অমর প্রেম

তুলসী দাস বিদ
(রামপুরহাট, বীরভূম)
অমর প্রেমের গোলাপ খানা
ভালোবাসা নিখাদ সোনা
গল্প হলেও সত্যি l
চিরকুমার দুজন বন্ধু
দিনু-বলাই এর রক্ত বিন্দু
ওজন মাপার নিত্তি ll
আপন চোখে দেখা এদিন
ভালোবাসাও স্বার্থহীন
ফেলে আসা অনেক বছর আগে l
আম বাগানে থাকার বাসা
ভালোবাসার নিত্য নেশা
গভীর অনুরাগে ll
ভিন্ন জাতি ভিন্ন ধর্ম
বেঁচে থাকার সারমর্ম,
অন্ধ বলাই স্বজন ছাড়া
দিনু ভরসা দিনুই আশা,
মুক্ত মনের দোসর l
দিনের শেষে সাঁঝের বেলা
সুখ দুঃখের গল্প বলা,
এক আসনে বসা
ভক্তি প্রেমের বাসর l
অমর প্রেম: স্বার্থহীন বন্ধনের এক মানবিক উপাখ্যান
মানবজীবনের সবচেয়ে গভীর ও পবিত্র অনুভূতির নাম প্রেম। এই প্রেম কখনো রোমান্টিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, ত্যাগ ও নির্ভরতার মধ্য দিয়েও তা প্রকাশ পায়। “অমর প্রেম” শিরোনামের কবিতায় যে প্রেমের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা কেবল হৃদয়ের আবেগ নয়
এ এক মানবিক আদর্শের প্রতিচ্ছবি। এখানে প্রেম মানে নিখাদ সোনা, স্বার্থহীন ভালোবাসা এবং জীবনসঙ্গীর মতো বন্ধুত্বের এক চিরন্তন বন্ধন।
প্রেমের রূপক ও প্রতীক
কবিতার শুরুতেই বলা হয়েছে
“অমর প্রেমের গোলাপ খানা / ভালোবাসা নিখাদ সোনা”।
গোলাপ এখানে সৌন্দর্য ও পবিত্রতার প্রতীক, আর ‘নিখাদ সোনা’ প্রেমের বিশুদ্ধতা ও মূল্যবোধকে নির্দেশ করে। গোলাপ যেমন সুগন্ধ ছড়ায়, তেমনি সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষের জীবনকে সুগন্ধময় করে তোলে। আর সোনার মতোই তা অমলিন ও অক্ষয়।
দিনু-বলাই: বন্ধুত্বের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন
কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই চিরকুমার বন্ধু
দিনু ও বলাই। তাঁদের সম্পর্ক কেবল বন্ধুত্ব নয়; এটি নির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বলাই অন্ধ, তাই তার জীবনের আলো দিনুই। দিনু শুধু তার সহচর নয়, তার ভরসা, আশা ও আশ্রয়। এখানে প্রেম কোনো সামাজিক সংজ্ঞায় আবদ্ধ নয়; এটি মানবিকতার এক উচ্চতর প্রকাশ।
বন্ধুত্বের এই রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত ভালোবাসা স্বার্থের হিসাব করে না। আজকের স্বার্থপর পৃথিবীতে যেখানে সম্পর্কগুলো প্রায়ই লাভ-ক্ষতির অঙ্ক কষে গড়ে ওঠে, সেখানে দিনু-বলাইয়ের সম্পর্ক এক নির্মল উদাহরণ।
ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ধর্ম: মানবতার জয়
কবিতায় উল্লেখ আছে—
“ভিন্ন জাতি ভিন্ন ধর্ম / বেঁচে থাকার সারমর্ম।”
এই পংক্তি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন। জাতি ও ধর্মের বিভাজন মানবসমাজে বহু দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। কিন্তু প্রকৃত ভালোবাসা এসব ভেদরেখা মানে না। দিনু ও বলাই প্রমাণ করে, মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই জীবনের মূল সারমর্ম।
এখানে কবি এক গভীর মানবতাবাদী বার্তা দিয়েছেন
মানুষের পরিচয় তার মানবিকতায়, কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ে নয়।
স্মৃতি ও সময়ের আবহ
“ফেলে আসা অনেক বছর আগে / আম বাগানে থাকার বাসা”
এই লাইনগুলো স্মৃতির নস্টালজিয়া জাগিয়ে তোলে। আমবাগানের নিসর্গ যেন এক শান্ত, সরল জীবনের প্রতীক। সেখানে নেই কোলাহল, নেই জটিলতা আছে শুধু দুই বন্ধুর নির্ভেজাল সম্পর্ক। প্রকৃতির সান্নিধ্যে তাদের ভালোবাসা আরও গভীর ও অকৃত্রিম হয়ে উঠেছে।
সাঁঝের বেলা: জীবনের অন্তিম অধ্যায়ের ইঙ্গিত
“দিনের শেষে সাঁঝের বেলা / সুখ দুঃখের গল্প বলা”
এই চিত্র জীবনের গোধূলি লগ্নের প্রতীক। দিনের শেষে যেমন সূর্যাস্ত আসে, তেমনি জীবনের শেষ প্রান্তেও থাকে স্মৃতির আলো-আঁধারি। দুই বন্ধু এক আসনে বসে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়
এ যেন জীবনের সারাংশ।
এখানে প্রেম মানে একসাথে পথ চলা, একসাথে সময় কাটানো এবং একসাথে জীবনের গল্প বলা।
অমরত্বের তাৎপর্য
কবিতার নামেই আছে “অমর প্রেম”। অমরত্ব এখানে শারীরিক অস্তিত্বের নয়; বরং স্মৃতি, অনুভূতি ও আদর্শের। দিনু-বলাইয়ের ভালোবাসা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে এক অনন্ত মানবিক আদর্শে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেম মৃত্যুকে অতিক্রম করে—কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।
সবশেষে বলতে হয়
“অমর প্রেম” কেবল একটি কবিতা নয়; এটি মানবিক সম্পর্কের এক গভীর দলিল। এখানে প্রেম মানে স্বার্থহীনতা, বন্ধুত্ব মানে নির্ভরতা, আর মানবতা মানে সকল বিভেদ ভুলে পাশে দাঁড়ানো।
আজকের ব্যস্ত ও বিভক্ত সমাজে এই কবিতা আমাদের শেখায়—
ভালোবাসা নিখাদ হলে তা কখনো নষ্ট হয় না।
বন্ধুত্ব সত্য হলে তা অমর হয়ে থাকে।
অতএব, “অমর প্রেম” আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানুষ নিজেই। নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আন্তরিক বন্ধুত্বই জীবনের প্রকৃত সোনা।