Spread the love

ইউক্রেন সংকট ও ভারত

ভ্রান্তি অধিকারী

স্বাধীনতার ঊষা লগ্ন থেকেই আন্তর্জাতিক সংকটে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একথা ঠিক যে সুদীর্ঘ পৌনে দু’শো বছরের ব্রিটিশ ও ঔপোনিবেশিক শাসনের ফলশ্রুতি হিসাবে ভারতবর্ষ আজও ক্ষুধা-দারিদ্র বেকারী-অনগ্রসরতা ইত্যাদির শিকার। স্বাধীনতা প্রাপ্তির অব্যবহিত পরে তার এই বোঝা ছিল পর্বত প্রমান। এতদসত্ত্বে সেই পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকে ভারতবর্ষ উত্তেজনা প্রশমন এবং বিশ্বশান্তি  নিরাপত্তা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। 

প্রকাশ থাকে যে ভারতবর্ষের বিদেশনীতি হোল জোট নিরপেক্ষ বিদেশ নীতি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকা বিশ্বের দুই মহাশক্তিধর দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ার নেতা হিসাবে এবং আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়ার নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনভারতবর্ষ এই দুই জোটের কোনটির সঙ্গে নিজেকে অঙ্গীভূত করে নি। ভারত ঘোষণা করে যে সে জোট নিরপেক্ষ থাকবে। অর্থাৎ স্বাধীন অবস্থানে দাঁড়িয়ে সে প্রতিটি আন্তর্জাতিক সমস্যার মূল্যায়ন করবে এবং সেই মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এই প্রসঙ্গে আমাদের দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর একটি বক্তব্য খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন যে আমরা জোট নিরপেক্ষ বটে, কিন্তু আমরা নির্লিপ্ত নই। তাঁর মতে স্বাধীনতা যেখানে পদদলিত, ন্যায়বিচার যেখানে বিপন্ন, সেখানে আমরা কখনই নির্বিকার থাকতে পারি না, নির্বিকার থাকবো না। তাঁর ভাষায়– “Where freedom is menaced, justice threatend, we shall not be and cannot be neutral.” নেহেরুর এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে ভারতের জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতির কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়–(১) ভারতের জোট নিরপেক্ষ বিদেশ নীতি হলো সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। (২) এই বিদেশনীতি হলো ঔপোনিবেশিকতাবাদ বিরোধী; (৩) এই বিদেশ নীতি হলো বর্ণ বৈষম্যবাদ বিরোধী; (৪) আমাদের জোট নিরপেক্ষ বিদেশনীতি অনাক্রমন, অনাগ্রমন,ও শান্তিপূর্ণ সহবস্থানে বিশ্বাসী।

বিদেশনীতির এই দৃষ্টিকোণের জন্য সেই চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকের গোধূলিকাল থেকে ভারতবর্ষ তার কঠিন ও জটিল আর্থ-সামাজিক-সংস্কৃতিক সংকটাবলী সত্ত্বেও বিশ্বের দরবারে তার মর্যাদার আসন হিমালয় সম সুউচ্চে রেখেছে। 

তাই আমরা লক্ষ্য করি যে, প্রতিটি আন্তর্জাতিক সংকটে তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ শান্তিকামী ভূমিকাকে বিশ্ববাসী সম্মান করে এসেছে। আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তি ঘটেছে ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসের ১৫ তারিখে, আর কোরিয়ার সংকট শুরু হয়েছে ১৯৫০ সালের ২৫শে জুন তারিখে। কোরিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমেরিকা, এবং উত্তর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে সম্মুখ সমরে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। সমাজতান্ত্রিক ও ধনতান্ত্রিক দুই শিবিরে এই মুখোমুখী সংঘর্ষ কালে উত্তেজনা প্রশমন ও বিশ্বশান্তি রক্ষার প্রয়াসে নেমে পড়েন ভারতের প্রধান মন্ত্রী পণ্ডিত নেহেরু। তাঁর মধ্যস্থতাকে সব পক্ষ অর্থাৎ আমেরিকা, চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সবাই মেনে নেন। সে সময় আমেরিকায় হেরি ট্রুম্যান-আইসেন হাওয়ারের যুগ। কমরেড যোসেফ স্ট্যালিন ও কমরেড মাওসেতুং ক্রেমলিন ও পিকিং এর কর্ণধার। সকলেই প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর শান্তি প্রস্তাবকে মেনে নেন। 

এরপর ১৮৫৬ সালে সুয়েজ সংকটে একদিকে রাষ্ট্রপতি নাসের ও সোভিয়েত প্রধান নিকিতা ক্রুশচেভ, অন্যদিকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার নেতৃদ্বয় প্রধানমন্ত্রী এন্থনী ইডেন ও রাষ্ট্রপতি আইসেন হাওয়ার। ইং-মার্কিন বনাম মিশর সোভিয়েত দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপটে সুয়েজ সংকটে গোটা বিশ্বজুড়ে এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখানেও বিবাদমান পক্ষগুলিকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে বিশ্ব শান্তির পথ সুগম করেন পণ্ডিত নেহেরু। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরু একইভাবে ১৯৬০ সালে কঙ্গো সংকট ও ১৯৬২ সালে কিউবা সংকটে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। নেহেরু কন্যা শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ১৯৭০-৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের সময় এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং শুধু এশিয়া নয়, গোটা পৃথিবীতে এক নতুন প্রভাতের সূচনা করেছিলেন।

এক কথায় ভারতবর্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস একথা প্রমাণ করে যে, অতীত দিনের ভারতের প্রধানমন্ত্রীরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার কারণ ছিল এই যে অনেক সীমাবদ্ধতা তাঁদের থাকলেও তাঁরা ছিলেন একনিষ্ঠ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও জোট নিরপেক্ষতাবাদী। এই আদর্শগত বনিয়াদই ছিল তাঁদের সাফল্যের চাবি কাঠি। আর ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার তথা তার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হলেন আমেরিকা তথা তার দাবারগুটি NATO-র সেবাদাস। NATO রাশিয়াকে বিপন্ন করতে চায় ইউক্রেনকে শিখন্ডী করে। রুশ ইউক্রেন সংকটের মূল বীজ এখানে। মোদীর গালে আতপ চাল। তিনি আমেরিকা তথা NATO -র মূল ষড়যন্ত্রটা বিশ্ববাসীর কাছে ফাঁস করবেন কি করে? তাই তিনি মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন এ ব্যাপারে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী নেহেরু বা প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী গান্ধীর মতো ৫৬ ইঞ্চির বুকের ছাতির মিঁত্রো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী রুশ ইউক্রেন সংকটে কোন সদর্থক ভূমিকা পালন করবেন কি করে? বিশ্বের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেদের জনমতের চাপ অবশ্যই অচিরে এই সংকটের সমাধানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে, এবং যুদ্ধ বাদের হাতিয়ার NATO -র অবলুপ্তি ঘটাবে। এ বিষয়ে আছে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। 

লেখিকা–পরিচিতি

অধ্যাপিকা ভ্রান্তি অধিকারী একজন জননেত্রী, লেখিকা, ও প্রশাসিকা। তিনি দীর্ঘদিন উত্তর ২৪ পরগণা জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি ছিলেন, জনস্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মাধ্যক্ষা ছিলেন। তিনি হলেন রাষ্ট্রীয় বিদ্যাসরস্বতী পুরস্কারে ভূষিত জাতীয় স্তরের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক খগেন্দ্রনাথ অধিকারীর জীবন সঙ্গিনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *