Spread the love

খগেন্দ্রনাথ অধিকারী

শিশু দিবস। অঙ্কন প্রতিযোগিতায় যারা প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছে, তাদের পুরস্কার বিতরণ করতে এসেছেন জাসটিস আম্বু মুখার্জী। সকালে প্রতিযোগিতা হয়েছে। বিকালে পুরস্কার বিতরণ। বিতরণ অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। প্রথম হওয়া বাচ্চাটি আসেনি। বিচারপতি ম্যাডাম গাড়ীতে উঠতে যাবেন। এমন সময়ে হোমের আন্টির হাত ধরে বাচ্চাটি এসে হাজির। উদ্যোক্তা বি. ডি. ও শুভশ্রী দাস ওঁকে বিনীত ভাবে অনুরোধ করলেন–ম্যাম, যদি Kindly একটু সময় দেন। প্রথম হওয়া বাচ্চাটি এসে গেছে।
জাসটিস মুখার্জীর খুব তাড়া। তবু হাসি মুখে উনি রাজী হলেন। ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। বছর পাঁচেক বয়েস হবে। নাম তুহিনা। ওর আঁকা ছবিটা বি. ডি. ও ম্যাম ওঁকে দেখালেন–আঁধারের বুক চিরে চাঁদ উঠছে। — বাঃ! অসাধারণ। তুমি অনেক বড় শিল্পী হবে। জাসটিস মুখার্জী আদরে ওর গাল টিপে পুরস্কারটা হাতে তুলে দিলেন। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন–এমন হীরের টুকরো মেয়ে। আপনি রত্নগর্ভা। কিন্তু একটু সময় মত আসবেন তো! সবাই বাচ্চাটাকে দেখতো। এখন তো ফাঁকা।
–সরি ম্যাম! ছলছল চোখে ভদ্রমহিলা বললেন– আমি অরফ্যান হোমের একজন সেবিকা। আজ হোমে ইনেস্‌পেকশান ছিল। তাই ওকে নিয়ে আসতে দেরী হোল। অফিসার ম্যাডাম প্রতিটি বাচ্চার ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশান করে তবে ছাড়লেন। তুহির Roll ছিল শেষের দিকে। তাই দেরী হোল।
–মানে, আপনি . . .?
–হ্যাঁ ম্যাম! আমি ওর মা নই। হোমের আন্টি।
জাসটিস মুখার্জীর চোখদুটি ছল ছল করে ওঠে।
–ম্যাম! যদি একটু সময় দেন, একটা কথা বলি।
–হ্যাঁ বলুন, বলুন।
–তিন বছর আগে বসিরহাট কোর্টে একটা মর্মস্পর্শী ডিভোর্সের মামলা উঠেছিল আপনার এজলাসে। অধ্যাপক রোশন আলি VS রেহানা পারভিন। এই মামলার শুনানীর বিবরণ খুব কাগজে বেরুতো। আমরা দেখতাম আপনি বিচারপতির আসন থেকে দম্পতির সম্পর্ক জোড়া লাগানোর খুব চেষ্টা করেছিলেন। পারেননি। বিচ্ছেদ হয়ে গেল। বাবা মা কেউই বাচ্চাটির দায়িত্ব নিলো না। আপনি ওকে আমাদের হোমে পাঠালেন। সেখান থেকেই ও আমাদের কাছে। জানেন ম্যাম! আমার বাড়ীতে ওরই বয়সী আমার একটি বাচ্চা আছে। নাম তন্ময়া। আমার শাশুড়ী মা তো বলেন–দেবীকা মা! তোমার যমজ মেয়ে, তুহিনা ও তন্নয়া।
–দেবীকা বোনটির বয়স কত?
–ত্রিশ ছুঁই ছুঁই ম্যাম।
–তার মানে এখনো ত্রিশ বছরের বেশি চাকরি আছে।
মুখটা দেবীকার কানের কাছে এনে নীচু স্বরে উনি জিজ্ঞেস করলেন–ওর বাব-মা কেউ খোঁজ নেয় না?
–না ম্যাম। কেউ না। ওরা দু-জনেই আবার দুই ডিভোর্সীকে বিয়ে করে ঘর সংসার করছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জাসটিস মুখার্জী নিজের একটা কার্ড দেবীকাকে দিয়ে বললেন–সামনের সপ্তাহে আমার বদলি। মাঝে মাঝে আমায় ফোন করবেন। আপনার নাম্বারটাও আমায় দিন। হোমের রসদ ছাড়া এই কুঁড়িটিকে ফুটিয়ে তুলতে যা সাহায্য প্রয়োজন, আমায় জানাবেন। আমি কোরবো।
জাসটিস মখার্জী হাতের ঘড়ি দেখলেন। শিশু তুহিনার মুখে একটা চুমু দিয়ে গাড়ী ছাড়লেন। অনুষ্ঠান কেন্দ্রের মাইকে তখন বাজছে–
“মধুর আমার মায়ের হাসি
চাঁদের মুখে ঝরে,
মাকে মনে পড়ে আমার,
মাকে মনে পড়ে . . .”
বিচারপতি ম্যাডাম গান শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে ভাবছেন, শিশু তুহিনা কি কিছু বুঝছে এই আকূতির মর্ম কথা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed

পুনরাবৃত্তি ©অঞ্জলি দে নন্দী, মম আমার বয়স তখন অধিক নহে। বিদ্যালয়ের নিম্ন শ্রেণীর ছাত্রী। বঙ্গ ভাষায় পাঠ্যরূপে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের কপালকুণ্ডলার কিয়দংশ পাঠ করান হইত। আমি শ্রেণীর খুব মেধাবিনী পঠিয়ত্রী ছিলুম। আমি প্রথম স্থান অধিকার করিয়া প্রত্যেক বৎসর ঊর্ধ্ব শ্রেণীতে গমন করিতুম। ঐ পাঠ্যের এক পত্রে বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয় কতৃক লিখিত হইয়াছিল, ” তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন? ” পাঠ্যে ওই অংশটির নাম ছিল, ‘সাগর সঙ্গমে নবকুমার’। যাহা হউক- আমার চিত্তে এই বাক্যটি গভীরভাবে রেখাপাত করিয়াছিল। আমার সহিত উক্ত সময় নবকুমার বাবুর সহিত যেইরূপ ঘটিয়াছিল ঐরূপ কিছু ঘটিলে আমি তাহাকে ঠিক ঐরূপভাবেই গ্রহণ করিতুম। কিন্তু এই সময়ে আমি উহাকে পরিবর্তীত করিয়া লইয়াছি। এইরূপে – তুমি অতিশয় অধম সেইহেতু বলপূর্বক আমাকেও ঠিক তোমারই স্বরূপ অতি অধমে রূপান্তরিত করিতে চাহিতেছ। আমি অতি অধম না হইলে তুমি আমাকে কৌশলে এই ইহলোক হইতে পরলোকে পাঠাইয়া দিবে। সেইহেতু আমি মৃত্যুলোকবাসীনি না হইবার কারণ বসত তোমাকে সন্তুষ্ট করিবার হেতু মিথ্যা অভিনয় করিয়া তোমাকে দৃশ্য করাইয়া চলিতেছি যে আমিও তোমার স্বরূপই অতি অধমে পরিণত হইয়াছি। বাস্তবিকই তোমার প্রচেষ্টা সার্থক হইয়াছে। আমি আর পূর্বের ন্যায় অতি উত্তম নহি। কিন্তু তুমি কদাপি বুঝিতে পার নাই যে আমি প্রাণে বাঁচিয়া থাকিবার নিমিত্ত তোমার সম্মুখে এইরূপ মিথ্যা, নকল অভিনয় করিতেছি। আদৌই আমি অধম হই নাই। পূর্বে যেইরূপ অতি উত্তম ছিলুম অদ্যাপি ঐরূপই বিদ্যমান রহিয়াছি। কেবলমাত্র একটি নকল আবরণ ধারণ করিয়াছি। নতুবা অকালে তোমার হস্তে আমার প্রাণ বিসর্জিতা হইত। তদপেক্ষা ইহা অধিকতর সঠিক পথ বলিয়া আমা কতৃক ইহা বিবেচিতা।