পুষ্প
———
লিলি সেন।
কৃষ্ণনগর, নদিয়া।প.ব।
সেই থেকে পুষ্প ভেবেই চলেছে, আর ভেবেই চলেছে…….., মুখে হাত রেখে চাটাই বেড়ার ঘরে মাটির দাওয়ায় বসে কোন এক শীতের নির্জন সন্ধ্যায়। হ্যাঁ, শীতই তো,দোচালা ঘরটির উপরে করগেট টিনের ছাউনি আর বারান্দার চালের ছাউনি টালির। চারদিকে চাটাই বেড়া। উত্তুরে হাওয়া বইছে। ভাঙ্গাচোরা চাটাই বেড়ার ফাঁক ফোকর দিয়ে কন্ কনে ঠান্ডা ঢুকছে। ছোট্ট উঠানের এক কোনে ঝুর ঝুরে গোয়াল ঘরটি হেলে পড়েছে। মুদির দোকানদারের কাছ থেকে কয়েকটি ছেঁড়া আলুর বস্তা চেয়ে নিয়ে চারিদিকে ঘিরে রেখেছে। দোকানদার বলেছে বিনিময়ে একদিন খাঁটি দুধ খাওয়াতে হবে। পুষ্প তাতেই রাজি। কারণ এই শীতে না হলে গাই গোরুকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তবু সুখীর গা শীতে কাঁটা দিয়ে উঠছে। পুষ্প আদর করে গাই গোরুর নাম রেখেছে সুখী। আসলে এই বাড়ির চার চারটি প্রাণকে দুধ দিয়ে,গোবর দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছে এই গাই গরু। তাই এমন নাম।
এদিকে টালির ভারে ঘুঁনপোকায় খাওয়া বাঁশের বাতাগুলি নুইয়ে যেন কাঁদছে, আর বলছে আর কতকাল তোদের মাথায় এমনি ভাবে টালির শ্যাওলার চাল ধরে রাখবো বলতে পারিস ? বাড়ির উঠোনে প্রবেশের পথেই প্রকাণ্ড একটা আম গাছ নিঃশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে যেন অনুভূতির কথা শুনছে। একটা শুকনো বড় ডাল আলতো হাওয়ায় হঠাৎই ভেঙে পড়ল। যেন বলে উঠলো এই নে আমার বুড়ো অঙ্গের একাংশ তোকে দিয়ে দিলাম, ঘরটাকে একটু ঠিক্ ঠাক্ করে রাখ।বাঁশের খুঁটি গুলোর অবস্থা আরো খারাপ। যখন তখন গোটা চালটা মাথার উপর ভেঙে পড়তে পারে। পুষ্প তড়িঘড়ি একটা ভোঁতা দা দিয়ে অতি কষ্টে সেটিকে সাইজ করে কোনমতে একটি খুঁটির পাশে একটু শক্ত করে ঠেকনা দিয়ে দিল।
তার স্বামী ফটিক বিহারে এন. সি.লা.রি কোম্পানিতে কাজ করত। কিন্তু বাড়িতে আসার জন্য ছুটি চেয়ে ছুটি মঞ্জুর হয় নি। তাই রেগে ঐ কোম্পানির কাজ ছেড়ে দিয়ে এইচ.ই.সি কোম্পানিতে কাজে যোগ দিয়েছে।সে ছেলে মেয়েদের মুখটা বেশি দিন না দেখে থাকতে পারে না। অথচ বিহারে সংসার খরচ অনেকটাই বেশি।তার উপর আবার বাংলা মিডিয়ামের স্কুলও ফটিকের কোয়ার্টার থেকে অনেক দূরে। পড়াশোনার খরচও অনেক বেশি। তাই পরিবার নিয়ে বিহারে থাকাও সম্ভব হয় না। অগত্যা ফটিককেই মাঝে মাঝে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ায় আসতে হয়। আসলে অ্যাকাউন্টের কাজটা খুব ভালো জানা আছে,তাই কোন বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ পেতে অসুবিধা হয় না।কিন্তু কি একটা ঝামেলার জন্য প্রায় তিন চার মাস বাড়িতে টাকা পাঠায় না। তাহলে সংসার টা চলবে কিভাবে?এই বেহাল অবস্থার কথা কেই বা না জানে!
এই সব ছাই পাস্ ভাবতে ভাবতে পুষ্প মাথায় হাত দিয়ে বলে ওঠে—উফ্;কি যে করি! খুব শীত করছে। মনে মনে বলে— ছেলেমেয়েদের মানুষের মতো মানুষ করবে বলেই বিহার ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের একটা গ্রামে রয়ে গেছে শ্বশুরের ভিটে বাড়িতে, শেষে শাড়ির আঁচলটা মুড়িয়ে মাথায় ঘোমটা দিয়ে কুলো বধূর মতো সেটিকে কোনমতে গায়ে জড়িয়ে একটু কুঁজো হয়ে বসল।এবার বোধ হয় শীতটা একটু কম লাগবে। তারপর ছেলেমেয়েরা স্পোর্সের মাঠ থেকে ফিরে এলেই আগুন জ্বেলে দেবে সেদিনের কুড়ানো শুকনো আম পাতা গুলোতে। তাই এখন আর একটু কষ্ট করি……. ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যার অন্ধকার টা আরো একটু গাঁঢ় হয়ে এলো। পাখিরা অদূরের গাছ-গাছালি তে কিচির মিচির গান থামিয়ে তাদের ক্লান্ত চোখের পাতা মুদে দিয়েছে তাদের খুদে নীড়ে। পুষ্প ভাবতে থাকে আর অজানা আশঙ্কায় শরীরে যেন শীত ততটাই জাঁকিয়ে বাসা বাঁধতে থাকে। ছেলেমেয়েদের ফিরতে এত দেরি হচ্ছে কেন?মাটির দাওয়ায় সেই একই জায়গায় চুপ করে বসে থাকে। তবে কি খেলা শেষ হতে হতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে? আবারও মনে হয় ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক পার হয়ে তবেই বাড়ি ফিরতে হবে। রাস্তায় একের পর এক গাড়ি চলছে তো চলছেই; যদি কোন দুর্ঘটনা; না না এমন কেন ভাবছি! এমন সময় একটা বাদুর ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে অন্ধকার ঘরের একটি কোণে চুপ করে মুখ লুকিয়ে থাকলো। ভয়টা যেন এবার আরও একটু বেড়ে গেল কিন্তু ইস্; ইস্ ওদের তো খুব শীত করছে ।কতবার বললাম সোয়েটার টা সাথে নিয়ে যা। বাড়িতে ফিরে আসার সময় গায়ে গলিয়ে নিস্ ।কে কার কথা শোনে। সোয়েটার টা বহু পুরনো। তাই সাথে নিতে লজ্জা লাগে।কত বার বলেছি ওই ৫৫৫ সুতো আর বহু পুরনো রং চটা উল দিয়ে বোনা সোয়েটার হলেও ওটা নিয়েই আপাতত চালা, পরে তোদের বাবা আবার যখন বাড়িতে আসবে তখন ভালো দেখে সোয়েটার কিনে দেব। অবশ্য ৫৫৫ সুতো দিয়ে এখন আর কেউ সোয়েটার বোনে না। আমাদের মতো হতভাগা কেই বা আছে!কিন্তু কিছুতেই ওরা কথা শোনে না, বন্ধুদের কাছ থেকে প্যাক্ খাবে বলে। বাড়িতে অবশ্য ওটাই ছেলের শেষ সম্বল। শীতের দিনে কোথাও যেতে গেলে জামার ভিতরে আগে সোয়েটার টা পড়ে নেয়। কিন্তু ওভাবে তো ভর দুপুরে ছোটাছুটি করে খেলা যায় না।
তাদের একমাত্র সম্বল মানিকের দোকান।ওকে বলে কয়ে ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু চালের ব্যবস্থা করে মাঝে মাঝে।আর মাঝে মাঝে পুষ্পকে না খেয়েই দিনপাত করতে হয়। ওরা স্বামী স্ত্রী দুজন বলাবলি করে— ছেলেমেয়েরা বড় হলে দেখো আমাদের আর কোন কষ্ট থাকবে না। কিন্তু এখন তো ওদের বাবাও বাড়িতে নেই, বিহারেই পড়ে আছে। কি খাচ্ছে! কেমন ভাবে চলছে কি জানি!
