সংসার-অন্তহীন মায়ার বাঁধন
লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
রচনাকাল : ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬

অমিত বাবু আজ তাঁর একতলার বারান্দায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। সামনের বাগানটা অযত্নে আগাছায় ভরে গেছে, ঠিক যেমন তাঁর সাজানো সংসারটা আজ বিশৃঙ্খল। নিজের জীবনের দিকে তাকালে তিনি আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেন। এক সময় যে মানুষটা পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দিনরাত এক করে খাটতেন, আজ সেই মানুষটাই সবার কাছে ব্রাত্য।
অমিত বাবু মনে করতেন, শাসন মানেই দূরত্ব তৈরি করা। তাই তিনি স্ত্রী সুমিতা, ছেলে আকাশ আর মেয়ে তিতলিকে অগাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। জীবনের কোনো কঠিন বাস্তব তাদের স্পর্শ করতে দেননি। সুমিতার শপিংয়ের নেশা হোক বা আকাশের দামী বাইকের আবদার—সবকিছুই অমি বাবু হাসিমুখে পূরণ করেছেন। তিনি ভেবেছিলেন, এই স্বাধীনতাই তাদের হৃদয়ে তাঁর জন্য শ্রদ্ধা তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। অতিরিক্ত স্বাধীনতা তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলল। তারা শিখল শুধু নিতে, দিতে নয়।
অমিত বাবু: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) “আমি ওদের ডানা দিয়েছিলাম ওড়ার জন্য, কিন্তু ওরা সেই ডানা ব্যবহার করল আমার বুক থেকে দূরে চলে যাওয়ার জন্য। শাসনহীন স্বাধীনতা যে আসলে শৃঙ্খলাহীনতা, তা বুঝতে বড্ড দেরি হয়ে গেল।”
সংসারের যখনই কোনো অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে, অমি বাবু তা নিজের বুকের ওপর সয়েছেন, কিন্তু ঘরের কাউকে বুঝতে দেননি। ঋণের বোঝা যখন তাঁর ঘাড়ের ওপর পাহাড়ের মতো চেপে বসেছে, তখনও তিনি স্ত্রী-সন্তানের বিলাসিতায় টান পড়তে দেননি। বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সমস্যার কথা স্বীকার না করে তিনি বরং মিথ্যে আশ্বাসের দেয়াল তুলেছেন। ফলে পরিবারের সদস্যরা ভেবে নিয়েছে যে, বাবার কাছে টাকার কোনো টান নেই। তারা তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই স্বাচ্ছন্দ্যকে নিজেদের অধিকার বলে ধরে নিয়েছে।
একবার সুমিতা হীরের গয়নার বায়না ধরলেন। অমিত বাবু জানতেন তাঁর ব্যবসার অবস্থা তখন শোচনীয়, তবুও তিনি বন্ধুর কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা ধার করে সেই গয়না এনে দিলেন। এই ‘না’ বলতে না পারার দুর্বলতাই আজ তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময় যখন পাল্টালো, অমিত বাবুর শরীর ও ব্যবসা দুটোই যখন ভেঙে পড়ল, তখনই শুরু হলো আসল দহন। যেদিন তিনি প্রথমবার আকাশকে বললেন, “বাবা, এ মাসে তোমার ওই নতুন ফোনের টাকাটা আমি দিতে পারছি না,” সেদিন থেকেই আকাশের চোখে তিনি ‘অযোগ্য’ বাবা হয়ে গেলেন।
আকাশ : (বিরক্তির সুরে) “তুমি দিতে পারবে না কেন? সারা জীবন তো দিয়ে এলে, এখন হাত তুলে দিচ্ছ? তোমার এই ম্যানেজমেন্টের অভাবেই আজ আমাদের বন্ধুদের কাছে ছোট হতে হচ্ছে।”
সুমিতা : “তুমি আমাদের এই আভিজাত্যের অভ্যাস করিয়ে এখন কেন গরিবী দেখাচ্ছ? নিজের অক্ষমতা ঢাকতে এখন আমাদের ওপরেই দোষ চাপাচ্ছ।”
অমিত বাবু বুঝতে পারলেন, তিনি আসলে বাবা ছিলেন না, ছিলেন একটি চলমান ভাণ্ডার। দিতে দিতে যতদিন হাতভর্তি ছিল, ততদিন তিনি ছিলেন সবার প্রিয় ‘সুপার ড্যাড’। আজ যখন জোগান বন্ধ হয়ে গেছে, তখন তিনি এক মুহূর্তেই ‘খারাপ বাবা’ বা ‘অপদার্থ স্বামী’ হয়ে গেছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি ত্যাগকে আজ বিলাসিতার চোখে দেখা হচ্ছে। তিতলিও এখন বাবাকে এড়িয়ে চলে, কারণ বাবা তাকে আর দামী উপহার দিতে পারেন না।
অমিত বাবু আজ নিজের ঘরে একা। ঘরের অন্য প্রান্ত থেকে স্ত্রী-সন্তানের হাসির আওয়াজ ভেসে আসে, কিন্তু সেই হাসিতে অমিত বাবুর কোনো ভাগ নেই। তিনি বুঝতে পারছেন, সন্তানদের মানুষ করতে গিয়ে তিনি আসলে তাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের শিখিয়েছেন স্বার্থপর হতে, শিখিয়েছেন শুধু নিজের অধিকারটুকু বুঝে নিতে।
অমিত বাবু: “মানুষ বলে ‘দিতে দিতে নাকি ভালোবাসা বাড়ে’, আমি দেখলাম—দিতে দিতে মানুষের লোভ বাড়ে। আর যেদিন দেওয়া বন্ধ হয়, সেদিন ভালোবাসা নয়, জেগে ওঠে এক বুক ঘৃণা।”
সংসারের এই অন্তহীন টানাপোড়েনে অমিত বাবু আজ একাই দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর অতিরিক্ত স্বাধীনতা, বাস্তবের প্রতি উদাসীনতা আর অন্ধ মমতাই আজ তাঁর শান্তিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।
এক রাতে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে অমিত বাবু হঠাৎ নিজের ভেতর এক অদ্ভুত শক্তি অনুভব করলেন। তিনি বুঝলেন, এভাবে গুমরে মরে কোনো লাভ নেই। তিনি আজই শেষবারের মতো পরিবারের সবাইকে বসার ঘরে ডাকলেন। তাঁর কণ্ঠে আজ সেই পুরোনো দুর্বলতা নেই, বরং আছে এক কঠিন গাম্ভীর্য।
অমিত বাবু: “তোমরা সবাই শোনো। আজ থেকে এই বাড়িতে আর কোনো মিথ্যে আভিজাত্যের নাটক চলবে না। আমি আমার সমস্ত জমানো পুঁজি দিয়ে ছোট একটা গ্রসারি আউটলেট খুলছি। সেখানে আমি নিজে বসব। আর আকাশ, তুমি কাল থেকে টিউশনি শুরু করবে অথবা কোনো কাজ খুঁজবে। তিতলি, তোমার বাড়তি বিলাসিতা আজ থেকে বন্ধ। এই বাড়িটা আমি ভাড়া দিয়ে আমরা আমাদের পুরোনো গ্রামের পৈতৃক ভিটে বাড়িতে ফিরে যাব।”
অমিত বাবুর এই রুদ্ররূপ দেখে সুমিতা আর আকাশ স্তব্ধ হয়ে গেল। তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে, শান্ত স্বভাবের মানুষটা এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অমি বাবু স্থির করলেন, তিনি আর তাদের ওপর নির্ভরশীল হবেন না, বরং নিজের হারানো সম্মান ফিরে পাবেন পরিশ্রমের মাধ্যমে।
প্রথম কয়েকদিন বাড়িতে রণক্ষেত্র তৈরি হলো। আকাশ রাগ করে দুদিন না খেয়ে থাকল, সুমিতা কান্নাকাটি করলেন। কিন্তু অমিত বাবু অটল। তিনি সকালে উঠে নিজে দোকানে যাওয়া শুরু করলেন। রোদে পুড়ে, পরিশ্রম করে যখন তিনি রাতে বাড়ি ফিরতেন, তখন তাঁর চোখে একধরণের তৃপ্তি থাকত।
একদিন রাতে অমিত বাবু প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হলেন। সারাদিন দোকানে পরিশ্রম আর অনিয়মের ফলে শরীরটা ভেঙে পড়েছিল। মাঝরাতে তাঁর তৃষ্ণা পেল, কিন্তু গলার স্বর ফুটছিল না। হঠাৎ দেখলেন, আকাশ তাঁর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে আর তিতলি পাশেই বসে তাঁর পা টিপে দিচ্ছে। সুমিতা চোখের জল মুছতে মুছতে পাশে এসে বসলেন।
আকাশ : (গলা ধরে আসা স্বরে) “বাবা, আমাদের ক্ষমা করে দাও। আমরা বুঝতে পেরেছি তুমি আমাদের কতটা আগলে রেখেছিলে। আমি এক মাস ধরে টিউশনি করে যে হাজার টাকা রোজগার করেছি, সেটা প্রথম তোমার হাতেই দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার এই অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়ে গেছি বাবা।”
সুমিতা : “অমিত, আমি বুঝতে পারিনি তুমি একা কতটা লড়াই করেছ। আমাদের এই অতিরিক্ত স্বাধীনতা আর শখ মেটাতে গিয়ে তুমি নিজেকেই শেষ করে ফেলেছিলে। আর হবে না, আমরা সবাই মিলে এবার লড়াই করব।”
অমিত বাবুর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল আনন্দাশ্রু। এই দিনটার জন্যই তো তিনি অপেক্ষা করেছিলেন। তিনি বুঝলেন, দিতে দিতে যখন হাত খালি হয়েছিল, তখন তাঁর পরিবার তাঁকে চিনতে ভুল করেছিল। কিন্তু আজ যখন তিনি কঠোর হয়ে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করালেন, তখন তারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারল।
সংসারের সেই অশান্তির মেঘ কেটে গিয়ে এক নতুন রোদের দেখা মিলল। অমিত বাবু বুঝতে পারলেন, জীবন মানে কেবল অবারিত স্বাধীনতা নয়, জীবন মানে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। দিতে দিতে বাবা ‘খারাপ’ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সত্যের পথে চালিত করে আজ সেই বাবা আবার পরিবারের কাছে ‘আদর্শ’ হয়ে উঠল।
উপসংহার : অমিত বাবুর এই ঘুরে দাঁড়ানো কেবল অর্থনৈতিক ছিল না, এটি ছিল একটি পরিবারের নৈতিক পুনর্জন্ম। তারা শিখল যে, সংসারের মূল ভিত্তি ভোগ নয়, বরং ত্যাগ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
কর্তৃপক্ষকে অসংখ্য ধন্যবাদ
গল্পটি প্রকাশ করার জন্য কর্তৃপক্ষকে অসংখ্য ধন্যবাদ।