নদীর বয়স বাড়ে না ✓শুভ্রনীল ধর নীল-ই 

Spread the love

নদীর বয়স বাড়ে না

✍️শুভ্রনীল ধর নীল-ই

 

রেহা-রা পুজোর পর চলে যাবে— খবরটা পাড়ায় ছড়াতে খুব বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু খবরটা সুবর্ণর ভেতরে পৌঁছাতে কয়েকটা দিন লেগেছিল। প্রথম দিন সে খবরটাকে গুজব ভেবেছিল, দ্বিতীয় দিন নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে এতে তার কিছুই যায় আসে না। অথচ তৃতীয় দিনের বিকেলে গঙ্গার ধারের বকুলতলায় বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার মনে হলো, গত চারদিনে রেহার সঙ্গে দেখা হয়নি। আর তখনই বুকের ভেতর কোথাও একটা নরম শূন্যতা তৈরি হলো।

সুবর্ণ তখন ইকোনোমিক্স অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র। কলেজ, ক্লাব, আড্ডা আর বন্ধুদের নিয়ে তার জীবন বেশ স্বাভাবিকভাবেই এগোচ্ছিল। মফস্বলগুলো যেমন হয়— একটা বাজার, একটা স্কুল, কয়েকটা ক্লাব, নদীর ধারে একটা ঘাট, আর সেই ঘাটকে ঘিরে অসংখ্য গল্প। বাইরে থেকে সব মফস্বলকেই একরকম লাগে, কিন্তু যারা সেখানে বড় হয় তারা জানে, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মোড়, প্রতিটি বিকেলেরও আলাদা আলাদা ইতিহাস থাকে।

সুবর্ণদের মফস্বলের ইতিহাসের বড় অংশ জুড়ে ছিল স্বামীজী সংঘের মাঠ, গঙ্গার ঘাট আর বকুলতলা। আর সেই বছর সেই ইতিহাসের ভেতর ঢুকে পড়েছিল একটা নাম, রেহা রায়চৌধুরী।

পুজোর তিন মাস আগে ক্লাবে স্মরণিকা বের করার সিদ্ধান্ত হলো। সিদ্ধান্ত যত সহজ, কাজ তত সহজ নয়। লেখা চাই, বিজ্ঞাপন চাই, টাকা চাই। আর এই সবকিছুর মাঝখানে ঋক নিজেকে সম্পাদক ঘোষণা করে বসল। বাংলা বানানের সঙ্গে যার চিরকালীন শত্রুতা, সে সম্পাদক হয়েছে শুনে সবাই যথেষ্ট আনন্দ পেয়েছিল।

সেইদিন ক্লাবঘরে বসে স্মরণিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে, এমন সময় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল একটি মেয়ে।

— গল্প জমা দেওয়ার শেষ দিন কবে?

ঋক চশমা ঠিক করে গম্ভীর গলায় বলল,

— সাহিত্যকে ডেডলাইনের মধ্যে বাঁধা যায় না।

মেয়েটা একবার তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

— তাহলে বিজ্ঞাপনদাতাদেরও বলুন টাকা না দিতে।

ঘরের মধ্যে হাসির রোল পড়ে গেল। ঋকের মুখ দেখে মনে হচ্ছিল, জাতীয় অপমানের শিকার হয়েছে।

সেদিনই প্রথম রেহাকে লক্ষ্য করেছিল সুবর্ণ।

পরে বহুবার ভেবে সে বুঝেছে, জীবনের বড় ঘটনাগুলো কখনও ঢাকঢোল পিটিয়ে আসে না। তারা আসে একেবারে সাধারণ কোনো বিকেলের ছদ্মবেশে।

রেহা-র বাবার সরকারি চাকরি। বদলির চাকরি। তিন-চার বছর পরপর নতুন শহর, নতুন বাড়ি, নতুন মানুষ। তাই নতুন জায়গার সঙ্গে খুব বেশি জড়িয়ে পড়ার অভ্যাস তাদের পরিবারের কারও ছিল না। কিন্তু আশ্চর্যভাবে, রেহা খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে তাদের আড্ডার অংশ হয়ে উঠল। কখনও ক্লাবের লাইব্রেরীতে, কখনও গঙ্গার ঘাটে, কখনও বকুলতলায়।

মেয়েটা অদ্ভুত ছিল। সে এমন সব প্রশ্ন করত, যার উত্তর কেউ জানত না।

একদিন গঙ্গার ধারে বসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,

— বলো তো, নদীর বয়স বাড়ে?

ঋক সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— পরীক্ষায় আসবে?

— না।

— তাহলে উত্তরও দেব না।

রেহা হেসে ফেলল।

সেই হাসিটা শুনলে সুবর্ণর দিন ভালো হয়ে যেত। কেন হতো, সে তখনও জানত না।

শরৎ নামছিল ধীরে ধীরে। নদীর ধারে কাশফুল ফুটেছে, সন্ধ্যার বাতাসে ছাতিমের গন্ধ। স্মরণিকার কাজ করতে করতে কখন যে রেহা আর সুবর্ণ একটু বেশি কথা বলতে শুরু করেছে, সেটা কেউ টের পায়নি।

একদিন তিনজনকে পাঠানো হলো নদীর ওপারের বাজারে বিজ্ঞাপন আনতে। যাওয়ার সময় আকাশ পরিষ্কার ছিল, কিন্তু ফেরার সময় কালো মেঘে ঢেকে গেল চারদিক।

ঋক বলল,

— আমি আগেই বলেছিলাম, ছাতা নিয়ে বেরোতে।

— তুই তো নিজেই আনিসনি।

— সম্পাদকদের ছাতা লাগে না।

— সম্পাদকদের বুদ্ধি লাগে।

রেহার উত্তর শুনে সুবর্ণ হেসে ফেলল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। তিনজন দৌড়ে আশ্রয় নিল পুরনো ফেরিঘাটের টিনের ছাউনির নিচে। বৃষ্টির শব্দে চারদিক ভরে গেছে। গঙ্গার বুকজুড়ে ঝরে পড়া ফোঁটাগুলো যেন জলের উপর অসংখ্য গল্প লিখে চলেছে।আকাশ যেন মেঘের সঙ্গে চুক্তি করে আজ সারাদিন কাঁদতে বসেছে। ভেজা বাতাস, মাটির সোঁদা গন্ধ আর গঙ্গার শান্ত স্রোত—সব মিলিয়ে প্রকৃতি আজ এক অনন্য, মায়াময় রূপে ধরা দিয়েছে..

সুবর্ণ হঠাৎ লক্ষ্য করল, বৃষ্টিতে ভেজা চুল কপালে লেগে আছে, গালের পাশে একটা জলের ফোঁটা আটকে আছে, আর রেহা হাসছে।

খুব সাধারণ একটা দৃশ্য।

তবু সুবর্ণের মনে হলো, পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যেন এই এক মুহূর্তে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টিভেজা গঙ্গার ধারে, ধূসর আকাশের নিচে, রেহার সেই নির্ভার হাসিটা যেন তার চারপাশের সব শব্দকে ম্লান করে দিল। সে বুঝতে পারল না ঠিক কখন থেকে, কিন্তু এই হাসিটা দেখার জন্যই হয়তো সে অপেক্ষা করে থাকে..

সেদিন ফেরার সময় বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল। কিন্তু সুবর্ণ বুঝেছিল, তার ভেতরে অন্য কিছু শুরু হয়েছে।

তারপর থেকে অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটতে লাগল। দিনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতে বারবার রেহার কথাই মনে পড়ে।

মানুষের জীবনে প্রেম আসার কোনো শব্দ হয় না। শুধু একজন মানুষ হঠাৎ ধীরে ধীরে সবার থেকে আলাদা হয়ে ওঠে।

ঋক অবশ্য অনেক আগেই বিষয়টা ধরে ফেলেছিল।

একদিন বকুলতলায় বসে বলল,

— তুই প্রেমে পড়েছিস।

সুবর্ণ চমকে উঠল।

— কার প্রেমে?

— আমার ঠাকুমার।

বলেই সে এমনভাবে হাসল যে রেহা-ও হেসে ফেলল।

সেই হাসির দিকে তাকিয়ে সুবর্ণর মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ বোধহয় নিজের মনকে লুকিয়ে রাখা।

পুজো এগিয়ে আসছিল। স্মরণিকাও বেরিয়ে গেল। রেহা-র একটা গল্প ছাপা হয়েছিল সেখানে। গল্পটা ছিল এমন এক মেয়েকে নিয়ে, যে বারবার শহর বদলায়। শেষ লাইনে লেখা ছিল—

“সব মানুষ চলে যায় না, কেউ কেউ একটা জায়গার ভেতর রয়ে যায়।”

লাইনটা পড়ে অকারণেই সুবর্ণর বুক কেঁপে উঠেছিল, তিনদিন পর সে বুঝল কেন।

রেহার বাবার বদলির চিঠি এসেছে।

পুজোর পর তারা চলে যাবে অন্য কোনো শহরে।

খবরটা শোনার পর তার মনে হলো, একটা অচেনা মানুষ কখন যে জীবনের সম্পূর্ণ অংশ হয়ে যায় সেটা বোঝা যায় না। শুধু হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে তার গুরুত্ব বোঝা যায়..

সপ্তমীর সন্ধ্যায় তারা দেখা করলো আলাদা করে ,দুজনে গঙ্গার ধারে হাঁটছিল, নদীর ওপারে আলো জ্বলছে। হাওয়ায় ছাতিমের গন্ধ।

রেহা বলল,

— জানো, ছোটবেলায় ভাবতাম বড় হলে মানুষ খুব সাহসী হয়ে যায়।

— হয় না?

— না। বড় হলে শুধু হারানোর জিনিস বেড়ে যায়।

কথাটা বলে সে মুচকি হেসেছিল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরের মনখারাপটা সুবর্ণর চোখ এড়ায়নি।

সেই মুহূর্তে সুবর্ণর খুব ইচ্ছে করছিল বলতে,

“তুমি যেও না।”

আরও ইচ্ছে করছিল বলতে,

“আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।”

কিন্তু বলা হলো না.. কিছু কিছু কথা মানুষের বুকেই জন্মায়, বুকেই থেকে যায়।

অষ্টমীর রাতে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল। সব ভিড় তখন পুজোর প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে, বকুলতলায় লোকজন ছিল না বললেই চলে। সুবর্ণ আর রেহা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল, নদীটা যেন দিন দিন তাদের ভীষণ আপন হয়ে গিয়েছিল, হঠাৎ রেহা বলল,

— যদি কোনোদিন খুব মনে পড়ে, তখন কী করবে?

— জানি না।

— আমি জানি।

— কী?

— নদীর ধারে এসে বসব।

— কাজ হবে?

— জানি না। তবে মনে হবে সবকিছু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে ব্যাগ থেকে একটা বই বের করল রেহা।

— এটা তোমার জন্য।

— কেন?

— এমনিই।

সুবর্ণ আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

বিসর্জনের দিন শহরটা সবসময় একটু মনখারাপ করে। আনন্দ থাকে, কিন্তু বিদায়ও থাকে। সেদিন প্রতিমা জলে নামানোর সময় ভিড়ের মধ্য রেহা চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

অনেকক্ষণ পরে বলল,

— আগামী বছর এই সময় আমরা কোথায় থাকব বলো তো?

— জানি না।

— আমিও না।

দুজনেই নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। দেখলো গঙ্গা বয়ে যাচ্ছিল তার আপন মনে,প্রতিমা ধীরে ধীরে জলের ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে। আর সুবর্ণর মনে হচ্ছিল, জীবনের কিছু মুহূর্তও বোধহয় এমনই— চলে যাওয়ার সময়ই তাদের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়।

রেহা-রা চলে গিয়েছিল দুদিন পরে।

কোনো নাটক হয়নি, কেউ দৌড়ে যায়নি।,কেউ কাউকে থামায়নি। শুধু একটা পরিবার মফস্বল ছেড়ে চলে গিয়েছিল। শুধু সুবর্ণ টের পেলো তাঁর বুকের বাঁ দিকে বিসর্জনের সুর বাজছে।

সেদিন রাতে সুবর্ণ রেহার দেওয়া বইটা খুলেছিল।

প্রথম পাতা খুলতেই ভেতর থেকে একটা শুকনো বকুলফুল মেঝেতে পড়ে গেল।

আর পাতার কোণে ছোট্ট করে লেখা ছিল—

“সব অনুভূতির শব্দ হয় না। কিছু কিছু অনুভূতি শুধু থেকে যায়।”

কোনো নাম ছিল না। তবু সেই মুহূর্তে সুবর্ণ অনুভব করেছিল, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ভালোবাসাগুলো হয়তো মিলনের জন্য নয়; শুধু দুটো হৃদয়ে সমানভাবে বেঁচে থাকার জন্য জন্মায়।

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে।

ঋকের বিয়ে হয়েছে। স্বামীজী সংঘের মাঠে নতুন গ্যালারি উঠেছে। শহর বদলেছে, মানুষ বদলেছে, সময় বদলেছে,তবু শরৎ এলে এখনও গঙ্গার হাওয়ায় সেই চেনা গন্ধ ভেসে আসে।

এক সন্ধ্যায় বহু বছর পরে সুবর্ণ আবার বকুলতলায় এসে বসেছিল। সূর্য ডুবে যাচ্ছে। নদীর ওপারে আলো জ্বলছে।

তার মনে পড়ল, রেহা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল—

“নদীর বয়স বাড়ে?”

সেদিন সে উত্তর দিতে পারেনি। আজও তার কাছে উত্তর অধরা.. হয়তো নদীর বয়স বাড়ে না। কিছু কিছু স্মৃতিরও না। কিছু কিছু ভালোবাসারও না।

তারা ঠিক সেই জায়গাতেই স্তব্ধ থেকে যায়— একটা শরতের বিকেলে, গঙ্গার ধারে, বকুলফুলের গন্ধ মাখা একটা মফস্বল শহরে।

আর অনেক বছর পরেও, হঠাৎ কোনো সন্ধ্যায় বুকের ভেতর নরম একটা হাওয়া হয়ে ফিরে আসে।

তখন মনে হয়, কিছু মানুষ সত্যিই চলে যায় না।

তারা রয়ে যায় একটা মফস্বলের অজানা ভালোবাসা হয়ে, থেকে যায় একটা নদীর মধ্যে, আর একজন মানুষের সবচেয়ে সুন্দর বয়সটার মধ্যে।

হয়তো সেই কারণেই নদীর বয়স বাড়ে না..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

💬 Chat on WhatsApp