গল্প : চিঠি বন্ধু

কলমে : অর্পিতা রায় চৌধুরী

**************************

খাটে তোর দিকটায় আজও শুতে পারিনা।বালিশের ঢাকনা যদিও বদলে দি নিয়ম করে।তোর চায়ের কাপে রোজ সকালে চা ঢেলে নিজের কাপে চুমুক দিয়ে শেষ করবার চেষ্টা করি গল্পটা। সেই গল্পটা যেটা সেদিন সকালে শুরু করেছিলাম। চায়ের কাপটা টেবিলের ওপরে নামিয়ে রেখে,চশমার ওপর দিয়ে চোখ তুলে,আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে তুমি বলেছিলি,”আশা,মনে পড়ে আমাদের সেই চিঠি লেখার দিন গুলো?”। আমি রীতিমতো চমকে গিয়েছিলাম জানিস? সেদিন হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না নিজের কান কে!

কি জানিস তো শুভ,কিছু মনে করতে হলে,প্রথমে সেটা কে যে ভুলতে হয়। আমি যে কিছুই ভুলে যাইনি। বয়সের দোষে আজকাল টুকটাক অনেক কিছুই খেয়াল থাকে না ঠিকই,কিন্তু এত গুলো বছর আগের কথা গুলো অদ্ভূত ভাবেই স্মৃতি তে রয়ে গিয়েছে। হয়তো তোকে সব মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই। স্পষ্ট মনে পড়ে,শনিবার বাড়িতে একটা বাংলা পত্রিকা এসেছিল। সেটার শেষ পাতায়,”চিঠি বন্ধু” বিভাগে দেওয়া ঠিকানায় কি মনে করে পাগলামি করে একটি চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম।তার জন্যে যদিও বাড়িতে বকা খেতে হয়েছিলো। মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল পরিবার হলে যা হয়।

কিছুদিনের মধ্যে হ্যারি পটার ছবিটার মতো চিঠির ঝড় বইতে শুরু করে। একুশ বছরের একটি মেয়ের মনের অবস্থা বুঝতেই পারছিস কি হতে পারে। এদিকে বাড়িতে কড়া নির্দেশ,কোনো উত্তর দেওয়া বারণ,চিঠি আসছে আসুক,সে বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু লাল নীল ইত্যাদি রঙের খামে আসা চিঠি,তাতে আমার উদ্দেশ্য লেখা বন্ধুত্বের নানান কথা পড়ে আমার মন কেবলই অস্থির হয়ে উঠত;বড্ড ইচ্ছে করতো উত্তর দিতে। আসলে যুগটা ছিল বেশ অন্যরকম। অর্কূট বা ফেসবুকের যুগে,এই এরা কিছুতেই বুঝতে পারবেনা সেটা। আজকাল তো একটা বোতাম টিপে দিলেই বন্ধুত্ব! পছন্দ না হলে আন-ফ্রেন্ড করে দাও। সত্যি কতো সহজ। আর কতো ক্ষণস্থায়ী।

প্রায় শ’ খানেক চিঠি তখন এসে গিয়েছিল। আমারও বারণ মেনে আর উত্তর দেওয়া হয়নি কাউকে। সেদিন দুপুরে সবে খেয়ে উঠেছি, এমন সময় কলিং বেল বেজে ওঠে।গেটের সামনে দাঁড়িয়ে চেনা ডাকপিয়ন,হাতে একটা সাদা খাম। বেশ লজ্জা করত জানিস আমার বয়স্ক লোকটার থেকে চিঠি গুলো নিতে। কি জানি কি ভাবতেন ভদ্রলোক। কিসের এত চিঠি আসে মেয়েটার কাছে! এটাই হয়তো ভেবে অবাক হতেন। খুব খারাপ লাগতো জানিস?বেকার এত কষ্ট করে চিঠি পৌঁছে দেওয়া। উত্তর দেওয়া যে আমার বারণ তা যদি ওনাকে বলতে পারতাম তবে হয়তো চিঠি গুলো আর ওনাকে বয়ে নিয়ে আসতে হতো না। ফেলে দিতে পারতেন।

সাদা খামটা আগের আসা বাকি চিঠি গুলোর চেয়ে খানিক বড়ো আর ভারি ছিল। পেছনে খুব সুন্দর হাতের লেখায়,লেখা ছিল,”ফ্রম : শ্রীমান শুভময় বসাক,৫৬/এ হাজরা রোড,কলকাতা”।পিন কোডটা আজ যদিও আর খেয়াল নেই। তবে মনে আছে বাড়ির লোকেদের থেকে আড়াল করে, ছাদে চলে গিয়ে একাধিক বার চিঠি খানা পড়েছিলাম। অদ্ভূত সুন্দর ছবির মতো হাতের লেখা। কাব্যিক রূপকের ব্যবহারে যেন একটা রোমাঞ্চকর কারেন্ট ছড়িয়ে পড়ছিল আমার সারা শরীরে। আমার নামটা লিখেছিলি লাল কালি তে। নিজেরটা নীল। চিঠিটা কালো তে।দেখেছিস,কেমন অক্ষরে অক্ষরে সমস্তটা মনে রয়েছে আমার? 

গত বছর জানুয়ারি মাসে যখন হাসপাতাল থেকে টেলিফোনটা এলো,বিশ্বাস কর শুভ,আমি আমার নিজের স্বর্গীয় স্বামীর স্মৃতি আর কন্যা জামাই নাতিদের নিয়ে সংসারের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে,এক দৌড়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম তোর কাছে ফোনের তরঙ্গ পথ দিয়ে। বিশ্বাস কর শুভ, কিছুতেই আমি আর স্থির থাকতে পারিনি সেদিন। লজ্জার মাথা খেয়ে,সব নিয়মের গোড়ায় আগুন জ্বেলে,দার্জিলিং থেকে কলকাতা নেমে সোজা হাসপাতালে,তোর কাছে। জানালার ধারে তুই, আমার সোনালী সুতার কাজ করা কালো পাঞ্জাবী, বসে ছিলি হাসপাতালের দেওয়া হালকা নীল পোশাক পড়ে। আমায় চিনতে পারলি না, যদিও আমি পড়ে গিয়েছিলাম সেই কালো সুতির শাড়িটা। একবার আমার দিকে চেয়ে থেকে পুনরায় মনোনিবেশ করলি বাইরের ওই আকাশের দিকে। আকাশ দেখতে তোর যে বরাবর খুব ভালো লাগতো!

ডাক্তার ভৌমিক আমায় নিজের চেম্বারে ডেকে জানালেন,আলঝাইমারসে ভুগছিলি তুই মাস খানেক ধরে। তোকে নাকি বৃদ্ধাআশ্রম থেকে এখানে দিয়ে গিয়েছে। পরিবার বলতে বলবার মতো কেউ নেই, সুতরাং এক কথায়, বৃদ্ধাআশ্রম তোকে ত্যাগ করেছে। তোর পুত্র আমেরিকা তে স্ত্রী পুত্র নিয়ে সংসার করছে। বেশ ভালোই আছে। তাই তাদের কাছে তুই অবাঞ্ছিত বোঝা মাত্র।অগত্যা তোর মানিব্যাগ ঘেঁটে একটি চিঠিতে আমার ঠিকানা পেয়ে, অনেক খোঁজ খবর করে আমায় টেলিফোন করেছিলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমার নামটা যদিও ওনারা জানতেন না। চিঠিতে বরাবর পাগলী বলেই ডাকতি যে!

ডাক্তারের উপদেশ মান্য করে,শুরু হলো আমার তোর সাথে নতুন করে গল্প বাঁধা। অচেনা মুখ বলে প্রথমটা তুই বিরক্তি প্রকাশ করতি। তবে ধীরে ধীরে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে, তুই আমায় বন্ধু মানতে আরম্ভ করেছিলি। রোজ অল্প অল্প করে তুই আমায় বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলি। আমি তোকে আমাদের দুজনের গল্পটা একটু একটু করে প্রতিদিন বিকেলে বলতাম আর তুই চুপ করে শান্ত ছেলের মতো শুনতি আর মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো প্রশ্ন ছুড়ে দিতি একটি শিশুর মতো। চরিত্র দুটো আমার আর তোর মধ্যে একটি সেতু তৈরি করে দিচ্ছিল ক্রমশ। 

প্রতিদিন বিকেলে তোর ঘরের জানালার ধারে বসে, আমরা হারিয়ে যেতাম আমাদের চিঠির দিন গুলোতে। বাড়ির নিষেধ উপেক্ষা করে এক বুক সাহস সংগ্রহ করে,লিখে ফেলেছিলাম চিঠি তোর ঠিকানা তে। কিছুদিন পর উত্তরও এলো।বাড়িতে ভাবলো, নতুন কোনো চিঠি। ধীরে ধীরে তোর লেখা শব্দ গুলো গভীর হয়ে উঠছিল। আমারও সাহস বেড়ে চলেছিল। কথা ছিল প্রতি মাসে একটির বেশি চিঠি লেখা যাবেনা। বাড়িতে সন্দেহ করবে। তাই একটি খামে একত্র করে পাঠাতাম একাধিক চিঠি। যে ইশ্বর যেই ফুলে তুষ্ট!

যেদিন নার্স আমায় তোর ব্যাগ থেকে পাওয়া চিঠিটা দিয়েছিলো,আমার নিজের হাতে লেখা চিঠিটা দেখে মুহূর্তে মনে পড়ে গেছিল আমাদের প্রথম দেখা করার আগের উত্তেজনাটা। চিঠিটা তোকে পড়ে শুনাতে,তুই বলেছিলি, তোর নাকি একটা কালো পাঞ্জাবী ছিল, ঠিক গল্পের ছেলেটির মতো। মনে হচ্ছিলো তোকে তখন জড়িয়ে ধরে বলি,”ওরে আমার পাগল,সেটা যে আমি তোকে দিয়েছিলাম প্রথম দেখা হওয়ার দিন”।

চিঠিটা ছিল কিছুটা এইরকম,”আমার পাগল,তুই সোনালী সুতার কাজ করা কালো পাঞ্জাবী আর হালকা ফেড হওয়া জিন্স।পাঞ্জাবীর হাতা গুটিয়ে রাখা। ওপর দিকের ৩ তে বোতাম খোলা। বা হাতে বাদামী চামড়ার স্ট্র্যাপ্ লাগানো ঘড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। পায়ে বাদামী চামড়ার স্যান্ডেল।আমি কালো সুতির শাড়ি আর সাদা রঙের লম্বা হাতার, হাতে আঁকা ব্লাউজ।মেকআপ খুব অল্প। কাজল, ঠোঁটে হালকা রং আর কপালে ছোট্ট কালো টিপ।গয়না বলতে হাতে তৈরি লাল আর সাদা রঙের পোড়া মাটির সেট, তাতে রবিগান এর কিছু লাইন লেখা। ডান হাত খালি। বা হাতে তোর মতই বাদামী চামড়ার স্ট্র্যাপ্ লাগানো বড় ডায়ালের ঘড়ি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। চুল খোলা।পায়ে কালো চটি।দেখা হবে। ইতি তোর পাগলী”।

দেখাটা অবশেষে হয়েছিলো ঠিকই কিন্তু গঙ্গার ধারে বসে তোর করা একটি প্রশ্নের উত্তর আমি সেদিন তোকে দিতে পারিনি। চোখের জলের সাহায্যে শুধু বুঝিয়ে দিয়ে ছিলাম মনের অব্যক্ত কথা গুলো, তুই কিছুটা বুঝেছিলি তবে অধিকাংশই ভুল বুঝেছিলি। রাস্তায় সদ্য বিছানো নরম পিচের ওপর কখনো অখেয়াল বসত পা পড়ে গেলে চটি জোড়ার যেই অবস্থাটা হয়,তোর সাথে দেখা হওয়ার পর আমার মস্তিষ্কের ওই চটি জোড়ার মতোই করুন অবস্থা হয়েছিলো। তোর কালো পাঞ্জাবীর গুটিয়ে রাখা হাতার ভাঁজে সেদিন নীরবে আমি আমার ইচ্ছেদের জমিয়ে ছিলাম। আর একদিন অন্যমনস্ক ভাবে সেই ভাঁজ করা হাতা খুলে ফেলেছিলিস তুই। সেটাই অবশ্য নিয়ম।জামা কাপড় ময়লা হলে ধুতে তো হবেই,নোংরা দাগ ঘামের গন্ধ,আর সেই জমিয়ে রাখা ইচ্ছে গুলো। 

মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল পরিবারের বাইশ বছরের মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিলো ত্রিশ বছরের 

এক সরকারি চাকরিরতার সাথে। বাড়ির বিপক্ষে দাঁড়াবার মতো আমার সাহস ছিল শুভ কিন্তু তুই যে অনেকটা সময় চেয়েছিলি আমার থেকে। আমি তোর কথা বলে,গোটা তিন দিন উপবাস করেছিলাম,কিন্তু তবুও বাড়ির লোক মেনে নেয়নি। সেদিন কালো শাড়ির মনে হয়েছিলো বর্তমানের বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে ভবিষ্যতে পৌঁছে যেতে। যেখানে থাকবে না কোনো পিছুটান,থাকবে না  কোনো নিয়ম মেনে চলার বাধ্যকতা। স্বাধীনতার মধুর সুভাষ গায়ে মেখে সে এলোমেলো জীবন কাটাবে তার কালো পাঞ্জাবী সাথে। কিন্তু তুই অবশেষে ভুল বুঝেছিলি সমস্তটা। গঙ্গা সাক্ষী আছে, আমি সেদিন তার পবিত্র জলে বিসর্জন দিয়েছিলাম নিজের সমস্ত আবেগ কে। 

এরপর মাস খানেক কেটে যাওয়ার পর একদিন ডাক্তার ভৌমিক আমায় চেম্বারে ডেকে বললেন,তোকে হাসপাতালের বন্দি পরিবেশে আর না রেখে,বাড়ির পরিবেশে রাখলে নাকি তোর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে ভালো। কিছুক্ষণের জন্যে নির্বাক থেকে মনে হলো,সকল নিয়ম মেনে চলা অতীত পেরিয়ে এসে,আমার সত্যি এখন স্বাধীন বাতাস গায়ে মাখার সময় এসেছে। একবারের জন্যে আর বিলম্ব না করে, ঠিক করলাম,প্রিয় শহর দার্জিলিঙের আড়ালে কাটবে আমাদের শেষ মুহূর্ত গুলো। আর কোনো নিয়ম নয়। নিয়ম মেনে চলার বাধ্যকতা নয়। এবার শুধু তুই আর আমি আর আমাদের না শেষ হওয়া গল্পটা শেষ করা।

পরের সপ্তাহেই আর দেরি না করে,তোকে বগল দাওয়া করে নিয়ে চলে এলাম দার্জিলিং। আমার স্বামী দীপক দত্তগুপ্ত ঊর্ধ্বলোকে গমন করেছেন আমাদের কন্যার বিয়ের পরের বছরেই। তাও প্রায় বছর এগারো হয়ে গেলো। এখন কন্যা স্বামী পুত্র সহ দিল্লী তে ঘর করছে। জামাই অম্লান বেশ সুখেই রেখেছে জুই আর আমার নয় বছরের নাতি উজান কে। তবে কোচবিহারে আমার কিছুতেই মন বসত না। অম্লানের সাহায্যে বাড়ি বিক্রি করে দিয়ে,এই ছোট্ট বাড়ি খানা কিনে ফেললাম। তুই তো জানিস আমার বরাবরই দার্জিলিং খুব প্রিয়। ড্রাইভার রণজিৎ ছেত্রী আর তার স্ত্রী সুনিতা আমায় বেশ দেখে শুনে রাখে। সুনিতা রান্না করে ঘর সামলায়।

তোর কথা জুই কে বলিনি। বেকার ওকে ওর শ্বশুর বাড়িতে অপ্রস্তুত করার কোনো মানে হয়না। এটা সম্পূর্ণ আমার স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত। জীবনে দার্জিলিং চলে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া এটা আমার দ্বিতীয়বার নিজের জন্যে কিছু করা। তুই দার্জিলিং এসে পাহাড় দেখে একদম বাচ্চাদের মতো করেছিলি,তোর আনন্দ যেন শেষ হওয়ার না। বারান্দা থেকে কিছুতেই সরতে চাইতি না। ঠান্ডার মধ্যে বসে থাকতে চাইতি পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে।

রণজিৎ আর সুনিতা বিশেষ প্রশ্ন করত না, কিন্তু কিছু টের তো ওরা পেতোই।তোকে রাত্রে একা ছাড়া যাবেনা বলে এক বিছানায় শুতাম তোর পাশে। তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তোকে ঘুম পারিয়ে দিতাম। তুই ঘুমিয়ে পড়লে,আস্তে করে তোকে জড়িয়ে তোর বুকে মাথা রেখে শুয়ে থাকতাম,ঠিক যেমন আমার চিঠি গুলোয়ে লেখা থাকতো। বিয়ে করতে চেয়েছিলাম তোকে,ঘর করতে চেয়েছিলাম তোর সাথে। ইশ্বরের যে অন্য কিছু পরিকল্পনা ছিল তা তখন বুঝতে পারিনি। সেই ঘর করাই হলো, কিন্তু তুই কিছুই টের পেলি না শুভ। তোর জানার আড়ালে আমি আর তুই করে চললাম পুতুল খেলা সংসার। তোর সেবা করা,তোকে খাইয়ে দেওয়া, স্নান করিয়ে দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো ইত্যাদি সব আমি নিজের হাতে করতাম। তবে বুকে পাথর চেপে তোকে আমাদের গল্প বলাটা ছিল সব চাইতে বেশী কঠিন রে শুভ!

ক্রমশ তোর শরীরটা খারাপ হয়ে পড়ছিল। ডাক্তার বাবু টেলিফোনে জানালেন,এটাই নাকি স্বাভাবিক তোদের মতো রোগীদের জন্যে। চেষ্টা করতে বললেন যতোটা সম্ভব তোকে আনন্দে রাখতে। তোকে সব থেকে বেশি আনন্দ দিত বারান্দায় বসে হট চকলেট খেতে খেতে,কালো শাড়ি আর কালো পাঞ্জাবীর গল্প শোনা। বারবার বলতি আমায় ওদের গল্পটা বলতে। বুক ফেটে যেতো, তবু হাসি মুখে গল্পটা বলতাম। গঙ্গায় সেদিন বিসর্জন দেওয়া আবেগ পুনরায় মাটি থেকে তৈরি হচ্ছিলো,সেটা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। 

সেদিন ছিল রবিবার,তুই আর আমি ভোরে প্রতিদিনের মতো চায়ের কাপ নিয়ে বসেছিলাম বারান্দায়। তোকে আগের দিন বিকেল থেকেই কেমন আনমনা লাগছিল। কি যেন একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলি। সকালে চা খেতে খেতে, হঠাৎ একটা বিস্ফোরক প্রশ্নে আমায় চমকে দিয়ে আবার  আকাশের দিকে চেয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলি।

সেটাই ছিল তোর শেষ কথা। সেদিন বিকেলে, বিছানা বারান্দা আমার বুক ফাঁকা করে দিয়ে চলে গেলি তুই শান্তি ঘুমের দেশে,চিরতরে। মনে হয়েছিলো প্রকৃত অর্থে আমি এবার বিধবা হলাম। আক্ষেপ রয়ে গেলো একটাই, তোর শেষ প্রশ্নের উত্তরে গল্পটা পুনরায় তোকে বলা হলো না। মনের কথাটা তোকে বলা হলো না। তোর অভিমান ভাঙা হলো না। শুভ,তোকে “ভালোবাসি” বলা হলো না। 

আশা রাখি আবার হবে দেখা, স্বর্গের বাগানে বসে অপেক্ষা করিস আমার,সেই সোনালী কাজ করা কালো পাঞ্জাবীটা পড়ে। আমি আসছি আমার সেই কালো সুতির শাড়িটা পড়ে। দেখা হবে।

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *