প্রফেসর শিমুল

✍️ শিমুল গোল
১. চন্দ্রাভিযানের রোমাঞ্চ
প্রফেসর শিমুল যখন ল্যাবরেটরির কাচের জানালায় হাত দিয়ে দাঁড়ান, তখন তাঁকে বিজ্ঞানীর চেয়ে কোনো দুঃসাহসী অভিযাত্রী বেশি মনে হয়। পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স হলেও তাঁর শরীর যেন ইস্পাতে গড়া—টানটান পিঠ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর চিবুকে সর্বদা এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের আভাস। পোশাক-আশাকে তিনি অত্যন্ত পরিপাটি, ঠিক যেন এক ফিটফাট ব্রিটিশ জেন্টলম্যান।
তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিল দুই তরুণ গবেষক—অর্ক এবং অনিন্দ্য। অর্ক কিছুটা চঞ্চল হলেও গণিতে তুখড়, আর অনিন্দ্য শান্ত ও যন্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী।
প্রফেসর শিমুল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “অর্ক, অনিন্দ্য, আমাদের তৈরি ‘আকাশতরী-৩’ মহাকাশযান প্রস্তুত। চাঁদের দক্ষিণ মেরুর যে রহস্যময় সংকেত আমরা পেয়েছি, তার উৎস সন্ধান করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তোমরা কি তৈরি?”
“আমরা সম্পূর্ণ তৈরি, প্রফেসর,” অর্ক উত্তেজিত গলায় বলল।
রকেটের কাউন্টডাউন শুরু হলো। প্রচণ্ড গর্জনে মেদিনী কাঁপিয়ে আকাশতরী-৩ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছিন্ন করে মহাশূন্যের বুকে ডানা মেলল।
২. চাঁদের বুকে অদ্ভুত আতঙ্ক
চাঁদের বুকে যখন মহাকাশযানটি অবতরণ করল, চারদিকের ধূসর, নিস্তব্ধ পরিবেশ দেখে গা ছমছম করে ওঠে। স্পেসস্যুট পরে প্রফেসর শিমুল প্রথম পা রাখলেন চাঁদের মাটিতে। তাঁর পেছনে অনিন্দ্য আর অর্ক।
হঠাৎ অনিন্দ্য চিৎকার করে উঠল, “প্রটোকল মনিটরে একটা থার্মাল সিগনেচার দেখা যাচ্ছে, প্রফেসর! আমাদের দিকেই কিছু একটা এগিয়ে আসছে!”
তারা টর্চের আলো ফেলতেই শিউরে উঠল। চাঁদের একটি গভীর গিরিখাতের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসছে এক অদ্ভুত আকৃতির মানুষ—অথবা মানুষরূপী কোনো প্রাণী! তার শরীর কাচের মতো স্বচ্ছ, ভেতরের নীলচে শিরার মধ্য দিয়ে এক ধরনের আলো প্রবাহিত হচ্ছে। চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল।
সেই অদ্ভুত প্রাণীটি মানুষের ভাষা বোঝে না। সে এক বিকট চিৎকার করে প্রফেসরদের দিকে তাড়া করল। তার হাতের এক ইশারাতেই চাঁদের নুড়ি-পাথরগুলো বাতাসে ভেসে উঠে বুলেটের মতো ধেয়ে আসতে লাগল।
“অর্ক, লেজার গান বের করো! অনিন্দ্য, রকেটের থ্রাস্টার অন করো!” প্রফেসর শিমুল একটুও আতঙ্কিত না হয়ে আদেশ দিলেন।
শুরু হলো এক অসম এবং অদ্ভুত লড়াই। চাঁদের কম মাধ্যাকর্ষণের সুবিধা নিয়ে সেই প্রাণীটি বিশাল বিশাল লাফ দিয়ে প্রফেসরের ঘাড়ে পড়তে চাইল। কিন্তু প্রফেসরের ক্ষিপ্রতা ছিল দেখার মতো। তিনি শূন্যেই শরীর মোচড় দিয়ে প্রাণীটির আঘাত এড়িয়ে গেলেন এবং নিজের পোর্টাবল ইলেকট্রোম্যাগনেটিক গান দিয়ে একটি শক্তিশালী রশ্মি ছুঁড়লেন। প্রাণীটি সাময়িকভাবে স্তব্ধ হয়ে পড়ে গেল।
“ছুটো! রকেটে ওঠো!” প্রফেসরের চিৎকারে অর্ক ও অনিন্দ্য ছিটকে রকেটের ভেতর ঢুকে পড়ল। প্রাণীটি আবার উঠে তাড়া করার আগেই প্রফেসর কন্ট্রোল প্যানেলের বোতাম চেপে দিলেন। রকেট প্রচণ্ড গতিতে চাঁদের মাটি ছেড়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল।
৩. মহাজাগতিক ঝড় এবং মঙ্গল গ্রহ
চাঁদের কক্ষপথ ছেড়ে পৃথিবীর দিকে ফেরার উপায় ছিল না, কারণ জ্বালানি ট্যাঙ্কে সামান্য ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। তার ওপর মহাশূন্যের মনিটরে ফুটে উঠল এক নতুন বিপদ—ভয়াবহ মহাজাগতিক ঝড় (Cosmic Storm)। তীব্র সৌরঝড় এবং গ্রহাণুপুঞ্জের তাণ্ডব এড়াতে প্রফেসর শিমুল রকেটের গতিপথ পরিবর্তন করলেন মঙ্গলের দিকে।
“আমাদের লাল গ্রহে ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং করতে হবে,” প্রফেসর শান্ত মুখে স্টিয়ারিং সামলাতে সামলাতে বললেন।
মঙ্গল গ্রহে যখন তারা নামল, তখন সেখানে চলছে আদিম যুগের মতো ধূলোর ঝড় আর অ্যাসিড বৃষ্টি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে গেল সেই বৈরী পরিবেশে। মহাকাশযানের ভেতরে বসেই তারা মঙ্গলের মাটির গঠন, ভূগর্ভস্থ জলের কণা এবং অদ্ভুত কিছু জীবাণুর সন্ধান পেলেন। প্রফেসর শিমুলের অসীম ধৈর্য এবং সাহসের ওপর ভর করেই তরুণ দুটি ছেলে বেঁচে থাকার আশা বজায় রাখল। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁরা প্রচুর মূল্যবান বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করলেন।
৪. পৃথিবীর বুকে জাদুকরি জঙ্গল
অবশেষে মঙ্গলের ঝড় শান্ত হলে এবং রকেটের ক্ষতবিক্ষত অংশ কোনোমতে মেরামত করার পর, তাঁরা আবার পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে রকেটটি নির্দিষ্ট মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে না নেমে, এসে আছড়ে পড়ল এক আমাজন বা আফ্রিকার মতো এক গভীর, নামহীন জঙ্গলের বুকে।
রকেটের দরজা খুলে বের হতেই তাঁরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেলেন। জঙ্গলটি সাধারণ ছিল না, সেটি ছিল এক ‘জাদুকরি জাদুঘর’। চারপাশের গাছপালা থেকে মৃদু নীল ও সবুজ আলো নির্গত হচ্ছে। এমন কিছু অদ্ভুত উদ্ভিদ সেখানে রয়েছে, যা কোটি বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে ভাবা হতো। ডাইনোসর যুগের কিছু ছোট ছোট নিরীহ প্রাণী গাছের ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জায়গাটি অত্যন্ত নিরাপদ, কোনো হিংস্রতা নেই, যেন এক প্রকৃতির নিজস্ব সংগ্রহশালা।
অনিন্দ্য বিস্ময়ে বলল, “প্রফেসর, এটা তো প্রকৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর! এখানে মানুষের কোনো পায়ের ছাপ পড়েনি।”
প্রফেসর শিমুল ডায়েরিতে দ্রুত কলম চালিয়ে বললেন, “ঠিক তাই। প্রকৃতি নিজের সেরা সৃষ্টিগুলোকে এই দুর্ভেদ্য জঙ্গলে লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের রকেটটা দ্রুত সারাতে হবে, তবে এই জায়গার ক্ষতি না করে।”
৫. প্রত্যাবর্তন
সেই অদ্ভুত ও নিরাপদ জঙ্গলে কিছুদিন থেকে তাঁরা রকেটের শেষ মেরামতের কাজ সম্পন্ন করলেন। জাদুকরি জঙ্গলের ভেষজ উদ্ভিদ এবং বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের ছবি ও জিনগত তথ্য অত্যন্ত গোপনে এবং যত্ন সহকারে নিজেদের ডাটাবেসে সংগ্রহ করলেন তাঁরা।
কয়েকদিন পর, আকাশতরী-৩ আবার গর্জে উঠল এবং জঙ্গল থেকে উড়ে এসে সগৌরবে ল্যান্ড করল মূল লোকালয়ের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে।
চাঁদের সেই অদ্ভুত প্রাণীর তথ্য, মঙ্গলের দীর্ঘদিনের অভিযানের বিবরণ এবং পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা সেই জাদুকরি জাদুঘরের অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ঝুলি নিয়ে যখন প্রফেসর শিমুল রকেট থেকে নামলেন, তখন তাঁর পোশাকে বা অবয়বে ক্লান্তির কোনো চিহ্ন নেই। তিনি তখনও ঠিক ততটাই ফিটফাট এবং মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে।
সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের সামনে দাঁড়িয়ে প্রফেসর শিমুল মৃদু হেসে বললেন, “মহাবিশ্ব রহস্যের এক অন্তহীন ভাণ্ডার। আমরা কেবল তার একটা পৃষ্ঠা উলটেছি মাত্র