ধারাবাহিক পৌরাণিক কাব‍্য

★কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিন★

রচনা: কৃষ্ণপদ ঘোষ।
উপস্থাপন– ২৪
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১৭। ঘটোৎকচ বধ।

চক্ষু লোহিত শ‍্যামল বপুটি বিশাল।
আকর্ণ বিস্তৃত মুখ দংস্ট্রা করাল।।
বৃহৎ মস্তকে তার উচ্চ কেশ চূড়া।
হস্তে তার ছেদিবার ভয়ঙ্কর খাঁড়া।।
মস্তকেতে শুভ্র কিরীট শ্মশ্রু পিঙ্গল।
কর্ণে অরুণ বরণ শোভিত কুণ্ডল।।
বিশাল শরীর ঢাকা দৃঢ় লৌহ বর্মে।
আচ্ছাদিত রথ তার কৃষ্ণ ভালু চর্মে।।
সুবিশাল রথ টানে শত কৃষ্ণ হয়।
চলিছে সমরে ভীম – হিড়িম্বা তনয়।।
উড়াইয়া ধূলা রথ বায়ু বেগে ধায়।
ঘর্ষণ গর্জন তার রথের চাকায়।।
তারে বধিবারে কর্ণ আইলেন ধেয়ে।
দোঁহাকার শরজালে যায় নভ ছেয়ে।।
ক্ষণপরে ঘটোৎকচ মায়া যুদ্ধে রত।
ঘোর দর্শন রাক্ষস এল শত শত।।
লৌহচক্র শিলা শূল করে বরিষণ।
কৌরবসেনা কম্পিত ত্রাসেতে ভীষণ।।
অকম্পিত কর্ণ শুধু সেই মায়ারণে।
রহিলেন রত তিনি বাণ বরিষণে।।
ঘটোৎকচদেহে বিদ্ধ বাণ শত শত।
শজারুর ন‍্যায় দেহ হলো কণ্টকিত।।
দৃশ‍্য কভুও অদৃশ্য হিড়িম্বা তনয়।
কভু ভূমে কভু নভে কাটিছে সময়।।
হেনরূপে দীর্ঘক্ষণ চলে মায়ারণ।
তারপর নিজ দেহ করে বিদারণ।।
নিজ দেহ ভাগ ক’রে জন্তু বহুরূপে।
রাক্ষস পিশাচ শিবা বিষধর সর্পে।।
বৃকপক্ষী ব‍্যাঘ্র সিংহ হিংস্র ভীষণ।
ধায়িল সকলে কর্ণে করিতে ভক্ষণ।।
কর্ণ অতি দ্রুত গতি আয়ুধ ক্ষেপনে,
নিমেষে করেন হত্যা সেই প্রাণীগণে।।
*
আইল রাক্ষস এক অলায়ুধ নাম।
দুর্যোধন-পাশে আসি করিল প্রণাম।।
কহিল সে দুর্যোধনে, “ওহে মহারাজ।
ভীমের কীর্তি তোমায় কহে দিব আজ।।
বন্ধুদ্বয়ে ভীম মোর করিল হরণ।
কন‍্যা হিড়িম্বায় মোর করিল ধর্ষণ।।
পাণ্ডুপুত্রগণে আজ করিয়া হনন,
সকলে তাদের আমি করিব ভক্ষণ”।।
আজ্ঞা লভি অলায়ুধ গমিল সে রণে।
কিন্তু হায় প্রাণ যায় মস্তক ছেদনে।।
অতি রাগে ভীমপুত্র করিল গর্জন।
ভীমবেগে মুণ্ড তার করিয়া ক্ষেপন।।
মায়াবলে সৃষ্ট যত রাক্ষস সকলে,
শত শত কুরুসেনা হানে দলে দলে।।
রণে ভঙ্গ দিল যত কুরু-বীরগণ।
তাই হেরি যত সেনা করে পলায়ন।।
ঘটিছে এসব কাণ্ড ইন্দ্র দৈব বলে।
যত রথী মহারথ ভাবিল সকলে।।
দৈবশক্তি মহাশক্তি নাহি পরিত্রাণ।
ছাড়ে রণ রণাঙ্গন বাঁচাইতে প্রাণ।।
চক্রযুক্ত শতঘ্ণী করি প্রক্ষেপন,
ঘটোৎকচ চারি অশ্বে করিল নিধন।।
ব‍্যাকুল কৌরবকুল কর্ণে তাঁরা কন,
“যথাশীঘ্র শক্তি অস্ত্র করহ মোচন।।
শক্তি অস্ত্রে রাক্ষস করহ সংহার।
নচেৎ জীবিত কেহ রহিবেনা আর।।
এতেক শুনিয়া কর্ণ বিচলিত মন।
কিবা উচিত? ভাবেন,”কি করি এখন।
সর্বক্ষণ এই অস্ত্র রাখিলাম পাশে।
নাশিব অর্জুনে আমি এই অভিলাষে।।
কিন্তু এখন যে দেখি নাহিক উপায়।
নাশিতে রাক্ষসে অস্ত্র বিফলেতে যায়”।।
ভাবিয়া হেন করেন তিনি মনস্থির।
“ভয়ে ভীত কুরুদল সকলে অস্থির।।
ঘটোৎকচ হত্যা শ্রেয় সর্ব অগ্রে তাই।
শক্তি অস্ত্র ছাড়া দেখি অন্য পথ নাই”।।
ইন্দ্রদত্ত অস্ত্র উল্কা সম দীপ‍্যমান।
হিংস্র কৃতান্ত জিহ্বা অগ্নি লেলিহান।।
লইলেন হস্তে তাহা কর্ণ মহাবীর।
হেরিয়া রাক্ষস দল ভয়েতে অধীর।।
মরণ নিশ্চয় নাহি কোন সংশয়।
সেই ক্ষণে ভাবে মনে হিড়িম্বা তনয়।।
হয়ে ভীত হয় স্ফীত বিন্ধ‍্য অদ্রি যথা।
পিছে গমে ধীরে ধীরে বাঁচিবারে তথা।।
কর্ণ হতে শক্তি অস্ত্র হলো নিক্ষেপিত।
ঘটোৎকচের মায়া হলো ভস্মীভূত।।
বিদীর্ণ করিয়া অস্ত্র ব‍্যূঢ় বক্ষ তার,
দেবলোকে দিল পাড়ি নাই দেখা আর।।
নভ চুমে পড়ে ভূমে দেহখানি হায়।
নিষ্পেষিত অগণিত কুরুসেনা তায়।।
কর্ণ হস্তে শক্তি-অস্ত্রে হারাইয়া প্রাণ,
দেহখানি কর্ম এক করিল মহান।।

শোকাকুল পাণ্ডুকুল করিল রোদন।
হৃষ্ট কেশব করেন পার্থে আলিঙ্গন।।
রথাশ্ব রশ্মি তাঁহার করেন সংযত।
অতঃপর রথোপরি হন নৃত্য রত।।
হেরিয়া অর্জুন তাহা অতীব অপ্রীত।
কেশবে কহেন তিনি হইয়া দুঃখিত।।
“পুলকিত মন কেন হে মধুসূদন।
শোকাকুল সবে দেখ করিছে রোদন”।।
ত‍্যাজি নৃত্য হর্ষ চিত্ত কহেন কেশব।
“কণ হতে অপসৃত যত শক্তি সব।।
কবচ কুণ্ডল তাঁর পূর্বে দূরীভূত।
ইন্দ্রদত্ত শক্তি-অস্ত্র আজ অপসৃত।।
যত শক্তি সব আজ হলো নিঃশেষ।
যুদ্ধক্ষেত্রে কর্ণ তাই হইবে নিকেশ।।
পার্থ, তব হিতে আমি সদা সচেতন।
ঘটোৎকচ অলায়ুধে করানু হনন।।
হিড়িম্বা কির্মীর বকে ঘটানু পতন।
জরাসন্ধ শিশুপাল লভিল মরণ।।
শোন পার্থ, এই সব নয় অকারণ।
এতেক নিধন সব মঙ্গল কারণ”।।
কহেন কৃষ্ণে অর্জুন,”কিবা হিত তায়।
যুদ্ধক্ষেত্রে এতসব জীবন হত‍্যায়”।।
শুনিয়া কেশব কন অর্জুনে তখন।
“কহিতেছি আমি যাহা করহ শ্রবণ।।
জরাসন্ধ হিড়িম্বে না করিলে হনন,
এরা পরে হতো সব ভয়ের কারণ।।
দিত তারা যোগ সব কৌরবের দলে।
বৃদ্ধি পেত কুরু শক্তি তাহাদের বলে।।
জন্ম মোর বিনাশিতে দেবদ্বেষীগণে।
তারপর জগতের মঙ্গল সাধনে।।
শক্তি-অস্ত্রে ঘটোৎকচ হয় তাহে হত।
ধর্মনাশী পাপী তাহে হলো অপসৃত।।
কর্ণ হতে শক্তি-অস্ত্র দূরীভূত রণে।
পরিত্রাণ পেলে তুমি নিশ্চিত মরণে।।
পরিত্রাণি সাধুগণে বিনাশি দুষ্কৃত।
সংস্থাপিতে ধর্মেরে হই আবির্ভূত।।

যুধিষ্ঠির শোকাকুল অতীব অস্থির।
কেশব সান্ত্বনা দেন অতি নম্র ধীর।।
“আপনার মত জ্ঞানী করেন রোদন।
নহে ঠিক ইহা কভু নয় সুশোভন।।
আরো রণ আছে বাকি হন দৃঢ়চেতা।
ভেঙে যদি পড়ি তবে যাবে নাতো জেতা।।
জয় হবে সংশয় হ’লে মুহ‍্যমান।
উঠুন কর্ম করুন সাথে ভগবান”।।
যুধিষ্ঠির কন অশ্রু করিয়া মোচন,
“ব্রহ্ম হত‍্যা পাপে পাপী কৃতঘ্ন যে জন।।
বালক ঘটোৎকচ বনবাস কালে,
করেছিল উপকার বহু সেই কালে।।
রহিল কাম‍্যক বনে অর্জুন বিহনে।
তরাল গন্ধমাদন দুর্গম গমনে।।
তারই সাহায্যে মোরা করিনু গমন।
পরিশ্রান্তা পাঞ্চালীরে করিল বহন।।
বহু দুঃসাধ্য কর্ম করিল এ রণে।
কহ হে কেশব তারে ভুলিব কেমনে।।
সে ছিল আমার ভক্ত অতি প্রিয় জন।
তার তরে আমি আজ শোকার্ত এখন।।
তুমি, আমরা জীবিত সবে যতক্ষণ,
ঘটোৎকচ নিহত কেন জনার্দন।।
জয়দ্রথ হলো হত সামান্য কারণে।
প্রীত আমি নহি তাহে তাহার হননে।
ইচ্ছা যদি ছিল মনে শত্রুরে হনন,
কর্ণ দ্রোণে হত্যা ছিল উচিত তখন।
সকল দুখের হেতু এঁরা দুই জন।
এঁদের হত‍্যাই শ্রেয় ওহে জনার্দন।।
কর্ণ দ্রোণে হত‍্যা ঠিক আছিল যেথায়।
জয়দ্রথে পার্থ কেন বধিল তথায়।।
ভীমসেন দ্রোণ সনে ভীমরণে রত।
চলিলাম কর্ণে আমি করিবারে হত”।।
এতেক কহিয়া রণে গমনে উদ‍্যত।
হেনকালে ব‍্যাসদেব আসি উপস্থিত।।
“যুধিষ্ঠির হও স্থির শোন মোর কথা।
একা রণে কি কারণে গমন অযথা।।
ত‍্যাজিল ঘটোৎকচ শক্তি-অস্ত্রে প্রাণ।
শক্তি-অস্ত্র হ’তে পার্থ লভে পরিত্রাণ।।
ঘটোৎকচ লাগি না করিও শোচন।
ভ্রাতাদের সাথে যুদ্ধে করহ গমন।।
ধর্ম আছে সাথে তব হবে ঠিক জয়।
ধর্ম লাগি কর যুদ্ধ নাই কোন ভয়।।
ভগবান সাথে তব জয় সুনিশ্চিত”।
এতেক কহিয়া তিনি হলেন প্রস্থিত।।
★★★
(চলবে)

রচনাকার কৃষ্ণপদ ঘোষ


Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *