তটিনীর তলদেশে

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

রথ দেখা ও কলা বেচা দু’টোই একসাথে হবে, এই ভেবে নিতাই বাবু তিন দিন হোল এসেছেন ত্রিপুরাতে। কাল সন্ধ্যার ফ্লাইটে কোলকাতায় ফিরে যাবেন। গতকাল ও আজ বিকেল পর্যন্ত BBMC কলেজ অডিটোরিয়ামে রিটায়ার্ড এডুকেশান অফিসারদের মিটিং। তারপর মাতা বাড়ীতে মা ত্রিপুরা সুন্দরী দর্শন এবং সেই সঙ্গে সন্ধ্যে থেকে কাল বিকেল পর্যন্ত কয়েকজন পুরানো বন্ধু বান্ধবদের কাছ থেকে দুঃস্থ বাচিক শিল্পী ও কবি আরণ্যক দাশের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে নিয়ে গিয়ে কোলকাতায় পৌঁছানো।

বেলা দুটোর আগেই মিটিং শেষ হয়ে গেছে। একটা গাড়ী রিজার্ভ করে নিতাই বাবু ছুটলেন মা ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরের দিকে। গাড়ীতে বসেই উনি ঠিক করে ফেললেন যে ধরমপুর থেকে ফিরে অন্ততঃ দুটো জায়গায় আজ হানা দেবেন– 

(১) শঙ্কর ভট্টাচার্য্যের বাড়ী, 

(২) স্মৃতি বসাকের বাড়ী। 

দু’জনেই ওনার সতীর্থ। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওনারা ১৯৭৯-৮১ সালে একই সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম. এ. করেছেন। তিন জনেরই আদি নিবাস পশ্চিমবঙ্গে। নিতাইবাবু নবদ্বীপের, স্মৃতি দেবী বসিরহাটের, শঙ্করবাবু বহরমপুরের। কর্মক্ষেত্রে শঙ্করবাবু ত্রিপুরায় গিয়ে আগরতলায় সেটেলেড্‌ হয়েছেন। একটি কলেজের অবসর প্রাপ্ত অধ্যক্ষ। স্মৃতিদেবী বিবাহ সূত্রে ত্রিপুরায় স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন; উনি একটি গার্লস্‌ কলেজ থেকে ২০১৯-এর মার্চে অবসর নিয়েছেন। নিতাই বাবু ২০১৮-র ডিসেম্বরে একজন উচ্চশিক্ষা আধিকারিক হিসাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে VRS নিয়েছেন।

বন্ধু শঙ্করকে আগেই বলে রেখেছিলেন নিতাই বাবু যে আজ সন্ধ্যায় ওঁর বাড়ীতে যাবেন। কিন্তু স্মৃতিকে বলা হয়নি। তাই গাড়ীতে বসেই ফোন করলেন। ওপাশ থেকে যে কণ্ঠস্বর ভেসে এল তাতে মনে হোল ৮৫/৯০ বছরের কোন বৃদ্ধা ফোনটি ধরেছেন; স্মৃতির শাশুড়ী বা কেউ হবে। তাই নিতাই বললেন–

দয়া করে একটু Prof. স্মৃতি বসাককে ডেকে দেবেন?

–আপনি কে বলছেন?

–আমায় আপনি চিনবেন না মাসীমা। আমি ওনার সহপাঠী ছিলাম।

–সহপাঠী? কেমন সহপাঠী?

–ভারী ঝামেলায় পড়া গেলতো বুড়িটাকে নিয়ে। নিতাই বাবু বিড় বিড় করে বললেন। অগত্যা উত্তর দিলেন–

–আমি ওনার এম. এ. ক্লাশের সহপাঠী। ওনাকে বলুন যে আমি। নিতাই; নিতাই গোস্বামী। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঁর সহপাঠী।

–নিতাই? মানে SFI নেতা নিতাই? আমাদের CR নিতাই? এতক্ষণে নিতাই বাবু বুঝলেন এটা স্মৃতির গলা। বললেন

–তোমার গলা শুনে তো চেনাই যাচ্ছে না। ৪০ বছরের ব্যবধান বটে। কিন্তু তাই বলে এত পরিবর্তন গলার। যা হোক শোন। আমি এখন আগরতলায় একটা সভায় আছি। সন্ধ্যে বেলা তোমার সাথে দেখা কোরবো। থাকবে তো বাড়ীতে? 

–হ্যাঁ। অবশ্যই এসো। খুবভালো লাগবে। চল্লিশ বছর আগের সহপাঠী তুমি। তাড়াতাড়ি আসবে কিন্তু। এখানে আমাদের সাথে Dinner সারবে। আন্তরিকতা ঝরে পড়লো ওপ্রান্ত থেকে।

নিতাই বাবু, ত্রিপুরা সুন্দরীর মন্দির দেখে ছ’টার মধ্যেই আগরতলায় ফিরে শঙ্কর বাবুর বাড়ীতে গেলেন। ভাবলেন, ওনার কাছ থেকে আরণ্যকের জন্য সাহায্যের টাকাটা নিয়ে ওনাকে সঙ্গে করেই প্রফেসর স্মৃতি বসাকের বাড়ীতে যাবেন। একই এলাকায় তো বাড়ি। কিন্তু তা হোল না। শঙ্কর বাবু খুব খুশী মনেই বন্ধুর আপ্যায়ন করলেন। পাঁচহাজার টাকা দানও দিলেন। কিন্তু Prof. Basak
-এর বাড়ীতে যেতে চাইলেন না। বললেন–

আমি ভাই ওখানে যাবো না। ওরা স্বামী স্ত্রী দুটোই বদ। কাজ হাসিল করতে স্মৃতিও যেমন, তেমন ওর গরুর ডাক্তার বরটীও। কোন নীতি, নৈতিকতা, সততা কিছুরই বালাই নেই দুটোরই। স্মৃতির অধ্যাপনার জন্য রাতারাতি স্বামী-স্ত্রী দু’জনে বড় কমরেড হয়ে গেল। আমাদের টাউন অফিসে দু’জনেই অনেক রাত পর্যন্ত হত্যে দিত। কিন্তু চাকরিটা পেয়েই চম্পট। বদমায়েসরা এখন বি. জে. পি করছে। রাস্তায় দেখা হলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।

–সেটা হলে খুবই দুঃখের। কিন্তু ওর বরকে গরুর ডাক্তার-টাক্তার বলছিস্‌ কেন? উনিতো শুনেছি অর্থোপেডিক্সের ডাক্তার। প্রসেনজিৎদা, উত্তমদা, অনেকেই এটা আমায় বলেছেন। তোর কথায় ডাক্তার সুনীল বসাককে ভেটিনারী ডাক্তার বলে বর্ণনা করে আমি অপদস্থ হয়েছি।

–লে হালুয়া। কুকুরের ঠাং কাটা আর মানুষের হাড় জোড়ানো একই কথা।

–দেখ ভাই শঙ্কর। কাউকে তোর অপছন্দ হতেই পারে; কিন্তু, তাই বলে তাকে এইভাবে বলাটা ঠিক নয়।

–আচ্ছা কি ব্যাপার বলতো? সেই ইউনিভার্সিটি থেকেই দেখতাম, তুই সবসময় স্মৃতির দোষ ঢেকে চলতিস্‌। সেবার কোলাঘাটে ডিপার্টমেন্টাল পিকনিকে গিয়ে কি কেলেঙ্কারীটাই না স্মৃতি করেছিল। তুই সব ধামা চাপা দিয়ে দিলি। কি ব্যাপারটা বলতো?

