“ব্যারাম”
অরবিন্দ সরকার
সেদিন সোমবার! বাগোড় গ্রামে বাসন্তী পূজা। খুব ধুমধাম, বহু লোকের সমাগম প্রাঙ্গণে। মেলা খেলা সমস্ত বসে বাগোড় হাইস্কুলের মাঠে। বহুদূর দূরান্ত থেকে মেলা দেখতে গোরুর গাড়ীতে টোপর বেঁধে আসে। সমীর মণ্ডলের বাড়িতে লোকজন এসেছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা গাভী জামাইকে দান করেছিলেন তাঁর শ্বশুর মশাই। গাভীটি খুবই ছোট , বাছুর সমেত দান। দুধ দেয় মোটামুটি এক গ্লাস মতো। গরুর যত্ন করতে খৈল লাগে এককেজি এবং পরিশ্রমের শেষ নাই। দুধের সমিতি আছে তাই সমীর খৈলের খরচ তুলতে সমিতিতে দুধ দিত। খাঁটি দুধের ফ্যাট উঠলো না।পরের দিন এক গ্লাস দুধে ,এক গ্লাস জল দিলো ।ফ্যাট উঠলো ভালো দাম পেল।পরের দিন সমীর দুধে দু গ্লাস জল দিলো ফ্যাট একই উঠলো।তারপরের দিন চার গ্লাস জল দিলে সমিতি দুধ ফেরৎ পাঠালো। সমীর আর গরুর যত্ন করা ছেড়ে দিল। গরু পোয়াল (খড়) বাড়ীর উঠানে রাখা নিজে নিজেই খেত।জলটা নাদা পূরন করা থাকত পাইপ দিয়ে। গোয়ালে যত্ন সহকারে ফ্যান টাঙানো আছে। সেদিন রাতে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে ফ্যান বন্ধ।গরু মশা তাড়াতে লেজ দুলাতে দুলাতে খড়কাটা বটিতে কেটে মাটিতে পড়ে গেল।আর বাছুরের গলায় দড়ি আটকে মরে পড়ে আছে। সকালে বাড়ীতে লোকজন ভরপুর।চা পান পর্ব শেষ হয়েই সমীরের বৌয়ের গোয়ালে চোখ চলে গেল ।দেখলো বাছুর টা গলায় দড়ি দিয়ে মারা গেছে। সমীর তাড়াতাড়ি গলার দড়ি খুলে দিল ও বললো এমনি ব্যারামে মারা গেছে। সমীরের বৌ বললো চিৎকার করে হায় হায়রে এ যে মহাপাপ। সঙ্গে সঙ্গেই চিৎকারে পাড়ার লোকজন ও তার ভাইয়েরা হাজির। বিধান দিলো সবাই ব্রাহ্মন দিয়ে এর প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। সমীর বাড়ি থেকে পালানোর ধান্দা খুঁজতে গিয়ে সবাই ধরে ফেললো। সমীরের গলায় গোরুর দড়ি পড়িয়ে ভিক্ষা করতে পাঠালো। ব্রাহ্মন বেলা বারোটার সময় এলো। সমীরের মস্তক মুণ্ডন করা হলো।গোয়ালে শ্রাদ্ধ হ’য়ে পুকুরে ঘাটের কাজে ওখানে গেল। মন্দিরের লাগোয়া ঘাটে সমীরের শ্রাদ্ধ দেখতে ভীড় জমে গেলো ।সবাই জিজ্ঞাসা করতে থাকলো কি হয়েছে? সমীর বললো ব্যারাম। আপনারা যেখানে এসেছেন সবাই সেখানে যান। আপনাদের যখন শ্রাদ্ধ হবে তখন দেখবেন। বামুনের মন্ত্রপাঠে সমীর শুধুই মুখ বন্ধ করে কপালে হাত দিচ্ছে। শ্বশুরবাড়ির লোকদের গালিগালাজ মন্ত্রের বদলে। এমন গাভী দান করেছেন যে এককাপ দুধ দেয় না। অদান গরুদানে নিদান এই! ঘাটের কাজ শেষে গো- ডহরে হোবিষ্যি পর্ব। খাওয়া তো দূর অস্ত বমিটমি করে একাকার। হাঁড়ি পুকুরে ডুবিয়ে বাড়িতে ফিরে এক কাপ চা সেবন। রাত্রি বেলা খইসেবন ঐ গাভীর দুধে। বাড়ীর লোকজন উনুন বন্ধ শুনে যে যার বাড়ি ফিরে গেছে। সমীর সকালে লেজকাটা গাভীর গার্ডার দিয়ে নকল লেজ বানিয়ে বিক্রি করে দিয়ে গোয়ালে প্রণাম করলো।মা বাসন্তী ভগবতী ভাগ্যিস তুমি মারা গেলে? আমার শ্রাদ্ধ তো হলো,আরো গ্যাটের কড়ি খরচ হতো চারদিনের মেলার ছলে। মা ভগবতী ব্যারাম দিয়ো মা তোমার পূজোর সময়।