গল্পের নাম:- কুয়াশা
কলমে :- মিলন পুরকাইত।

হাঁটুর ব্যথার জন্য আজকাল আর মাটিতে পা মুড়ে বসতে পারেন না সুনয়না । এই হাঁটুর জন্য একতলা-দোতলাও করতে পারেন না । নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া এই দোতলাতেই বন্দী । কে বলবে একসময় নিজের স্কুলের চাকরি সামলেও গোটা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতেন সুনয়না । অনিকেত যেমন অগোছালো ছিল , তেমনি ছিল দুই ছেলেমেয়ে । কোথাকার জিনিস যে কোথায় ফেলত তার ঠিক ছিলনা । তবু তারমধ্যেই সব ঘরগুলোকে নিজের হাতে মনের মতো করে সাজিয়ে রাখতেন । তারপর ছিল ওর সাধের ফুলগাছেরা । ছাদে সারি সারি টবে হরেক রকম ফুল ফোটানো নেশার মতো ছিল সুনয়নার । এখন সেসব কোথায় হারিয়ে গেছে । বহুদিন পর পরশু জিমি আর প্রিন্সের সাথে ছাদে উঠেছিলেন । ছাদের কার্নিশে অবহেলা-অযত্নে কতগুলো অশ্বত্থ গাছের চারা বেশ বেড়ে উঠেছে মনের সুখে । লতিকাকে বলেছিলেন ওগুলো তুলে ফেলে দিতে কিন্তু দিয়েছে বলে মনে হয়না । সুনয়নার কত সাধের বাড়ি এটা !!!!!

ও ঠাম্মি এখনো গরম আছে ? কখন দেবে আমাকে ? প্রিন্সের কথায় খেয়াল ফেরে সুনয়নার । ইস্ কতক্ষণ বসে আছে গো ছেলেটা !!!! থালা থেকে খানিকটা দলা তুলে নিয়ে পাকিয়ে নাড়ু বানিয়ে দেয় প্রিন্সের হাতে । জিমিটা টিভিতে কার্টুন দেখছিল , সেও ছুটে এসে হাত পেতেছে সাথেসাথে । জিনির হাতেও একটা নাড়ু পাকিয়ে দিয়ে বাকি নাড়ুগুলো পাকাতে থাকেন । পাপিনরা আগামী পরশু সন্ধ্যের ফ্লাইটে চলে যাবে । তার আগে ওদের ভালোবাসার জিনিসগুলো যতটা পারছেন তৈরি করে দিচ্ছেন । নিজে না পারলেও লতিকাকে বলে বলে করিয়ে নিচ্ছেন । নারকেল নাড়ু , মুড়ির মোয়া , কুচো নিমকি , হিং দেওয়া বড়ি এইসব আর কি !!!! বাজারে কিনতে যতই পাওয়া যাক্ , পাপিন বলে তাতে নাকি মায়ের হাতের মতো স্বাদ হয়না । মেম বৌমার এইসব খাবার পছন্দ না হলেও নাতি-নাতনি দুটো হয়েছে পাপিনের মতো । প্রিন্স-জিমি তো বেশ বাংলাও বলতে শিখেছে ওদের বাবার কাছে ।

ছেলে-মেয়ের বিয়ে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল অনিকেতের , কিন্তু সে সাধ পূর্ণ হয়নি ওর । মেয়ে পিউলি বাড়ির অমতে বিয়ে করেছিল হানিফকে । অনিকেত তারপর আর কোন সম্পর্ক রাখেনি মেয়ের সাথে । জেদি – অভিমানী মেয়ে আজ এগারো বছর হয়ে গেল এই বাড়িতে ঢোকেনি । এমনকি অনিকেত হঠাৎ চলে যাওয়ার খবরটা পেয়ে শ্মশানে গিয়েছিল , কিন্তু বাড়িতে আসেনি । এখন কালেভদ্রে ফোন করে মায়ের খোঁজ নেয় । এক শহরে থেকেও মেয়েটাকে দেখেনি কতো বছর !!!!!

খড়গপুর থেকে আই.আই.টি. পাশ করে আমেরিকাতে পড়াশুনোর সুযোগ এসেছিল । একবুক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিল অনিকেত । কতো আশা মনের মধ্যে , পাপিন বিদেশের ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে বড়ো চাকরি করবে , মানুষের মতো মানুষ হবে । সুনয়নার বন্ধু ছন্দার মেয়েটাকে ভীষণ পছন্দ ছিল অনিকেতের । সুনয়নাকে বারবার বলতো , পাপিনের সাথে ওর মেয়ের বিয়েটা ছন্দার সাথে কথা বলে পাকা করে রাখতে । অনিকেতের পাগলামিতে কান দিত না সুনয়না । এইভাবে কারো বিয়ের ঠিক করে রাখাটা মোটেও ভালো লাগত না ওর । ভাগ্যিস অনিকেতের কথা মতো কথা বলেনি ছন্দার সাথে , তাহলে কি বেইজ্জতি না হতে হতো ছন্দাদের কাছে । বছর পরে পাপিন মেম বৌকে সাথে নিয়ে দেশে ফিরেছিল । বিয়ের কথাটা আগে মা-বাবাকে জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি , একেবারে বৌ নিয়ে হাজির । সাতদিন থাকবে বলেও সেবার মাত্র দুদিন থেকে আমেরিকাতে ফিরে গিয়েছিল পাপিন । এদেশের এপ্রিল মাসের গরম ওর বৌ কিছুতেই সহ্য করতে পারছিল না । কথা দিয়েছিল ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে এসে কয়েকটা দিয়ে গিয়েছিল ।

পাপিনের হঠাৎ পরিবর্তনে মনে একটা জোর ধাক্কা লেগেছিল ওদের দুজনেরই । সুনয়না সেটা সামলাতে পারলেও , অনিকেত পারে নি । হাসিখুশি – চনমনে মানুষটা কেমন যেন গুম হয়ে বসে থাকত সারাটা দিন । একটাই আফসোস করতো , ছেলে-মেয়ে কেউ মনের মতো হলো না !!!!

মানুষটা তারপর আর বেশিদিন থাকেনি । জানুয়ারীর এক ভোররাতে হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই চলে গেল । পাশে শুয়েও কিচ্ছুটি টের পায়নি । রোজকার মতো ঘুম থেকে ওঠার জন্য ডাকতে গিয়েছিল সুনয়না , কিন্তু সুনয়নার ডাকে আর সাড়া দেয়নি অনিকেত । পাপিন এসেছিল বাবার পারলৌকিক কাজের জন্য , তখন অবশ্য বৌকে আনেনি ।

মাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল পাপিন , সুনয়না রাজি হয়নি । তখনো দুবছর চাকরি ছিল সুনয়নার , তবু সময়টা কেটে যেত । কিন্তু অবসরের পর দিনগুলো কেমন যেন দীর্ঘ হয়ে গেল , প্রয়োজনের তুলনায় অনেক দীর্ঘ । সুনয়না আর সব সময়ের কাজের মেয়ে লতিকা , সময় যেন আর কাটতেই চায় না । আগে ভাবতেন অবসরের পর অনেক সময় পাবেন , তখন কতো কি করবেন । অথচ এখন যেন সেই কিছু করার ইচ্ছাটাই সারাদিন লুকোচুরি খেলে সুনয়নার সাথে । ইচ্ছা হয় তো শরীর সঙ্গ দেয়না আর শরীর যখন একটু ঠিক থাকে হয়ত ইচ্ছাটাই করে না ।

অনিকেত চলে গেছে আটবছর হলো । এরমধ্যে পাপিন দুবার বাড়ি এসেছে , তবে ফোনে নিয়মিত খোঁজখবর নেয় । পাঁচবছর আগে যখন এসেছিল জিনি তখন এত্তোটুকু । তারপর আর আসা হয়ে ওঠেনি ওদের । প্রিন্সের জন্মানোর খবরটা পেয়েছিল , কিন্তু নাতিকে দেখলেন এই প্রথমবার ।

এবার পনেরদিনের লম্বা ছুটি নিয়ে এসেছে পাপিন । কোথা দিয়ে যে দিনকটা কেটে গেল বুঝতেও পারলো না । মাঝে একদিন দক্ষিণেশ্বর ঘুরে এসেছে সবাই মিলে । জিনি আর প্রিন্স কি ভীষণ ঠাম্মির ন্যাওটা হয়ে পড়েছে । রাতে অবধি সুনয়নাকে জড়িয়ে শুয়ে থেকেছে দুজনে । আগামী পরশু থেকে আবার সেই নিস্তব্ধতা । প্রয়োজনে টুকিটাকি কথা হবে লতিকার সাথে । সময়ের কাঁটা যেন আবার থমকে থমকে চলবে সুনয়নার জীবনে ।

লতিকাকে নাড়ুগুলো কৌটোয় ভরে রাখতে বলে বাইরের ব্যালকনিটায় এসে দাঁড়ান সুনয়না ।

চারদিক উচুঁ উচুঁ বাড়িতে ঢেকে গেলেও সামনের সবুজ মাঠটাতে এখনো যেন কিছুটা সজীবতা টিকে আছে । এখানটাতে এসে দাঁড়ালে কিছুটা প্রাণভরা বাতাস যেন এখনো খুঁজে পায় সুনয়না । কি একটা দরকারি কাজে বৌকে নিয়ে বেরিয়েছে পাপিন । জিনি আর প্রিন্স বাড়িময় ছুটোছুটি করে খেলা করছে ।

কাল রাতেই কথা হচ্ছিল পাপিনের সাথে । এদেশে ওরা আর ফিরবে না কখনো । ও দেশে অনেক সুযোগ-সুবিধা , ওখানে থাকলে মনের মতো করে মানুষ করতে পারবে জিনি-প্রিন্সকে । এ দেশে কি আছে !!!!!

বড় অদ্ভুত লেগেছিল পাপিনের কথাটা । এদেশে কি আছে !!!! সত্যি তো কি এমন আছে এদেশে , যার টানে দেশে ফেরা যায় । কয়েক বছর এখন খুব কাজের চাপ , আর হয়তো দেশে আসার সময় হবে না ওদের । তবে সময় পেলেই চলে আসবে বলেছে ।

পাপিনের আবার যখন আসার সময় হবে তখন জিনি-প্রিন্স হয়তো অনেক বড়ো হয়ে যাবে । তখন কি আর এইভাবে আঁকড়ে ধরে আপন করে নেবে ওদের ঠাম্মিকে !!!! ওদের সাথে আবার দেখা হওয়া অবধি বেঁচে থাকবেন কি সুনয়না নিজেও !!!!!

হেমন্তের বিকাল যেন বড্ড তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে আসে । গুঁড়ো গুঁড়ো কুয়াশার হাত ধরে নেমে আসে অন্ধকার , সাথে হিমহিম হাওয়া ।

— ঠাম্মি স্মোকের মতো ওগুলো কি ?

জিনিটা কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেননি সুনয়না ।

— কোনগুলো রে ?

— ঐ যে স্মোকের মতো সাদাকালো ঐগুলো কি ?

— ও তো কুয়াশা ।

— দেখো দেখো ঐ কুয়াশা কেমন আস্তে আস্তে সব ঢেকে দিচ্ছে ।

কুয়াশা গাঢ় হচ্ছে , নিভে আসছে দিনের আলো ।

স্বামী-সন্তান-সংসার সব কিছু হারিয়ে , সুনয়নাও যেন ধীরে ধীরে ঢেকে যাচ্ছে একাকিত্বের কুয়াশায় । ছোটবেলায় কুয়াশার গন্ধটা ভীষণ ভালো লাগতো সুনয়নার । অথচ আজ যেন কুয়াশার গন্ধটাতে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তাঁর । ভীষণ কষ্ট হচ্ছে……..

76600cookie-checkগল্প:- কুয়াশা
– মিলন পুরকাইত
Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *