতা।
তমালঃ- এটা কার জন্য?
জয়িতাঃ-আছে একজন। তোমার কত লাগে? XLনা XXL?
তমালঃ- আমার কেন? নাকি আমার মতোই কেউ?
জয়িতাঃ-ও, তোমাকে পরে বলব সব।
তমালঃ- XL টাই বেশি ইউজ করি।XXLপরলে নিজেকে Unsmart লাগে।
জয়িতাঃ-দেখ তো কালার টা ঠিক লাগছে কিনা। বলেই একটা হাতে তুলে দেখালো।
তমালঃ- Wow! Excellent colour! তমাল কিছুই বুঝলো না। কিন্তু জয়িতা মনে মনে খুব খুশি হল।তার অনেক দিনের ইচ্ছে পূরণ হতে চলেছে।
জয়িতাঃ-তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমি ক্যাশ কাউন্টার থেকে আসছি। ক্যাশ কাউন্টারে পে করতে গিয়ে জয়িতা QR CODE মোবাইলে নিলেও amount আসছে না। বারবার চেষ্টা করতে থাকল। কিন্তু কোন ভাবেই হচ্ছে না। মেসেজ আসছে Net banking service interrupted for three days. অর্থাৎ তিন দিনের জন্য নেট ব্যাঙ্কিং এর সমস্যা।
জয়িতার চোখে মুখে একটা অস্বস্তি দেখল তমাল।
কি হল জয়িতা? Any problem? বলে এগিয়ে গেল সে।জয়িতার লজ্জায় মুখ লাল হয়ে গেল। মুখে কিছুই বলতে পারছিল না। এমন ঘটনা তার কোনদিন ঘটেনি জীবনে। তাছাড়া এই নতুন মোবাইল টা তার এখনো রপ্ত হয়নি তেমন।
জয়িতাঃ- দেখ তো,এটা কি হচ্ছে। Amount আসছে না কেন?
তমাল মোবাইল টা হাতে নিয়ে দেখলো মেসেজ টা। আরে, এটা তো নেট ব্যাঙ্কিং এর সমস্যা। তিন দিনের জন্য। ক্যাশ পে করা যাবে না তো।
জয়িতাঃ- কি হবে তাহলে? জয়িতার আত্মসম্মানে আঘাত লাগল। চোখ মুখ রক্ত বর্ণ হয়ে গেল। ও বুঝতে পারছিল না যে এখন তার কি করা উচিত।
তমালঃ- একটু থামো,দেখছি কি করা যায়। হঠাৎ মনে হল মা তাকে দোকানের 5000/ কিস্তির টাকা দিতে পাঠিয়ে ছিল। ওটা দিয়ে দেবে জয়িতাকে। একদিকে বান্ধবীর মানসম্মান অন্যদিকে উপায় হীন পরিবারের কিস্তি পরিশোধ। বিচলিত হচ্ছিল এসব ভেবে। সাত পাঁচ ভেবে টাকাটা পকেট থেকে বের করে দিল জয়িতার হাতে। ইতস্তত করছিল সে।
‘না থাক’- বলল জয়িতা।
তবু গুঁজে দিল হাতে।
জয়িতা ভাবছিল, সে বারবার হেরে যাচ্ছে তমালের কাছে। আজকের ঘটনায় তার আত্মবিশ্বাস যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তমালের কাছে একেবারে নিরুপায় হয়ে টাকা টা ধরল শেষমেশ। পে করার পর অবশিষ্ট তিন শো টাকা তমাল কে ফেরৎ দিল।কিন্তু সে যেন আর নিজের মধ্যেই রইল না।
টাকা টা দেওয়ার পর তমালের মনেও তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। কারণ তার বাবা হার্টের পেশেন্ট,মা’য়ের সুগার আর থাইরয়েড। ওষুধ কিনতে বেশ কিছু মাসে গলে যায়। তমাল এখনো চাকরি পায়নি। দু-মাস হল instalment এ একটা ফ্রিজ কিনেছিল ওরা। ওই টাকা তো এখন বান্ধবীর হেফাজতে। নিজে থেকে না দিলে চাইতেও পারবেনা তমাল।দুজনের দুই বিপরীত মুখী সমস্যা দুজনকেই নিঃশেষ করে দিচ্ছিল নীরবে। মলের বারান্দায় এক কাছে থেকেও তারা যেন আলাদা আলাদা গ্রহে বিচরণ করতে লাগলো। দুটো পাহাড়ের দুরত্ব এড়াতে যেমন কাঠের সাঁকো দিয়ে সংযোগ রক্ষা করা হয় তেমনি সম্পর্কে মল থেকে বেরিয়ে এলো ওরা।
জয়িতা বাবার একমাত্র মেয়ে। বাবা মোটা মাইনের চাকরি করেন। মা একজন গৃহবধূ। চাইলেই কিছু টাকা সঙ্গে নিতে পারত। কিন্তু একবার যেহেতু ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে,তাই বাড়তি ঝুঁকি নিতে চায়নি ও।
মনে মনে অনেক পরিকল্পনা করেছিল তমালের সাথে দেখা হওয়ার পর। একসাথে লাঞ্চ করবে, ঘোরাঘুরি করবে। নদীর শান বাঁধানো ঘাটে কিছু সময় বসবে।
কিন্তু একটা ঘটনা যেন সব কিছুতে জল ঢেলে দিল।
মল থেকে বেরিয়ে এসব চিন্তা জয়িতার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। বেশ কিছুদিন বাদে যাচ্ছে মাসির বাড়ি। ফল মিষ্টি নেওয়া দরকার। কিন্তু ……….।
একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল জয়িতাকে।
তমাল অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। সে বুঝতে পারলো জয়িতার কিছু সমস্যা রয়েছে। নিজের সমস্যা নিয়ে ভাবছেনা সে। জয়িতার কাছে কোন নগদ টাকা নেই। আর টাকা না থাকলে মানুষ যে কত অসহায় তমাল সেটা ভালো করেই বোঝে। দোলাচলে হাঁটতে হাঁটতে একটা গাছের নিচে দাঁড়াল দুজনে।
এখানে একটু দাঁড়াও আমি আসছি,বলল তমাল।
জয়িতা বলল,’ঠিক আছে।’
বলেই একটা গলির ভিতর ঢুকে গেল সে।
কিছুক্ষণ বাদে একহাতে মিষ্টির প্যাকেট অন্যহাতে কিছু ফল নিয়ে এলো তমাল। এগুলো ধরো মাসির বাড়ি নিয়ে যাবে,বলল তমাল।জয়িতা আরও লজ্জিত হল। আবার খুশিও হল মনে মনে। কারণ তার কাছে আর কোন অপশন ছিল না।
তমালেরও মনে মনে খুব আফসোস হচ্ছিল।
সেও জয়িতাকে জোরাজুরি করতে পারছে না রেস্টুরেন্ট যাওয়ার জন্য। কারণ তার পকেট তো এখন গড়ের মাঠ।
এমতাবস্থায় জয়িতার মেসোমশাই উল্টো দিক থেকে এসে দেখল তাদের। বাইক থামিয়ে বলল,’আরে জয়িতা মামনি। বাড়ি থেকে আসছ বুঝি? একবার তো ফোন করতে পারতে। সত্যি বলতে, জয়িতার ইচ্ছে ছিল ফোন করার। কিন্তু সারাদিনে ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি তাকে সব ভুলিয়ে দেয়। ‘চল রেস্টুরেন্টে চল,’বলল মেসোমশাই।তুমিও এসো তমাল।
দুজনকেই রেস্টুরেন্টে খাইয়ে নিল মেসোমশাই।
তারপর হেলমেট পরে গাড়ি স্টার্ট করে জয়িতাকে নিয়ে চলে গেল।
চলবে।
লেখক: হান্নান বিশ্বাস, নদিয

শিরনামহীন কবিতা, এই গুচ্ছে কবি মকলেসুর রহমান, নতুন ভাষায় কথা বলতে চান, সন্দেহ নেই। ভাষার আদল গড়তে চান নতুন করে।…
কবি প্রজ্ঞা পারিজাতের কবিতা "যত্ন" প্রেম দাম্পত্য নিয়ে লেখা কবিতা। সহজ অবয়বে এটি জীবন চর্চার গভীরে যেতে চেষ্টা করেছে। কিন্তু…
কবিতাটি প্রকাশ করবার জন্য মাননীয় সম্পাদক মহাশয় সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ মহাশয়
শ্যামল মণ্ডল রচিত "লোহার ভিতর দিয়ে হাঁটা" (১ম পর্ব) গল্পের পর্যালোচনা ◆ পর্যালোচনায় : শংকর হালদার শৈলবালা ◆ আলোচনা কাল…