Spread the love

আমরা কি সত্যিই প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ পেয়েছি?

বটু কৃষ্ণ হালদার

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায়/ দাসত্ব শৃংখল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়? কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন রচনা কেউ পড়ুক বা না পড়ুক কিন্তু এই সুন্দর পংক্তিটির মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা লাভের উচ্ছ্বাস সুন্দরভাবে প্রকাশ পায়। যুগের পর যুগ বুকভরা উক্তিটি অমর হয়ে থাকবে জাতির জীবনে। প্রতিবছরই আমরা ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করি, তাই স্বাধীনতা আমাদের কাছে চির নবীন অস্তিত্ব। ইদানিং আবার ১৪ই আগস্ট রাত বারোটার পর পতাকা উত্তোলনের বাতিক বাড়ছে দিন দিন। কিন্তু স্বাধীনতা দিবসের ৭৬ বছর করতে গিয়ে বুকের মাঝে কোথাও একটু বোধহয় খটকা লাগে আমরা আজও কি স্বাধীনতা দিবস অন্তর থেকে পালন করি? কারণ স্বাধীনতা দিবস মানে সমগ্র ভারতবাসীর মুক্তির দিবস। যা ছিল কল্পনার অতীত, তা প্রজাপতির ডানার মত এ বাগান থেকে সে বাগান খুশির মতো উড়ে বেড়ানোর আনন্দ এসেছিল তাজা তাজা রক্তের বিনিময়ে। স্বাধীনতা নাইটেঙ্গেল পাখির গান, দম বন্ধ করা পরিবেশ থেকে চিরতরে মুক্তি। সেই সঙ্গে পুনরায় অনুভব করা হল যে আমরা ১৯৪৭ সালের আগে পরাধীন ছিলাম। দাসত্বের বেড়ি আমাদের পায়ের নিত্য সঙ্গী ছিল। ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল দেশের মানচিত্র।রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল দেশের মাটি। যে মাটি বর্তমান সময়ে সোনার থেকেও খাঁটি সেই মাটিতে ছিল রক্তের সোঁদা গন্ধ। সেই মাটিকে খাঁটি সোনা করতে সংকল্প নিয়েছিল একশ্রেণীর দেশপ্রেমিকরা। তার জন্যে ছিল আত্মত্যাগের লড়াই। জীবনের মানে বুঝে ওঠার আগেই দেশমাতার বহু সন্তানরা নির্দ্বিধায়, অকাতরে, ভয়ডর হীন  ভাবে হাসতে হাসতে ফাঁসিতে ঝুলে ছিল। স্বাধীনতার লড়াই লড়তে গিয়ে বুকে গুলি খেয়েছিল। কোন কোন দেশ প্রেমিক জেলের ভিতর দুধ ছানা কচি পাঁঠার মাংস পেলেও বহু বিপ্লবী কে অকথ্য অত্যাচার, নির্যাতন করা হয়েছে। যোনির ভিতর লঙ্কার গুঁড়ো দেওয়া হয়েছে। বহু নারী বিপ্লবীদের ধর্ষণ করা হয়েছে। বহু বিপ্লবীর লাশ গঙ্গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। বহু বিপ্লবী দ্বীপান্তরিত, দেশ ছাড়া হয়েছিল। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মত বহু বিপ্লবী ভিক্ষা চেয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে চাননি। চোখে, মুখে শিরায়, শিরায় দৌড়েছিল বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ। চোখের তারায় স্বপ্ন ছিল দেশবাসীর একদিন মুক্তি লাভ হবে। বহু আত্মত্যাগ তাজা তাজা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা আমরা পেলাম কিন্তু স্বাধীনতা নিয়ে ভাবলেই যে প্রশ্ন মনের মধ্যে জেগে ওঠে জীবন বলিদান এর মধ্যে দিয়ে আমরা যে স্বাধীনতা লাভ করেছি  সেটা সত্যিই স্বাধীনতা? কারণ স্বাধীনতার পরে বহু বিপ্লবীকে অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মরতে হয়েছিল। দেশের লাগাম কংগ্রেসের নয় গাঁধী বংশের হতে উঠেছে। তা থেকে ভারত বাসীর আজও মুক্তি ঘটেনি। ব্রিটিশদের কবল থেকে মুক্তি ঘটেছে গাঁধী বংশের হাত থেকে নয়। আর তাদের আঙুলের ইশারায় বহু বিপ্লবীদের ইতিহাসের পাতায় স্থান হয় নি। বহু বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী তকমা জুটে ছিল কপালে, এমনকি তাদের ইশারায় মুক্তি হওয়া বহু বিপ্লবী দের ফাঁসি কাঠে ঝুলতে হয়েছিল। জীবিত বিপ্লবীদের নূন্যতম ভাতা টুকু মেলেনি। চোখের জলে নীরবে বিদায় নিয়েছে। অথচ তাঁরা ও তাঁদের পরিবার দেশের টাকায় মহা ভুরিভোজ করেছে, বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছে। এর নাম কি স্বাধীনতা?

১৪ই আগস্ট রাত বারোটার পর স্বাধীনতা দিবস পালন করতে গিয়ে যারা পতাকা উত্তোলন করেন তাদের মধ্যেই বেশিরভাগ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ইতিমধ্যেই অনেক নেতা মন্ত্রীরা জেল খাটছে তারাও স্বাধীনতার গল্প শুনিয়েছেন, ভাষণ দিয়েছেন, পতাকা উত্তোলন করেছেন। এইসব কি মিথ্যা নাটক নয়? স্বাধীনতা দিবসের লজ্জা নয়? দেশের পতাকার অপমান নয়?আবার কেউবা খুনি দাগি, মস্তান আবার কেউ বা জেল খাটা আসামী। আমাদের দেশে বর্তমানে যারা নিজেদের দেশ সেবক বলে মনে করেন তাদের মধ্যে বেশিরভাগ স্বার্থপর। আবার খুনি জেল খাটা আসামি না হলে ভোটের টিকিট পান না। অশিক্ষিত,বর্বর। কোনমতে পতাকা উত্তোলন করে দিয়ে সারারাত ধরে মদ আর মাংস খেয়ে উল্লাস করে। এর জন্যই কি বিপ্লবীরা প্রাণ দিয়ে গেছেন? শুধু তাই নয় স্বাধীনতার ছিয়াত্তর বছর পরেও ব্রিটিশদের কোটি কোটি টাকা কর দিতে হয়। ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ সংস্থা ক্লিক নিক্সন মহারাষ্ট্রের অমরাবতী এবং মর্তুজা পুরের মধ্যে একটি ন্যারোগেজ রেললাইনে স্থাপন করেছিল করেছিল যার দৈর্ঘ্য হল মোট ১৯৯ কিমি সময় লেগেছিল ১৩ বছর। সেই রুটে একমাত্র শকুন্তলা এক্সপ্রেস চলে, তাই এই রুটটির নাম শকুন্তলা রুট। ধীর গতিতে চলা এই ট্রেনটি সম্পূর্ণ যাত্রা করতে সময় লাগে ৬ থেকে ৭ ঘন্টা, এই রুটের মধ্যে ছোট বড় মিলিয়ে ট্রেনটি মোট ১৭ টি স্টেশনে থামে। প্রায় ১০০ বছরের পুরানো এই ট্রেনটি আগে বাষ্প ইঞ্জিনের সাহায্যে চলত কিন্তু ১৯৯৪ সালে এটি ডিজেল ইঞ্জিনের দ্বারা চালানো শুরু হয়। কিন্তু মজার বিষয় হল স্বাধীনতার ৭৬ বছরে এসেও এখনো ওই লাইনটি ব্রিটিশ সংস্থা দ্বারা পরিচালনা করা হয় এবং পাঁচ বগি ওয়ালা ট্রেনটিতে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি মানুষ যাতায়াত করেন। ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও ব্রিটিশদের অধীনে রয়ে গেছে লাইনটি। কারণ ১৯৫১ সালে যখন ভারতের সমস্ত রেলপথের জাতীয়করণ করা হয়েছিল তখন কোন এক অজানা কারণে ওই রেলপথ ভারত সরকারের অধীনে আসেনি তারপর থেকে আর এটার জাতীয়করণ করা হয়নি। তার জন্য ভারত সরকারকে আজও ব্রিটিশ সংস্থাকে ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা করে কর দিতে হয় বাৎসরিক।স্বাধীন দেশে  কেন ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখল থাকবে সে বিষয়টা আজও বোধগম্য নয়। যে টাকাটা ব্রিটিশ সরকারকে কর হিসাবে দিতে হয় তা আমাদের দেশের টাকা। ভারতবর্ষের কোন সরকার এই বিষয়টা নিয়ে  মাথা ঘামাননি কেন?

দেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও দেশের সর্বোচ্চ জায়গায় ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয় না। পতাকা উত্তোলন করা হয় না, জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না যে দেশের মাটি, ফল, ফুল, হাওয়া,বাতাস গায়ে মেখে জীবন কাটাচ্ছে সেই দেশেতেই পাকিস্তানের পতাকা তুলে ভারত মুর্দাবাদ স্লোগান দেওয়া হচ্ছে।প্রকৃত ভারতবাসী বঞ্চিত, লাঞ্ছিত হচ্ছে আর বহিরাগত উদ্বাস্তুরা ভারতবর্ষে এসে মহাসুখে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। এই জন্যই কি বিপ্লবীরা প্রাণ দিয়ে গেছেন দেশকে স্বাধীন করার জন্য? তবুও স্বাধীনতা দিবস কারো কারো কাছে অত্যন্ত দুঃখের। অন্তর দিয়ে অনুধাবন করেন। তবে স্বাধীনতার এত বছর পরে জাত ধর্মর বৈষম্য ভীষণ ভাবে প্রকট হয়ে উঠছে। যা খুব চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে জাত ধর্ম নির্বিশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা এনেছিল।ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, নেতা মন্ত্রীরা রাতারাতি কোটিপতিতে পরিনত হচ্ছে, আর বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ জনগণ। গরীবরা আরো গরীব হচ্ছে। হু হু করে বাড়ছে দ্রব্য মুল্যর দাম। শিল্প কারখানার অকালে মৃত্যু ঘটছে যার ফলে বাড়ছে বেকারত্বর সংখ্যা। বেতন বৈষম্য বাড়ছে। দেশের প্রতিভাবান শিক্ষিতরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের চাকরি ও ভবিষ্যৎ দুই চুরি হচ্ছে। তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। শিক্ষিতরা জীবন বাঁচানোর তাগিদে দুর্নীতিমূলক কাজে লিপ্ত হচ্ছে। যা দেশের জন্যে ভয়ঙ্কর। নারী সুরক্ষার বিষয় এখনও আঁধারে ডুবে আছে। শুধু নারী প্রকল্পের কথা বলে সুরক্ষার দায় এড়িয়ে গেলে চলবে না। দেশের আইন ব্যবস্থা নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। কারণ ইতিমধ্যেই ধনী, নেতা,মন্ত্রীরা টাকার জোরে আইন ব্যবস্থাকে পকেটে পুরে ফেলেছে। আমাদের দেশে যত ধরণের দুর্নীতিমূলক কাজ হচ্ছে, তাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জড়িত আছে নেতা মন্ত্রীরা। সেই সব নেতা-মন্ত্রীরা অপরাধ মূলক কাজ করে রেহাই পেয়ে যান। কিন্তু গরিবরা এক মুঠো চাল চুরির অপরাধে বছরের পর বছর সাজা ভোগ করেন। আমাদের দেশের আইন ব্যবস্থা বর্তমান সময়ে বড়লোকদের কাছে মুক্ত আকাশ, আর গরীবের কাছে মাকড়সার জাল। সরকারকে সবকিছু বিষয়ে মাথায় রাখতে হবে। স্বাধীনতা দিবসের ৭৬ বছর দিবস পালনীয়তে সরকারকে সংকল্প নিতে হবে যাতে দেশের মানুষ সুবিচার পায়। সরকারি অনুদান থেকে তারা যেন বঞ্চিত না হয়।

*লেখকের মতামত সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed

পুনরাবৃত্তি ©অঞ্জলি দে নন্দী, মম আমার বয়স তখন অধিক নহে। বিদ্যালয়ের নিম্ন শ্রেণীর ছাত্রী। বঙ্গ ভাষায় পাঠ্যরূপে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কপালকুণ্ডলার কিয়দংশ পাঠ করান হইত। আমি শ্রেণীর খুব মেধাবিনী পঠিয়ত্রী ছিলুম। আমি প্রথম স্থান অধিকার করিয়া প্রত্যেক বৎসর ঊর্ধ্ব শ্রেণীতে গমন করিতুম। ঐ পাঠ্যের এক পত্রে বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয় কতৃক লিখিত হইয়াছিল, ” তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন? ” পাঠ্যে ওই অংশটির নাম ছিল, ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’। যাহা হউক- আমার চিত্তে এই বাক্যটি গভীরভাবে রেখাপাত করিয়াছিল। আমার সহিত উক্ত সময় নবকুমার বাবুর সহিত যেইরূপ ঘটিয়াছিল ঐরূপ কিছু ঘটিলে আমি তাহাকে ঠিক ঐরূপভাবেই গ্রহণ করিতুম। কিন্তু এই সময়ে আমি উহাকে পরিবর্তীত করিয়া লইয়াছি। এইরূপে – তুমি অতিশয় অধম সেইহেতু বলপূর্বক আমাকেও ঠিক তোমারই স্বরূপ অতি অধমে রূপান্তরিত করিতে চাহিতেছ। আমি অতি অধম না হইলে তুমি আমাকে কৌশলে এই ইহলোক হইতে পরলোকে পাঠাইয়া দিবে। সেইহেতু আমি মৃত্যুলোকবাসীনি না হইবার কারণ বসত তোমাকে সন্তুষ্ট করিবার হেতু মিথ্যা অভিনয় করিয়া তোমাকে দৃশ্য করাইয়া চলিতেছি যে আমিও তোমার স্বরূপই অতি অধমে পরিণত হইয়াছি। বাস্তবিকই তোমার প্রচেষ্টা সার্থক হইয়াছে। আমি আর পূর্বের ন্যায় অতি উত্তম নহি। কিন্তু তুমি কদাপি বুঝিতে পার নাই যে আমি প্রাণে বাঁচিয়া থাকিবার নিমিত্ত তোমার সম্মুখে এইরূপ মিথ্যা, নকল অভিনয় করিতেছি। আদৌই আমি অধম হই নাই। পূর্বে যেইরূপ অতি উত্তম ছিলুম অদ্যাপি ঐরূপই বিদ্যমান রহিয়াছি। কেবলমাত্র একটি নকল আবরণ ধারণ করিয়াছি। নতুবা অকালে তোমার হস্তে আমার প্রাণ বিসর্জিতা হইত। তদপেক্ষা ইহা অধিকতর সঠিক পথ বলিয়া আমা কতৃক ইহা বিবেচিতা।