সম্প্রীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নজরুল ইসলামের কলম গর্জে উঠলে ও গ্রহণযোগ্য কতটা ছিল?

কলমে- বটু কৃষ্ণ হালদার

“আজও উজানের হাওয়া লাগেনি/ মাঝির নৌকা পালে /আজও সমাজে রক্ত ঝরে/ধর্ম ধর্মের বেড়াজালে”। উনিশ শতকে বাংলার দরবারে যে সমস্ত সাহিত্যিক বা মনীষীরা শুধু বাংলায় নয় সমগ্র বিশ্বজুড়ে সাহিত্যের আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি শুনিয়ে গেছেন সাম্য মৈত্রীর বাণী। হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মেলবন্ধনের সাঁকো তৈরি করেছিলেন। তাই তো তার কলমের আঁচড় দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল”মোরা একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান”। সময় আপন গতিতে বয়ে চলেছে, কিন্তু আজও হয়নি মানসিক পরিবর্তন। যে সমাজ কে কুসংস্কারমুক্ত করতেই এমন বহু মনীষীরা তাদের জীবনের সর্বস্ব টুকু উজাড় করে দিয়ে গেছেন, তাঁদের সংস্কার মুখী চিন্তাধারা শুধুমাত্র রয়ে গেছে বইয়ের পাতায়। এতটুকুও বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। কারন আজো এই অবক্ষয় সমাজে ধর্ম ধর্মের বেড়াজালে আপনার হাত রক্তে রঞ্জিত করি। সু_সভ্যতার রং লাগিয়ে নিজেদেরকে কখন যে অসভ্যতার দাসে পরিণত করে ফেলেছি তা বুঝতেও পারেনি কেউ। বর্তমানে সমাজের বুকে মেলবন্ধনের সেতুতে ফাটল ধরেছে। তা বোধ হয় আজ আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি। এতোটুকু বদল হয়নি সামাজিক চরিত্রের কলঙ্কময় বৈশিষ্ট্য। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কলম গর্জে উঠেছিল এই সমাজের বুকে অসহায় দিন দরিদ্রের জন্য, পাষণ্ড অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে। পরাধীনতার যন্ত্রনা তার বুকে কুরে-কুরে খেত।তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার মন্ত্রে দীক্ষিত করার ডাক দেন।তাঁর কলমের ডগায় আগুন জ্বালিয়ে লিখেছিলেন দেশ বীরদের উদ্বুদ্ধ করতে। সমাজের বুকে ঘুমন্ত মানুষগুলোর ঘুম ভাঙাতে লিখেছিলেন”দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার হে/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার”। দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করতে লিখেছিলেন অজস্র বিদ্রোহী কবিতা। তার লেখনীতে দুর্বল ভীরু কাপুরুষ রা উজ্জীবিত হয়ে, বিদ্রোহ করে তোলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। তাঁর মন্ত্র বীনার অমৃত সুধা পান করে দিশেহারা যুবসমাজ খুঁজে পায় আলোর দিশা। দেশের সন্তানরা মায়ের মুক্তির জন্য অবলীলায় দিয়েছেন হাজার হাজার প্রাণ। তাই প্রতি রইল আমাদের গভীর সমবেদনা ও  আন্তরিক ভালোবাসা। যুগ যুগ ধরে তিনি আজও সবার হৃদয়ে মাঝে আলোকিত হয়ে রয়েছেন।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল শুধুমাত্র সু সাহিত্যিক নন, তিনি একাধিক গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি কবিতার সাথে সাথে লিখেছিলেন অজস্র গান। মুসলিম জাতির জন্য যেমন বিয়ের, মহরমের, দর বেশীর গানের সুর বেঁধেছিলেন, তেমনি অমুসলিমদের জন্য রচনা করেছিলেন বহু শ্যামা সংগীত। “বল রে জবা বল/কোন সাধনায় পেলি রে তুই শ্যামা মায়ের চরণতল”। তিনি ও অ_ মুসলমানদের জন্য গান বেঁধে সামাজিক সমন্বয় গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাঁর রচনা ধর্মের গণ্ডিকেও সারিয়ে বহুমাত্রিক রূপ ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিল। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ ত্রয়োদশ শতকে বাংলার বৈষ্ণব ধর্মের পাশাপাশি শাক্ত ধর্মের উদ্ভব ঘটে এবং তাকে কেন্দ্র করে শাক্ত গীতি চর্চা ধারণা প্রচলিত হয়। এই সময়ে বঙ্গদেশে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈষ্ণব ধর্মের চেয়ে শাক্ত দর্শন ও পূজা ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। তবে শ্যামা সংগীত এর ধারণাটি বিকাশ লাভ করে খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতকে। আঠারো শতকের মধ্যভাগে সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন শ্যামা সঙ্গীতের প্রাণ সঞ্চার করেন। বাংলা সাহিত্য জগতে শাক্ত পদাবলী শ্যামা সংগীত নামে একটি বিশেষ সংগীত ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তবে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ শ্যামা সংগীত রচনা করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তৎকালীন সময়ে ভারত বর্ষ উত্তাল ছিল,একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর অন্যদিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের গনগনে আগুনের আঁচ চারিদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে। পুঁজিবাদী দেশগুলো আগ্রাসন নীতি শুরু  করেছিলেন। সে সময়ে প্রতিবাদ ছিল নজরুল ইসলামের একমাত্র ভাষা। সাথে সাথে শাক্ত দর্শন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল কাজী নজরুল ইসলামকে।

শাক্ত ধর্ম মানে শাক্ত বাদ। হিন্দু ধর্মের প্রধান তিনটি বিভাগের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম ও ব্যাপক জনপ্রিয়। হিন্দু ধর্মের একটি শাখা সম্প্রদায় ছিল শাক্ত অনুগামীরা। হিন্দু দিব্য মাতৃকা শক্তি বা দেবী পরম ও সর্বোচ্চ ঈশ্বর, এই মতবাদের উপর ভিত্তি করে শাক্ত ধর্মের উদ্ভব আর এই শাক্ত দর্শন থেকে নজরুল শ্যামা সংগীত রচনা শুরু করেন। তিনি শ্যামা মায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন“আমার হাতে কালি মুখে কালি/মা আমার কালি মাখা মুখ দেখে মা/পাড়ার লোকে হাসে খালি”। শাক্ত পূজায় তার ভক্ত হৃদয়ের আকুলতা ও অকৃত্রিম আকুলতা ও আরতি রাঙা জবা গানে খুঁজে পাওয়া যায়। নজরুল ইসলামের শ্যামা সংগীত চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ “রাঙা জবা” ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত হয় ১০০ টি শ্যামা সংগীত রচনা নিয়ে। তৎকালীন সময়ে গ্রন্থটির মূল্য ছিল তিন টাকা। শুধু তাই নয় নারী শক্তির প্রতি নজরুলের ভগ্ন হৃদয়ের অকৃত্রিম আকুলতা চিরকাল ছিল। সেই ভাবধারার শুধুমাত্র শ্যামা সংগীত ও সংগীতে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং কবিতার মধ্যে ও প্রকাশ পেয়েছিল।”ধুমকেতু”তে প্রকাশিত “আনন্দময়ীর আগমন” নামক কবিতার জন্য কবির এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। তাতেও ছিল নারী শক্তি সাধনার আরাধনা। তিনি লিখেছিলেন“আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল, আসবি কখন সর্বনাশী”।কাজী নজরুল ইসলামের শ্যামা সংগীত জনপ্রিয় হওয়ার একমাত্র অন্যতম প্রধান কারণ ছিল আবেগের গভীরতা ও চিন্তার প্রসারতা।আবার কেউ কেউ মনে করেন নজরুল হৃদয়ের গভীর থেকে শ্যামার প্রতি ভক্তি নিবেদন করেছিলেন, সেই ভক্তি সঞ্চার হয়েছিল তার গানের ভাষাতে।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ধুমকেতু কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত এর পাশাপাশি সৃষ্টি করেছিলেন অজস্র ইসলামিক গান সেগুলি ইসলাম সমাজে গজল নামে পরিচিত। ইসলাম ধর্ম ইসলামী সংস্কৃতি জনপদের জীবনযাত্রা ও লোকাচা রে র প্রভাব এতটাই বিস্তার করেছিল যে, যুগের পর যুগ  বাংলা ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক নতুন স্বতন্ত্র ধারণার জন্ম দিয়ে গেছেন। ইসলাম ধর্মের মৌলিক ধর্ম বিশ্বাসকে উপজীব্য করে রচিত হয় বাংলা গানের এক শক্তিশালী ধারা ইসলামিক গান বা গজল গান। সপ্তম শতকে আরব দেশে যে ধর্মের নবযাত্রা সূচিত হয়েছিল সেই ধর্মের উপাদান বর্তমান সময়ে ধারণ করে বাংলা ভাষা আধারে রচিত হয় এই সমস্ত গজল গান। এই সমস্ত ইসলামিক গান গুলো বাংলা গানের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সমাজের বুকে। তবে মধ্যযুগ থেকে বাংলায় ইসলামী গান রচনা যে প্রভাব দেখতে পাওয়া যায় তা আধুনিক ইসলামিক গানের রচনায় যে নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত তিনি আর কেউ নন আমাদের সবার প্রিয় কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সৃষ্টিশীল হাতের ছোয়ায় বাংলা ইসলামিক গান, গজল গান, লোক গানের পর্যায় থেকে রাগ গানের পর্যায়ে আধুনিক গানের মর্যাদা লাভ করেন।বিংশ শতকে এসে বাঙালি মুসলিমরা  আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটাতে উর্দু কাওয়ালী গান শুনে আত্মতৃপ্তি মেটাতেন। লোক গানের আদলে ইসলামী গান সমাজে প্রচলিত ছিল। এমন বন্ধ্যা যুগে কাজী নজরুল ইসলাম আবির্ভূত হলেন মহীরুহ হিসাবে।তার অসাধারণ শিল্প কুশলতায় একের পর এক সৃষ্টি হতে লাগলো অনবদ্য সব ইসলামী গান। আর ইসলামিক গান হয়ে উঠলো বাংলা গানের নতুন শাখা রূপে প্রাণ ফিরে পেল।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বরাবরই সম্প্রীতির পক্ষে ছিলেন। তার লেখনীতে বিভিন্নভাবে তা উপস্থাপনা করে গেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণা তিনি আক্ষেপের সুরে বহু কথা বলে গেছে ন।কেউ বলেন আমায় বাণী যবন কেউ বলেন কাফের। আমি বলি ও দুটোর কোনটাই নয়। আমি কেবল মাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডসেক করার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে না। কেননা একজনের হাতে আছে লাঠি আরেকজনের আস্তিনে আছে চুরি।হিন্দু মুসলমানের দিন-রাত হানাহানি জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ,যুদ্ধ-বিগ্রহ মানুষের জীবনে এক দিকে কঠোর দরিদ্র ঋণ অভাব অন্য দিকে লোভি অসুখের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাচার স্তূপের মত জমা হয়ে আছে। এ অসাম্য ভেদ জ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলাম।আমার কাব্যের সঙ্গতে কর্মজীবনে অবৈধ সুন্দর সাম্য কে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। আমি যত চাই না খেতে চাইনা প্রতিষ্ঠা চাইনা নেতৃত্ব চাইনা। জীবন আমার যতই দুঃখ ময় হোক আনন্দের গান বেদনার গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাবো নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকব আমি বেঁচে। এই আমার প্রতি আমার সাধনা এই আমার তপস্যা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন, দেখ উন্মাদ তোর জীবন শেলীর মত, জন কিটস এর মত খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে। তুই প্রস্তুত হ। তোর জীবনে সেই ট্রাজেডি দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বর্ষায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু আমার এই জীবনে রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মতো দগ্ধ। মেঘের উঠোনে শূন্যের মতো কেবল হাসি কেবল গান কেবল বিদ্রোহ। তিনি তার স্মৃতিচারণায় আরো বলেছেন। আমার বেশ মনে পড়ছে একদিন আমার জীবনে মহা অনুভূতির কথা। আমার ছেলে মারা গেছে। আমার মন যখন তীব্র পুত্রশোকে  ভেঙে পড়েছে ঠিক সেদিনই সেই সময় আমার বাড়িতে হাসনুহানা ফুটেছে। আমি প্রাণভরে সেই হাসনুহানার গন্ধ উপভোগ করেছিলাম। আমার কাব্য আমার গান আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছে।যদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূন্য থেকে অসময়ে নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবে না আমি সেই নজরুল। সেই নজরুল অনেকদিন আগে মৃত্যুর খিরকি দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছে।মনে করবেন পূর্ণ তৃষ্ণা নিয়ে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল। অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল। তিনি আক্ষেপের সুরে আরো বলে গেছেন, যেদিন আমি চলে যাব সেদিন হয়তো বা বড় বড় সভা হবে। কত প্রশংসা কত কবিতা বেরোবে হয়তো আমার নামে। দেশপ্রেমী ত্যাগী বিদ্রোহী বিশেষণের  পর বিশেষণ। টেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরে। বক্তার পর বক্তা। এই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু তুমি যেন যেওনা। যদি পারো চুপ্টি করে বসে আমায় অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ করো। তোমার ঘরের আঙ্গিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও। সেটিকে বুকে চেপে বল বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি।

এমন কবির জীবনী এক দুর্জয় নেমে আসে। সে সময়ে লেখক মুহাম্মদ কাসম তার স্মৃতিকথা জানিয়েছেন সেই দুর্ঘটনার  কথা।বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন  “নবযুগ’ পত্রিকার সম্পাদক। ঠিক সে সময়ে চলছিল ভারত বিভাজনের প্রক্রিয়া। তৎকালীন সময়ে সমস্ত ক্ষমতা কলকাতার শিক্ষিত শ্রেণীর হাতে।তরুণ মুসলিম লীগ নেতা বদরুদ্দোজা,আলম হোসেন, জুলফিকার হায়দার রা তখন ভারত বিভাজনের জন্য আন্দোলন করছেন। কিন্তু বিদ্রোহী কবি নজরুল বিভাজন আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি করলেন। তিনি কখনোই চাইতেন না ভারত বর্ষ দ্বিখণ্ডিত হোক। তিনি বললেন এ টি মেকি,ভুয়া আন্দোলন।পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরক্ষর মুসলমানদের মুখের গ্রাস করে এরা নেতা হতে চান। তাদের পুরো চক্রান্ত তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তার সমকালীন বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিক যারা বুঝেও মুখ খোলেননি। সেটাই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ালো। নবযুগ’ পত্রিকা য় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয় লিখেন। একটি সংখ্যায় তিনি সম্পাদকীয় কলমে লিখলেন_”পাকিস্তান না ফাঁকি স্থান”। ব্যাস এটুকুতেই যেন দাবানল সৃষ্টি হয়ে গেল। ভারত বিভাজনের যে সমস্ত আন্দোলনকারীরা সমর্থন করতেন তারা নজরুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। একদিন কবি পত্রিকা অফিসের কাজ ছেড়ে অনেক রাতে ফেরেন। কবিকে সামনাসামনি ধরাশায়ী করা যাবে না, তাই আন্দোলনকারীরা কাপুরুষের মত পেছন থেকে আক্রমণ করলেন। এক সময় যারা কবি নজরুল ইসলামের স্থানীয় নিয়ে কলকাতার বুকে দাপটের সাথে চলতেন তারাই তার জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালে ন। আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করেছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারি শফি চাকলাদার সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি ছবি তুলে রেখেছিলেন কিন্তু প্রকাশ্যে আনেননি। তার চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার জন্য সমিতি হল “নজরুল রোগ নিরাময় সমিতি”। কিন্তু সেখানেও ঢুকে গেল দু-একজন পাকিস্তানপন্থী। তারাই কবির চিকিৎসা,দেখাশোনা,অর্থ সংরক্ষন সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন। তারা ইচ্ছা করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিলম্ব করতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে সেই রোগ নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে উঠলো।জুলফিকার লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে লোক আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেয়া হল। পঞ্চাশের প্রথমদিকে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় নজরুল ইসলামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রবি উদ্দিন কে সাথে নিয়ে কবি কে ভিয়েনায় পাঠানো হলো। কিন্তু ততদিনে নিভেছে দেউটি। কবি আর ভালো হলেন না,পিছনের জেনার টি ঘরে গিয়ে পৌঁছায় সেটি শুকিয়ে মরে গেছে। এভাবে শিক্ষিত সুশীল সমাজ ব্যবস্থার সামনে একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমী জীবনকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা সফল হয়ে গেল। না এর প্রতিবাদ কিন্তু হয়নি। এমন এক প্রতিভা দিনে দিনে চোখের সামনে প্রদীপের সলতে এর মত নিভে যেতে দেখেও তেমনভাবে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। অবশেষে পশ্চিমবাংলার পুরোধা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর আর্থিক সহযোগিতায় নজরুল ইসলামের স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য মধুপুর পাঠানো হলো। সালটা ছিল ১৯৪২ এর ১৯শে জুলাই।কিন্তু অর্থ শেষ হয়ে যাবার পর কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয় ওই সালের একুশে সেপ্টেম্বর। ১৯৪৪ সালের ২৪ শে মে আনন্দবাজার পত্রিকায় কবি নজরুল পীড়িত শিরোনামে একটি আবেদন প্রচারিত হয়।সেই আবেদনে বলা হয়েছিল বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বহুদিন যাবত পক্ষাঘাতের শয্যাগত আসক্ত হইয়া পড়ায় তিনি এখন নিঃস্ব ও কর্মদক্ষ হীন। তাহার স্ত্রী ও পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী নি।চিকিৎসা দূরের কথা এমন সংগতি নাই যে শিশুপুত্র আপনিও নিজের আহার টুকু জোটে।বাংলার জাতীয় কোভিদ প্রাণ রক্ষায় শহীদের সর্বসাধারণের আক্রান্ত সাহায্য একান্ত আবশ্যক ভাবা যায় নজরুলের মতো মানুষের খাওয়া পড়ার জন্য সাহায্যের আবেদন করতে হয়েছিল এই ভারতবর্ষে।

১৭৭১ সালে জন্ম হলো স্বাধীন বাংলাদেশ। ১৯৭২ সালের ২৪ শে মে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে কবিকে নিয়ে আসা হলো ঢাকায়। জীবনের শেষ চার বছর কবি এখানে ছিলেন নজরুল সংগীত গুরুজিত ধীরেন বসু কবি সম্বন্ধে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এক জায়গায় বলেছিলেন, ঢাকায় কবির ৭৩ তম জন্মবার্ষিকীতে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে কাজী সব্যসাচী মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় কল্যাণী কাজী ধীরেন বসু সকলেই কবি কে মাল্যদান করতে গেছেন কিন্তু কিছুতেই মাথা তুলতে পারছেন না। এমত অবস্থায় কাজী সব্যসাচী ধীরেন বসু কে বললেন“ধীরেন তোমার গাওয়া সেই গানটি ধরো”। হারমোনিয়াম টেনে নিয়ে ধীরেন বসু গাইলেন“ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি”। গান শেষ হল। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম মাথা তুলে সকলকে দেখলেন মাল্যদান এর পালা শেষ হলো। হয়তো তিনি অভিমানে সে সময় মাথা তোলেনি। অভাবের তাড়নায় মানসিক কষ্ট নিসংগতা সঙ্গে কবির একান্ত আপন বন্ধুদের দূরে চলে যাওয়া অবহেলা এসবই ছিল তার শেষ জীবনের সঙ্গী।পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিনা ভাড়ায় থাকার জন্য ফ্ল্যাটের বন্দোবস্তদুই বাংলা থেকেই লিটারারি পেনশনের ব্যবস্থা হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছিল তাঁর জীবনে।১৯৬২ সালের ২৩ শে জুন দীর্ঘ 23 বছর ধরে পক্ষাঘাতে শয্যাগত স্ত্রী প্রমীলার দেহ বসান হলো। তিনি আরও নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। কোভিদ আশা ছিল মৃত্যুর পর তাকে যেন প্রমীলার পাশে সমাহিত করা হয়। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয় নি। এক সময় ব্রিটিশ অধিকৃত বহু ভারতবাসীর স্বপ্নপূরণের কান্ডারী ছিলেন তিনি। সশরীরে তিনি সৈন্যবাহিনীতে ও চাকরি করেছিলেন। শুধুমাত্র দেশের মানুষের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য। অথচ এমন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমী জীবনের অতিক্ষুদ্র শেষ চাওয়া টুকু রয়ে গেল অধরা। ঝএ আমাদের সমাজের চরম লজ্জা ছাড়া আর কি হতে পারে।

ভারতবর্ষের বুকে এক জ্বলন্ত অগ্নি কুণ্ডের নাম নজরুল ইসলাম। তার শিরা ও ধমনীতে ছিল দেশপ্রেমের মন্ত্র। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মন্ত্রছিল  নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমের জয়ও গান। দেশের জন্য তাকে আমরা বিভিন্ন রূপে পাই। কখনো তিনি সশরীরে সৈনিকের বেসে, আবার দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। জীবনের প্রতি পদে তাকে গ্রাস করেছিল দারিদ্রতা। সেই দারিদ্রতাকে উপেক্ষা করেও তিনি দেশের জয়গান গেয়ে ছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক ছিলেন তিনি।রবি ঠাকুরকে যেমন ক্ষুধার্ত গ্রাস করতে পারেনি,তেমনি জীবনের প্রতিটা পদে দারিদ্রতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তিনি দুবার দুর্জয় হয়ে উঠেছিলেন। তবুও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যে খ্যাতি পেয়েছিলেন তিনি সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি।বর্তমানে দেশের বিদেশের বহু জায়গায় রবীন্দ্র সংগীত শুনতে পাওয়া গেলেও নজরুল সঙ্গীত তেমনভাবে শুনতে পাওয়া যায় না। এ বৈষম্য কেন? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো আমরা খোঁজার চেষ্টা করিনি। জীবনে কখনো উচ্চাকাঙ্খার স্বপ্ন দেখেনি। দেশের প্রধানমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। নেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। অথচ তৎকালীন সময়ে দেশের স্বাধীনতাকে নিয়ে ডামাডোল সৃষ্টি করেছিল দেশের একশ্রেণীর স্বার্থন্বেষী রা। নিজেদের স্বার্থে ভারতবর্ষের দ্বিখন্ডিত করল। নিজেদের ইচ্ছা পূরণ করতেই দেশের লাগাম হাতে নিলেন। অথচ প্রকৃত দেশ বীরেরা রয়ে গেল উপেক্ষিত অবহেলিত ও বঞ্চিত।তাদের মধ্যে একজন হলেন হতভাগ্য নজরুল ইসলাম। স্বার্থবাদীরা দেশের লাগাম হাতে নিতেই প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের ইতিহাসকে দূরে ঠেলে দেয়। এজন্য বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো বহু দেশপ্রেমিককে শেষ জীবনে অর্থকষ্টে ও রোগে ভুগে,অনাহারে মরতে হয়েছে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো দেশপ্রেমিকদের এই দেশে কি এতোটুকুই পাওনা ছিল? এই প্রশ্ন সমাজের বুকে ছুঁড়ে দিয়ে গেলাম। পাঠকরা তার উত্তর দেবে, এমনটাই আশা করব।(তথ্য সংগৃহীত)

বটু কৃষ্ণ হালদার,৩২৭/৩ এম জি রোড, পোস্টআর সি ঠাকুরাণী,হরিদেবপুর,কবরডাঙ্গা কলকাতা১০৪, ফোন_৮৬১৭২৫৫৯৫৮

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *