• Sat. Jun 25th, 2022

অরুপের রুপকথা – রোকেয়া ইসলাম (ঢাকা , বাংলাদেশ)

ByKabyapot

Jun 4, 2022

অরুপের রুপকথা
রোকেয়া ইসলাম


আজান শেষ হতেই দরজা খুলে উঠোনে নামে মেঘবতী। কলপাড়ে গিয়ে বুঝতে পারে চায়না ঘুম থেকে ওঠেছে বেশ আগেই,  ওর ফরজ গোসল সারা হয়ে গেছে। ভেজা কাপড় বালতিতে করে এককোণায় রেখে দিয়েছে যাতে কারো নজরে না আসে যে ও স্বামী সহবাস করেছে  মেয়েটার লাজলজ্জা, আক্কেল বেশ টনটনে। ওজু সেরে ঘরের পৌটায় পা রাখতেই কল চাপ দেবার শব্দে পেছন ফিরে দেখে চায়না কল চেপে বালতি ভরছে।
মতিমিয়া  ঘর থেকে দ্রুত উঠোনে নেমে কলপাড়ে গিয়ে অজু করে মসজিদের পথ ধরে।   মেঘাবতী স্বস্তির মনে জায়নামাজ পেতে নামাজে দাঁড়ায়।
চায়না বাঁসি কাজ সেরে গোয়াল থেকে গরু বের করবে খোপ খুলে মুরগী বের করে কুঁড়া মাখিয়ে মুরগীগুলোকে খেতে দেবে,  তই তই করে হাঁসগুলো আলাদা করে তাদের খেতে দেবে। গরুর চাড়িতে পানি দেবে,  খড় কেটে গরুকে খেতে দিয়েই, বাড়ির মানুষের জন্য সকালের খাবারের ব্যাবস্থা করবে একা হাতে।
মসজিদে নামাজ শেষে দোয়া কালাম পড়ে বাজারে গিয়ে বসে চা পান করে মতিমিয়া। আগে এই চায়ের অভ্যাস ছিল না। শুধু চা কেন অনেককিছুরই অভ্যাস ছিল না। এই যে এখন চা পানের পর হেঁটে হেঁটে বাজারের এমাথা ওমাথা ঘুরে মাছ তরকারি কিনবে। প্রতিদিন দুপুরে মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার অভ্যাস এটাও ছিল না ওদের পরিবারে।


গাছের পাকা ফল দিয়ে গাইয়ের দুধ দিয়ে রাতে  ভাত খায়, ঘরে কলা শেষ হলেই বাজার থেকে কিনে আনবে গাছপাকা কলা।
ভাল কলা না পেলে গুড় কিনবে।
গুড় আবার এই বাজারে পাওয়া যায় না। এই বাজারটা হলো প্রতিদিন বেলা ওঠার আগে থেকে বসে আবার সকালের রোদ ছড়িয়ে পড়তেই শেষ হয়ে যায়।
আশেপাশের নদীপাড়ের মানুষেরা সারারাত মাছ ধরে বেশিরভাগই আড়তে চলে যায় খুচরোগুলো এই বাজারে তোলে। জাংলার লাউ ঝিঙে কুমড়া সিম জাতীয় তরতাজা সবজি।
ভুঞাপুরে কোন কাজে গেলে  সুবাসিত সাবান, ডিটারজেন্ট পাউডার নারকেল তেল পোয়াটাক, আঙুল আপেল পাউরুটিও কিনে আনে। আগে এগুলোর দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাতো,  আর এখন দরদাম করে ধোয়াকাঁচা পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকা বের করে সওদা নিয়ে হৃষ্টমনে মাথা উঁচু করে বের হয়।
আজ  গ্রামের বাজার থেকে কিনেছে নধর দেখে একমুঠো ডাটা এক কেজি বেগুন আর এক ভাগা চেলা মাছ।
হাঁটতে হাঁটতে নধর ডাটাগুলোর দিকে তাকায়, তাজা মাছ দিয়ে রান্না করা তরকারি স্বাদ কেমন  হবে, ভাবতেই পথ শেষ হয়ে যায়।
বাড়িতে ঢুকে শ্যাফালী  বলে ডাক দেয়।  ছোটমেয়ে এসে সদাই-পাতি বাবার হাত থেকে নিজের হাতে নেয়।
মতিমিয়া কলপাড়ে গিয়ে দেখতে পায় পানি ভরা বালতিতে লাল প্লাস্টিকের মগ ভাসছে। কাছেই প্লাস্টিকের নীলরঙা টুল।
ভেতর থেকে তৃপ্তির নিঃশ্বাস বের হতেই কপালে একটা ভাঁজ ভেসে ওঠে।
ঘরের মেঝেতে পাটি পেতে খারমানের পাতা আর কালিজিরার  ভর্তা দিয়ে এক থালা বৌখুঁদা এগিয়ে দেয় চায়না,  মেঘাবতী একগ্লাস পানি নিয়ে সামনে বসে। সাথে সাথেই দুই ছেলে এসে বসে তাদের সামনেও ভরা থালা এগিয়ে দেয় চায়না,
শ্যাফালী ও শ্যাফালী তুইও খাইয়া ল,  আবার তো স্কুলে যাওন লাগব।


ননদ আর শাশুড়ীর খাবারের থালাও দিয়েই, উঠোনে ধান শুকোতে দেয় চায়না।
ওদের খাওয়া শেষ হতেই এঁটো বাসন গ্লাস উঠিয়ে নিয়ে কলপাড়ে নিয়ে ধুয়ে  উঠানের কোনায় ছোট্ট মাচায় উপুর করে দেয়, রোদে শুকোবে এগুলো। 
স্বামী আর দেবর বের হয়ে যায়,  শেফালীও স্কুলে যায়।
মাছগুলো কুঁটে ধুয়ে ছিঁকায় তুলে রাখে।
ও বউ তুমি খাইলা না, খাইয়া লও। বাইড়া থুইছি তো তুমার খাওন। লও খাইয়া লও।
হাতের কামডি সাইরা লই
এতোক্ষণে চায়নার গলার আওয়াজ শোনা গেল । মুখ বন্ধ করে সংসারের সব কাজ করে যায় অবশ্য কেই বা ওর সাথে কথা বলে । ওর স্বামীও দিনে দুটো কথা বলে কিনা সন্দেহ। বলবে কেন প্রয়োজনীয় সব কিছু হাতের কাছে গুছিয়ে রাখে।
স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে কি শুধু প্রয়োজনীয় কথাই থাকে ,  কত অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে হাসি  কথা তো থাকতে পারে।
কথা হাসি তো দূরে থাক ওকে সাথে নিয়ে কখনও  বাবার বাড়িতে পর্যন্ত যায় না।
এই যে এখন বাড়ীতে শুধু বউ শাশুড়ী,  তাও তো তেমন কথা হবে না দুজনের। একটু পরে উঠোনের কোনে খোলা চুলার পাড়ে গিয়ে কি দিয়ে কি রান্না হবে সেটুকু বলবে, সাথে আরো কোন কাজের কথা থাকলে অন্যদিকে  মুখ ঘুরিয়ে কথা বলবে।
মতিমিয়া ভুঞাপুর থেকে ফিরলো, উঠানে দাঁড়িয়ে হাঁক দেয়
শ্যাফালি ও শ্যাফালি কোনে গেলি
চায়না  ঘোমটা তুলে দৌড়ে গিয়ে শুশুরের পাশে দাঁড়ায়
শ্যাফালি স্কুল থন আহে নাই অহনতরি, দেইন আমার থন দেইন।
চায়নার শব্দ শুনে মুখটা বিরক্তিতে অন্যদিকে ঘুরাতে গিয়ে চোখ আঁটকে যায় বড় ঘরের টিনের চালে কালো রঙের দুটো কবুতর খুনসুটি করছে, ধারেকাছে ডাকছে কুটুম পক্ষী,  । আস্তে করে ব্যাগটা চায়নার হাতে তুলে দিয়ে দ্বিধান্বিত মনে কলতলায় যায়।
বারান্দায় পাটি পেতে খাবারের আয়োজন করেছে চায়না । শাশুড়ী পিঁড়ি পেতে বসে সবাইকে খেতে দেয়।
চায়নার হাতের রান্না খুব স্বাদের। ওর মায়ের কাছ থেকে এই গুণ ও পেয়েছে ,  খাবারের স্বাদ বুঝিয়ে দেয় ধনী খানেয়ালা ঘরের মেয়ে চায়না।
এতো পদ দিয়ে আগে কখনও ভাত খেতো না ওরা। তিনবেলা গরম খাওয়াই তো জুটতো না। মাসুমের বিয়ের পর মেঘাবতীর সংসারের চাকা ঘুরে গেছে। যদিও সবাই পরিশ্রম করছে, আগেও তো পরিশ্রম করতো তখন তো অন্ধকারই থাকতো সংসারের চৌহদ্দি জুড়ে।


চার ছেলে দুইমেয়ে আর স্বামী স্ত্রী দুজন এই আটজনের সংসারে জমি ছাড়া আর কোন আয়ের পথ ছিল না,  বড় ছেলে আই এ পাশ করে চাকরির চেষ্টা করতে গিয়ে ধাক্কা খায়,  বিরাট অংকের ঘুষ ছাড়া তো চাকরির পথ আঁধারে ঢাকা। ওদের কোন বড় চাকুরীওয়ালা আত্মীয় স্বজনও নেই।
টাকা কোথায় পাবে মতিমিয়া। বড়মেয়েটাও বিয়ের লায়েক হয়ে যায় মেজ ছেলেও মাথা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। দিকদিশা হারিয়ে মতিমিয়া কিছু ধানীজমি বিক্রি করে দিয়ে বড়মেয়ের বিয়ে দেয়,
গ্রামের একজন শহরে ছোট চাকরি করে কিন্তু তার ক্ষমতাবান  বড়সড় বসের সাথে দহরমমহরম আছে,  সেই বেশ মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পিয়নের চাকরিতে বহাল করে বড়জনকে।
মেঝজছেলেও বড়টার পথ ধরে। মুটামুটি ধানীজমি শেষের পথে নিয়েই তাদের চাকুরী যাত্রা।
শেষ সম্বল যেটুকু ছিল তাও নদী নিয়ে নেয়।
শহরে চাকরিওয়ালা দুছেলে মতিমিয়ার সংসারে কোন টাকাপয়সা দিতে পারে না, তাদের সংসার নিয়েই দুর্মূল্যের বাজারে হিমসিম অবস্থা।
মাসুমও লেখাপড়ায় তেমন ভাল নয়, আর ভাল হলেই কি চাকরি তো টাকা ছাড়া হবে না। নতুন করে টাকার সংস্থান করা অসম্ভব।
অভাবে ভিটামাটি আঁকড়ে ধরে কোনমতে খেয়ে না খেয়ে কর্মের অনিশ্চয়তায় দিনগুলো খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটে জীবন নামক  অচেনা কঠিন পথে।
ইব্রাহিম ঘটক তালতলা গ্রাম থেকে মাসুমের বিয়ের প্রস্তাব আনে।
চায়নার বাবা কুইট্ঠাল ধনী। দুই ছেলে  আর্মিতে চাকরি করে। মেয়েদেরও ভাল ভাল ঘরে বিয়ে হয়েছে। বাড়িতে বড় বড় ডোঁয়া পাকা টিনের ঘর,  গোয়াল ভরা গরু, বাইরে পেল্লাই খড়ের পালা।
এ বাড়ির মেয়েদের ভদ্র নম্র হিসাবে নাম আছে।
এখানে বিয়ে করালে বেশকিছু নগদ টাকা যৌতুক পাওয়া যাবে,  তা দিয়ে মাসুম ব্যাবসা শুরু করতে পারবে,  বাবার বাড়ির সম্পত্তির ভাগও কম পাবেনা ছোটমেয়ে।
সব শুনে প্রস্তাবটা লুফে নেয়।
ইব্রাহিম ঘটকের সাথে কন্যা দেখতে তালতলা গ্রামে যায় মতিমিয়া।
দুইবার কয়েক পদের পিঠা সেমাই ক্ষীর ঢাকাইয়া বিস্কুট কাপে করে  চা, তারপর রোষ্ট ঝাল গোশত দিয়ে কড়ির প্লেটে  সুবাসিত ধোয়া ওঠা পোলাওয়ের পর মেয়ে দেখে সব খাবার গলা দিয়ে ওঠার উপক্রম হয়।
কোনমতে ছাতা বগলে ফেলে রওনা হয় বাড়ির পথে।
সাতদিন পর ইব্রাহিম ঘটক বোঝায়” রুপ ধুইয়া কি পানি খাইবা মিয়া,  রুপ দেখবা একদিন আর নগদ যা পাইবা হেডা নাড়াচাড়া কইরা চলতে পারবা হারাজীবন। ভাইরাও চাকরি করে ভাইগনা ভাগনি অইলে হ্যারাই চাকরির ব্যাবস্থা করব,  মোটের উপর তুমি মিয়া নিচন্তা অইলা।
বড় দুইডা বিয়া করাইছো কি পাইছো বউ ছাড়া।
নগদ আরো একলাখ, দুই ভরির গহনা বাড়াইয়া মুখের মধ্যে “কইষট্রা বরুই “পুরে বিয়ে করায়।
বউ দেখে গ্রামের মানুষ আড়ালে বলে, বউ না মতিমিয়া ট্যাহার বস্তা বিয়া করাইছে।
মুখফোঁড়া কেউ কেউ সামনেই বলে ফেলে
কি গো মতিমিয়া পোলা কি ট্যাহার লগে হুইব না বউর লগে হুইব। মুহের দিকে চাইলে তো জিনিস খাঁড়াইব না।


মতিমিয়া অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চলে আসে, উত্তর দিতে পারে না। সংসারের অর্থনৈতিক দুর্গতি, দুই ছেলে তাদের সংসার নিয়ে হিমসিম, এটা তাদের কাছে বাপের সংসার, এটা চালাবার দায় তাদের নয়। ঘাড়ের উপর বেকার দুই ছেলে ছোটমেয়েও হাত পা ঝাড়া  দিয়ে ওঠছে। জমি বিক্রি করে শেষ,  বাকিটুকু যমুনার অতলে।
মাসুমকে বিয়ে করিয়ে নগদে কিছু পাওয়া গেল।
শরীককের বড়ভাবী তো মুখের উপর বলেই ফেললো
মতিভাই পুলাডারে জব দিলা নিজের আতে। ঘরে যুদি সুখ না পায় ট্যাহা দিয়া কি অইব।
ভাবী ট্যাহাই অইলো আসল সুখ, ট্যাহা গুননের সুখের লগে জগতের আর কুনু সুখ মিলে না।
বলে আর দাঁড়ায় না, হনহন করে  সড়কে ওঠে নদীর দিকে হেঁটে যায়।
মতিমিয়া কি আউস কইরা পুলার ঘরে পেত্নী হান্দাইয়া দিছে। বড় দুই পুলার বৌ ধলার কাছাকাছি গায়ের রঙ নাক মুখ চোখের ডিল গঠন ভাল। হেডায় অইছে কি?  চেহারা ছবি ভালা অইলে
হেই বালা দিয়া কি করুম,  গরম ভাতের লগে সেদ্ধু দিয়া নুন মরিচ দিয়া ডইলা  ভর্তা কইরা খামু “
বিয়ের পরদিন সকালে মাসুমকে  নদী থেকে গোসল করে আসতে দেখে মনের ভেতরে গেঁথে রাখা পাথরটা নেমে গেছে।
বিয়ের আগেরদিন মেঘাবতী ফিসফিস করে বলছিল মাসুম বড়মেয়ের কাছে বলেছে” বাবা আমারে কুরবানির ষাড় পাইছে আর কেরু নগে পারলো না আমারে হাটে তুললো,  আমার মনডা বাপে বুঝলো না।
তারপর থেকেই মনটার ভেতর পাথর ছিল।
যাক শরীরের সাথে শরীর তো মিলছে এই মিলেই সব মিলিয়ে দেবে।
বিয়ের পরদিন থেকেই বুঝতে পারে বৌটা অন্য দুই বৌয়ের মত না এ একেবারেই আলাদা ।
বিয়ের কাজকর্ম  মিটে গেলে তিন বাপবেটায় মিলে বুদ্ধি করে সড়কের কোণায় ঔষধের দোকান দেয়। গ্রামের  একজন স্কয়ার ফার্মাসিস্টের ম্যাডিকেল রিপ্রেজেন্ন্টেটিভ হিসাবে আছে, সে মাসুমকে একটা ঔষধ বিষয়ক বই দেয়,  কোন ঔষধের কি কাজ।
কয়েক মাসের মধ্যে কিছুটা সচল হয় সংসারের চাকা।


চায়নাও বাড়ির আশেপাশে সবজির গাছ লাগায়,  মতিমিয়া জাংলা তুলে দেয়,  হাঁস মুরগী পালতে শুরু করে। চায়না ওর বাবার কাছ থেকে দুধ খাবে বলে দুধেল গাই নিয়ে আসে।
মোটামুটি বছরখানেকের মধ্যে সংসারের অভাবের  চাকা ঘুরে সচ্ছলের পথ ধরে,  মতিমিয়া ধোয়া লুঙ্গি পাঞ্জাবি পড়ে মসজিদে আসরের নামাজ শেষ করে সড়কের চায়ের দোকানে বসে চা বিস্কুট খায়,  টিভিতে খবর শোনে নায়ক মান্নার ছবি দেখতে দেখতে মাসুমের দোকানে চোখ রাখে,  মাসুমের দোকানটা বড় করা খুব দরকার,  সেটাও হয়ে যায়।
মাসুম ছয়মাস ট্রেনিং নিয়ে এসে এলাকায় মাসুম ডাক্তার নামে পরিচিত।
মাসুম ডাক্তারের বাবা মতিমিয়া ধানী জমির পরিমান বাড়াচ্ছে, বাড়িতে মাসুমের ঘরটার মেঝে পাকা করা হয়েছে ফ্রিজ কেনা হয়েছে।
মোটামুটি টাকার বাদ্যটা বাজছে। মসজিদ কমিটিতে স্থান পেয়েছে,  মুরুব্বি হিসাবে বিচার শালিসে ডাক পায়।
ঢাকায় বসবাসরত ছেলেরাও মাঝেমাঝে বৌ ছেলেমেয়ে নিয়ে বাড়িতে বেড়াতে আসে। বড়মেয়েটাকে মাসে একবার নাইওর আনে। চায়না বছরে একবারও বাবার বাড়িতে যেতে চায় না। ওর বাবা জোর করে বছর একবার নিয়ে যায়।
চায়নার কোল আলো করে একছেলে এক মেয়ে আসে সংসারে।
সব চলছে নির্বিঘ্নে তবুও যেন কিছুই চলছে না। চায়না সব জায়গায় আছে তবুও কোথায়ও ও নেই।
রান্না করলেও সামনে বসে বেড়ে খাওয়ায় না। সবার সাথে বসে খায় না,সংসারের সব কাজকর্ম একা করলেও সামনে আসে না কখনো, সবসময় আড়ালে থাকে।
এটাই যেন অলিখিত নিয়ম।

চায়না মাঝে মাঝে বোরখায় আপাদমস্তক ঢেকে ভুঞাপুর বাজার থেকে নিজের একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আনে। মাসুম ব্যাস্ততায় চায়নার জন্য কিছু কিনতে পারে না।

মাসুম শরীকের ভাবীদের জন্য চানাচুর বাদামটানা মুরলি নিমকি জিলাপি কিনে আনে, ভাবীরা ওর ভাগেরটুকু দিয়ে যাবার সময় রসালো মন্তব্য ছেড়ে যায়। চুপচাপ শুনে যায়। চায়না জানে ওরা ওর দিকে না তাকিয়েই কথাগুলো বলছে।
খাবারগুলোর দিকে ফিরেও তাকায় না চায়না।

আগে বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারে শুধু স্খলনের জন্য সঙ্গম হয় মাঝেমধ্যে রাতে। কোনরকম আদর স্পর্শ পায়নি কোনদিন মাসুমের কাছ থেকে চায়না।  কথাও তো হয় না।
শুধু ওর প্রভাবশালী বাবার অর্থ এবং আর্মির চাকুরে ভাইদের ভয়ে ওকে ফিরিয়ে দিতে পারেনি কিন্তু চায়না নিজ থেকে যেন চলে যায়, তার  সব ব্যাবস্থা করেছে।
চায়না  দাঁতে দাঁত ঘষে পড়ে আছে এ বাড়িতে।
শশুর শাশুড়ী ভাসুর জা ননদ ননাস কে না ওকে শুনিয়ে রুপের খোটা দিয়েছে,  চায়না  কারো কোন কথার জবাব দেয়নি কোনদিন।
এবাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের আর কিছু থাকুক না থাকুক গা ভরা রুপের জৌলুশ আছে,
নিজের বাবাকেও কোনদিন বলে নি ওকে চায় না বলেই কি ওর নাম চায়না রেখেছে। মায়ের পেটের  সুন্দর মুখশ্রীর ভাই বোনরাও কোনদিন ওর সাথে ভাল করে কোন কথা বলেনি,  সবসময়ই দূরত্ব রেখেছে।
ও বুঝতে পারে সব,  নিজের মত করে উত্তরও তৈরি করে নেয় ভেতরে।
কঠিন পথ ওর একার, চলতে হবে একা। এই বোধ ওকে সোজা রাখে সমাজের বিরুদ্ধে সংসারের বিরুদ্ধে আপনজনের বিরুদ্ধে। রুপের বিরুদ্ধে।
তাই তো
শুধু সংসারের আয় বাড়িয়ে গেছে। নিজের জমার অংকটিও কম নয় আজ।
ওর আয়ের উৎস ওর পায়েরতলের শক্ত মাটিটা চেনে,  মাসুম,  মতিমিয়া মেঘাবতী তাই হয়তো বিষ হজমের মত করে ওকে মেনে নিয়েছে।
ছোটখাট গড়নের শ্যামলারঙের চায়নার দুচোখের নিচ থেকে চিবুক অবধি মিশমিশে কালো রঙের জন্ম জরুল। চোখ দুটো কুতকুতে,  চওড়া কপালে বসে আছে কুচকুচে ভ্রমর ভ্রু হয়ে, গোয়াথুবি চুল।
ওকে ভয় হয় ঘৃণা হয়। ভালবাসা উবে যায় করুণাও হয় না
চায়নার মেয়েটা কোনদিন ওর গলা জড়িয়ে ঘুমায়নি। শেফালী ফুফুর সাথে ঘুমায় সারাদিন দাদির সাথে থাকে,  ছেলেটাকে মায়ায় কাছে টানতে গেলে ভয়ে দূরে সরে যায়।
ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছিল চায়নার বিছানায়,  প্রচন্ড গরম পরেছে,  গ্রামের নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় বিদ্যুৎ চলে যাওয়া।
গরমে হাত পা নাড়ছিল।
শুকনো কাপড় তুলে ঘরে রাখতে গিয়ে চোখে পরে ছেলেটা ঘামছে,  গরমে এখুনি জেগে যাবে। হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকে ছেলেটাকে।
চায়নার নিজেও কাজে করতে করতে ক্লান্ত,  চোখ বুজে আসে,  ছেলের পাশে গিয়ে শুয়ে ওকে বাতাস করতে থাকে, 
আহা বড় আদরের সন্তান ওরা চায়নার।মমতার হাত বুলিয়ে দেয় তার নাড়িছেঁড়া ধনের গায়ে।
জেগে যায়,  চায়নার চোখে চোখ রাখে, হেসে চায়না ওকে জড়িয়ে ধরতেই আত্মা ছিঁড়ে চিৎকার করতে থাকে ভয় পাই ভয় পাই বলে। শাশুড়ী দৌড়ে এসে কোলে তুলে নিতেই কান্না বন্ধ হয় ছেলের।

আয়নার সাথে ওর কোনদিন সখ্য ছিল না,  আজ সারাদিন আয়নায় সাথে কাটিয়ে দেয় চায়না।
আয়নায় ভেসে ওঠে আশ্চর্য অরুপ – রুপকথার সংসার।

সকালে মেঘাবতী দেখে সমস্ত মুখমন্ডল ওড়নায় ঢেকে উঠোন ঝাড়ু দিচ্ছে চায়না।
মুখের আবরণ খুলেনি….

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published.