নিতাই বাবু, বিদ্যুৎগতিতে মাথা খাটিয়ে একটা বানানো কথা বলে দিলেন–

–দ্যাখ ভাই, আমার এক পিসতুতো দাদার সঙ্গে স্মৃতির বিয়ের কথা পারিবারিক স্তরে ঠিক হয়েছিল। তাই দাদার বাগদত্তা হিসাবে একটা আলাদা সম্ভ্রমবোধ ওর সম্পর্কে আমার ছিল। তবে দুর্ভাগ্যের যে আমার দাদাটা পরে ওকে বিয়ে না করে অন্য একজনকে বিয়ে করেছে। 

–উচিৎ কাজই করেছে তোর দাদা। একটা বদমায়েস সুবিধাবাদী মাল ছিল ওটা। বেঁচেছে তোর দাদা। উচিৎ শিক্ষাই দিয়েছে ঐ সুন্দরী নোংরা মেয়েটিকে। 

নিতাই বাবু আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ী ঘুরিয়ে Prof. Basak-এর বাড়ীর দিকে রওনা দিলেন। মিনিট দশেক বাদে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দরজার সামনে গিয়ে উনি স্মৃতিকে ফোনও করলেন এবং কলিং বেলও টিপলেন। দরজা খুলে গেল। অপূর্ব সুন্দরী, সোনার রঙের এক স্থূলকায়া বয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এলেন।–

আরে ভাই এসো এসো। চল্লিশ বছরের আগের চেহারার সঙ্গে এখনো তোমার বহু মিল আছে নিতাই। কিন্তু দেখ না। আমায় দেখে এখন আর কেউই স্মৃতি বলে চিনতে পারে না। এতক্ষণে গোস্বামী বাবু বুঝলেন যে কাঞ্চনবর্ণা ইনিই হলেন স্মৃতি–

বাব্বা! তোমায় তো চেনার উপায় নেই। না গলায়, না চেহারায়।

–যা বলেছো ভাই। তোমায় তো আমার নাতনি হলে তার সাথে বিয়ে দেওয়া যাবে।

–তাহলে বলো আমার কি মত আছে!

স্মৃতি হো হো করে হেসে বলল–

একশ বার।

–কিন্তু তোমারটা বোন এমন হোল কেন? ইউনিভার্সিটির ফাংশানে তুমি যে রবীন্দ্র সংগীত গেয়েছিলে তা এখনো এই চল্লিশ বছর বাদেও কানে বাজে। সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল তোমার গলা।

–কি গান গেয়েছিলাম বলোতো?

–অনেক কথা বলেছিলেম . . .।

–দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতি বলল আমার এখনো ৬২ পোরেনি। ১৫ বছর হোল আমার গলার স্বর এমন হয়েছে। স্বামী ডাক্তার। কত বড় বড় জায়গায় তিনি চিকিৎসা করালেন। কিছুই হয়নি। গলাটা হারিয়ে গেছে আমার।

–খুবই দুঃখের। আমি তোমার গলা ও এই চেহারা দেখে ভেবেছিলাম বোধহয় তোমার থাইরয়েড হয়েছে।

— না না, তাহলে তো হতো। গলা গেছে এক অজানা রোগে। আমায় তো ব্যাঙ্গালোরে এক Ent Specialist – বলেছেন যে অত্যন্ত সিগারেট খেলে বা ড্রিঙ্কস করলে কণ্ঠস্বরে এই রোগ বাধে। রাখাল দার ক্যানটিনে তো তোমরা আমায় খ্যাপাতে আজ এই ব্রত করি বাবা, কাল সেই ব্রত করি বলে। আমি তোমাদের এগরোল খাওয়াবো তোমাদের দাবীতে। কিন্তু নিজে স্রেফ একগ্লাস জল খেতাম গণেশ চতুর্থী বা এই জাতীয় কোন তিথি উপলক্ষ্যে। বারো মাসে তেরো ব্রত আমার লেগেই থাকতো। এই দেখোনা, আজই আমি সন্তোষী মা করেছি। আর বরাবর তো আমি গণেশের Worshipper। সুতরাং, মহিলা হয়ে সিগারেট, লিকার ওসব কখনো ছুঁইনি, ছুঁইনা। তবু তো গলাটা গেল। এমনও সম্ভাবনা ছিল বোবা হয়ে যাবার।

একটু থেমে আবার বললো–

আর এই যে মুটকি হয়েছি, তা খেয়ে খেয়ে, আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।

–খুব খাও বুঝি? কই, ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তে, দু-একদিন ক্যানটিনে তোমায় ভাত খেতে দেখেছি। কালীঘাটের দিদির বাড়ী থেকে আসতে। খুব সকালে ক্লাশ থাকলে ক্যানটিনেই খেতে। তখন তো দেখতাম পাখির মত এইটুকু খেতে। তুমি অপূর্ব সুন্দরী ছিলে। স্লিম ছিল তোমার ফিগার। করবী, সাহানা, তৃপ্তি, ভ্রান্তি, অবন সবাই তোমার পেছনে লেগে বোলতো–

–ওরে স্মৃতি তুই আর একটু খা। তোর অত ডায়েটিং করতে হবে না। ফিল্মের লোকরা তোকে এমনিতেই সেধে ডেকে নেবে। তুই এখন রাজী থাকলে হয়। কিন্তু, আজ এত মোটা হলে কি করে? কত কত খাও এই বয়সে?

মুক্তের মত ঝকঝকে দাঁত বার করে, খিলখিল করে স্মৃতি বললো–

একটা বাচ্চা হাতি যতটা খায়, ততটাই খাই। আর শুনবে?

–না না, আমি তা বলিনি।

–আরে নারে ভাই। তুমি বলনি। আমার কর্তা প্রায়ই আমায় পেছনে লেগে বলে–

এবার তোমার জন্য একটা শ্বেতহস্তিনী বান্ধবী খুঁজতে হবে আমায়। আমিও তেমনি বলে দিই–আমিও একটা কেলে হাতি খুঁজবো তোমার সাথে বন্ধু হতে।

–কেন? উনিও কি মোটা?

–মোটা মানে? চালন বলে ধূচনি তুমি ছেঁদা। আমিও বলে দিই–

কেষ্ট ঠাকুর। বোকা এই রাধেকে পেয়েছিলে বলেই, বর্তে গেছো। না হলে ওই বার্নিশ কালো তোমার গলায় কোন চন্দ্রাবলী মালা দিত না। কেলে হাঁড়ি জুটতো কপালে।

একটু জল খেয়ে আবার উনি বলে চললেন– ২০১৯-এর মার্চে রিটায়ার করেছি ষাটে। পশ্চিমবাংলার মত এখানে ৬৫ নয়। তার পাঁচ বছর আগে মেয়ে দুটির বিয়ে হয়ে গেছে বিদেশে। বাড়ীতে ডাক্তার বাবু আর আমি। উনি সকাল নটায় খেয়ে বেরিয়ে যান চেম্বারে। ফেরেন রাত দশটার পরে। টিফিন দিয়ে দিই সাথে। সারাদিন কি করবো বলো তো বাড়ীতে! ঘুরে ফিরে খাই, আর ঘুমাই। তা মোটা হবো না? আমার যদি একটা ছেলে থাকতো তাহলে বৌমা, নাতি নাতনি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হোত। কিংবা আমি আর ডাক্তার বাবু যদি একই সাবজেকটের লোক হতাম, তাহলে খাওয়া দাওয়ার পরেও একটু Subject চর্চা করতাম। কিন্তু, সে উপায়ও নেই। গান চর্চা তো ভগবান কেড়ে নিয়েছেন। পশ্চিমবাংলায় থাকলে আরও পাঁচবছর Active থাকতাম, অধ্যাপিকা হিসাবে। তাও নেই। অতএব, খাও আর ঘুমাও, আর ঐ মুটকি হও।

–ওঃ। বুঝলাম।

–এই নিতাই। ছি, ছি। সেই কতক্ষণ এসোছো। শুধু বকবক করছি। একটু বোস। আগে চা করি, টিফিনটা দিই। তারপর আবার গল্প হবে। আর মনে আছে তো, ডিনার এখানে?

–না না বোন। ডিনার, টিফিন, কিছুই না। অনেক অবেলায় খেয়েছি। পেটটা আইডাই করছে। শুধু এক কাপ চা। রাতে কিছুই হয়তো খাবো না। তা ছাড়া আমার ডিনার টাইম রাত বারোটা।

–তাই হবে। ডাক্তার বাবু এলে গল্প গুজব করে তিনজনে একসাথে খাবো। আর আমার শ্বশুরের দেওয়া এই কুটীরে তোমার একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই রাতে হবে।

–কি বলছো? এটা কুটীর? এতো রাজপ্রাসাদ! জমিদারদের বাড়ী। 

–রাজপ্রাসাদ কিনা জানি না। তবে সত্যিই জমিদারদের বাড়ী। আমার শ্বশুর, দাদা শ্বশুররা জমিদার ছিলেন। সে যাই হোক। তোমার কিন্তু রাতে যাওয়া হবে না।

–না বোন। আমি অনেকগুলি কাজ নিয়ে এখানে এসেছি। তোমার এখান থেকে বেরিয়ে আরও ক’জনার সঙ্গে দেখা করে তবে হোটেলে ফিরবো।

— বেশ তাই হবে। আমি তোমার ফোন পেয়েই নিজে গিয়ে এখানকার বিখ্যাত দোকান থেকে মিষ্টি আর বিখ্যাত সুরুচি রেস্টুরেন্ট থেকে মাটন বিরানী, ফিস কবিরাজী ও চিকেন চ্যাপ এনে রেখেছি। যাবার আগে একটু গরম করে প্যাকিং করে দেবো। বোনের দেওয়া এই খাবারটা হোটেলে গিয়ে অবশ্যই খাবে। বোস, আমি একটু চা করে আনছি।

স্মৃতি কিচেনে গেলেন। নিতাই চশমা খুলে তাঁর চোখ দুটো মুছলেন। বুকের মধ্যে তাঁর তখন উত্তাল সমুদ্রের ঝড়। দীপেন দা, মানে তাঁর স্যার মোটেও ভুল করেননি স্মৃতিকে ভালোবেসে। ৪৪ বছর আগের সব কথা, ফ্লাশব্যাকে ভেসে ওঠে। দীপেন দার সঙ্গে ওঁর বা স্মৃতির বয়সের ডিফারেন্স মাত্র সাড়ে তিন বছরের। উনি নবদ্বীপ কলেজে পড়াতেন। ওখানেই নিতাই Pol. Sc বিভাগের ছাত্র ছিলেন। স্মৃতি পড়তো বসিরহাট কলেজে। অফ ডেতে স্যার সপ্তাহে দু’দিন ওদের বাড়ীতে পড়াতে যেতেন। বিরাট বড়লোকের মেয়ে। খুবই সরল ছিল স্মৃতি। স্যার খুবই এক সম্ভ্রান্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। বাবা ছিলেন জেলখাটা স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা প্রাথমিক শিক্ষক। পরে একজন কমিউনিস্ট।

জন্মসূত্রেই স্যার রাজনীতি করার আগ্রহটা পেয়েছিলেন। ছাত্র অবস্থাতেই ছাত্র আন্দোলন ও কৃষক আন্দোলন করতে গিয়ে কংগ্রেস আমলে বহুবার জেলে গেছেন। মামলায় ঝুলেছেন। এর মধ্যেই অনন্য সাধারণ মেধার তিনি অধিকারী– National Scholar। কো-এড স্কুল, কো-এড কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে পড়েছেন। কিন্তু, মেয়েদেরকে বোন ছাড়া অন্য চোখে দেখেননি। যেসব মেয়েরা ওঁর মেধাবী রেজাল্টের জন্য এবং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মাইকেলী চেহারা, অসাধারণ বাগ্মীতা, অসাধারণ কবিতা লেখার ক্ষমতা ও আবৃত্তি করার দক্ষতার জন্য ওঁর দিকে ঝুঁকতো, উনি তাদেরকে এড়িয়ে চলতেন।

কিন্তু স্মৃতিকে এড়াতে পারেননি। স্মৃতি তাঁকে পাগলের মত ভালোবেসেছিলেন। বুঝতে পেরে দীপেন দা ওকে আর পড়াবেন না বলে দিয়ে ছিলেন। কিন্তু, স্মৃতির কান্নাকাটিতে উনি ওকে আবার পড়াবেন রাজী হন। স্মৃতি কথা দিয়েছিলেন যে ওসব আর করবেন না। কিন্তু, অষ্টাদশী কিশোরীর প্রেম ছিল বাঁধভাঙা। নিজেকে সে সামলাতে পারেনি। অবাধ ভালোবাসার বন্যা বইয়ে দিল। সেই বন্যার স্রোতে ভেসে গেলেন এবার দীপেনদা। উনিও ভালোবেসে ফেললেন স্মৃতিকে। স্মৃতির বাড়ীর থেকে ওঁর কাছে প্রস্তাব গেল স্মৃতির এম. এ. পাশের পর ওদের বিয়ে হবে। ঐ রকম একজন Scholar ছেলে বাবা, যদি পরে বিগড়ে যায়, তাই স্মৃতির বাড়ীর de fecto guardian  বিমল বাবু দীপেন দাকে নিয়ে সাদা কাগজে লিখে নিয়েছিলেন স্মৃতি তাঁর বাকদত্তা।

এতকথা নিতাই জেনেছেন মেসোমশাই অর্থাৎ, দীপেনদার বাবা হঠাৎ স্ট্রোকে মারা গেলে তাঁর শ্রাদ্ধে গিয়ে মাসীমাও দীপুদার বৌদির মুখে। পরে সহপাঠী অবনের থেকেও একই কথা জেনেছেন।

যাইহোক, একটু বাদেই চা নিয়ে হালকা টিফিন সহ ঘরে ঢুকলেন স্মৃতি।

–নাও চা খাও। একটা গান শুনবে আমার গলার এই সাথে?

–হ্যাঁ শোনাও।

–কোন্‌ গানের ভিডিওটা দেবো বলো?

–সেই বিশ্ব বিদ্যালয়ের ফাংশানে যে রবীন্দ্র সংগীতটা গেয়েছিলে সেই গানটার যদি ভি. ডি. ও থাকে সেইটা।

–ওঃ। –অনেক কথা বলেছিলেম কবে তোমার কানে কানে।–এইটার কথা বোলছো তো? দেখছি। স্মৃতি একটু খুঁজে বললেন,

–হ্যাঁ আছে। দিচ্ছি।

স্মৃতি ভি. ডি. ওটা দিলেন–

অনেক কথা বলেছিলেম

কবে তোমার কানে কানে।

শুনতে শুনতে নিতাই-এর মনে হোল যেন বিরহী স্মৃতি তার বেদনা বিদ্ধ হৃদয়কে উজাড় করে দিচ্ছেন এই গানে।

–কি এত ভাবছো নিতাই আনমনে? 

–না, তুমি তো গাইলে “অনেক কথা বলেছিলেম।” এবার আমি অনেক কথা বোলবো, তবে তোমার কানে কানে নয়; তুমি তো আমার বোন, তাই তোমার সামনে।

–আরে, বলো বলো। ভারী সুন্দর তোমার বাচনভঙ্গি।

–আচ্ছা স্মৃতি, যে কথাটা তুমি বাইশ দিন আগে বললে, সেটা যদি ৪২ বছর আগে বলতে, তাহলে বহু ট্রাজেডি এড়ানো যেতো।

–তার মানে নিতাই? চমকে উঠলেন অধ্যাপিকা বসাক।

–তার মানে হোল স্মৃতি, তুমি আজ আমার বোন। কিন্তু হবার কথা ছিল আমার বৌদি। তুমি ও আমি একই স্যারের শিষ্য-শিষ্যা। সাড়ে তিন বছরের বড় উনি আমাদের থেকে। রক্তের কোন সম্পর্ক নেই ওনার সাথে আমার। কিন্তু, তোমার দেশের ঐ মানুষটি ও তাঁর গোটা পরিবার আমায় আপন করে নিয়ে ছিলেন। তাই আমি সব জানি। উনি চাননি। কিন্তু তুমি ও তোমার গোটা পরিবার ওনাকে তোমরা আপন করেছিলে। তুমি ওনার বাগদত্তা হয়েছিলে নিজের উদ্যোগে, বড়দের সম্মতিতে।

–না, মানে নিতাই . . .।

— কোন না মানে নেই স্মৃতি। স্যারের বৌদি আমায় সব বলেছেন।

স্মৃতি লজ্জায় না ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন, তা সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে বুঝতে পারলেন না নিতাই ঠিক ভাবে। শুধু বুঝলেন যে-স্মৃতি চুপসে গেছেন। নিতাই বলে চললেন–

বাইশ দিন আগে স্যার তোমায় ফোন করেছিলেন আরণ্যকের জন্য ৪২ বছর বাদে। এই সেই আরণ্যক দিনের পর দিন তোমায় যে স্যারের থেকে নিয়ে নোট বয়ে দিয়ে এসেছে তোমার কাছে। স্যারকে তুমিই আগ বাড়িয়ে আপন করেছিলে; তোমার কথামত তোমাদের বাড়ীর অভিভাবকরা স্যারের সঙ্গে কথা বলে তুমি এম. এ পাশের পর বিয়ে হবে পাকা করেছিলেন। এমনকি স্যার যাতে পরে বিগড়ে না যান, তারজন্য তাঁর কাছ থেকে লিখে নেওয়া হয়েছিল। তোমাদের বাড়ীর ম্যানেজার বিমল চৌধুরী instrumental হয়েছিলেন এই ব্যাপারে। তোমার বাল্য শিক্ষক স্যারের এক দাদা, অসীম মুখার্জী মাসীমা মেশোমশাইকে বলে রাজী করেছিলেন। জাতিগত কাঠামোয় তোমরা স্যারদের থেকে নীচু জাতের। ওঁরা ভরদ্বাজ ব্রাহ্মণ। তোমরা শিব গোত্রের। অসীম বাবুই সব সামলেছিলেন।

স্মৃতি মাথা নীচু করে চুপচাপ রইলেন।

–আরো শোন তুমি। তোমার সেই ১৮-১৯ বছর বয়সে তুমি তন্বী অপূর্ব সুন্দরী ছিলে। মেশোমশাই অর্থাৎ দীপেনদার বাবার শ্রাদ্ধে নবদ্বীপ থেকে আমি, সনৎ ওঁর বাড়ীতে গিয়েছিলাম ও কদিন থেকে ছিলাম। মাটির ঘর, গোলপাতার ছাউনি, সবুজে ভরা গ্রাম, আলো ছিল না, জল ছিল না, পাকা রাস্তা ছিল না। কিন্তু ওখানে মানুষের বুকভরা ভালবাসা ও আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ছিল। ঐ শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানেই তোমার গানের মাসীমা যাঁর কাছে স্যারের বোনও গান শিখতো, সেই মাসীমার নেমনতন্ন ছিল। কথা প্রসঙ্গে আমায় বলেছিলেন–

স্মৃতি কাজটা মোটেও ভালো করেনি। গোড়াতেই ওর আপত্তির কথা বা বাড়ীর লোকদের আপত্তির কথা জানিয়ে দিলে অথবা স্মৃতি তার ভালোবাসার অবস্থানে দৃঢ় থাকলে দাদার (দীপেনদার বাবার) স্ট্রোকে মৃত্যু হোত না। অপ্রিয় হলেও এটাই সত্যি যে স্মৃতি এই মৃত্যুর জন্য দায়ী। ওর মাই তো আমায় বলতেন বাড়ীর লোকজন সব কেমন, তার খোঁজ নিয়ে বলতে।

একটু থেমে, নিতাই আবার বলে চলেন, “শুধু স্যারের না, গোটা পরিবারের জীবনটা নিয়ে তুমি ও তোমার পরিবার ছিনিমিনি খেলেছো স্মৃতি। এটা কি বড়লোকের খাম খেয়াল গরীবদের নিয়ে? কেন তুমি ওঁকে ভালোবেসে এতকাণ্ড করলে? অপছন্দ হলে গোড়াতেই জানিয়ে দিতে পারতে! বাইশ দিন আগে অসুস্থ তোমার সতীর্থ ভাই তোমার জন্যে তিনটি বছর ধরে সকাল সন্ধ্যায় স্যারের নোট তোমায় দেওয়া নেওয়া করেছে, তার জন্য যখন উনি উপায়হীন ভাবে তোমার সাহায্য চাইলেন, তুমি উত্তরে তাঁকে বললে–আপনি আমার শিক্ষক। আপনি আমার প্রণাম নেবেন। ভালো থাকবেন স্যার। আরণ্যককে আমি সাহায্য দিতাম; কিন্তু দেবো না। কারণ ও প্রথমে আমার কাছে সাহায্য চায়। দেবোও বলেছিলাম। কিন্তু পরে ও আমার হোয়াটস্‌ আপে আজে বাজে কথা লিখেছে।

একটু থেমে নিতাই বললেন, এসব সাজানো কথা তোমার স্মৃতি। আসলে অকস্মাৎ তোমার কাছে সাহায্যের আবেদন আসায় তুমি মনস্থির করে না উঠতে পেরে সাহায্য দেবার কথা বলেছিলে। কিন্তু পরে ঠান্ডা মাথায় দীপেন দার সঙ্গে সম্পর্কের সব কথা লোপাট করার জন্য যাতে আরণ্যক দ্রুত মরে, তার জন্য সাহায্য না দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে।

–ছিঃ ছিঃ, আমায় এতটা নীচ ভেবো না নিতাই।

–না, তা ভাবছি না স্মৃতি। পরিস্থিতি তা ভাবাচ্ছে। তুমি পাঁচ বছর ধরে নিজেই নিজেকে আষ্ঠেপিষ্ঠে দীপেন দা ও তার পরিবারের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছিলে। আড়াই বছর দীপুদা ষাট টাকার বিনিময়ে তোমায় পড়াতেন। সংকোচেই ওটা ওঁকে নিতে হোত। তোমাদের বাড়ীর ম্যানেজার বিমল বাবু ওঁকে অপমান করেছিলেন। তোমার মেজদির বিয়ের তিন দিন আগে অসুস্থতায় কদিন তোমায় পড়াতে না যাবার জন্য উনি ত্রিশ টাকা মাইনে কেটে নিয়ে বাকী ত্রিশটা টাকা বাঁ হাত দিয়ে স্যারকে দিয়েছিলেন। ক্ষোভে ও অপমানে উনি তোমাদের বাড়ী যাওয়া বন্ধ করলেন। তোমার জন্য বিমল বাবু ও তোমার আপন দাদা মৃনাল বাবু নতুন মাস্টার ঠিক করলেন। তুমি পড়বে না তাঁর কাছে বলে দিলে। যেভাবে হোক দীপেনদা এই খবর পেয়ে বন্ধুপ্রতিম অনুজ আরণ্যককে দিয়ে রাত জেগে তোমায় যাবতীয় নোট করে পাঠাতেন। যেটা বুঝতে পারতে না, সেটা আবার ওকে ডেকে দীপুদাকে পাঠাতে। এইভাবে তুমি ও দীপুদা গভীর বোঝাপড়া করে চলতে, মাঝখানে আরণ্যককে রেখে। এই ভাবেই এম. এ. পাশ করলে। অথচ, সেই আরণ্যক অর্থ কষ্টে জেরবার। অসুস্থ ভীষণভাবে। তার চিকিৎসার পয়সা দিতে রাজি হলে না?

স্মৃতির চোখ দুটো ছল ছল করে ওঠে। মুখে নামে আঁধার।

–ব্যাথা পেয়ো না বোন। তুমি বলছিলে না স্মৃতি যে, তোমার শ্বশুর ও দাদাশ্বশুর জমিদার ছিলেন। কিসের জমিদার গো বোন? গরীব মারার জমিদার? জমিদার কাকে বলে দেখে এসো দীপেন দার গ্রামে গিয়ে। হিন্দু মুসলিম সমস্ত গরীব মানুষের মনের জমিদার ওই রায় পরিবার। স্বাধীনতা সংগ্রামী দীপুদার বাবা দীনবন্ধু রায় এলাকার কিম্বদন্তী নেতা। এসবের কোন মূল্য হয়নি তোমার কাছে? কস্মিনকালে কে দেখেছে যে ভাবী পুত্রবধুর কেরিয়ারের জন্য নিজের ছেলেকে তার বাবা মা বিদেশ যাত্রা আটকায়? মেশোমশাই মাসীমা তাই করেছিলেন। তুমি আমি তখন নিজ নিজ কলেজে অনার্স পার্ট টু পড়ি। স্যার তিন বছরের ফেলোশীপ পান বিদেশে Higher Education-এর। ভাবী পুত্র বধূর কেরিয়ার নষ্ট হবে, এই কারণে ছেলেকে কড়া নির্দেশ দেন বিদেশ যাত্রা বন্ধ করতে। দীপুদা নিজেও চাননি তোমায় ফেলে বিদেশে যেতে। এসবের কোন মূল্য ছিল না তোমার কাছে? তুমি তো জানতে, দীপেন দার কাছে পাঠানো তোমার ফটোটা দেখে মাসীমা আদরে তোমার নাম দিয়েছিলেন প্রিয়দর্শিনী অর্থাৎ দূর্গা। আর সেই তুমিই কিনা সেই মাসীমার সিঁথির সিঁদূরটা মুছে দিয়েছিলে মহানবমীর সকালে?

–না না নিতাই! প্লীজ ভাই! অমনটা করে বোল না।

–শুনতে অপ্রিয় হলেও, এটাই বাস্তব স্মৃতি। তোমায় নিয়ে ভাবী পুত্রবধূর স্বপ্নে মাসীমা-মেশোমশাই বিভোর ছিলেন। অথচ সেই তুমি কিছুই বুঝতে না দিয়ে হঠাৎই ডাক্তার বাবুকে বিয়ে করে ত্রিপুরায় চলে এলে। কিন্তু দেখ, বিয়ের মাস খানেক আগেও তুমি আরণ্যককে দিয়ে তোমার মার্কশীট, ফটো সব পাঠিয়েছিলে স্যারের কাছে অধ্যাপনার ফর্ম জমা দেবার জন্যে। উনি সব করে দিয়েছিলেন। এমনকি দরখাস্তে তোমার সইটাও পর্যন্ত। তুমিই তাঁকে বলেছিলে ইনটারভিউ-এর চিঠি পাঠানোর ঠিকানাটা স্যারের গ্রামের বাড়ীর ঠিকানা দিতে। উনি তাই করেছিলেন তোমায় বাকদত্তা হিসাবে। অথচ রাতারাতি সব ভুলে গেলে তুমি? আমি দুঃখিত বোন। তবু বলছি। কিসের কারণে তুমি দীপেনদার এত বড় সর্বনাশটা করলে? তোমার জন্যে ওঁর Ph D শেষ হয়নি বা শেষ করেননি চরম হতাশাতে। এমন কিছু কার্তিক কুমার ও তো নন তোমার কর্তা। একজন সাধারণ অর্থোপেডিক্স ডাক্তার; বাপের বিপুল সম্পত্তি। এই যা। দীপেনদা একজন অসাধারণ Scholar। বুদ্ধিদীপ্ত শ্যামবরণ চেহারা। যেমন সুবক্তা, সু আবৃত্তিকার, এবং দারুণ কবিতা লেখক। আমাদের কলেজের বাংলা ডিপার্টমেন্টের মেয়েরা তো ওঁকে মাইকেল বলে পিছনে ডাকতো। আমি তো অন্ততঃ একজন আমাদের কলেজ বান্ধবীর কথা জানি যে স্যারের প্রেমে পাগল হয়ে উঠেছিল। তুমি বোন অবশ্যই সুন্দরী। কিন্তু সেই মেয়েটি, নাম অলকানন্দা গোস্বামী, ছিল তোমার থেকে শতগুণ সুন্দরী, শত গুণ মেধাবী। আমাদেরই এক কলেজ অধ্যাপকের মেয়ে ছিল সে। স্যারের পেছনেই শুধু না, ওঁর বাবামার কাছেও পর্যন্ত বসিরহাটে ধাওয়া করে ছিলেন মেয়েটির বাবা ঐ অধ্যাপক স্যার। কিন্তু, কেউ স্যারকে টলাতে পারেনি। পারেনি স্যারের বাড়ীকেও। অথচ এসব কিছুরই হিসেব নিলে না?

–একটু থেমে নিতাই বললেন–স্মৃতি, রূপ, অর্থ ও যৌবনের মর্যাদাবোধ থাকা ভালো। কিন্তু, তার লোভ বা অহংকার কোনটাই ভালো নয়। তোমার মধ্যে লোভ ও অহংকার ঢুকেছিল। তাই তুমি এত বড় সর্বনাশটা করতে পেরেছিলে। নিজেকে অতিরিক্ত রূপসী ভাবতে। ভাবতে তুমি যা খুশী তাই করলে ধর্মে সইবে। লোভ ছিল তোমার আকণ্ঠ। কেরিয়ারের লোভে দীপেনদা ও তাঁর বাড়ীর সাথে মিথ্যা অভিনয় করেছিলে। আর নিছক অর্থের লোভে, যে জমিদাররা গরীবকে শোষণ করে, সেই জমিদার ঘরের ছেলে ডাক্তার বাবুকে বিয়ে করলে। ন্যায় নীতি সব জলাঞ্জলি দিলে? স্মৃতি! এসবের কোন প্রয়োজন ছিল না। যে কথাটা বাইশ দিন আগে দীপেনদাকে বলেছো, সেই কথাটা শুরুতেই ওঁকে বলতে পারতে। তাহলে একটি ট্রাজেডির উদ্ভব হোত না। দীপেনদার সব ক্ষতি পুষিয়ে গেছে। যার সঙ্গে ওঁর বিয়ে হয়েছে, সেই ভারতী তোমার থেকে রূপে-গুণে-মেধায়-যোগ্যতায়, অনেক অনেক উপরে। সে জননেত্রী, অধ্যাপিকা, সুলেখিকা, সুবক্তা, সুখী স্ত্রী, সুখী মা। দীপুদা ও সে একই সাবজেকটের। দীপুদা আজ তার কলমের জোরে প্রতিষ্ঠিত লেখক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের অধ্যাপক। সুতরাং, কোন ক্ষতিই করতে পারোনি তুমি তার। শুধু আশাভঙ্গে হৃদরোগে মেশোমশাই-এর মৃত্যুটাই ঘটাতে পেরেছিলে।

স্মৃতি চুপ করে মাথা নীচু করে থাকে। পাশে বীরবিক্রম উদ্যানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ভেসে আসছে হেমন্তর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান–

তুই ফেলে এসেছিস কারে

মনরে মন আমার?

রাত পৌনে নটা বাজে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিতাই বলেন–

–ওঃ! অনেক দেরী হয়ে গেল। উঠি স্মৃতি। অনেক অপ্রিয় কথা বলে ফেললাম। মনে করো তুমি আমি যমজ ভাই বোন। কোন আঘাত দিয়ে থাকলে নিজগুণে ক্ষমা করো। গুডনাইট। 

নিতাই উঠে পড়েন। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে স্মৃতি বলে ওঠেন–বোনের হাতে করা রাতের খাবারটুকু নিয়ে যাবে না নিতাই?

নিতাই-এর চোখে বর্ষা নামে। ভারাক্রান্ত গলায় বলে–

তুমি আমার বৌদি হতে। আজ আমার যমজ বোন। তোমার হাতের খাবার নেবো না? দাও এই ব্যাগে দাও। হোটেলে গিয়ে অবশ্যই খাবো।

খাবারটা স্মৃতি নিতাই এর ব্যাগে ঢুকিয়ে দেন। তারপর “একটু দাঁড়াও” বলে ছুটে ঘরে যান। এক মিনিটের মধ্যে একটা ব্লাঙ্ক চেক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন–

এটাও নিতে হবে তো নিতাই।

–কি ওটা।

–দেখ একটু তা।

–এতো ফাঁকা চেক। কি কোরবো তা আমি এটা নিয়ে?

–তুমি ব্যস্ত তাই। এ্যামাউন্টটা লিখিনি। আরণ্যকের চিকিৎসার জন্য আমি একমাসের পেনশান ষাটহাজার টাকা দিতে চাই। লিখে নিও পরে। আর দুটো কথা। রক্ত মাংসে গড়া একটা মানুষ আমি। আমার বহু ভুল হয়েছে জানি। তবে যতোটা খারাপ লোকে আমায় ভাবে, আমি কিন্তু ভাই ঠিক অতোটা খারাপ নই।

–না না স্মৃতি। আমি কিন্তু, সেভাবে তোমায় বলিনি।

–তা আমি জানি। তুমি বিশ্বাস করো নিতাই। আমি সত্যিই স্যারকে ঠকাতে চাইনি। পড়ানোর প্রথম দিন থেকেই ওঁর আচার-আচরণে আমি আকৃষ্ট হয়ে ওঁকে ভালোবেসে ফেলি। উনি আমায় পাত্তাই দিতেন না। বুঝতে পেরে আমায় আর পড়াবেন না বললেন। আমি নাছোড় হয়ে ওঁকে হারিয়ে দিয়েছিলাম। তারপরের সব ঘটনা তো তুমি বলেই দিলে। যেটা জানতে না, তা হোল এই আমার চাপে পড়ে আমার বাড়ীর লোকরা মত দিয়িছেলন মুখে; অন্তর থেকে নয়। ওই যে ম্যানেজার বিমল বাবুর কথা বললে, আমাদের পরিবারে ওই ছিল সর্বে সর্বা। কিছুতেই উনি চাননি স্যারের সাথে আমার বিয়ে হোক। আমার বাবা মারা যান আমার অল্প বয়সে। মা ও দাদা খুব সরল মানুষ ছিলেন। এঁদের সায় ছিল স্যারের সঙ্গে আমার বিয়েতে। কিন্তু কেন জানি না, বিমল বাবু উঠতে বসতে বাড়ীর সবাইকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন স্যারের বিরুদ্ধে। অজপাড়া গাঁ, হতদিরদ্র পরিবার, মাটির ঘর, গায়ের রং কালো, গাঁয়ে জল, বিদ্যুৎ, রাস্তা কিছুই নেই, মেয়েটা এখন মোহে পড়েছে, পরে ও জ্বলে পুড়ে মরবে–এইসব নানা কথা সর্বক্ষণ বলে বলে পাঁচটি বছর বাড়ীর সবাইকে স্যারের বিরুদ্ধে বিষিয়েছেন; আর দাদা, বৌদি, মা, দিদি জামাইবাবুরা প্রতি মুহূর্তে আমায় সরে আসতে বলে কান্নাকাটি করেছেন। আমি টলিনি। ঐ বদমায়েসটাই স্যারকে অপমান করে আমাদের বাড়ী থেকে সরিয়ে ছিল। কিন্তু, তাতেও স্যার ও আমার মধ্যে ফাটল ধরাতে পারেনি।

আঁচলে একবার জলভরা চোখদুটো মুছে স্মৃতি বলে চললেন–

সবশেষের দাওয়াই ছিল জাতপাতের প্রশ্ন। স্যারেরা বৈদিক ব্রাহ্মণ। আর আমরা তাঁতী। আপত্তি ওঁদের বাড়ীর দিক থেকেই হবার কথা। অথচ হোল উল্টো। আমার বাড়ীর লোকরা ধো তুললেন বেজাতের ঘরে মেয়ে দেবো কেন? আমাদের জাতের ঘরে কি ছেলে নেই? এই সব নানান মানসিক অত্যাচারে আমি প্রতিটি মুহূর্ত পাঁচ বছর ধরে বাড়ীতে জ্বলেছি। স্যার দুঃখ পাবেন বলে ওঁকে এসব জানাইনি। একাই লড়ে গেছি। প্রেরণা ছিল স্যারের অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং আমায় অধ্যাপিকা করে তোলার জন্য তাঁর বিরামহীন প্রচেষ্টা। স্যার তো আমায় অধ্যাপনা পাবার সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। আমার, তোমার, ও স্যারের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দম্পতি বঙ্গেন্দু বাবু-মীরাদিকে বলে রেখেছিলেন। তোমায় বলতে দ্বিধা নেই, উনি আমায় বলতেন, “আমাদের দু’জনকে স্যারও দিদির মত হতে হবে। আমি আজ ওঁরই বোনা ফসল হিসাবে অধ্যাপিকা হয়েছি। কিন্তু, পেশাগত জীবনসঙ্গী পাইনি। শুধু একজন স্বামী পেয়েছি। উনি আমার যত্ন নেন সবই ঠিক। অনেক অর্থবান। কিন্তু, আমার বৌদ্ধিক ক্ষুধাকে মেটাতে পারেন না। আমি যাঁর বাকদত্তা হয়েছিলাম উপজিয়ে, তিনি সেটি পারতেন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্মৃতি বলেন–

নিতাই, সাগরিকার উপরকে সবাই দেখে। তলদেশ কেউ দেখে না। আমার কি মন নেই ভাবো? আমাকে কি এইসব ব্যাথা কুরে কুরে খায় না? তাছাড়া তুমি তো বললেই, পশ্চিমবঙ্গে থাকলে আমি ৬৫ পর্যন্ত চাকরি করতাম। আর . . . .।

–আর কি স্মৃতি? বলো বলো তুমি।

— না, থাক গিয়ে নিতাই।

–না না, বলো তুমি বোনটি।

— আর সে দিনের এই স্বেচ্ছা বাগদত্তা যদি বাকদত্তের হাতে সিঁথিটা রাঙাতে পারতো, তা হলে, মা-দাদা-ভাইবোন সবার কাছাকাছি থাকতে পারতাম। এই দ্যাখো। কদিন আগে আমার দাদা মারা গেলেন। প্লেন ধরে যেতে যেতে সব ছাই হয়ে গেল। মরা মুখটাও দাদার দেখতে পেলাম না।

হাঁউ মাঁউ করে কেঁদে ফেললেন স্মৃতি। নিতাই এরও চোখে জল। শতদল পাঁপড়ির মত স্মৃতির হাত দুটো ধরে নিতাই বললেন–

–বোন কেঁদো না। যা ভবিতব্য, তাই’ই হয়। তাই’ই হয়েছে। এতদিন ভাবতাম, দীপুদাই শুধু অনেক কিছু হারিয়েছেন। এখন দেখছি অন্য। তুমিও হারিয়েছো বহু কিছু। দীপুদার সবক্ষতি পুষিয়ে গেছে। ভারতীর মত স্ত্রীসহ সব পেয়েছেন উনি। শুধু ফেরৎ পাননি তোমাদের দু’জনের বাকদানের দূর্বিপাকে, প্রচণ্ড মানসিক আঘাতে, তোমার বিয়ের পর পরই হঠাৎ স্ট্রোকে মারা যাওয়া বাবাকে। তুমি তোমার অসম্মতির কথাটা গোড়াতেই জানালে এই মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটতো না। যা হোক, এই একটি ক্ষেত্র ছাড়া, আর সব ক্ষেত্রেই দীপুদা পরিপূর্ণ। ভারতী তাঁকে পূর্ণতা দিয়েছে। হয়তো এই পূর্ণতা তুমি ওঁকে দিতে পারতে না। ভারতী দীপুদার সাবজেকটেরই অধ্যাপিকা, সহলেখিকা, আবৃত্তিকারিনী, বাগ্মীজননেত্রী, লাল ঝান্ডা নিয়ে সব সময় স্বামীর পাশে। হয়তো তুমি এটা পারতে না; পারলেও এতটা না। কারণ, যে ঐশ্বর্য্যের মধ্যে তুমি মানুষ, তাতে এটা করা তোমার পক্ষে অসম্ভব না হলেও এটা হোত কষ্টকর।

শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন স্মৃতি।

নিতাই বলে চললেন, আজও আসার সময় কোন একজনের সঙ্গে তোমায় নিয়ে ঝগড়া করেছি। ১৯৮০ সালে কোলাঘাটের ডিপার্টমেনটাল পিকনিকে তোমার করা কিছু ভুল কাজ নিয়ে উনি আজও খোঁটা দিচ্ছিলেন। কিন্তু সেদিন তোমায় দেখেছি আমার বাকদত্তা বৌদি হিসাবে; কিন্তু, আজ দেখছি যমজ বোন হিসাবে। যেদিন তুমি ডাক্তার বাবুকে বিয়ে করে চলে এলে এবং তার জেরে মেশোমশাই মারা গেলেন, সেদিন তোমায় খুবই ঘৃণা করেছি। ভেবেছি তুমি হলে দ্বিতীয় রেবেকা ম্যাক্‌টেভিস্‌। কিন্তু, আজ তোমার কাছে এসে আমার সে ভুল ভেঙ্গে গেছে। সমস্ত ঘটনার জন্য গোটা পরিস্থিতি দায়ী যার শিকার তুমি, দীপেন দা, মাসীমা, মেশোমশাই সকলে। 

–জানি না নিতাই। তবে আমি দিশেহারা হয়ে তাল রাখতে পারিনি। আত্মীয়-স্বজন, বাড়ীর চাপ, তাদের কান্নাকাটি, অন্যদিকে জমিদার পরিবার, পেশায় পাত্র ডাক্তার, সব মিলিয়ে একটু স্বস্তিতে বিয়েটা সারতে আমি স্যারের থেকে নীরবে সরে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম, দু’চারদিন একটু আমার বা স্যারের খারাপ লাগবে। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। তখন বুঝিনি এমন একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটবে।

–স্মৃতি, পৃথিবীতে সাধারণের মধ্যে এখনো বহু অসাধারণ মানুষ আছেন, যাঁরা পর্বতপ্রমাণ উঁচু মূল্যবোধকে ধরে রাখেন। তাইতো, বাগদত্তা পুত্রবধূকে রেখে পুত্র তার কেরিয়ার গড়ুক, এটা চাননি মাসীমা মেশোমশাই। পরিণামে মরতে হোল এক জনকে।

–এর জন্য আমিই দায়ী নিতাই। তাই তো মাসীমার অভিশাপে সব থেকেও আমি আজ নিঃস্ব। বাইরে থেকে উদ্বেল সাগরিকার মত সবাই আমাকে সুখী দ্যাখে। কিন্তু আমি যে কত দুঃখী, কত নিঃসঙ্গ, কত অভাগী সেকথা বোঝাবো কাকে? আমার একটি ছেলে নেই, কণ্ঠের সুর নেই, আমার বৌদ্ধিক ক্ষুধা মেটানোর কোন সাধ্য আমার স্বামীর নেই। চেষ্টাও নেই তার। শুধু টাকাই তার সব। 

হাঁউ মাঁউ করে কাঁদতে থাকে স্মৃতি।

–এসবই হয়েছে আমার পাপে। মাসীমার অভিশাপে।

–চোখ মোছ বোন। এমন বলে না। মাসীমা ব্যতিক্রমিক দেবী। উনি কখনোই তোমায় অভিশাপ দেননি। বরং বলি, মেশোমশাই-এর শ্রাদ্ধে গিয়ে মাসীমার সাদা সিঁথিটা দেখে আমার ভারী কষ্ট হয়েছিল। এর আগে দু-তিনবার গিয়ে নবরাগে উজ্জ্বল সিঁথি দেখেছিলাম কিনা। দুঃখে, মনোকষ্টে মাসীমার সামনে বলে ফেলেছিলাম, স্মৃতি যেন এই পাপ কর্মের সাজা হাতে হাতে পায়। মাসীমা আমার মুখ চেপে ধরে বলেছিলেন–অমন বলতে নেই বাবা। এ আমার কপালে ছিল। ওকে দোষ দিয়ে কি লাভ?

–হ্যাঁ নিতাই। অনেক বড় মন না হলে কেউ এটা বলতে পারেন না। উনি বেঁচে থাকলে ওনার পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসতাম।

–শোন বোন, জীবনের অস্তাচলে আজ আফশোস করে লাভ নেই। যা পাওনি পাওনি, যা পেয়েছো সেটাই তোমার প্রাপ্য ছিল ধরে নাও। এর বেশিও না, কমও না।

একটু থেমে নিতাই-এর সংযোজন–আরও ভয়ঙ্কর কিছু হতে পারতো তোমার জীবনে।

–তার মানে?

–তোমায় বলিনি। তোমার বিয়ের খবরে স্যার একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। ওঁর মধ্যে হতাশায় আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। আবেগের মাথায় উনি সেটা করলে, দেশ একটা প্রতিভাকে হারাতো, একটি পরিবার তার মেরুদন্ডকে হারাতো, আর তুমি হারাতে তোমার গোলাপী জীবনকে। কোথায় থাকতে তুমি ভেবে দেখেছো? আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে জেলে কয়েদীর জীবন যাপন করতে। ঘর সংসার কিছুই তোমার হোত না। সাধারণ মানুষ, সর্বোপরি তোমার স্বামী, শ্বশুর বাড়ীর সবাই তোমায় ঘৃণায় পরিত্যাগ করতো কুলটা বলে। তার থেকে তো বেঁচেছো। তোমার নিশ্চয়ই কিছু সুকীর্তি ছিল। তাই সে বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছো। দীপেনদারও অনেক অনেক সুকীর্তি নিশ্চত ছিল। তার জন্যে, তুমি তো তার যোগ্য ছিলেই, কিন্তু তোমার থেকেও যোগ্যতর ভারতীকে তিনি জীবনসঙ্গিনী করে পেয়েছেন। আর, আমার ভারতী বৌদিরও নিশ্চিত সুকর্ম ছিল, তাই দীপেন দার মত মানুষকে অপ্রত্যাশিতভাবে স্বামী হিসাবে পেয়েছেন। বলতে পারো উনি স্যারের হেনরিয়েটা। স্যারকে পূর্ণতায় উনি ভরিয়ে দিয়েছেন। নিতাই স্মৃতিচারণ করে চলেন–

জানো বোন। তোমার এই ঘটনার পর দীপেনদার মধ্যে তীব্র বিতৃষ্ণা জাগে বিবাহিত জীবন নিয়ে। কলেজ আর পার্টি; এই নিয়েই থাকতেন। মাসীমা একটা বিয়ে বাড়ীতে ভারতীকে দেখে পছন্দ করে ওঁর বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সেই মত বিয়ে হয়। আসলে কি জানো বোন? সৃষ্টিকর্তা যেমন হাঁড়ি তৈরি করেন, তেমনি প্রতিটি হাঁড়ির মাপে পৃথক পৃথক সরা তৈরি করেন। যেটির যে সরা, সেটিতে ঠিক সেটিই খাটে। অন্যটি খাটে না। দীপেন দার জন্যে ভারতীই ছিল সৃষ্টিকর্তার বিধান, তুমি ছিলে না। তাই এত করেও তোমাদের মিল হোল না। শুধু শুধু দৈবদুর্বিপাকে একটা মৃত্যুর জন্য তুমি মানুষের কাছে, তোমার বিবেকের কাছে দায়ী হয়ে রইলে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিতাই বললেন

–বোন, আস্তিকরা বলে বিধাতার বিধান; আর নাস্তিকরা বলে justice of nature। প্রকৃতির দেওয়া বিচার। এর থেকে কারো রেহাই নেই। দেখো না, খুনীকে খুন হওয়া বাড়ীর লোকরা ক্ষমা করলেও, আদালত তাকে ক্ষমা করে না। আইনে তার যা প্রাপ্য, তাকে তা পেতেই হয়। বিধির আদালতেও বা, প্রকৃতির আদালতেও ঠিক একই নিয়ম। তাই বেদনার হলেও, তোমার কৃতকর্মের ফল তোমায় ভুগতেই হবে বোন।

ম্লানমুখে অসহায় ভাবে স্মৃতি কথাগুলো শোনে।

–তবে একটা কথা। সৎ আচরণ দেখে সাজা প্রাপ্ত আসামীর কারাবাস অনেক মকুব হয় তুমি জানো। তুমিও বোন এই বৃদ্ধ বয়সে কিছু সৎকাজ করো। ছাত্রী থেকে বাগদত্তা হয়েছিলে; স্ত্রী হওনি বটে; তুমি নিজেও সেদিন ৪২ বছর বাদে স্যারকে তাঁর ফোনের উত্তরে বলেছো বললে–আমার প্রণাম নেবেন স্যার; আমি আপনার ছাত্রী ছিলাম ছাত্রীই আছি। কিন্তু বোন প্রণাম দিলে তো প্রণামী দিতে হয়; স্যারকে তো প্রণামী দিতে হবে।

–দিলাম তো নিতাই। আরণ্যকের চিকিৎসায় দানটা তো স্যারকেই আমার প্রণামী। ৪০ বছরের উপর আমার বিবাহিত জীবন। দুই সন্তানের মা আমি, শাশুড়ী আমি, একজন অধ্যাপিকা আমি। সমাজ সংসার কি বলবে বা ভাববে বলো আমার এই অতীত যদি জানে? তাই একান্তে মাঝে মাঝে আমার মনে স্যারকে ঘিরে, অনেক কষ্ট হলেও শাড়ীর আঁচলের নীচেই বুকের ভিতরে তা রাখি চেপে। সেদিন আরণ্যক ফোন করলে আমি তাকে সাহায্য করবো বলি, ওর ব্যাঙ্ক ডিটেলস্‌ও নিয়ে নিই। পরে ও আবেগে হোয়াটস্‌ আপে আমায় আগের মতই বোন ভেবে স্যার ও আমার বাকদানের কথা উল্লেখ করে কিছু কথা লেখে। ও তো সবই জানতো। ভাগ্যিস ডাক্তার বাবুর নজরে ওটা পড়েনি। দাম্পত্য সম্পর্কে চিড় ধরবে, এই বুড়ো বয়সে, মেয়ে জামাইরা জানলে ছি ছি করবে, এই ভয়ে আমি ওর নম্বরটা লক করে দিই। ওর উপর রেগে গিয়ে স্যারকে বলেছি, আমি আরণ্যককে কোন সাহায্য দেবো না। ওটা আমার মনের কথা ছিল না নিতাই; আমার আতঙ্কের কথা ছিল। বলতে পারো আমি একটু সাইকিক পেশেন্ট হয়ে গেছি। প্রায়ই এখন মনে হয়, বিশেষ করে আরণ্যকের ও স্যারের ফোনের পরে, যদি আমার husband বা আমার মেয়ে-জামাইরা এসব জেনে ফেলে, তাহলে কি হবে আমার? তাই, ভয়ে, আতঙ্কে, দু’জনকেই ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। এমনকি ফোনও লক করে দিয়েছি। কিন্তু, হৃদয়ের দূরভাষে ওঁদের নং লক কোরবো কি করে? প্রতি মুহূর্তেই যে ওঁদের বার্তা আসে ভেসে। নিতাই, তুমি আমার ভাই; কোলাঘাটের পিকনিকে যে অন্যায় আমি করেছিলাম, বাকদত্তা বৌদি ভেবে আমার যে পদস্খলন হয়েছিল, তুমি তাকে ধামাচাপা দিয়ে আমার মান বাঁচিয়েছিলে। তোমার ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্ব পরীক্ষিত। তাই তোমার হাতে আরণ্যকের জন্য এই চেকটা দিলাম।

–হ্যাঁ, এটা স্মৃতি বড় প্রণামী। কিন্তু আমি ঠিক এর কথা বলিনি। স্যারের যে আদর্শ ছিল এবং আজও আছে, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে গরীবদের পাশে থেকে তাদের অধিকারের জন্য লড়াই করার চেষ্টা কোরো। এই মিনার থেকে রাজপথে নেমো বোন!

–কথা দিলাম নিতাই। যৌবনে পারিনি; যে অঙ্গীকার আমি করেছিলাম সূর্য্য সাক্ষী রেখে, এই বৃদ্ধা বয়সে আমি সেই অঙ্গীকার রাখবো। আরণ্যক ও স্যারকে বোলো ওঁরা যেন আমায় ক্ষমা করেন। স্যারকে আমার প্রণাম জানিয়ো। এসব বেদনার কথা ওঁকে বোলো না। হয়তো কষ্ট পাবেন। ভারতীকে নিয়ে যেন উনি আরো অনেক অনেক সুখী থাকেন।

নিতাই অবাক বিস্ময়ে স্মৃতির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে।

–ওভাবে কি দেখছো নিতাই?

–আমার হারিয়ে যাওয়া বৌদিকে, আমার হারিয়ে যাওয়া যমজ বোনটিকে, সন্ধ্যার শিশিরে ভেজা বিকালের শিউলিকে।

দুজনেই অশ্রুসজল, নির্বাক। 

পাশের বীর বিক্রম পার্কের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে ভেসে আসছে রবীন্দ্র নাথের গান–

তুই ফেলে এসেছিস কারে,

মন রে মন আমার?

পায়ে পায়ে নিতাই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যান। ধীরে ধীরে এক তলায় নেমে গাড়ীতে উঠে বসে জানলা দিয়ে হাত নেড়ে বলেন–

–বোন বিদায়।

–বিদায়।

স্মৃতি অপলক চোখে তাকিয়ে থাকেন দুধ সাধা ছুটন্ত সুমোটার দিকে। দৃষ্টির আড়ালে গেলে উনি ঘরে গেলেন। তখন মাইকে ভেসে আসেছ আর একটি গান–

–ওরে আমার মন

কিসের তরে দেয় না ধরা

ভালোবাসার ধন।

শরতের জ্যোৎস্না। ত্রিপুরার হাওড়া নদীর পাড় ঘেঁষে ছবির মত আঁকা বাঁকা পথ ধরে ছুটে চলেছে গাড়ী। কাঁচের ফাঁক দিয়ে অপূর্ব সুন্দর সে বেগবতীর দৃশ্য প্রাণভরে নিতাই বাবু দেখছেন। আর ভাবছেন যেন বোন স্মৃতিই তাঁকে লুকিয়ে এই মায়াবী শৈবলিনী হয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বয়ে চলেছে নিরুদ্দেশের দিকে: কেউ জানে না কত বড় উথাল পাথাল ঘটছে এই তটিনীর তলদেশে সবার অলক্ষ্যেতে উচ্ছ্বল তরঙ্গ মেলার জামদানির নীচে। 

লেখক পরিচিতি

অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারী রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কার ও এশিয়া প্যাসিফিক পুরস্কার সহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কার প্রাপ্ত একজন খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ। ইনি কোলকাতার সাউথ সিটি (দিবা) কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ।

ঠিকানা-শরনিয়ার বাগান

পোষ্ট- টাকী

পিন- ৭৪৩৪২৯

পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

74180cookie-checkগল্প :তটিনীর তলদেশে – খগেন্দ্রনাথ অধিকারী
Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *