• Sat. Jun 25th, 2022

ক্যান্সার প্রতিরোধে কোষচক্র নিয়ন্ত্রনের গুরুত্ব – কলমে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়

ক্যান্সার প্রতিরোধে কোষচক্র নিয়ন্ত্রনের গুরুত্ব

ক্যান্সার

ক্যান্সার বা কর্কটরোগ অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন সংক্রান্ত রোগসমূহের সমষ্টি। এখনও পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। কারণ প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পড়ে না, ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ভালো কোন চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হয় না। বাস্তবিক অর্থে এখনও পর্যন্ত ক্যান্সারের চিকিৎসায় পুরোপুরি কার্যকর কোনও ওষুধ আবিষ্কৃত হয় নি। ক্যান্সার সারানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পরলে এই রোগ সারানোর সম্ভাবনা অনেকাংশ বেড়ে যায়। ২০০ প্রকারেরও বেশি ক্যান্সার রয়েছে। প্রত্যেক ক্যান্সারই আলাদা আলাদা এবং এদের চিকিৎসা পদ্ধতিও আলাদা। 

বিশ্বের সমস্ত প্রাণীর শরীর অসংখ্য ছোট ছোট কোষের মাধ্যমে তৈরি। এই কোষগুলো একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মারা যায়। এই পুরনো কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ এসে জায়গা করে নেয়। সাধারনভাবে কোষগুলো নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং নিয়মমতো বিভাজিত হয়ে নতুন কোষের জন্ম দেয়। কিন্তু এই কোষবিভাজন তখন অনিয়ন্ত্রিত ভাবে হতে থাকে তখন আমাদের শরীরের স্থানে স্থানে টিউমারের সৃষ্টি হয়। এই টিউমার বিনাইন বা ম্যালিগন্যান্ট হতে পারে। ম্যালিগন্যান্ট টিউমারকেই ক্যান্সার বলে।

ক্যান্সারের প্রকার

কারসিনোমা

এটা খুব সাধারণ ধরনের ক্যান্সার। ফুসফুস, মলদ্বার, স্তন এবং ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার এর অন্তর্ভুক্ত।

সারকোমা

সাধারণত হাড়ের, কশেরুকা, চর্বি বা মাংসপেশির ক্যান্সারকে সার্কোমা বলে।

লিম্ফোমা

আমাদের শরীর জুড়ে লিম্ফ নোড ছড়ানো রয়েছে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই লিম্ফ নোডের সাথে জড়িত। লিম্ফ নোডের ক্যান্সারকেই লিম্ফোমা বলে।

লিউকেমিয়া

রক্ত কোষের ক্যান্সারকেই লিউকেমিয়া বলে। এই রক্তকোষগুলো হাড়ের মজ্জা থেকে জন্ম নেয়।

সাধারণত বয়স যত বাড়তে থাকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়তে থাকে, কারণ এ সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এক হিসেবে দেখা যায় যত মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় তাদের শতকরা ৭০ ভাগেরই বয়স ৬০ বছরের ওপর। খাবার এবং জীবনযাপনের ধারার সাথে ক্যান্সারের গভীর সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছে গবেষকরা। যেমন, ধূমপান বা মদ্যপানের সাথে ফুসফুস, মুখ ও কণ্ঠনালীর এবং যকৃৎ বা লিভারের ক্যান্সারের যোগাযোগ রয়েছে। তেমনই ভাবে পান-সুপারি, জর্দা, মাংস, অতিরিক্ত লবণ, চিনি ইত্যাদি খাবারের সাথেও ক্যান্সারের যোগসূত্র রয়েছে। যারা সাধারণত শারীরিক পরিশ্রম কম করে তাদের মধ্যেও ক্যান্সারের প্রবণতাটা বেশি।ক্যান্সারের সাথে জিনগত সম্পর্ক রয়েছে বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই কারণে পরিবারের কারো যদি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা থাকে তাহলে অন্যদেরও ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকখানি বেড়ে যায়।

মানবদেহে যে সকল স্থানে ক্যান্সার ধরা পড়েছে তা হল প্রস্টেট গ্রন্থি, স্তন, জরায়ু, অগ্ন্যাশয়, রক্তের ক্যান্সার, চামড়ায় ক্যান্সার ইত্যাদি। একেক ক্যান্সারের জন্য একেক ধরনের লক্ষণ বা উপসর্গ থাকে। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ হচ্ছে:

  • খুব ক্লান্ত বোধ করা
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া
  • শরীরের যে কোনজায়গায় চাকা বা দলা দেখা দেয়া
  • দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা গলা ভাঙা
  • মলত্যাগে পরিবর্তন আসা (ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা মলের সাথে রক্ত যাওয়া)
  • জ্বর, রাতে ঠান্ডা লাগা বা ঘেমে যাওয়া
  • অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমা
  • অস্বাভাবিক রক্তপাত হওয়া
  • ত্বকের পরিবর্তন দেখা যাওয়া
  • মানসিক অস্বস্তি

তাহলে আমরা জানলাম ক্যান্সার কী, এর কারন কি এবং এর লক্ষন কী এবং এটি কতপ্রকার এর হয়ে থাকে। এবার আমরা জানব কোষচক্র বা Cell cycle কী। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক কোষচক্র সম্পর্কে।

কোষচক্র

একটি কোষ সৃষ্টি এর বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে বিভাজন এ তিনটি কাজের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় তাকে কোষ চক্র বলে।হাওয়ার্ড  ও পেল্ক এই কোষচক্রের প্রস্তাব করেন । 

প্রক্রিয়া

কোষ চক্র দুটি প্রধান ধাপে বিভক্ত যথা- ইন্টারফেস বা প্রস্তুতি পর্যায় ও এম ফেজ বা মাইটোসিস বিভাজন পর্যায়।

ইন্টারফেসঃ

কোষ বিভাজনের পূর্বে প্রস্তুতিমূলক এবং বিপাক সমৃদ্ধ ধাপকে ইন্টারফেস বলে।  এটি বেশ দীর্ঘ ধাপ। এম ফেজ ধাপকে সম্পূর্ণ করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় ইন্টারফেস অবস্থায় ।এটি তিনটি দশায় বিভক্ত  যথা- G1 দশা, S দশা ও G2 দশা।

G1 দশা

একটি কোষ পরবর্তীতে  বিভাজন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করবে কিনা তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এই দশায়। এ সময় প্রয়োজনীয় অন্যান্য প্রোটিন আরএনএ এবং ডিএনএ প্রতিলিপিকরণ তৈরি হয়। মোট কোষচক্রের ৩০-৪০% সময় এই দশায় ব্যয় হয়।

S দশা

এই দশার প্রধান কাজ হলো নিউক্লিয়াসের ক্রোমোজোমস্থ ডিএনএ সূত্রের প্রতিলিপন । এতে ৩০-৫০% সময় ব্যয় হয় ।

G2 দশা

এই দশার প্রধান কাজ হলো মাইটোসিস পর্যায় স্পিন্ডল তন্তু তৈরি করে বিভাজন প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি (ATP) তৈরি করা ।

মাইটোসিস

একটি জটিল প্রক্রিয়া নিউক্লিয়াসের বিভাজন ও পুনর্গঠন, সাইটোপ্লাজম এর  নতুন কোষে গমন,সেল মেমব্রেন এবং উদ্ভিদ কোষে কোষ প্রাচীর গঠনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ দুটি অপত্য কোষ সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে এই ধাপ সমাপ্ত হয়।

তাহলে আমরা জানলাম কোষচক্র কি, এটি কয়েটি পর্যায়ে বিভক্ত। এবার আমরা জানব কিভাবে কোষচক্র কে নিয়ন্ত্রন করলেও আমাদের ক্যান্সার প্রতিরোধ হয়। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক ক্যান্সার প্রতিরোধে কোষচক্র নিয়ন্ত্রনের গুরুত্ব।

কোষচক্র নিয়ন্ত্রন এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ

সাইক্লিন এবং সাইক্লিন নির্ভর কাইনেস যুগ্ম ক্রিয়া [CDK KINASE ACTIVITY]

সাইক্লিন নির্ভর কাইনেস [CDK] হল একটি প্রোটিন কাইনেস উৎসেচক যেটি আমাদের কোষচক্র কে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম। এই উৎসেচকটির আনবিক ওজন বা Molecular weight হল 34-40 kDa এবং এই উৎসেচকটি সাইক্লিনের সাথে যুক্ত হয় এবং এরপর এই পুরো সিস্টেমটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু সাইক্লিনের অনুপস্থিতি তে এই সিস্টেমটি সক্রিয় হয় ঠিকই কিন্তু ক্রিয়ার হার তেমন বৃদ্ধি পায়না। এই CYCLIN CDK COMPLEX কে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করে CDK Activating Kinase [CAK] নামক একটি উৎসেচক। এই উৎসেচকটি CDK সিস্টেমের নিম্মভাগে অবস্থিত Threonine 161 অ্যমিনো অ্যসিডের শৃঙ্খলটিকে Phosphorylate করে তোলে অর্থাৎ সক্রিয় করে তোলে। এই সক্রিয়করনের ফলে আমাদের CYCLIN DEPENDENT CDK PATHWAY টি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তার ফলশ্রুতিতে আমাদের শরীরের কোনো একটি কোষের কোনো একটি DNA যদি খারাপ থাকে তাহলে সেই কোষটি কোষচক্রের G1 দশা অতিক্রম করে আর S দশায় প্রবেশ করতে পারবেনা যার ফলশ্রুতিতে খারাপ DNA টির প্রতিলিপিকরন প্রক্রিয়া কোষচক্রের S দশা বা সংশ্লেষ দশায় ঘটবেনা এবং সর্বোপরি সেই কোষটির বিভাজন প্রক্রিয়া আর ঘটবেনা এবং তার ফলে ক্যান্সার সৃষ্টির সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যায় কারণ খারাপ বা Damage DNA থেকে ক্যান্সার সৃষ্টি হয়ে যায় যখন‌ সেই DNA এর প্রতিলিপিকরন প্রক্রিয়া আমাদের শরীরে সংঘটিত হয় এবং সেই Damage DNA যুক্ত কোষের বিভাজন বৃদ্ধি পেয়ে সেই কোষের সংখ্যা আমাদের শরীরে বৃদ্ধি পায়। সেই বৃদ্ধি প্রাপ্ত ক্ষতিকর কোষ সমুহ আমাদের শরীরে ম্যালিগন্যান্ট টিউমারের সৃষ্টি করে।

WEE-1 KINASE

WEE-1 KINASE হল CAK kinase এর মতোই একটি কাইনেস উৎসেচক। এর আনবিক ওজন হল 96 kDa এবং এটিও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কোষচক্রের নিয়ন্ত্রক। এটি CDK KINASE এর বিপরীতে ক্রিয়া করে থাকে। ইন্টারফেস দশায় এই WEE-1 KINASE CDK এর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি অ্যা্মিনো অ্যসিড Tyrosine কে Phosphorylate করে অর্থাৎ সক্রিয় করে তোলে এবং এরফলে CYCLIN DEPENDENT CDK KINASE PATHWAY অবদমিত হয় এবং কোষচক্র পুনরায় শুরু হয় এবং এইসময় যদি কোনো খারাপ DNA যুক্ত কোষ বিভাজনের জন্য আসে সেটি খুব সহজেই কোষচক্রের G1 দশা অতিক্রম করে S দশায় প্রবেশ করে রায় এবং সেখান থেকে G2 এবং মাইটোসিস দশা অতিক্রম করে নিজের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। এই খারাপ DNA যুক্ত কোষগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বিভাজনের ফলে আমাদের শরীরের মধ্যে ক্যান্সারের সৃষ্টির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

  • খারাপ DNA এর সঙ্গে কিছু বিশেষ ধরনের প্রোটিন যেমন H2AX, DNAPK প্রভৃতি যুক্ত হয়। এরা DNA এর খারাপ অংশ গুলোকে চিহ্নিত করে। এরপর এরা আরো কিছু বিশেষ ধরনের কাইনেস উৎসেচক কে সক্রিয় করে। সেগুলো হলো Ataxia Telangiectasia Mutated [ATM] এবং Ataxia Telangiectasia Mutated Related Kinase [ATR]। এই সমস্ত উৎসেচক সমুহ কিছু বিশেষ ধরনের প্রোটিন যেমন Chk1 এবং Chk2 কে সক্রিয় করে তোলে এবং এই Chk1 এবং Chk2 যুগ্ম ভাবে CDC25 নামক একটি বিশেষ জিন এর ক্রিয়াকে অবদমিত করে। 

এই CDC25 জিনটি WEE-1 KINASEকে Phosphorylate করে এবং নিষ্ক্রিয় করে তোলে এবং CDK KINASE এর সঙ্গে যুক্ত Tyrosine এর dephosphorylation ঘটে এইসময়। তার ফলে আমাদের CDK PATHWAY টি পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং CDK KINASE PATHWAY এর ক্রিয়া বৃদ্ধি পায়।

এভাবে কোষচক্রের নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে আমরা ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করতে পারি। আমরা সঠিক চিকিৎসা এবং সঠিক পথ্যের মাধ্যমে এইসমস্ত জিনের ক্রিয়াকৌশল কে প্রনোদিত এবং অবদমিত করার মধ্যে দিয়ে ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করতে পারব। এর জন্য আমাদের সঠিক চিকিৎসক এবং পথ্ বিশারদদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়াটা আবশ্যক। 

তথ্যসূত্র

1. http://www.bbc.com/bengali/news-58306728.amp

2. http://bangla.aajtak.in/amp/world/story/cancer-vanishes-every-patient-drug-trial-18-rectal-cancer-patients-were-given-same-drug-six-months-arg-381781-2022-06-08

3. http://ক্যান্সার – উইকিপিডিয়া

4. http://কোষ চক্র – Jibbiggan

5. http://কোশ চক্রের S দশাকে সংশ্লেষ দশা বলা …abvrp

6. http://Cell Cycle Regulation: Cyclins and CDKs …PraxiLabs – A virtual world of science

7. http://Cyclin-dependent kinases – PubMed

8. http://genomebiology.biomedcentral.comCyclin-dependent kinases | Genome Biology | Full Text

9. http://https://www.news-medical.net › Wh…What are Cyclin-Dependent Kinases? – News-Medical

10. http://https://en.m.wikipedia.org › wikiCyclin-dependent kinase – Wikipedia

11. http://www.ncbi.nlm.nih.gov › pmcWee1 kinase as a target for cancer therapy – PMC – NCBI

12. http://Cell Division Cycle 1 2 3 4 5SlideToDoc.com

13. http://Cell Cycle Arrest After DNA Damage …SpringerLink

14. http://DNA damage and p53-mediated cell cycle arrest: A reevaluation – NCBI

15. http://activation of cyclin-dependent kinases …ResearchGate

  • নাম-শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়
  • ঠিকানা:- হালিশহর নিউ পূর্বাচল,
  • পোস্ট:- নবনগর  
  • জেলা:- উত্তর ২৪ পরগনা 
  • পিন কোড:- ৭৪৩১৩৬ 
  • জন্মসাল:- জানুয়ারি ২০০১
  • বয়স:- ২১ বছর
  • ইমেল আইডি:[email protected]
Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published.