Spread the love

বিষবৃক্ষের অন্তরালে যৌতুক।

◆ রচনার শ্রেণী :- ছোটগল্প। সামাজিক ও যৌতুক প্রথার অত্যাচারের কাহিনী।
◆ লেখকের জীবনের দ্বিতীয় গল্প।
লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

◆ বর্তমান আধুনিক সভ্য মানুষের মাঝে বিষ বৃক্ষের ন্যায় সমাজের অন্তরালে চোরা স্রোতের মতো যৌতুক প্রথা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। বিভিন্ন দেশের সরকার পণপ্রথা আইন তৈরি করেও কিন্তু সমাজ থেকে একদম নির্মূল করতে পারেনি। দেশের কোথাও না কোথাও প্রতিদিন গৃহবধূরা পণপ্রথার শিকার হচ্ছে।

◆ উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ শহর এলাকায় সমীর বিশ্বাসের দুই মেয়ে সুষমা ও সরমা আর ছোট একটি ছেলেকে নিয়ে সংসার। ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। সুষমা উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক মেয়ে কিন্তু বর্তমানে বিয়ের উপযুক্ত হয়েছে।

◆ মেয়ে উপযুক্ত হলে তার বিয়ে দেওয়ার জন্য বাবা-মার চিন্তা বেড়ে যায়। তারপর যদি মেয়ের রঙ কালো হয়, তাহলে চিন্তার অন্ত থাকে না। পিতা সমীর বিশ্বাস দুশ্চিন্তার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছেলের সন্ধান করতে থাকে কিন্তু দর কষাকষি যৌতুকের টাকার চাহিদা পূরণ করার সাধ্য না থাকার কারণে কোথাও কালো মেয়ে কে বিয়ে দিতে পারছে না।

◆ সমিরন বিশ্বাস ভাবে :- যৌতুক প্রথা হাজার হাজার বছরের একটি সামাজিক অপরাধ মূলক ব্যাধি রূপে বর্তমান ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। সরকার বিভিন্ন আইন তৈরি করা সহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেও কিন্তু যৌতুক নামক ব্যাধি কে নিরাময় করা সম্ভব হয়নি।

◆ বিশ্বের বড় বড় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতা এবং আইন আদালত হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে কিন্তু এই ব্যাধি নিরাময় করার কোন উপায় অবলম্বন করতে পারছেন না।

◆ সমিরন তার মেয়ে সুষমার জন্য ছেলে খোঁজ করতে করতে এক সময় বনগাঁ মহকুমা এলাকার হেলেঞ্চা গ্রামের পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দা ও হেলেঞ্চা বাজারের ব্যবসায়ী অখিল মন্ডল নামক যুবকের সাথে দেখাশোনা শুরু হয়। উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে পণ্যের দর কষাকষির পর বিয়ের সিদ্ধান্ত পাকা হয়।

◆ বর পক্ষের অভিভাবকের দাবি:- ফ্ল্যাট টিভি, ফ্রিজ, খাট, স্কিন টার্চ ২৫ হাজার টাকা মোবাইল দামের ও দশ ভরি সোনা গয়না আর নগদ দুই লাখ টাকা দিতে হবে।

◆ সুষমা এই বিয়ের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিল না কারণ সে জানত, তার বাবার সমস্ত আয়ের টাকা এক মেয়ের বিয়ের যৌতুক দিতে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে যাবে। আরো আরেকটি বোন রয়েছে। বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু মা-বাবার চাপে পড়ে বিয়েতে রাজি হতে হয়।

◆ বিয়ের রাতে বিয়ে শুরু হওয়ার আগে বরপক্ষের অভিভাবক বরের বাবা-মা কিন্তু মেয়ের বাবার কাছে গিয়ে বলেন :- চুক্তি অনুসারে সবকিছুই ঠিকঠাক দেখছি কিন্তু নগদ লেনদেনের বাকি থাকা ৫৭ হাজার টাকা পরিশোধ করুন।

◆ বর বাবার হাত চেপে ধরে মেয়ের বাবা মাথা নত করে বলে :- বিয়াই মশাই; উক্ত টাকা সংগ্রহ করতে পারিনি কিন্তু আমাকে ছয় মাস সময় দিন, আমি টাকা শোধ করে দেবো।

◆ বরের বাবা-মা উপস্থিত সকলের সামনে উত্তেজিত হয়ে অপমানজনক কথাবার্তা বলতে শুরু করে আবার টাকা না দিলে বিয়ে বন্ধ করার হুমকি দিতে থাকে।

◆ বরের জামাইবাবু চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তার শ্বশুর ও শাশুড়ি কে আড়ালে ডেকে নিয়ে বুঝিয়ে বলে :- উত্তেজিত না হয়ে শান্ত হয়ে আমার কথাগুলো শুনুন।

◆ শাশুড়ি মা উত্তেজিত হয়ে তার জামাইকে বলে :- তুমি জামাই; জামাইয়ের মত থাকো। আমাদের ছেলের বিয়ের ব্যাপারে কোন নাক গলাবে না। না হলে তোমার কপালে বিপদ আছে।

◆ জামাই তার শাশুড়িকে বলে :- আপনার ছেলের কি যোগ্যতা আছে? ভাগ্য ভালো; আপনাদের ইতিহাস মেয়ের বাড়ির লোকেরা জানেনা।

◆ শশুর বলে :- জামাই বাবা; তুমি কি বলতে চাচ্ছ?

◆ জামাই তার শাশুড়ির উদ্দেশ্যে করে বলে :- বাড়িতে একটা কাজের মহিলা তো চাই। আপনি তো পটের বিবি হয়ে রাজরানী।

◆ শশুর বলে :- হা, হা দরকার।

◆ জামাই বলে :- আপনার বাড়িতে যে মহিলা কাজ করে তাকে মাসে ৫০০০ টাকা দিতে হয়। ভাবুন সেই কাজটাই ঘরের বউকে দিয়ে করাবেন। এক বছর কাজ করলেই আপনার টাকা শোধ হয়ে যাবে আবার মেয়ের বাবাকে চাপে রেখে টাকা আদায় করতে পারবেন।

◆ শশুর-শাশুড়ি সন্তুষ্ট হয়ে বলে :- ঠিক বলেছো বাবা।

◆ জামাই তার শ্বশুর-শাশুড়ির উদ্দেশ্যে করে বলে :- মনে রাখবেন আপনার মেয়ে সুজাতা কিন্তু পরের ঘরের বউ। তাকে কিন্তু স্বামী সন্তান ও শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে একই ছাদের তলায় বাস করতে হয়।

◆ সুষমা নববধূ রূপে তার শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার সাথে সাথেই শ্বাশুড়ীর মুখে যৌতুকের টাকা না পাওয়ার লাঞ্ছনা গঞ্জনার যন্ত্রণাদায়ক কথা বার্তা শুনতে হয়।

◆ বিয়ের অনুষ্ঠান মিটে যাওয়ার কয়েকদিন পর এক রাতে ধূমকেতুর মতো অখিলের মা তার ছেলের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে বলেন :- দরজা খুলতে দেরি হচ্ছে কেন?

◆ সুষমা ভিতর থেকে দরজা খুলে দিতেই, অখিলের মা ঘরে ঢুকে সুষমা কে বলেন :- বৌমা; দিনকাল ভাল যাচ্ছে না, তোমার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা গয়না গুলো দিয়ে দাও।

◆ সুষমা তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে, সেই মুহূর্তে তার স্বামী বলে :- মা যখন বলছেন; তা দিয়ে দাও। মায়ের কাছে আমাদের সবকিছুই তো সংরক্ষিত হয়ে থাকবে, তোমার যখন প্রয়োজন হয় মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নেবে।

◆ অখিলের মা তার বৌমার শরীর থেকে গয়না গুলো খুলে নেয় তারপর আলমারি থেকে ভালো ভালো কাপড় সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

◆ বিয়ের সাত মাস পর সুষমা বিছানায় শুয়ে ভাবে :- প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠার পর শ্বাশুড়ি মায়ের কৌতুকের টাকার জন্য নানা ধরনের বাজে বাজে মন্তব্য শুনতে হয়। বাড়ির ঝি চাকরের মতো দিন রাতে সংসারের সম্পূর্ণ কাজ করতে হয় কিন্তু তবুও পরিবারের কোনো সদস্যের কাছে মন পেলাম না। স্বামী আমাকে তার স্ত্রীর মর্যাদা দেয় না।

◆ দিনে শ্বাশুড়ি মায়ের অত্যাচার আবার রাতে স্বামীর যৌন খিদের অত্যাচার কতদিন আর সহ্য করে চলবো। আমার ভালো-মন্দ ও দেখাশোনার প্রয়োজন বোধ করে না কিন্তু মরে বা বাঁচে স্বামীর দৈহিক চাহিদা মেটাতে হবে।

◆ একজন বিবাহিত নারী তার স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির পরিবারের লোকজনের অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করতে না পারার কারণে কিন্তু বহু মহিলার জীবনের স্বপ্ন গুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

◆ এটা কি স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা! না, সাত পাকের প্রতিশ্রুতি সব মিথ্যা কথা বলা। স্বামী নামক পুরুষ পারিবারিক ভাবে নির্যাতিত নারীর চোখের জলের মূল্য দিতে অস্বীকার করছে। বাবার বাড়ির অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে বারবার নির্যাতিত হয়ে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা চালায় কিন্তু কখনো আমার মনের দুঃখের কথাগুলো বাবা মাকে বলতে পারি নাই।

◆ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের প্রগতি লাভ করলেও কিন্তু সেই অন্ধ বর্বর যুগের মন মানসিকতার সভ্য সমাজের মানুষের মধ্যে কোন পরিবর্তন হয়নি। এখনো প্রতি নিয়ত বহু মহিলারা যৌতুক হয়রানির শিকার হয়ে চলেছে।

◆ স্বামী নামক পুরুষ যৌতুকের টাকা না পেয়ে তার স্ত্রীকে বন্ধুদের মাধ্যমে ধর্ষণ করা কি মানবিক কাজ? নির্যাতিত মহিলা প্রতিবাদ করলেই তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা সমাজের একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

◆ সুষমা তার শাশুড়ি অত্যাচারে কথা স্বামীকে বলার পর, তার ওপর স্বামী কর্তৃক আরো বেশি অত্যাচার শুরু হয়ে যায়। সে তার চোখের জলে বিছানা ভিজিয়ে চলে। তার বেদনার কথা কারও কাছে প্রকাশ করতে পারেন না ..। সুষমার উপর প্রতিদিনের অন্যায়-অত্যাচারের কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে আর দিন দিন তা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থতা বোধ করতে শুরু করে।

◆ স্বামী কর্তৃক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে সুষমা ভাবে মনে :- যৌতুকের টাকার জন্য একজন স্বামী কি তার স্ত্রীকে সম্মান করবে না?
স্বামী নামক পুরুষ তাকে মারধর সহ জোর জুলুম করে মিলনের নামে ধর্ষণ করবেন? বিয়ের পর শরীরের চাহিদা মেটানোর জন্য এক পাষণ্ড পুরুষের সঙ্গে বিছানায় ঘুমাতে হবে কি? আজকের বিংশ শতাব্দীর যুগে বসবাস করেও কিন্তু যৌতুকের মারাত্মক সমস্যার সমাধান করার জন্য কত নারী লড়াই করে যাচ্ছেন।

◆ সুষমা তার বাবা-মায়ের পরিবারের সদস্যদের কাছে এই সমস্যা জানাতে পারেনি। কারণ তার বাবা এখন পর্যন্ত যৌতুকের টাকা শোধ করতে পারিনি। তার মনে একটা ভয় স্বামীর পরিবারের সদস্যরা জানতে পারলে, অত্যাচারের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেবে।

◆ সুষমা ভাবে :- অখিলের মা এক পুত্রবধূ ছিলেন কিন্তু একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও আরেক নারীর বেদনা বুঝতে পারছেন না? এভাবে আর কতদিন চলবে?

◆ শাশুড়ি বলেছিলেন:- বিয়েতে অনেক টাকা খরচ করা হয়েছে, খরচের টাকা তোমার বাপ কেই দিতে হবে। টাকা না দিলে তোমার উপর অত্যাচার করে করেই টাকা শোধ করবো। তাহলে পিতৃ ঋণ আমাকে এই ভাবেই শোধ করতে হবে। এই মারাত্মক ভয়ানক ব্যাধি যৌতুক প্রথা বন্ধ হওয়া দরকার।

◆ সবার সাথে মিলেমিশে পরিবারকে বাঁচানোর জন্য সুষমা তিন বছর ধরে স্বামী অখিলের পরিবারের অত্যাচার সহ্য করে চলেছে। পালানোর চেষ্টা অনেকবার করেছে কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আরো বেশি অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে।

◆ সুষমা ভাবে :- আমার গর্ভে এক বার সন্তান এসেছিল কিন্তু স্বামী মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বলে, আমি তোর সাথে থাকি না কিন্তু সন্তান আসলে কি করে? আমার চুলের মুঠো ধরে আমার বাবা-মা সহ তার চৌদ্দ গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো করতে করতে অশ্লীল ভাষায় খিস্তি খামারি দিয়ে অবৈধ সম্পর্কের বদনাম রটিয়ে দিয়ে আমার চরিত্র কলঙ্কিত করে মারধর করেছিল।
শাশুড়ি অত্যাচারের মাধ্যমে পেটে লাথি মেরে মেরে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেয়। সেই গর্ভপাতের ভীষণ যন্ত্রনা দায়ক ভোগান্তি আমি অনুভব করেছি।

◆ সুষমা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মাঝে মধ্যে সাপের মতো ফুসফুস করতে শুরু করে কিন্তু হিতে বিপরীত হয়ে তার জীবন সংশয় হয়ে ওঠ।

◆ অখিলের মা তার ছেলের সাথে ষড়যন্ত্র করে সুষমা কে ঘরের মধ্যে প্রথমে মা-ছেলে মিলে প্রচন্ড ভাবে মারধর করে ও অখিল সিগারেটের জ্বলন্ত আগুনে ছ্যাকা দিতে থাকে। এরপর মা-ছেলের সহযোগিতায় অখিলের এক বন্ধু সুষমা কে জোর জবরদস্তি করে ধর্ষণ করে।

◆ সুষমার প্রতিবাদ করার সাহস দেখে অখিল তার ধর্ষিতা স্ত্রীর উদ্দেশ্য করে বলে :- এরকম অনেক মানুষকে ঘরে নিয়ে এসে তোর বেশ্যাবৃত্তির মাধ্যমে সব টাকা তুলে নেবো।
থাকা-খাওয়া, কাপড়-চোপড় ও চিকিৎসার টাকা কি তোর বাপ দিয়ে যায়?

◆ কয়েক দিন পর সুষমা অত্যাচারে অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে পুলিশের হুমকি দেওয়ার ফলে সুষমার শরিলে কেরোসিন তেল ঢেলে দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে মারার চেষ্টা করে।

◆ সুষমা বাঁচার জন্য ঘরের মধ্যে বাঁধা অবস্থায় ছটফট করতে করতে পায়ের কাছে থাকা স্বামী কে তার তলপেটে জোরে লাথি মারে আর অখিল ঘরের দেয়ালে আঘাত লেগে চিৎকার করে ওঠে। সুষমা ভয়ংকর ভাবে চিৎকার করে উঠে, খাটের উপর থেকে গড়াগড়ি দিয়ে নিচে পড়ে যায় আর হাতের বাঁধন খুলে যায়। সুষমা মুহূর্তের মধ্যে দ্রুত বেগে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

◆ অখিলের মা আক্রমণাত্মক হয়ে সুষমাকে মারতে আসে কিন্তু সুষমা তার শাশুড়িকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে নাকে মুখে জোরে আঘাত করতে থাকে। আর শাশুড়ি মরে গেলাম বলে চিৎকার করতে থাকে।

◆ মায়ের চিৎকার শুনে ছেলে অখিল ক্রোধিত হয়ে সুষমার উপর আক্রমণ করে। সুষমা কোন কিছু না ভেবে হাতের কাছে দরজা হাক (অর্থাৎ লম্বা একটি কাঠ খন্ড) দিয়ে এলোপাতাড়ি ভাবে শাশুড়ি ও স্বামীকে আঘাত করতে থাকে।

◆ সুষমা পড়িমড়ি করে রক্তাক্ত ও অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে বাড়ির বাইরে রাস্তায় চলে আসে। ছায়া ও ব্লাউজ পড়া অবস্থায় রাস্তা দিয়ে দৌড়াতে শুরু করে।

◆ পাড়ার লোকজন এই দৃশ্য দেখতে পেয়ে কিন্তু অখিলের বাড়ির চারদিকে ঘুরে ধরে আর এক প্রতিবেশী যুবক হেলেঞ্চা থানায় ফোন করে ঘটনা জানায়।

◆ সুষমা দৌড়াতে দৌড়াতে সোজা থানার মধ্যে ঢুকে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে :- স্যার; আমাকে বাঁচান , স্যার; আমাকে বাঁচান , স্যার; আমাকে বাঁচান , আমার শ্বাশুড়ি ও স্বামী মিলিত হয়ে কিন্তু আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করেছে। জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছি।

◆ পুলিশ অফিসার কেরাশিনের গন্ধ অনুভব করে বলেন :- আপনি শান্ত হন। দোষীদের অবশ্যই সাজা দেওয়া হবে। তারপর এক মহিলা পুলিশকে নির্দেশ দেন, এই মহিলা কে রুমে নিয়ে গিয়ে শাড়ি পরিয়ে নিয়ে আসুন।

◆ কিছুক্ষণ পর সুষমার মুখ থেকে বিস্তারিত জানার পর দায়িত্বরত পুলিশ অফিস বলেন :- আপনার উপর নির্যাতনের মধ্যে নিশ্চয় আপনার ননদের মদক আছে।

◆ সুষমা বলে :- না, স্যার; আমার ননদের কোন দোষ নেই কারণ আমার সহযোগিতা ও আমার হয়ে প্রতিবাদের করার কারণে তার বাবা মার সাথে প্রচন্ড আকারে ঝগড়া অশান্তি হওয়ার কারণে বর্তমানে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, এই মামলার মধ্যে কোন প্রকার আমার ননদ কে জড়িত করবেন না। আমার শ্বশুর মশাই ভালো মানুষের মুখোশ পরে কিন্তু বাইরে থেকে কুট বুদ্ধি চালিয়ে আমার উপর নির্যাতন করেছে। স্বামীর দুই বন্ধু অনিক আর রবিন আমাকে ধর্ষণ করেছে। শশুর-শাশুড়ি, স্বামী ও তার দুই বন্ধুর নামে মামলা দায়ের করুন।

◆ থানার পুলিশ অফিসার, অখিলের পরিবারের সদস্যদের সহ অখিলের দুই বন্ধু কে গ্রেপ্তার করে বধূ নির্যাতন, ধর্ষণ ও খুন করার চেষ্টা মামলা দায়ের করেন।

◆ পুলিশ অফিসার ভাবে মনে :- ভারতবর্ষে বিবাহিত মহিলাদের চল্লিশ শতাংশ কোনও না কোনও ভাবে নির্যাতনের শিকার। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ২০১২-তে পণের দাবিতে বধূনির্যাতনের অভিযোগে ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭৬২ জন স্বামী-শ্বশুরবাড়ির লোক গ্রেফতার হন। তবে বেশির ভাগ মেয়েরাই নিরুপায় না হয়ে ৪৯৮এ ধারায় মামলা করে না।

◆ সুষমার বাবাকে থানায় ডেকে নিয়ে আসে আর সুষমা কে তার বাবার সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়।
মামলা আদালতে উঠে আর বিচারপতি, অখিলের পরিবারের সদস্যদের ও অখিলের দুই বন্ধুর জামিনের আবেদন নাকচ করে দেন।

◆ অখিলের বর দিদি সুজাতা, জেলখানায় তার বাবা মায়ের সাথে দেখা করে কান্না করে বলে :- তোমাদের তিন জনের কারণেই আমার দীর্ঘ দিনের সাজানো সংসার ভেঙে গেল, আমার স্বামী আমাকে ত্যাগ করেছে। রাস্তায় ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভিখারির মতো থাকবে কিন্তু তোমাদের মত অপরাধী বাবা মায়ের বাড়িতে কখনোই থাকবে না।

◆ বাড়ি তো শ্মশানে পরিণত হয়ে গিয়েছে। আর জেলে বসে বসে তোমার ধন সম্পত্তি ভোগ করো। মা যত পারো নিজের সাথে এখন অত্যাচার করো কিন্তু কেউ তোমাকে বাধা দেবে না। যাতে সারা জীবন জেলের ঘানি টানতে পারো, আমি রাজ সাক্ষী হয়ে সুষমার পক্ষ নিয়ে আদালতে কথা বলবে।

◆ সুষমা তোমাদের মত ভয়ংকর জানোয়ারের মন-মানসিকতার মানুষদের জেলে পাঠিয়ে কিন্তু বুদ্ধিমানের কাজ করেছে। সে বেচারা নিজেও তোমাদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

◆ অখিলের মা বলেন :- পেটে যেন শত্রু ধরেছি। বিপদের সময় পাশে থাকবে কিনা আবার বেশি করে বিপদে ফেলার ব্যবস্থা করছে।

◆ সুজাতা বলে :- তোমাদের মত মায়েদের কিন্তু জেলখানাই সবচাইতে নিরাপদ জায়গা। বলে দ্রুত বেগে বাইরে যাওয়ার প্রধান গেটের দিকে চলতে শুরু করে।

◆ সুজাতা বাইরে বেরিয়ে আসার পর তার স্বামী বলেন :- তাহলে তুমি; সুষমার মামলায় রাজ সাক্ষী হয়ে লড়াই করবে তো?

◆ সুজাতা বলে :- সেই কথাগুলো অপরাধী মা-বাবাকে বলে এলাম।

◆ সুজাতার স্বামী বলেন :- তাহলে এবার বাড়িতেই চলো, নিরাপরাধ হয়ে কেন তুমি একা সাজা ভোগ করবে! সুষমার বিয়ের দিনই কিন্তু বিয়ে টাকে ভেঙে দেওয়া ভালো ছিল।

◆ ব্যক্তিগত নিজস্ব টাটা সুমো গাড়ির দরজা খুলে সুজাতার ছেলে মেয়ে বেরিয়ে মা মা বলে জড়িয়ে ধরে বলে :- মামিমা কে দেখে আসি।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
◆ রচনাকাল :- ১৫ মার্চ ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে। দত্তপুলিয়া বাড়ি থাকাকালীন, নদীয়া।

◆ সংশোধন :- ১৮ আগস্ট ২০২৩ সাল। বাঙালি লেখক সংসদ কার্যালয়ে থাকাকালীন সময়ে, দত্তপুলিয়া, নদীয়া, পশ্চিমবঙ্গ।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

One thought on “বিষবৃক্ষের অন্তরালে যৌতুক। ◆ রচনার শ্রেণী :- ছোটগল্প। সামাজিক ও যৌতুক প্রথার অত্যাচারের কাহিনী। ◆ লেখকের জীবনের দ্বিতীয় গল্প। লেখক : শংকর হালদার শৈলবালা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed

পুনরাবৃত্তি ©অঞ্জলি দে নন্দী, মম আমার বয়স তখন অধিক নহে। বিদ্যালয়ের নিম্ন শ্রেণীর ছাত্রী। বঙ্গ ভাষায় পাঠ্যরূপে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কপালকুণ্ডলার কিয়দংশ পাঠ করান হইত। আমি শ্রেণীর খুব মেধাবিনী পঠিয়ত্রী ছিলুম। আমি প্রথম স্থান অধিকার করিয়া প্রত্যেক বৎসর ঊর্ধ্ব শ্রেণীতে গমন করিতুম। ঐ পাঠ্যের এক পত্রে বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয় কতৃক লিখিত হইয়াছিল, ” তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন? ” পাঠ্যে ওই অংশটির নাম ছিল, ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’। যাহা হউক- আমার চিত্তে এই বাক্যটি গভীরভাবে রেখাপাত করিয়াছিল। আমার সহিত উক্ত সময় নবকুমার বাবুর সহিত যেইরূপ ঘটিয়াছিল ঐরূপ কিছু ঘটিলে আমি তাহাকে ঠিক ঐরূপভাবেই গ্রহণ করিতুম। কিন্তু এই সময়ে আমি উহাকে পরিবর্তীত করিয়া লইয়াছি। এইরূপে – তুমি অতিশয় অধম সেইহেতু বলপূর্বক আমাকেও ঠিক তোমারই স্বরূপ অতি অধমে রূপান্তরিত করিতে চাহিতেছ। আমি অতি অধম না হইলে তুমি আমাকে কৌশলে এই ইহলোক হইতে পরলোকে পাঠাইয়া দিবে। সেইহেতু আমি মৃত্যুলোকবাসীনি না হইবার কারণ বসত তোমাকে সন্তুষ্ট করিবার হেতু মিথ্যা অভিনয় করিয়া তোমাকে দৃশ্য করাইয়া চলিতেছি যে আমিও তোমার স্বরূপই অতি অধমে পরিণত হইয়াছি। বাস্তবিকই তোমার প্রচেষ্টা সার্থক হইয়াছে। আমি আর পূর্বের ন্যায় অতি উত্তম নহি। কিন্তু তুমি কদাপি বুঝিতে পার নাই যে আমি প্রাণে বাঁচিয়া থাকিবার নিমিত্ত তোমার সম্মুখে এইরূপ মিথ্যা, নকল অভিনয় করিতেছি। আদৌই আমি অধম হই নাই। পূর্বে যেইরূপ অতি উত্তম ছিলুম অদ্যাপি ঐরূপই বিদ্যমান রহিয়াছি। কেবলমাত্র একটি নকল আবরণ ধারণ করিয়াছি। নতুবা অকালে তোমার হস্তে আমার প্রাণ বিসর্জিতা হইত। তদপেক্ষা ইহা অধিকতর সঠিক পথ বলিয়া আমা কতৃক ইহা বিবেচিতা।