এইসব ছাই পাস্ ভাবতে ভাবতে দেখতে পায় পাশের বাড়ির কাকিমা একটা লম্ফ হাতে করে জোর পায়ে এগিয়ে চেঁচাতে চেঁচাতে বাড়ি ঢুকছে— ও-গো শেফালির মা-আ-আ, দেখো দেখো কি কান্ডটাই না ঘটিয়েছে তোমার ছেলে মেয়েরা………… কই কোথায় গেলে গো? এমন জোরে চিৎকার শুনে পুষ্প রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে দাওয়া থেকে নামতে গিয়ে হোঁচট খায় আর কি। কি ঘটিয়েছে তার ছেলেমেয়েরা ? ওই কাকিমা তো ওদের তালপাতা ছাওয়া রান্না ঘরের বারান্দায় বসে খবরের কাগজের ঠোঙ্গা বানাচ্ছিল। সে কি এমন দেখেছে? তবে কি ওরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে ভাতজাংলা গ্রাম পঞ্চায়েতের মাঠে! খেলতে গিয়েছিল ফ্যান ভাত খেয়ে । ফ্যান ভাত ই বা বলি কেন? এক গামলা ফ্যানের মধ্যে তো মাত্র দুই হাতা ভাত আর একটু নুন দিয়ে ঘুঁটে তিনটি ছেলে মেয়েকে থালায় থালায় বেড়ে দিয়েছি। কার পাতে কটা ভাত পড়ছে গুনে বলা যাবে। সেই যে খেয়েছে তার পর এখনও পর্যন্ত আর কোন দানাপানি পড়েনি বোধ হয়। তবে যে শুনেছিলাম, খেলার মাঠে সব ছাত্রছাত্রীদের জন্য পাউরুটি কলার ব্যবস্থা আছে। ওদের যা পোড়া কপাল, তারপর আবার মুখচোরা। খাবার বোধ হয় চাইতেই পারেনি। বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে আসে। ওদের কষ্টে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে তো চোখের জল ও শুকিয়ে গেছে। চারদিকে শুধু হতাশা আর হতাশা।দুরের মরু কারবালার মতো গলার স্বর রুদ্ধ হয়ে আসে। কান্না ভেজা কাঁপো কাঁপো ঠোঁটে বলে ওঠে কি হয়েছে গো খুরি, ওরা কোথায়? পাশের বাড়ির কাকিমাকে পুষ্প খুরি বলেই ডাকে। ওরা ভালো আছে তো খুড়ি?—আমি এখনই যাব। মানিকের দোকান থেকে এক পোয়া চাল বুঝিয়ে সুজিয়ে ধার করে নিয়ে আসবো। ওদের খুব খিদে পেয়েছে। কই ওরা কই?
ওরা তিন ভাই বোন শেফালী, ডালিয়া, পলাশ। সবার হাতেই খেলার পুরস্কার। খুড়িমা চেঁচিয়ে বলে উঠলো, তোমার শেফালী মানে তোমার বড় মেয়ে মার্বেল স্পুন রেসে প্রথম হয়েছে। তোমার ছোট মেয়ে অংক দৌড়ে প্রথম হয়েছে। আর পলাশ ‘গো- এজ- ইউ- লাইক’ এ দ্বিতীয় হয়েছে। ওরা সবাই মাকে এসে জড়িয়ে ধরে খুশিতে খুশিতে স্বর্গ এনে দিল ছোট্ট চাটাই বেড়ার ঘরে। আর কত কথা জানালো, জানো তো পাপিয়া বলছিল তোরা সবাই প্রতি বছর কি করে পুরস্কার পাস্ রে। আমিতো পাইনা , তোদের রেজাল্টও তো খুব ভালো হয়।জানো তো মা ওরা বলছিল……. এত আনন্দে শীত কোথায় যেন পালিয়ে গেল। পুষ্প অতি আনন্দে কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনজন ছেলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে, তোরাই আমার সুখ আশা ভরসা সবকিছু। তোরা হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম কর। আমি দোকান থেকে চাল নিয়ে এসে এক্ষুনি দুটো আলু সিদ্ধ ভাত করে দেব। কিন্তু গ্রামের দোকান সন্ধ্যা লাগার কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও চাল যোগাড় হলো না। কান্নায় ভেঙে পড়ে পুষ্প, আর বলে ওঠে— অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়ে যায়। পুনরায় চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফেরে। উঠোনে ঢোকার আগে এক মুঠো হাসি নিয়ে ডাকে— পলাশ টালির চালের উপর একটা মিষ্টি কুমড়ো আছে।আমি লম্ফটা ধরি,তুই ওটা পেরে দিতে পারবি বাবা? আজ রাতে নতুন একটা খাবার তৈরি করব। শেফালী বলে না মা ভাই খুব ছোট। আমি চালে উঠব। ডালিয়া বলে দাঁড়া আমি কাঁচিটা এনে দিই। তখন শেফালী চতুর্থ শ্রেণীতে, ডালিয়া দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে, আর পলাশ প্রথম শ্রেণীতে পড়ে । অর্থাৎ শেফালী সবার বড়ো। তাই রেশন আনা, বাজার করা, মাঝে মাঝে মাঠে গিয়ে পাটের মোথা (শিকড়) তোলা সবই শেফালীকে করতে হয়।
পড়শীরা কেউ কেউ হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরে, আর রান্নাঘরের পিছনে বলাবলি করে।ওর ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খেতে দিতে পারে না,পড়ার বই কিনে দিতে পারেনা, তাও ওরা এত ভালো খেলে তা নয় পড়াশোনাতেও স্ট্যান্ড করে। এ কি করে সম্ভব? পুষ্প কুমড়ো সেদ্ধ করে একটু লবণ আর সকালের থেকে যাওয়া অল্প একটু ভাত দিয়ে ভালো করে চটকে তিন ছেলেমেয়েকে ভাগ করে দেয়, মুঠিতে এক একটা দলা পাকিয়ে। আর বলে ওঠে এটা তোদের ঠাকুমার দলা। খেয়ে দেখ্ কি সুস্বাদু হয়েছে। শেফালী বলে বলে মা তুমি খাবে না? না আজ উপোস আছি ।ওই পাড়াতে একজনার বাড়িতে শনির ঠাকুরের পূজো ছিল। এরপর আবার সেই দাওয়ায় এসে বসে, আর ঈশ্বরের কাছে বারবার মিথ্যে কথা বলার জন্য ক্ষমা চায়। আর কতদিন লাগবে এই দু্র্দিন থেকে বেরোতে ! সেই থেকে পুষ্প ভেবেই চলেছে আর ভেবেই চলেছে। মুখে হাত রেখে চাটাই ঘরের মাটির দাওয়ায় বসে। হঠাৎ ই দেখে তার স্বামী বিহার থেকে এসে হাজির। পুষ্প আর ভাবতে পারেনা…… অতদূর থেকে আসা স্বামীর সামনে এখন সে কি খেতে দেবে! সে বুঝি আবারও কাজ ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে। মানিকের দোকান থেকে বুঝি আর ধারে চাল পাওয়া যাবে না!
————————–
লেখিকা লিলি সেন একজন পরিচিত লেখিকা। তাঁর গল্প “পুষ্প” নির্মানে সামাজিক সত্যের প্রস্ফুটিত অবস্থান দিয়েছে। লেখিকার আরো গদ্য চাই।