Spread the love
  

🌾প্রত্যাশা🌾
✍️বুবাই দাস✍️
একটু মেজাজি,হটকারিতা সম্পন্ন  মানুষ তিনি।সবাই আমরা তাকে নরেন বলে চিনি।নরেন আর যাইহোক তিনি তার স্ত্রী কমলাকে খুব ভালোবাসতেন এবং তার কথা সবসময় মেনে চলতেন।
একদিন বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে নরেনের বাড়ির সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছি, হঠাৎ শুনতে পেলাম বাসনপত্র পড়ে যাওয়ার শব্দ। শুনতে পেয়ে আমি একটু জানালার দিকে কান ভিরিয়ে মনযোগ দিলাম।ওমনি তখন শুনতে পেলাম যে,কমলা ও নরেনের মধ্যে তুমুল ঝগড়া চলছে। হঠাৎ চিৎকার করে কমলা বলে উঠলো, চললাম আমি বাপের বাড়ি,তুমি থাকো তোমার বাড়িতে। যেদিন তুমি ভালো মানুষ হয়ে উঠবে সেদিন তোমার বাড়িতে পা রাখবো।এই বলে কমলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরলো। আমিও তখন বাড়ি চলে আসলাম।নরেন এখন বাড়িতে একা।নিজেই খুব কষ্ট করে রান্নাবান্না করে খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। কয়েক দিন পর দেখতে পেলাম নরেনের বাড়ির বাইরে এক সন্ন্যাসী দরজার কড়া নাড়ছে আর বলছে,”মা কিছু ভিক্ষা দাও”মাগো কেউ আছো?তখন নরেন বাইরে এসে সন্ন্যাসীকে কিছু চাল ও আলু তার ঝুলিতে ঢেলে দিলো।সন্ন্যাসী নরেনকে আশীর্বাদ দিলো আর বলল নরেন তুই ভালো হওয়ার চিন্তা করছিস?আজ থেকে ভালো মানুষের সাথে মেলামাশা শুরু কর,তুই ভালো মানুষ  হয়ে উঠবি।তারপর ঠিক তোর ভালোবাসার মানুষ ফিরে আসবেরে তোর কাছে।এই বলে সন্ন্যাসী চলে গেলেন।নরেন তারপর বেরিয়ে পড়লো ভালো মানুষের খোঁজে।প্রথমে তিনি এক মন্দিরে গেলেন।নরেন ভেবেছিল ভগবানকে যে পুজো করে, সেবা দেয় সে নিশ্চয় ভালো মানুষই হবে।এই ভেবে সে পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলেন এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন।নরেন এবার বাড়ীর পথে রওনা দিলেন।ফেরার পথে তিনি দেখলেন রাস্তার পাশেই এক বাড়িতে খুব ঝামেলা চলছে। তিনি এগিয়ে গেলেন এবং যা দেখলেন তা দেখে নরেনের মাথায় হাত।নরেন বিরবির করতে লাগলো যে মানুষটা ভগবানের পূজারী, বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞানে ভরা সে কিনা নিজের স্ত্রীকে মারধোর করছে।না এর সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না।এই বলে নরেন বাড়ি চলে আসলো।পরের দিন তিনি এক বিখ্যাত ডাক্তার সাথে কথা বললেন। তাকে নরেনের খুব ভালো লাগলো।ডাক্তারবাবু নরেনকে অনেক ভালো মানসিকতার কথা  ও সুস্বাস্থ্যের কথা বললেন।নরেন এবার বুঝতে পেরেছে যে,এটাই ভালো মানুষ।নরেন এই ভেবে পরের দিন আবার আসলেন ডাক্তারবাবুর কাছে।এসে দেখলেন ডাক্তারবাবু বিদেশী মদ ও সিগারেট পান করছেন।নরেন তা দেখে হতবাক হয়ে পড়লেন। যে মানুষটা সুস্বাস্থ্যের কথা বলে সে এতো বড়ো ভুল করে কিভাবে ? নরেন এইসব দেখে বাড়ি চলে আসে । দু’দিনের মতো আবার নরেন বেরিয়ে পড়লেন ভালো মানুষের সন্ধানে।এবার তিনি একজন উকিলের দেখা পেলেন। তার সাথে মেলেমেশা শুরু করলেন।উকিলবাবু নরেনকে একদিন তার বাড়িতে আমন্ত্রণ করলেন।সেইমতো নরেন একদিন উকিলের বাড়ি গেলেন।উকিলবাবুর বাড়ির চাকরটা নরেনকে বসতে বসে বললেন , বাবু একটু ব্যস্ত আছেন আপনি বসুন। পাশের ঘর থেকে উকিলবাবুর গলা পেলেন নরেন।গলে পেয়ে নরেন সেই ঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন শুনতে পেলেন এক ভদ্র লোকের সাথে কথা বলছেন।নরেন সমস্ত কথা কান পেতে শুনলেন,ওরা দুজনে কিছু সত্য ঘটনাকে মিথ্যা ও মিথ্যা ঘটনাকে সত্য করে সাঁজাচ্ছিলেন।ওই ভদ্রলোকটি উকিলবাবুকে অনেকগুলো টাকা দেওয়ার কথা বলছিলেন।এই সমস্ত কথা শুনে নরেন সেখান থেকে বেরিয়ে আসলেন। নরেন এবার খুব ক্লান্ত, হাঁপিয়ে পড়েছেন।রাস্তায় একা একাই বিরবির করতে শুরু করলেন।এতো বড়ো বড়ো মানুষ অথচ কেউ সৎ বা ভালো নেই!তিনি শেষবারের মতো আবার একবার চেষ্টা করলেন।এবার তিনি এক পুলিশের সাথে বন্ধুত্ব করলেন।নরেন একদিন সেই পুলিশ বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন থানায়। সেখানে গিয়ে দেখলেন,তার পুলিশ বন্ধুটি একদিকে চোরকে সাধু ও অন্যদিকে সাধুকে চোর বানাচ্ছেন এবং কার্যসিদ্ধি  জন্য গোপনে অর্থ গ্রহন করচ্ছিলেন।নরেন এই দেখে রেগে গিয়ে বাড়ি চলে আসলেন।তিনি আর 
কমলাকে ছেড়ে থাকতে নরেনের খুব কষ্ট হচ্ছে।  তার কথা আজ নরেনের খুব মনে পড়ছে।নরেন কমলাকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকতে পারতেন না। এখন খুব একা তিনি , খুব কষ্ট পাচ্ছেন। তাই নরেন এবার শেষমেষ  কমলার বাড়ির পথে রওনা দিলেন।কমলার বাড়ির কাছে এসে দরজার বাইরে থেকে চিৎকার করে কমলা, কমলা….করে ডেকে যাচ্ছে। কমলা তখন রান্না ঘরে রান্না করছে। নরেনের গলার আওয়াজ পেয়ে কমলা ছুটে এসে দরজা খুলে দেখে নরেন। তার শরীর আগের থেকে অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছে। কমলাকে দেখতে পেয়ে নরেন কাতর কন্ঠে বললো!কমলা বাড়ি ফিরে চলো।আমি ভালো মানুষ হয়ে গেছি।কমলা তখন বললো কিভাবে? তখন নরেন সন্ন্যাসীর কথা,ভালো মানুষের খোঁজ করা সমস্ত কিছু বললো।শুনে নিয়ে কমলা ঝড় ঝড় করে কেঁদে নরেনকে জড়িয়ে ধরলেন।নরেন কমলাকে জড়িয়ে ধরে বললো কমলা!সবার সাথে মেলামেশা করে আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমার কাছে তোমার চেয়ে ভালো মানুষ এই পৃথিবীতে আর কেউ নাই। তখন কমলা পুর্ণিমা ভরা মুখে মুচকি হাসি হেঁসে বললো,তোমার কাছে যিনি সন্ন্যাসী সেজে ভিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন তোমাকে ভালো মানুষের সাথে মেলামেশা করতে বলেছিলেন , সে আর কেউ নাগো আমার বাবা ছিলো।এই বলে তারা দুজনেই মস্ত হাসিতে সমস্ত রাগ,ভুল বোঝা বুঝি,অভিমান ভুলে গিয়ে পরের দিন সকালে নরেন তাঁর  ঘরের লক্ষী কমলাকে নিয়ে ফিরে আসলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *