• Mon. Oct 3rd, 2022

কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিন★ – কৃষ্ণপদ ঘোষ

Read Time:10 Minute, 27 Second

ধারাবাহিক পৌরাণিক কাব‍্য

★কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিন★
কাব‍্যরূপ:–কৃষ্ণপদ ঘোষ।
উপস্থাপন– ৩৩
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১৩। কর্ণের সহিত যুধিষ্ঠির
ও ভীমের যুদ্ধ।

‘দুরদান্তব্যূহ’ কর্ণ করিয়া রচন,
রণসাজে মহাযুদ্ধে করেন গমন।।
কৃপ কৃত তাঁরা স্থিত ব্যূহ ডান ভাগে।
শকুনি উলূক তাঁরা পার্শ্বদেশ ভাগে।।
গান্ধার সেনানী চলে পিশাচ দর্শন।
সাথে পার্বত বাহিনী করিল গমন।।
ব্যূহ বামে স্থিত যত ধার্তরাষ্ট্রগণ।
সংশপ্তক সেনানীও লইল শরণ।।
যায় রণে আর দল কম্বোজ যবন।
ব্যূহমাঝে কর্ণ পিছে রহে দুঃশাসন।।
অগ্নিদেব অশ্বরূপ করিয়া ধারণ,
পুরাকালে যেই রথ করেন বহন,
দেবরাজ ইন্দ্রদেব আরোহী যাহার,
সেই রথে কৃষ্ণার্জুন, গতি দুর্বার।।
হেরিয়া শল্য তাঁদের কর্ণে তিনি কন,
আসিছে অর্জুন কর্ণে করিতে নিধন।।
নানাবিধ দুর্লক্ষণ দেয় দরশন।
মেঘ তুল্য কবন্ধ ঐ ঘোর দরশন।।
কঙ্ক গৃধ্র সর্প হের আসে কত সব।
সমবেত হয়ে তারা করে কলরব।।
আকৃষ্ট পার্থ-গাণ্ডীব করিছে কূজন।
শরজাল শত্রুদলে করিছে নিধন।।
রণক্ষেত্রে পড়ে ঝ’রে নৃপতির মুণ্ড।
হস্তিযূথ ভয়ে দ্রুত ছুটে তুলি শুণ্ড।।
পদাতিরা ভয়ে কত করে পলায়ন।
অশ্বসহ আরোহীর ভূতলে পতন।।
এই সেই অর্জুন কৃষ্ণ সারথি যার।
যদি তুমি পার তারে করহ সংহার।।

হেনকালে সংশপ্তক করে আহ্বান।
ব্যাপৃত যুদ্ধে অর্জুন ল’য়ে ধনুর্বাণ।।
ঘন কৃষ্ণ মেঘ আসি ঢাকে শশী যথা।
সংশপ্তক বাহিনী পার্থে ঢাকে তথা।।
হেরি কর্ণ শল্যে তাই কহেন তখন,
যোদ্ধৃ-সাগরে অর্জুন নিমগ্ন এখন।
আজিকে তাহার নাহি কোন পরিত্রাণ।
এ যুদ্ধে জীবন তার হবে অবসান।।
বারি সিঞ্চনে হয়না বরুণ নিধন।
কাষ্ঠে কভু নাহি হয় অগ্নি নির্বাপন।।
পবনে ধরিতে আছে ক্ষমতা কাহার।
অর্জুনও সেইরূপ অজেয় সবার।।
তুষ্ট তুমি থাক তব নিজের বচনে।
নিবেদিল শল্য কর্ণে এ হেন কথনে।।

হেনকালে ধেয়ে এল দুই সেনা দল।
জাহ্নবী যমুনা যথা উত্তাল প্রবল।।
অর্জুন নাশেন শত্রু চারিদিকে তার।
রুদ্র যেমতি করেন পশুরে সংহার।।
নিহত পাঞ্চাল কত কর্ণ-শরজালে।
শার্দূল নাশিছে যেন মেষ পালে পালে।।
পাণ্ডবসেনা সকল করিয়া ভেদন,
কর্ণ করে যুধিষ্ঠিরে তীব্র আক্রমণ।।
শিখণ্ডী সাত্যকী তাহে হন উচাটন।
যুধিষ্ঠিরে ত্বরা তাঁরা করেন বেষ্টন।।
সাত্যকী নিষাদ সেনা করেন প্রেরণ।
সসৈন্য উদ্ধত কর্ণে করিতে হনন।
কিন্তু তারা ভূপতিত কর্ণ-শরজালে।
কর্তিত শাল যেমতি পড়ে দলে দলে।।
যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ অতি কর্ণে তিনি কন,
দর্শাও তব বিক্রম বীরত্ব এখন।।
মোর সাথে কর যুদ্ধ হে সূত-নন্দন।
এ যুদ্ধে তব আকাঙ্ক্ষা করিব পূরণ।।
হেন কহি যুধিষ্ঠির করেন ক্ষেপন।
বজ্র তুল্য তাঁর বাণ নিশ্চিত মরণ।।
সেই বাণে কর্ণ তাঁর হারান চেতন।
অতঃপর রথোপরি হইল পতন।।
ক্ষণপরে লভি জ্ঞান রণেন ভীষণ।
যুধিষ্ঠির-বর্ম তিনি করেন ছেদন।।
ভল্লাঘাতে হয় নষ্ট যুধিষ্ঠির-রথ।
পলায়নপর তিনি চড়ি অন্য রথ।।
হেরি তাহা কর্ণ যান রোধিতে গমন।
অচিরেই স্কন্ধ তাঁর করেন ধারণ।।
কর্ণ কন যুধিষ্ঠিরে ব্যঙ্গ শ্লেষাত্মক।
ক্ষত্রিয়-বীর আপনি কেন পলাতক।।
ক্ষত্রধর্মে জ্ঞানহীন যুদ্ধ-পটু নন।
যাগ যজ্ঞ বেদপাঠ কর্মে রত রন।।
আর নাহি যুঝিবেন বীরগণ সনে।
বিদ্ধ নাহি করিবেন অপ্রিয় বচনে।।
হেন শ্লেষ ভীমসেন করিয়া শ্রবণ,
সৈন্য নিয়ে কুরুসেনা করে আক্রমণ।।


দুই দলে যুদ্ধ শুরু হইল তুমুল।
অশ্ব হস্তি সেনা কত হইল নির্মূল।।
মহারণে ভীমসেন মহা রণবীর।
কুরুসেনা রণক্ষেত্র ত্যাজিতে অস্থির।।
হেন হেরি কর্ণ তাই হন উচাটন।
রোধিবারে ভীমসেনে ত্বরিতে গমন।।
মহাবাহু ভীমসেন ভয়ানক ক্রুদ্ধ।
কর্ণ সনে চলে তার মহা শরযুদ্ধ।।
হেনরূপে দোঁহে চলে যুদ্ধ কিছুক্ষণ।
ক্ষণপরে ভীম-শরে কর্ণ অচেতন।।
হেরি তাই ভীমসেন পুলকিত মন।
ল’য়ে সেনা কুরুদলে করিল পীড়ন।।
হত শরে কত শত্রু কত বীরগণ।
ইন্দ্র যথা রাক্ষসেরে করেন নিধন।।

১৪। অশ্বত্থামা ও কর্ণের সহিত
যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের যুদ্ধ।

কর্ণের হেন দশায় হ’য়ে উচাটন,
সেইক্ষণে ভ্রাতাগণে কন দুর্যোধন।।
ভীম সনে আজি রণে কর্ণ অচেতন।
রক্ষা কর আজি তারে মোর ভ্রাতাগণ।।
দুর্যোধনের আদেশ করিয়া শ্রবণ,
ভ্রাতাগণ ভীমসেনে করে আক্রমণ।।
ভীম-ভল্লাঘাতে হত ভ্রাতা উপনন্দ।
হত হলো কত ভ্রাতা বিকট ও নন্দ।।
বিনষ্ট ভীমের ধনু কর্ণ-শরাঘাতে।
ভীমসেন বিনাশেন সেনা গদা হাতে।।
পার্থ ঘোর যুদ্ধ রত তথা সেইকালে।
হত কত শত্রুসেনা তাঁর শরজালে।।
হেরিয়া অর্জুন সনে করিবারে রণ,
আইলেন রণস্থলে কৃপ দুর্যোধন।।
অশ্বত্থামা-শরজালে আচ্ছন্ন গগন।
তাঁর সনে করে রণ পাণ্ডু-সেনাগণ।।
ক্রুদ্ধ যুধিষ্ঠির তাঁরে কহেন তখন,
বিপ্র হয়ে যুদ্ধ কর কেন অকারণ।।
হেনরূপে হ’লে তুমি নিকৃষ্ট ব্রাহ্মণ।
দান ধ্যান কর আর বেদ অধ্যয়ন।।
শুনিলেন অশ্বত্থামা না কহি বচন।
নাশিবারে শত্রু তাঁর নিবেশিত মন।।
যুধিষ্ঠির বিচলিত তাঁর সাথে রণে।
ত্যাজিলেন রণাঙ্গন দিয়া ভঙ্গ রণে।।
ধৃষ্টদ্যুম্ন দুর্যোধন ঘোর যুদ্ধ রত।
দুর্যোধনের রথাশ্ব নষ্ট সেনা কত।।
দুর্যোধন অন্য রথে করি আরোহন,
শিবিরে করেন তিনি ত্বরা পলায়ন।।
কর্ণ আইলেন তথা করিবারে রণ।
ব্যাঘ্র মৃগযূথে যথা করে আক্রমণ।।
ধৃষ্টদ্যুম্ন রণক্লান্ত কর্ণ-আক্রমণে।
কত শত পাণ্ডুসেনা ব্যস্ত পলায়নে।।
উচাটন পার্থ তাই কৃষ্ণে তিনি কন,
কর্ণ সকাশে ত্বরায় করহ গমন।।
অশ্বত্থামা আইলেন গতি নিবারণে।
করিলেন রোধ তিনি শর বরষণে।।
শৈথিল্য হেরি পার্থের কৃষ্ণ তাঁরে কন,
বাহুবল লুপ্ত তব হয়েছে এখন।।
গাণ্ডীব সত্ত্বর তুমি কর ব্যবহার।
অশ্বত্থামায় করহ ত্বরিতে সংহার।।
গুরুপুত্র স্মরি নাহি করহ উপেক্ষা।
নচেৎ যাইবে প্রাণ নাই কোন রক্ষা।।
হেন বচন অর্জুন করিয়া শ্রবণ,
চতুর্দশ ভল্ল তিনি করেন ক্ষেপন।।
ভল্লাঘাতে অশ্বত্থামা হন অচেতন।
তুলিয়া সারথি তাঁরে করে পলায়ন।।
যুধিষ্ঠির উচাটন যুদ্ধে কর্ণ সাথে।
হইলেন বিদ্ধ তিনি কর্ণ-শরাঘাতে।।
হেরি তাই দয়াবশে কহেন মাতুল,
যুধিষ্ঠির সনে রণে নাহি কর ভুল।।
অস্ত্র শস্ত্র বৃথা ক্ষয় নাহি কর আর।
অচিরে শূন্য হইবে তূনীর তোমার।।
অর্জুনের সনে রণ করিবে কেমনে।
বাধ্য হইবে তখন তুমি পলায়নে।।
সর্বাগ্রে উচিত তব অর্জুনে নিধন।
তারপর অন্য কার্যে করহ মনন।।
হের ওই ভীমসেন রণেন ভীষণ।
দুর্যোধনে তিনি বুঝি করেন নিধন।।
সত্ত্বর সেথায় তাই করহ গমন।
রক্ষিতে হইবে তাঁরে সর্বাগ্রে এখন।।
হেন কহি দোঁহে যান দুর্যোধন ত্রাণে।
আইলেন তথা তাঁরা ব্যাকুলিত প্রাণে।।

রণে ক্ষত যুধিষ্ঠির লাজ ল’য়ে মনে,
আইলেন শিবিরেতে সারথির সনে।
উৎপাটিত যদিবা দেহ শল্য যত,
নিরাময় নাহি হয় মানসিক ক্ষত।।

ভার্গবাস্ত্র কর্ণ রণে করেন ক্ষেপন।
দলে দলে পাণ্ডুসেনা করিতে নিধন।।
হেরিয়া অর্জুন তাহা উচাটন মন।
সেইক্ষণে কৃষ্ণে তিনি কহেন তখন।।
করিতে নারিব এই অস্ত্র নিবারণ।
সম্ভবও নয় মোর যুদ্ধ পলায়ন।।
কহিলেন কৃষ্ণ তাঁরে করিয়া শ্রবণ,
পাণ্ডব শিবিরে এবে করহ গমন।।
রণ-ক্ষত যুধিষ্ঠির করিয়া শয়ন।
আশ্বস্ত করহ তাঁরে দিয়া দরশন।।
তারপর রণক্ষেত্রে ফিরিয়া আবার,
কর্ণ সনে রণ তুমি কর পুনর্বার।।
রণক্লান্ত হবে কর্ণ দীর্ঘক্ষণ রণে।
বধিবে তখন তারে শর বরষণে।।

( চলবে )

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published.