দানবীয় এবং দানবীর: তফাৎ শুধুই এক অক্ষরে
শ্যামল মণ্ডল

বাংলা ভাষার সৌন্দর্য শুধু তার শব্দভাণ্ডারের সমৃদ্ধিতেই নয়, শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থের গভীরতাতেও নিহিত। এমন অনেক শব্দ আছে যাদের বানানে সামান্য পার্থক্য থাকলেও অর্থে তারা সম্পূর্ণ বিপরীত। “দানবীয়” এবং “দানবীর” তেমনই দুটি শব্দ। এই দুই শব্দের মধ্যে পার্থক্য মাত্র একটি অক্ষরের, কিন্তু তাদের অর্থের ব্যবধান আকাশ-পাতাল।
“দানবীয়” শব্দটি এসেছে “দানব” থেকে। এর অর্থ হলো নিষ্ঠুর, অমানবিক, ভয়ঙ্কর বা নৃশংস। দানবীয় আচরণ মানুষের মধ্যে ভয়, ঘৃণা এবং কষ্টের জন্ম দেয়। ইতিহাসের নানা সময়ে আমরা দানবীয় কর্মকাণ্ডের উদাহরণ দেখেছি যুদ্ধ, গণহত্যা, অত্যাচার, শোষণ এবং দুর্বল মানুষের ওপর শক্তিশালীদের নির্মম নির্যাতন। এসব কাজ মানুষের মানবিক গুণাবলিকে কলঙ্কিত করে এবং সমাজে অশান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, “দানবীর” শব্দটি গঠিত হয়েছে “দান” এবং “বীর” শব্দের সমন্বয়ে। দানবীর বলতে বোঝায় সেই ব্যক্তিকে, যিনি উদার হৃদয়ে অন্যের কল্যাণে নিজের সম্পদ, শ্রম বা সামর্থ্য উৎসর্গ করেন। দানবীর মানুষেরা সমাজে আলো ছড়ান। তারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান, শিক্ষার প্রসার ঘটান, চিকিৎসা সহায়তা দেন এবং মানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখেন। ভারতীয় মহাকাব্যের কর্ণকে দানবীর হিসেবে স্মরণ করা হয়, কারণ তিনি নিজের সর্বস্ব দান করতে দ্বিধা করেননি।
এই দুই শব্দের তুলনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষের জীবনেও কখনো কখনো সামান্য একটি সিদ্ধান্ত, একটি চিন্তা বা একটি কাজই তাকে মহান কিংবা নিকৃষ্ট করে তুলতে পারে। একজন ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থকে সবার উপরে স্থান দেন এবং অন্যের ক্ষতি করে নিজের লাভ খোঁজেন, তখন তার মধ্যে দানবীয় প্রবৃত্তির প্রকাশ ঘটে। আবার যখন তিনি সহানুভূতি, মমতা ও উদারতার পরিচয় দেন, তখন তিনি দানবীরের পথ অনুসরণ করেন।
সমাজের উন্নতি ও শান্তির জন্য দানবীয় মানসিকতার পরিবর্তে দানবীরসুলভ মনোভাবের প্রয়োজন। অর্থের দানই শুধু দান নয়; জ্ঞান, সময়, শ্রম, ভালোবাসা ও সহানুভূতিও মূল্যবান দান। একজন শিক্ষক জ্ঞানদান করে, একজন চিকিৎসক সেবাদান করে, একজন স্বেচ্ছাসেবক শ্রমদান করে সমাজকে সমৃদ্ধ করেন। এভাবেই মানবতা বিকশিত হয়।
সুতরাং, “দানবীয়” এবং “দানবীর” শব্দদ্বয়ের মধ্যে পার্থক্য শুধু একটি অক্ষরের হলেও তাদের তাৎপর্য মানবজীবনের দুই বিপরীত দর্শনকে তুলে ধরে। একদিকে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংস; অন্যদিকে উদারতা, মানবতা ও কল্যাণ। আমাদের প্রত্যেকের উচিত দানবীয় প্রবৃত্তিকে পরিহার করে দানবীরসুলভ মানবিক গুণাবলি অর্জনের চেষ্টা করা। কারণ মানুষের প্রকৃত মহত্ত্ব তার সম্পদে নয়, তার উদারতা ও মানবপ্রেমে প্রকাশ পায়।
অসাধারণ ও মানসম্মত এ পত্রিকাটির উত্তরোত্তর উৎকর্ষতা ও প্রচার বৃদ্ধি হোক।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা