সম্পাদকীয়: খড়কাঠ থেকে গ্যাস: উন্নয়নের আলো নাকি নির্ভরতার অন্ধকার?
– শ্যামল মণ্ডল

একসময় আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের রান্নাঘর ছিল প্রকৃত অর্থেই স্বনির্ভরতার প্রতীক। খড়, কাঠ, ঘুঁটে এইসব প্রাকৃতিক উপাদানই ছিল জ্বালানির প্রধান উৎস। কোনো বাজার নির্ভরতা ছিল না, ছিল না দামের চিন্তা। সংসারের চুলা জ্বলত নিজের জোগাড়ে, নিজের নিয়ন্ত্রণে। সেই চুলার ধোঁয়া যেমন কষ্ট দিত, তেমনি সেই আগুনেই লুকিয়ে ছিল স্বাধীনতার স্বাদ।
পরবর্তীকালে কয়লার উনুনের আগমন কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে এল। তাপের নিয়ন্ত্রণ বাড়ল, রান্নার গতি বাড়ল, কিন্তু একইসঙ্গে বাজারের সঙ্গে এক নতুন সম্পর্কও গড়ে উঠল। তবুও, সেই সময়ে জ্বালানির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কয়লা ছিল সহজলভ্য, তুলনামূলকভাবে সস্তা, এবং বিকল্পের সুযোগও ছিল।
কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন আসে গ্যাসের আগমনের সঙ্গে। “স্বাস্থ্য” ও “পরিবেশ রক্ষা” এই দুই শক্তিশালী যুক্তিকে সামনে রেখে গ্যাসকে প্রায় অপরিহার্য করে তোলা হয়। সরকারের উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে সিলিন্ডার পৌঁছে দেওয়া হয়, অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে সংযোগও দেওয়া হয়। ধোঁয়াবিহীন রান্না, সহজ ব্যবহার সব মিলিয়ে গ্যাস যেন উন্নয়নের প্রতীক হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই উন্নয়নের ভিতরেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর প্রশ্ন এই পরিবর্তন কি সত্যিই মানুষের কল্যাণের জন্য, নাকি এটি এক নতুন ধরনের নির্ভরতার সূচনা?
আজ আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে গ্যাস ছাড়া রান্না প্রায় অচল। অথচ গ্যাসের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, ভর্তুকি কমছে, এবং সাধারণ মানুষের উপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে। একসময়ের স্বনির্ভর রান্নাঘর আজ সম্পূর্ণভাবে বাজারের হাতে বন্দী। সিলিন্ডার না থাকলে চুলা নিভে যায় এ যেন স্বাধীনতা হারানোর এক নিঃশব্দ প্রতীক।
এখানে প্রশ্ন ওঠে পরিবেশ দূষণ কি সত্যিই শুধু খড়কাঠ বা কয়লার দোষ? উন্নত প্রযুক্তি, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী জ্বালানির দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। উন্নত বায়োমাস চুলা, বায়ু চলাচলের সঠিক ব্যবস্থা এসব নিয়ে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং সরাসরি পুরনো পদ্ধতিকে অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, গ্যাসকে “পরিষ্কার” বলে প্রচার করা হলেও, তার উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের প্রক্রিয়ায় পরিবেশের ওপর যে প্রভাব পড়ে, তা খুব একটা আলোচনায় আসে না। অর্থাৎ, এক ধরনের দূষণকে আড়াল করে অন্য একটি নির্ভরতা তৈরি করা হয়েছে যা অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি গভীর।
এই প্রেক্ষাপটে “উন্নয়ন” শব্দটির অর্থ নতুন করে ভাবতে হয়। উন্নয়ন কি শুধুই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নাকি মানুষের স্বাধীনতা ও সামর্থ্যের বিস্তার? যদি উন্নয়নের ফলে মানুষ তার মৌলিক চাহিদার জন্য সম্পূর্ণভাবে বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই?
আজকের দিনে গ্যাসের জন্য হাহাকার শুধু একটি জ্বালানি সংকট নয় এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা হয়তো আধুনিক হয়েছি, কিন্তু সেই সঙ্গে কিছু মূল্যবান জিনিস হারিয়েছি স্বনির্ভরতা, বিকল্পের স্বাধীনতা এবং নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ।
অতএব, সময় এসেছে ভারসাম্যের পথে ফিরে যাওয়ার। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করতেই হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও বিকল্প ব্যবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত বায়োমাস চুলা, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এসবকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। শুধু একটি পথ নয়, বহুমুখী সমাধানই পারে আমাদের এই সংকট থেকে মুক্তি দিতে।
শেষ কথা একটাই আগুন জ্বালানো শুধু রান্নার প্রয়োজন নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক। সেই আগুন যদি আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়, তবে উন্নয়নের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, তার ছায়া কিন্তু আরও গভীর হয়ে উঠবে।
The dol festival of Nabadwip, a column by Shyamal Mondal is an wonderful english writing. We as readers need his…
অমর প্রেম: স্বার্থহীন বন্ধনের এক মানবিক উপাখ্যান মানবজীবনের সবচেয়ে গভীর ও পবিত্র অনুভূতির নাম প্রেম। এই প্রেম কখনো রোমান্টিক সম্পর্কের…
কবি ফরিদ হোসেন হৃদয় এর "মিলে মিশে ঈদ করব" কবিতায় হাতটা বড় মিষ্টি, কবি প্রমান করলেন। আমি আগেই বলি, আমি…
শ্যামল মণ্ডল রচিত "ছেলের চিঠি" কবিতার পর্যালোচনা পর্যালোচনায় : শংকর হালদার শৈলবালা আলোচনা কাল : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ◆ ১.…
শংকর হালদার শৈলবালা রচিত “পণ্যের হাটে ঈশ্বর" কবিতার পর্যালোচনা পর্যালোচনায় : ভাষাবিদ অপরাজেয় আলোচনা কাল : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ◆…