গল্পের নাম:- তোমায় চাহি রে..
লিখেছেন:- মিলন পুরকাইত

হুট করে ছোড়দির বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো। মেঘমালার হোস্টেলে ফোন এলো আর বাড়ি ফিরেই পিসির কাছে প্রশ্নের ঝুড়ি খুলে বসলো।

“কোথায় বিয়ে ,কার সাথে বিয়ে ” এই হাজার প্রশ্নের উত্তরে পিসি এক কাপ চা আর ডিমের পরোটা এনে পাশে বসলো
“তুই আসবি বলে আমি আগেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। দেখ তো খেয়ে কেমন হয়েছে “

পিসিকে জড়িয়ে হেসে উঠলো মেঘমালা
“সেই ছোট থেকে এটাই করে এসেছো তুমি। যখন যখন উত্তর দিতে পারো না আমার প্রশ্নের তখনই এমনটা করো। কিন্তু আজ না বললে আমি কিচ্ছুটি মুখে দেবো না। যদিও আমার খুব খুব খিদে পেয়েছে “
এতেই কাজ হলো।
পিসি উঠে জানলার ধারে চলে গেলো।
বললো
“সে অনেক বড় গল্প। শুধু এইটুকু বলে রাখি তোর ওই উদ্ধত ,কারোর কথা না শোনা ছোড়দি কি করে কে জানে এমনটা বদলে গিয়ে এই বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো, আমি তো কিছুই বুঝতে পারিনি , তুই যদি পারিস জিজ্ঞেস করে নিস!”

রহস্য আরো বেড়ে গেলো মেঘমালার কাছে। উঠে জানলার পাশে এসে দাঁড়ালো। আর পিসীর চোখে জল দেখে আরো ঘাবড়ে গিয়ে বললো
“ও পিসি তুমি কাঁদছো কেন , কি হয়েছে সব বলো আমায় “

পিসি হাত ধরে এনে বসালো মেঘমালাকে খাবার টেবিলের সামনে আর ছোট ছোট টুকরো ওর মুখে দিতে দিতে বললো “ছেলেটা চোখে দেখতে পায় না “
বলেই আঁচল ঠুসে নিজের মুখে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগলো।
“মানে !”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো মেঘমালা।
“এসব কি বলছো তুমি, আমি এখনই যাচ্ছি ছোড়দির কাছে।”
ওর হাত ধরে বসালো পিসি।

জন্মে থেকেই এই বাড়িতেই আছে রিক্তা। কি করে কে জানে বিয়ে থা আর করা হয়ে ওঠে নি। বাবা মা দাদা বৌদিরাও কম চেষ্টা করে নি কিন্তু রিক্তা একবারও রাজি হয়নি এ সংসার ছেড়ে অন্য কিছু নিজের জন্য ভাবার।

আজ বাবার শরীর খারাপ , কাল মায়ের বুকে ব্যথা। কোনদিন রান্নার লোক এলো , কোনদিন এলো না সবেতেই তো রিক্তা। একে একে দুই দাদার বিয়ে হলো। দুই বৌদি এসে কোনদিন বাড়িতে একজন ননদ বসে আছে বলে কোন অশান্তি করে নি।
বরঞ্চ একে একে তাদের ছেলে মেয়ে হয়েছে আর দিব্যি “ও দিদি ভাই একটু তুমি দেখো , একটু তুমি পড়িয়ে দাও ” করতে করতে রিক্তার ঘর পরিবর্তন হয়েছে।

ছোট ঘর থেকে বড় ঘর।

তাতে চার ভাইপো ভাইঝির টেবিল খাট ঢুকেছে। আর রিক্তা পিসি থেকে কখন যেন এদের মা হয়ে গেছে
তাহলে আবার সংসার কেন আলাদা করে নিজের জন্য। এই তো সব পেয়েছির দেশ তার কাছে।

ধীরে ধীরে কেউ কাজের জন্য কেউ বা পড়ার জন্য বাইরে চলে গেছে রিক্তার সেই বড় ঘর ছেড়ে। মেঘমালা ক্লাস এইটে পড়ার সময় একটা সাদা কাগজের বোর্ডে লিখে ঝুলিয়েছিল
“সোনা পিসির হোটেল” ।

সেইটা কি করে আজও থেকে গেছে।

জানলা থেকে ফিরে এলো পিসি আর আদরের ভাইঝির মাথায় হাত বুলিয়ে বললো
“তোর ছোড়দি জানিস তো ছোট থেকেই কেমন একগুঁয়ে , তোদের সবার চেয়ে আলাদা।মুখে যা আসে তাই বলে দেয়।কত বুঝিয়েছি সেই ছোট থেকে কিন্তু সেই এক কথা আমি অত রেখে ঢেকে বলতে পারবো না। অথচ মনটা ঠিক তালশাঁসের মতো নরম। কত মানুষকে কি ভাবে সাহায্য করে ও নিজেও হয়তো মনে রাখে না। “
থামলো পিসি , উঠে জল খেলো আর মুখ মুছে আবার এগিয়ে এলো মেঘমালার পাশে।

” শুরু থেকেই সেই এক বন্ধু ওর মিতালী। সেই মিতালীর বাড়ি আসা যাওয়া একটু হঠাৎ বেড়েছিল। বৌদি মানে তোর মা বরাবর কারো সাতে পাঁচে থাকে না। তোর জেঠিমা সে তো আরো ব্যস্ত নিজের ঠাকুর ঘর নিয়ে। তা আমিই না পেরে আর রাতে যখন শুতে এসেছে আমার পাশে কথাটা তুললাম।
–তোর কি হয়েছে রে সোনাই , কিছুদিন ধরে বড্ড বদলে গেছিস। না চেঁচাস , না ঝগড়া করিস না শাসন করিস কাউকে–

তাতে মেয়ে একটিও কথা না বলে শুধু পাশ ফিরে শুলো। আমিও আর ওকে বিরক্ত করবো না ভেবে ওষুধ খেয়ে সবে হাত জোড় করে প্রার্থনা করছি দেখি উঠে বসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে।

তুই চলে যাবার পর থেকে ও ঘরে এখন আমরা দুজনেই থাকি শুধু তাই একটু জোরেই বললাম —- কি হয়েছে তুই কাঁদছিস কেন !
সত্যি বলতে ও মেয়েকে আমি কাঁদতে খুব কম দেখেছি !”

আবার উঠে গেলো পিসি ।ঘরের দরজা খুলে ছাদ বাগানে এসে দাঁড়ালো।

আকাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার , হয়তো অমাবস্যা আজ। রাস্তার ধারেই বাড়ি তাই গাড়ির আলো আর হর্ণের আওয়াজ মাঝে মাঝে অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা চিরে ছারখার করে দিচ্ছে।

কোথাও যেন রাত প্যাঁচা এক ভাবে ডেকেই যাচ্ছে। অনেক গাছের মাঝে কাঁচের বড় একোরিয়ামে রাখা মাছেরা ছোট ছোট সবুজ জলের গাছের মাঝে লুকোচুরি খেলছে। একটা গোল্ড ফিস বারবার পাথরের টুকরো মুখে তুলছে আর জলের বুদবুদের সাথে তাকে বাইরে ফেলছে।

মেঘমালা এসে বসলো চুপ করে পিসির পাশে।
পিসির মুখটা ভালো করে দেখা যাচ্ছে না এখন। শুধু কখনও এক ছিটে আলো এলে বেশ বুঝতে পারছে মেঘমালা যে পিসি কাঁদছে।

“মিতালীর ছোট কাকার কাছেই পড়তো ওরা দুজন। জন্ম থেকে অন্ধ হলেও কি হবে সে লেখাপড়ায় কারো থেকে কম নয়। সারাদিন বাড়িতে ছাত্র ছাত্রীদের ভিড় লেগেই থাকে। দু’তিনটে ইউনিভার্সিটিতে সপ্তাহে এক দুদিন যায় ক্লাস করাতে।

সেই কাকাইয়ের কাছেই মিতালী আর তোর দিদি বেশ কিছুমাস ধরে ইংলিশ পড়েছিল।
পরে চাকরি পাওয়ার পরে আর তেমন যেতো না কোনদিন ওদের বাড়িতে তাই দেখা সাক্ষাৎও কমে গিয়েছিল।

আবার গেছিলো তিনমাস আগে মিতালীর জন্মদিনে।
ঘরোয়া খাওয়া দাওয়ার পরে তোর ছোড়দিকে সবাই নাকি গান গাইতে বলেছিল। সে গানের সাথে হঠাৎ কখন যে মিতালীর কাকাই গলা মিলিয়েছিল সে কথা সোনাই নিজেও না কি বোঝে নি। সেদিন বাড়ি ফেরার আগে সবার থেকে বিদায় নেবার সময়ে হঠাৎ একটা অদ্ভুত কথা বলেছিল ওর কাকাই

“এই গানটা জানো আমারও সবচেয়ে প্রিয় গান”
আর বলেই চলে যেতে গিয়ে হঠাৎ হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল।

সোনাই স্বাভাবিক ভাবেই বলেছিল
“চলুন আপনাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি”
তার উত্তরে পেছন ফিরে হেসেছিল অনিন্দ্য — মিতালীর কাকাই। আর বলেছিল
“চোখে দেখি না তো তাই অনবরত হোঁচট খাই , ছোটবেলায় মা সবসময় সাথে ঘুরতো কিন্তু এখন সে নেই তাই অভ্যেস করে ফেলেছি হোঁচট খাওয়ার”

চলে গেছিলো অনিন্দ্য।

আর নিজের অজান্তেই একটা একরোখা উদ্ধত মেয়েকে সোনার কাঠির ছোঁয়ায় বদলে দিয়েছিল ওই কিছু কথায়।

বদলে গেছিলো সোনাই সেই মুহূর্ত থেকেই। যে সোনাই জন্মদিনের উৎসবে গিয়েছিল সে সোনাই ফেরে নি আর সেই হলুদ দোতলা বাড়ি থেকে।
রোজ রোজ যেতে না পারলেও প্রায়ই যাওয়া শুরু করেছিল সে।

মিতালী অবাক হয়ে বলেছিল
“তোর হলো টা কি ! আমি কিন্তু কাকী বলে ডাকতে পারবো না তোকে”

হাসে নি সোনাই শুধু বলেছিল “নিজের সাথে নিজের লড়াই চলছে এখন রে। মনের মধ্যে অনেক লোভ , অনেক হিংসে এতদিন ধরে পুষেছি জানিস , আজ বড় ইচ্ছে করছে কারো চোখের তারায় আলো জ্বালাতে “

কেঁদেছিল মিতালী তার এই পাগল বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে।

তারপর এ বাড়িতে বোঝানোর দায়িত্ব আমার কাঁধে চাপিয়ে তোমার ছোড়দি রোজ সকালে উঠে অফিস যাবার আগে পালা করে রান্না শিখেছে আমার কাছে।

একদিন বললাম
“হ্যাঁ রে আমাদের তো কোনদিন রান্না করে খাওয়াস নি। “

তাতে মেয়ে বলে কি না
“ও পিসি ওর খুব ইচ্ছে বিয়ের পরে বাইরে চলে যাওয়ার , অনেক ছোট থেকে নাকি ওই ইচ্ছে পুষে রেখেছে। তা সে সব দেশে কে এসব রান্না করে খাওয়াবে বলো ! আসলে এসব শুক্তো , পোস্ত , চচ্চড়ি খেতেই যে ভালোবাসে”

পরদিন রাতেই দেখা হলো ছোড়দির সাথে।

আমাকে দেখে জড়িয়ে নিয়ে বললো
“এসেছিস ,অনেক কথা আছে তোর সাথে !”
রাতে পিসিকে ঘুম পাড়িয়ে দুই বোন ছাদে এলাম।

প্রথমার চাঁদ আসবো কি আসবো না ভেবে সবে চোখের পাতা খুলেছে নীরবে।

দাঁড়ানো ছোড়দির কাঁধে হাত রাখলাম।
ফিরে তাকালো ছোড়দি। চোখ জলে ভরা অথচ কি অদ্ভুত শান্তি ছেয়ে আছে।
বললাম
” এবার তুই খুশী তো ছোড়দি “
হাজার তারার আলো ছোড়দির চোখে মুখে ফুটে উঠলো।
হাসলো ছোড়দি , তাতে একটুও কষ্ট বা গ্লানি নেই। বললো
“মনে আছে তোর মেঘ , যখন কলেজের শেষ দিনে অরুণাভ আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এই বলে — আমি না কি ওর যোগ্য নই ,আমার মতো এত কালো মেয়ের না কি স্বপ্ন দেখার কোন অধিকার নেই। অথচ ওই অরুণাভ তিন বছর আমার বানানো নোটস্ ,আমার বই আমার খাতা ব্যবহার করেছে এমন ভাবে , এত ভালো ভালো কথা বলেছে এমন করে আমি তাকে ভালোবাসা বলে ভুল করেছি , সে নাকি আমার দোষ”
থামলো ছোড়দি
“জানিস আমি তো গুটিয়ে নিয়েছিলাম নিজেকে , কত সম্বন্ধ এসেছে আমার , তারা খেয়ে দেয়ে যাবার সময় বাবা মার মুখের ওপর বলে গেছে
— এ মেয়ের বিয়ে হওয়া খুব মুশকিল “

অনিন্দ্য যেদিন প্রথম আমাকে ভালো লাগার কথা বলেছিল , আমি একেবারেই না বলেছিলাম। বলেছিলাম আপনি আমাকে না দেখে এসব বলছেন। আমি খুব কালো , আমাকে কেউ পছন্দ করে না আর আমি সে নিয়ে একটুও চিন্তিত নই। আমি সারাজীবন চাকরি করে এ ভাবেই কাটিয়ে দিতে চাই।

চুপ করে গেছিলো অনিন্দ্য আর আমার হাতের ওপর নিজের হাত আলতো ছুঁয়ে বলেছিল
“কালো সাদা কি হয় আমি যে জানি না শুধু জানি তোমার কাছে যে মনটা আছে সেটা ঠিক আমার মায়ের ঘুম পাড়ানি গানের মতো স্নিগ্ধ , সরল , সুন্দর। আমি তো চোখে দেখি না তাই সে ভাবে বলতে পারবো না তোমাকে। কিন্তু মনের চোখ কোনদিন ফাঁকি দেয় না। তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করবো না আমি, বাড়ি যাও। সবাইকে বোলো। নিজে ভেবে দেখো তারপর যা হবে আমাকে জানিও।

আমি অপেক্ষা করবো না তোমার , তবু যদি ফিরে আসো জানবো আমার অন্ধকার চোখের তারার স্বপ্ন সত্যি হলো হয়তো”

কখন যে উঠে চলে গেছিলো ছোড়দি মনে নেই।
ছাদের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে শুনলাম গাইছে ছোড়দি
“চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে”

ছোট থেকেই ছোড়দি বড্ড আলাদা , বড্ড একগুঁয়ে , সব সময় অন্য কিছু করার কথা ভাবে।

এবারেও তো জীবন দিয়ে বাজি খেলে গেলো।

এমন আলাদা , অন্যরকম ছোড়দি ভালো থাকিস তুই কারো চোখের তারা হয়ে — মনে মনে বলতে বলতে ঘুমন্ত পিসীকে জড়িয়ে আমি শুয়ে পড়লাম
বাতাসে ভেসে আসছে তখনও
“এখন তোমার আপন আলোয় তোমায় চাহি রে “

✍️ মিলন পুরকাইত ।

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *