ধারাবাহিক পৌরাণিক কাব‍্য

★কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিন★

——– কৃষ্ণপদ ঘোষ।
উপস্থাপন– 21
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১২। কর্ণের হস্তে ভীমের পরাজয়।
ভূরিশ্রবা বধ।

না শুনিয়া দীর্ঘক্ষণ শঙ্খফুৎকার,
কিম্বা বারেকের তরে গাণ্ডীব টঙ্কার,
ধীরস্থির যুধিষ্ঠির হন উচাটন।
তাই ভ্রাতা বৃকোদরে কহেন তখন।।
“তব কনিষ্ঠ ভ্রাতার নাহি হেরি চিহ্ন।
নীরব হইল কেন কৃষ্ণপাঞ্চজন‍্য।।
যুদ্ধক্ষেত্রে হত আজ হইল নিশ্চয়,
গাণ্ডীবধারী পাণ্ডব ভ্রাতা ধনঞ্জয়।।
কৃষ্ণ যুদ্ধরত আমি করি অনুমান।
তাই তুমি ত্বরা সেথা কর অভিযান”।।
করিয়া শ্রবণ কন বীর বৃকোদর,
“ধনঞ্জয় লাগি মোর নাই কোন ডর।।
তথাপি আদেশ তব করিতে পালন,
অতি শীঘ্র তথা আমি করিব গমন”।।
অতঃপর বৃকোদর ধৃষ্টদ‍্যুম্নে কন,
“ধর্মরাজে রক্ষিবারে করিও যতন।।
পাঞ্চাল সোমক সেনা আছে যত জন,
লইয়া অর্জুন পাশে করিনু গমন।।
*
ধায়িলেন ভীমসেন সনাদল সাথে।
রোধিলেন গতি দ্রোণ ধনুর্বাণ হাতে।।
হাস‍্যমুখে ভীমসেনে কহিলেন তিনি,
“তুমি যাও যেথা চাও অগ্রে মোরে জিনি”।।
কহিলেন ভীমসেন, “হে নীচ ব্রাহ্মণ,
এক্ষণে রোধিতে মোরে করহ যতন।।
এই বাহিনী ভেদিয়া যদি করি গতি,
তার লাগি নাহি লাগে কোন অনুমতি”।।
এত কহি ভীমসেন গদাঘাতে তাঁর
বিনষ্ট করেন রথ সারথি তাঁহার।।
অন্য এক রথে দ্রোণ করি আরোহণ,
ব‍্যূহ দ্বারে ত্বরা তিনি করেন গমন।।
হীনবল সেনাদল বাধ্য পলায়নে,
বৃকোদর তৎপর উদ‍্যোগী গমনে।।
হীনমতি কুরুপতি ভ্রাতা চারিজন।
বৃকোদরে রোধিবারে আইল তখন।।
বিন্দ, অনুবিন্দ, সুবর্মা আর সুদর্শন।
এই চারি ভ্রাতা ভীম করেন নিধন।।
জয় করি কুরুসেনা ভীম বৃকোদর,
সাত‍্যকি অর্জুন পাশে হন অগ্রসর।।
কিছুদূরে পার্থে ভীম করি দরশন,
হরষিত ভীমসেন করেন গর্জন।
বৃকোদরের গর্জন করিয়া শ্রবণ,
যুধিষ্ঠির ধীরস্থির পুলকিত মন।।

উচাটন দুর্যোধন আসিয়া তখন,
দ্রোণ পাশে মনোক্লেশে তাঁরে তিনি কন।।
“অর্জুন সাত‍্যকি আর ভীম বৃকোদর,
জয়দ্রথ অভিমুখে আজি অগ্রসর।।
আপনারে জিনি তারা আসিল কেমনে।
জাগিয়াছে সংশয় সবাকার মনে।।
এ দুর্গতি মোর অতি আর কারো নয়।
বিশ্বাস হইব নাশ সকলে নিশ্চয়।।
এইবার আপনার কিবা অভিপ্রায়।
রক্ষিতে জয়দ্রথে কি হইবে উপায়”।।
এত শুনি দ্রোণ তাঁরে কহেন তখন,
“ইতিপূর্বে কহিলাম আমার বচন।।
পাণ্ডবের সেনাদল অতি পরাক্রান্ত।
অগ্রে পিছে কুরুসেনা হইল আক্রান্ত।।
জয়দ্রথে রক্ষিবারে দাও প্রাণ মন।
ত‍্যাজি মায়া প্রাণ কায়া যুঝ প্রাণপণ।।
দুর্মতি শকুনি অতি করে দ‍্যূত ক্রীড়া।
জ্ঞাত সকলে তোমরা কৌরবের ব্রীড়া।।
কৌশলে দ‍্যূত ক্রীড়ায় লভিয়াছ জয়।
সেই জয় নহে জয় ধর্ম-পরাজয়।।
ক্ষত্রকুল রণস্থলে লভে যে বিজয়,
সেই জয় ঠিক জয় জানিবে নিশ্চয়।।
এইক্ষণে দৃঢ়মনে রক্ষ জয়দ্রথে,
হইবে জয় নিশ্চয় তিন মহারথে”।।
উপদেশে মনোক্লেশে তাই দুর্যোধন,
সাথে ল’য়ে অনুচর করে পলায়ন।।
*
ভীমসেন পার্থপাশে গমিবার কালে,
কর্ণ সনে তাঁর যুদ্ধ হয় খড়্গ ঢালে।
রথাবতরেন ভীম ল’য়ে খড়্গ ঢাল।
কর্ণ ভীমের রণ সে অতীব ভয়াল।।
ভীমঢালে কর্ণ হানে তীব্র ঘাত তায়।
সেই ঘাতে ভগ্ন ঢাল ভূতলে লুটায়।।
ভীমসেন হইলেন ক্রুদ্ধ ভয়ঙ্কর।
কর্ণ প্রতি দেন ছুঁড়ে খড়্গ অতঃপর।।
কর্ণ-ধনু হয় ছিন্ন সেই অস্ত্রাঘাতে।
কর্ণ ত্বরা অন‍্য ধনু লইলেন হাতে।।
মৃত হস্তী ভীমসেন করিলেন ঢাল।
হস্তী ছুঁড়ে কর্ণে বধ করিবার তাল।।
সেই কালে কর্ণ ত্বরা ত‍্যাজিলেন বাণ।
ভীমসেন মূর্ছা যান নাহি যায় প্রাণ।।
কুন্তী বাক্য স্মরি তিনি বিরত তখন।
ভীমে জিনি নাহি তিনি করেন হনন।।
সহাস্যে কহেন ভীমে, “ওরে তূবরক,
ঔদারিক, রণে অজ্ঞ, মূঢ় বুজরক।।
অস্ত্র জ্ঞানে দেখি তুমি অতীব অজ্ঞান।
রণভূমির অযোগ্য করহ প্রস্থান।।
নানান খাদ্য পানীয় রহে যেই স্থানে,
রণ ত‍্যাজি যাও চলে তুমি সেইখানে।।
ভরিতে উদর তব যাও তুমি বনে।
ফলমূলে বৃকোদর পুরিবে ভক্ষণে।।
করিলে যুদ্ধ এখন তুমি মোর সনে,
পাইবে বহুত ক্লেশ রেখ তুমি মনে।।
কৃষ্ণার্জুন পাশে তুমি করহ গমন।
কিম্বা গৃহে গমি অন্ন করহ ভক্ষণ”।।
ভীম কন, “কেন তব মিথ্যা গর্ব হেন।
বহুবার পরাজিত হয়েছিলে জেনো।।
ইন্দ্র তিনি দেবরাজ, তাঁরও পরাজয়,
হয়েছিল কতবার কভু মিথ্যা নয়।।
মল্লযুদ্ধ কর তুমি দেখি মোর সনে।
কীচক সম বধিব তোমারে এক্ষণে”।।
হেন কালে উপস্থিত অর্জুন সেখানে।
ভীমে ত‍্যাজি কর্ণ যান অর্জুন দমনে।।
ভীমসেন চলিলেন সাত‍্যকির রথে।
ভুরিশ্রবা করিলেন গতিরোধ পথে।।
কিছু কাল দোঁহে যুদ্ধ চলিল ভীষণ।
অতঃপর সাত‍্যকির ভূতলে পতন।।
ভূরিশ্রবা সাত‍্যকিরে করি পদাঘাত,
উদ‍্যত হন করিতে তিনি মুণ্ডপাত।।
শরবর্ষণ করিয়া অর্জুন তখন,
দক্ষিণ হস্ত তাঁহার করেন খণ্ডন।।
কহিলেন ভূরিশ্রবা,”অতি অপকর্ম।
হে পার্থ, লঙ্ঘিলে তুমি আজি ক্ষত্রধর্ম।।
অন‍্যের সহিত যবে ছিনু যুদ্ধ রত,
সেক্ষণে করিলে মোর বাহু ভূপতিত।।
কৃষ্ণাজ্ঞায় কর তুমি কর্ম হেন রূপ।
অতীব অন‍্যায় কর্ম ধর্মের বিরূপ”।।
এত কহি বাম হস্তে পাতিলেন শর।
করিবারে ধ‍্যান তিনি তাহার উপর।।
মহোপনিষৎ ধ‍্যানে হলেন মগন।
ইচ্ছা তাঁর ব্রহ্মলোকে করিতে গমন।।
ভূরিশ্রবায় অর্জুন কহেন তখন,
অস্ত্রহীনে চেয়েছিলে করিতে হনন।।
বধিলে তোমরা সবে নিরস্ত্র বালকে।
হেন কর্ম হীন কর্ম জানে সর্বলোকে।।
ভূরিশ্রবা ভূমে মাথা করি পরশন,
ডান বাহু করিলেন দূরে নিক্ষেপন।।
কহেন অর্জুন,”তুমি মহা কীর্তিমান।
মম প্রীতি তব প্রতি আছে বিদ‍্যমান।।
নৃপতি শিবি যথা গমেন পূণ‍্যলোকে।
উশীনর পুত্র ন‍্যায় যাও সেই লোকে”।।
কৃষ্ণ কন, “মম লোকে করহ গমন।
গরুড়ারূঢ় হইয়া কর বিচরণ”।।
হেনকালে জ্ঞান লাভ হলো সাত‍্যকির।
উঠিলেন ভূমি হতে সেই বৃষ্ণিবীর।।
ধাবিলেন হস্তে খড়্গ করিয়া ধারণ।
ভূরিশ্রবার মস্তক করিতে ছেদন।।
করেন নিষেধ যত মহারথ গণ।
তথাপি করেন তিনি মস্তক ছেদন।।
কহেন সাত‍্যকি সবে,”শোন যোদ্ধৃগণ।
অধর্ম হয়নি কোন করিয়া হনন।।
নিরস্ত্র বালকে যবে করিল নিধন,
উহাদের ধর্ম ছিল কোথায় তখন।।
শোন সকলে তোমরা আছে মোর পণ,
যুদ্ধক্ষেত্রে পদাঘাত করে যেই জন,
হইলেও তিনি ন‍্যায় ব্রত পরায়ণ,
আমি তারে নিশ্চয়ই করিব হনন”।।

শুনি যুদ্ধ বিবরণ ধৃতরাষ্ট্র কন,
“ভূরিশ্রবা সাত‍্যকিরে করিল পীড়ন।।
কিরূপে সম্ভব হয় তা কহ সঞ্জয়।
সাত‍্যকি সে করেছিল বহু যুদ্ধ জয়”।।
সঞ্জয় কহেন তাঁরে করিয়া শ্রবণ,
“সে কাহিনী কহি আমি করুন শ্রবণ।।
যযাতির পুত্র যদু ছিল মহাবীর।
সেই বংশে জনম শিনি দেবমীঢ়।।
দেবমীঢ়-পুত্র শূর অতি গুণবান।
পুত্র তাঁর বসুদেব মহা ভাগ‍্যবান।।
কৃষ্ণ তনয় তাঁর তিনি মধুসূদন।
করিলেন তিনি মধু দানবে দমন।।
স্বয়ংবর কালে হৃত দেবক নন্দিনী।
হরণ করেন তাঁরে যদুকুল শিনি।।
বসুদেব সাথে বিয়া দিবারে বাসনা।
তার লাগি হরিলেন সয়ম্বরা কন‍্যা।।
হেরিলেন সে হরণ কুরু সোমদত্ত।
শিনি সনে বাহু যুদ্ধে হলেন প্রবৃত্ত।।
কিছু ক্ষণ চলে যুদ্ধ অতীব ভীষণ।
অতঃপর সোমদত্তের ভূমিতে পতন।।
শিনি তাঁরে সেইকালে করি পদাঘাত,
করিবারে উদ‍্যত তাঁর মুণ্ডপাত।।
পরিশেষে কৃপাবশে হত‍্যা নাহি করি,
পরাজিত সোমদত্তে তিনি দেন ছাড়ি।।
অতঃপর সোমদত্ত যান তপস‍্যায়।
তুষ্ট হন মহাদেব তাঁর সাধনায়।।
কহিলেন মহাদেব কহ তুমি মোরে,
কিবা বর দেব আমি আজিকে তোমারে।।
সোমদত্ত কহিলেন, দিন এই বর,
পুত্র যেন দক্ষ হয় করিতে সমর।।
মম পুত্র পদাঘাতে কভুও সমরে,
বধিতে উদ‍্যত হয় শিনি বংশধরে।।
ভূরিশ্রবায় পেলেন মহাদেব বরে।
করেন পীড়ন তাই তিনি সাত‍্যকিরে”।
★★★
( চলবে )

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *