Spread the love

[ নীলস বোর, নোবেল প্রাইজ ১৯২২, পদার্থবিদ্যা ]

অনেকের অজান্তে হওয়া সিদ্ধান্ত বা সৃষ্টিগুলির মুগ্ধকর সফলতা, চমকে যাবেন। পড়ুন। প্লিজ।

[ A Bengali Column causing Unknowingly creations or findings how brought bigger success without measure, written by Ridendick Mitro ]

|| লেখার ভিতরে স্থানে-স্থানে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে। এটা ভালো। কিন্তু, পাঠক পড়বেন রচনার একদম নিচে গিয়ে দেখুন এর শেষ কোথায়। কোথাও বিজ্ঞাপন দেখে ভাববেন না যেন সেখানেই লেখাটা শেষ। যার লেখাই পড়ুন, এই বিষয়ে খেয়াল রেখে পড়বেন। তাহলে পড়ার ইচ্ছে পূর্ণতা পাবে।||

—————————-
ঋদেনদিক মিত্রো ( ভারত )

[ ১ ]
ভালো কথা সবাই শুনতে চায় না,
কারণ, ভালো হবার দায় থেকে যায়।

জানিয়ে রাখি, কাউকে বা কোনো বিষয়কে নিয়ে কোনো একটি অধ্যায়ে লেখা আছে, মানে এই নয় যে সেটা সেখানেই শেষ। সেটা নিয়ে একাধিক অধ্যায়ে হয় তো লেখা ও ব্যাখ্যা আছে বিভিন্ন পর্বে, প্রাসঙ্গিক কারণে। তাই, আপনাদের পড়তে হবে পুরোটাই। সময় নিয়ে পড়ুন। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।

নিবন্ধের পোষ্টার ছবি নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী নীলস বোরের, কিন্তু পড়ে দেখুন, তিনি যেমন আছেন এই নিবন্ধে, তেমনি সম প্রয়োজনে আছেন পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মুজাফফর আহমেদ, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী সব্যসাচী, রজনীকান্ত সেন, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস, Sir Alfred Nobel, Lady Gaga, গায়িকা Shakira, John Hill, সুরকার R-K Paul, গায়িকা অয়ন্তিকা চক্রবর্তী, নিউজিল্যান্ড নাগরিক ভারতীয় বংশোদ্ভূত “স্থায়ী বিশ্বশান্তি সূত্র” এর আবিস্কারক ও এর বাস্তব রূপায়নের প্রবর্তক মাইকেল তরুন, কাঁচা বাদাম গানের ভূবন বাদ্যিকর, গায়িকা রানু মন্ডল, কবি-গীতিকার ওয়াহিদা খাতুন, বাচিক শিল্পী ফিয়োনা পারভিন, X-Ray এর আবিস্কর্তা নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী রোয়েন্টজেন, পলাসী যুদ্ধের শহীদ বীর মিরমদন, জেমস ওয়ার্ট, রাজা পঞ্চম জর্জ, সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মুর্শিদাবাদের মুদ্রিত “নবারুন” পত্রিকার সম্পাদক ও মুক্ত মানসিকতার সমাজ সংস্কারক সৈয়দ শীষমহাম্মদ, মুর্শিদাবাদের “উর্বরমন” সাহিত্য-সংবাদ পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিম, পৃথিবীর সুবৃহৎ কবিতা সংকলন — দুই হাজারের অধিক কবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও কবিতা নিয়ে এই সংকলনের সম্পাদক শ্রী প্রবীর কুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশে থাকা নবাব সিরাজের নবম বংশধর সৈয়দা মেহমুদা, ঐ পরিবারের তনভীর, নবাব মিরজাফরের বংশধর ছোটে নবাব সৈয়দ রেজা আলী মির্জা, ভারতের কেন্দ্র ইতিহাস নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস রক্ষা নিয়ে বিশ্ব পরিচিত আন্দোলনের বিপ্লবী দার্শনিক সমর্পিতা দত্ত, গবেষক সাংবাদিক মানস সিনহা, হীরাঝিল বাঁচাও কমিটি, নবাব সিরাজের প্রাসাদ ভূমির জমি দাতার পরিবার সহ উজ্জ্বল সরকার, বাংলাদেশের সাংবাদিক সালাহুদ্দিন সুমন, Barasat Academy of Culture, সাহিত্যে নোবেল জয়ী গুন্টার গ্রাস — যিনি ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পাবার আগে কয়েক বছর কলকাতার বারুইপুরে একজনের বাড়িতে paying guest ছিলেন স্ত্রী সহ। এঁদের একত্র করে লেখা। আছে আরো কেউ-কেউ, সব নাম গুছিয়ে আনা গেলোনা হয় তো। তবে এই লেখার শেষে আছে Jane Taylor এবং তাঁর বোন Ann, “Twinkle twinkle, little star” এর কবি দুই বোন।

[ ২ ]
স্যার আলফ্রেড নোবেল নিয়ে প্রথমে শুরু করলে অনেকে এটিকে অন্য ভাবনায় নেবেন। তাই এই নিবন্ধের ভিতরে আমি কোথাও তাঁকে নিয়ে আলোচনা করেছি, বিষয়ের অনিবার্যতায়।

নিবন্ধের head picture নীলস বোরের ছবি দেওয়া হল কেন, এর কারণ তিনি বিজ্ঞানী বা নোবেল জয়ী বলে নয়। তিনি বিদেশি, তাই আমাদের অতিথি। তাই নীলস বোরের ছবি দেওয়া হল। একাধিক ছবি দিলে সব দেওয়া যাবেনা, ওয়েবসাইটের নানা কারণে। কারণ এটা ক্রয় করা মাধ্যম। পাঠকদের এটা বুঝে অভিমান করা যাবে না, অনুরোধ করি। আবার তাঁদের মধ্য থেকে কয়েক জনের ছবি দিতে চাইলে সেক্ষেত্রে কাদের ছবি যাবে, কাদের ছবি যাবে না, এই বিচার এখানে হবে না। এখানে কার্যকারণে সকলের উপস্থিতি সমান। বিভিন্ন জন বিভিন্ন সফলতার জন্য।

এখানে কে কার সমকক্ষ, সেটা কোনো প্রশ্ন নয়। কারণ, মানুষের চুল পাকা, দাড়ি পাকা, চোখে ছানি পড়া, এইসব দেখে মানুষের যোগ্যতার উচ্চতা দেখা হয় না, তাই নোবেল কমিটি সাড়ে সতেরো বছর বয়সের ছাত্রী মালালাকে দিল নোবেল প্রাইজ।

যেসব চর্চা আন্তর্জাতিক মানের নয় সেগুলো কু-চর্চা বা মেধা দুর্বল করার চর্চা। আমি সেইসব চর্চা করাকে সময় নষ্ট করা মনে করি।

আমার সময়ের জীবিত গুণীদের চিনতে পারলাম না, আমি বহু বছর আগে মৃত গুণীদের চিনে ফেললাম, আমি আমাদের দেশের গুণীদের চিনতে পারলাম না, কিন্তু বিদেশের গুণীদের চিনে ফেললাম, এইরকম আলোচক আমি নই। মাপ করবেন।

আপনি দেখুন, প্রিয় পাঠক, আপনার বাড়ির ছেলেমেয়েরা বিদেশি বিখ্যাতদের মত কোথায় গেছে। এবং এই সময়ের কতজন কৃতি বহু পূর্বের স্মৃতি বিজড়িত ইতিহাস জয়ী কৃতিদের মতো এক একজন, কেন, কিভাবে। দেখুন।

অনুরোধ, সবাই পড়ুন। কবি, সম্পাদক, সমালোচক থেকে বিজ্ঞানী, সমাজসেবী, পাঠক সহ সবাই পড়ুন। এবং এক রকম প্রশান্তি পাবেন।

সব ক্ষেত্রে তারিখ বা সাল দিয়ে লিখছি না। সহজ নিয়মে বিভিন্ন কাহিনীকে একসাথে নিয়ে আসছি, বক্তব্যের ধারায় যেমন আসে লেখনির স্বাদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে। ভিন্ন সময়ে পড়া স্মৃতি থেকে বলছি। কোথাও অজান্তে কোনো ভুল থাকলে সবাই ক্ষমা করবেন। ঠিক, ভুল। সবটা আপনারা বুঝে নেবেন, নিজেদের পড়া স্মৃতি ও অনুভূতি থেকে।

[ ৩ ]
দ্রুত বলে যাচ্ছি। পড়বেন দ্রুত নয়। কারণ, দ্রুত পড়ার মজা নেই।

গায়িকা লেডি গাগার “Bad Romance” শিরোনামের প্রেমের সঙ্গীতের ইউটুব খুলে অনেক দেখতাম। প্রিয় গানগুলির মধ্যে এটিও একটি।অনেকদিন পরে আবার সেই ইউটুব খুলতে গিয়ে মনে পড়লো এই গান লেখার কাহিনী। আর, তখন এটি লেখা। এটাও অজান্তে লিখে ফেলা হয়। লেখার পরে বারবার জুড়েছি অনেক, সাজিয়েছি মনের মতো। কিন্তু, এই নিবন্ধ লিখবার জন্য প্রস্তুতি নিইনি। ঐ গানটিকে নিয়ে বিভিন্ন হোয়াটসাপ গ্রুপ পত্রিকায় পোষ্ট করতে হবে, সাথে আলাদা করে লিখে দেবো এই গানটি লেডি গাগা কিকরে লিখেছিলেন। সেটাই লিখে ঠিক করছি, তখন সেই ধারায় আরো কিছু এই রকম কাহিনী মনে আসতে থাকে। সেগুলি পরপর জুড়তে থাকি। এবং একটা নিবন্ধ হয়। তখন নিবন্ধের নাম দিই, পরে আরো ভালো করে নামটা দিই। এইভাবে অজান্তে লেখা হল এই নিবন্ধ অজান্তে সৃষ্টি হওয়া কিছু সৃষ্টি বা সূত্র নিয়ে।

Bad Romance, এই শিরনামে বিশ্বখ্যাত গান বাসে বসে লিখেছিলেন লেডি গাগা। সেটাই বেরুনোর পর তাঁকে সব চেয়ে জনপ্রিয়তা দেয় ও ধনী করে।

এবার কিছু আকর্শনীয় গল্প বলি।

তাই, সবাইকে মনে রাখতে হবে কার কী সাহিত্য, সমালোচনা, নাচ, গান, কবিতা, ইত্যাদি কখন কিভাবে সৃষ্টি হয়ে তাঁকে বিরাট প্রতিষ্ঠা দেয় কেউ জানে না। তাই সতর্ক নিয়মে সবাইকে কাজ করতে হবে, যার পক্ষে যতটা সময় দেওয়া সম্ভব। এই Bad Romance গান নিয়ে অনেক ইউটুব আছে লেডি গাগার, অনেকগুলি আলাদা লেবেলে। কপি রাইট আইন মেনেই। সবগুলি প্রায় কোটি-কোটি ভিউয়ার। এক একটি কাজ এইভাবে চমকে দেয় সারা বিশ্বকে। শাকিরার “waka waka” এই রকম একটি গান। যদিওবা waka waka গানটি প্রায় ১০ জন লিখেছিল। যুগ্মভাবে শাকিরা ও John Hill. এইভাবে দুজনের কাজ জুড়ে waka waka গান। ওই গানের সব গীতিকারদের নাম আন্তর্জাতিক তালিকায় আছে। আসলে কোন সৃষ্টি কিভাবে হয়, আর তাতে আশাতীত ফলাফল আসে কেউ জানে না। সাকিরা জানত কি সে world cup football এ গান লিখে ও গেয়ে বিশ্বের এক সেরা গায়িকা হবেন ও থিম গানের জগতে সেরা হবেন। আমরা জানি waka waka গানটি ১০১০ সালের football world cup এ গেয়ে ১০/১০ নম্বর পেয়েছিলেন।

আমি world cup football দেখিনা তেমন। তবে সেবার ঘটনাক্রমে একটি ক্লাবে ঢুকে দেখি এবং খেলায় থিম সঙ হয় জানতাম না। আমি ঐ theme song দেখে অবাক হই ও কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি ইংরেজি গান লিখেও বিশ্বখ্যাত হবার স্বপ্ন দেখি।

তারপরের গল্প আলাদা। পরে হবে। এই নিবন্ধে সেগুলি বলবো না। বলবো অন্যদের কথা।

তবে এটাই বলতে চাই, সবাই যেন সঠিক চেষ্টা ও আস্থা নিয়ে কাজ করে। কার কাজ কোথায় কীভাবে বড় হয় কেউ জানে না।

[ ৪ ]
পরাধীন সময়ে ব্যাবসায়ীদের পত্রিকা “ভান্ডার” থেকে ব্যাবসায়ী গ্রুপ কবি রজনীকান্ত সেনের কাছে গিয়ে বলে,” দাদা, স্বদেশী দ্রব্য নিয়ে একটা কবিতা লিখে দিন না।”

তখন রজনীকান্ত সেন লেখেন, এই কবিতা,

মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়
মাথায় তুলে নে রে ভাই,
দীন দুখিনী মা যে তোদের
তার বেশি আর সাধ্য নাই।

কবিতাটি আরো বড় সবাই জানেন। আমি এই কটা লাইন লিখে আপনাদের শৈশবের কবিতা পড়ার স্মৃতিতে দিশা দিলাম।

সেটাই কবিকে বাংলা কবিতায় অমর করে।

তাই কাজ করুন। যত্ন নিয়ে। ব্যাস। এবং সততার সাথে।

কে কবে কিসে বিরাট হয় কেউ জানে না।

কিংবা, “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি “, লিখেছিলেন যে অজ্ঞাত কবি, তাঁর কত কবিতা বা বই আছে কেউ প্রশ্ন করিনা, তিনি একটি কবিতায় অমর ও সেটি প্রায় কম বেশি ৯০ বছর পরে লতা মুঙ্গেস্কর গেয়ে গানটিকে বিশ্বখ্যাত করেন।

এগুলি আমাদের অনেক কিছু শেখায়। আমরা যেন আশাহত না হই।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর “কেউ কথা রাখেনি” কবিতাটি নাকি এইভাবে লেখা হয়। এক লিটিল ম্যাগের সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর ফ্ল্যাটে এসে কবিতা চাইলে উনি সম্পাদককে বলেন,” আপনি বসুন, ঘরের ভিতর থেকে আসছি।”

সেটাই সেই কবিতা, “কেউ কথা রাখেনি”।

কবি নজরুল ইসলাম, ১৯১৭-১৮ সালে সংঘটিত হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে কখোনো বা কমুনিষ্ট বন্ধুদের সাথে কাটাতেন। মৌলালিতে একটি ঘরে কমুনিষ্ট পার্টি কর্মী বন্ধু মুজাফ্ফর আহমেদের কাছে থাকতেন অনেক সময়। তখন তিনি সাড়ে একুশ বছর হবেন। সকালে রোদে ছাদে উঠে লিখলেন “বিদ্রোহী” কবিতা। সেটাই তাঁকে কবিতায় প্রতিষ্ঠা দিল। ও এই কবিতার আবৃত্তি তাঁর বড় ছেলে কাজী সব্যসাচীকে বিশ্বের সেরা আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিল। মনে হয় এই কবিতা আবৃত্তি করার জন্য কাজী সব্যসাচী জন্মেছিলেন। এবং তারপর থেকে আবৃত্তি হল পেশা হিসেবে একটি উৎকৃষ্ট শিল্পকাজ, সমস্ত আবৃত্তি শিল্পীদের কাছে। ভাবা যায়! পৃথিবীর একটি সেরা public poetry এইভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, তাও আবার নজরুল ইসলামের সদ্য যৌবনে প্রবেশের কালে লেখা।

এগুলো বলেছি কোনটা আমাদের সময়ে হোলেও বিদেশে হয়েছিল, আবার অনেকগুলি এদেশের হোলেও আমাদের অনেক আগের সময়ে।

এবার আমাদের সময়ে একটি উদাহারণ দিচ্ছি। আমি আগের সময়ের ধারক, বর্তমানের বাহক। তবেই আমি পূর্ণ সমালোচক।

[ ৫ ]
এই সময়ের একটি উদাহারণ দিই।

২০২১ সালের মাঝামাঝি কবি ওয়াহিদা খাতুন ZODIAK MUZIK HOUSE এর গীতিকার নেবার অডিশনে পরীক্ষা দেন। সারা বাংলা থেকে প্রায় ২৫০ (দুই শত পঞ্চাশ) জন এই পরীক্ষায় যোগদান করেন ও মাত্র ১৫ ( পনের) জন পাস করেন। এগুলি আমরা তাঁর কবিতার সাথে প্রকাশিত সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি থেকে জেনেছি।

কিন্তু, এই সময় একটি কাহিনী আছে। ওয়াহিদা একটি উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষিকা হওয়ায়, তিনি স্কুল থেকে খুব পরিশ্রান্ত হয়ে বাড়িতে এসে মুখ হাত ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তার পর সন্ধ্যেবেলা রান্না করছেন ও রান্না করতে-করতে মাঝে-মাঝে বিছানায় শুয়ে লিখছেন, আবার উঠে কড়ায় রান্নাটা খুন্তি দিয়ে নাড়ছেন। আবার এসে শুয়ে লিখছেন।

এইভাবে যে গানটি লেখেন, সেটাই এই সময়ের একটি বিখ্যাত স্বাধীনতা মর্মী সঙ্গীত হয়ে উঠেছে।

“কেন কাঁদো মা গো আমার” ( keno kando maa go “) । কন্ঠে অয়ন্তিকা চক্রবর্তী। লেখনি, সুর, গায়কি ও সভ্য মিউজিকে গানটি একটি কালজয়ী কাজের সমান বলে আমার মতো অনেকের ধারণা। সব বিপন্ন দেশের ক্ষেত্রে এটি প্রতীকী সঙ্গীতের হাওয়া যেন এই সঙ্গীত। সেই ভাবনা নিয়েই লিখেছেন এই সঙ্গীতের গীতিকার।

গানটি লিখে তিনি ঐ কোম্পানীর হোয়াটসাপ গ্রুপে দেন। সেটাই কোম্পানীর মালিকের ভালোলাগে এবং রেকর্ডিং হয়। তখন ওয়াহিদা সবেমাত্র অডিশনে পাস করেছেন। পরীক্ষাটি সবার ক্ষেত্রেই তিনটি ধাপে হয়েছিল।

এবার এই গানটি কোম্পানীর মালিক তখন আর-কে-পালকে দিয়ে সুর করিয়ে রেকর্ড করান। হ্যাঁ গাইলেন অয়ন্তিকা চক্রবর্তী, আগেই বলেছি। অয়ন্তিকাও যেন এই সঙ্গীত গাইবার জন্য জন্মেছিলেন। আসলে এক একটা কাজের সফলতা আসে এক একটা ভালো সমন্বয়ের উপরে দাঁড়িয়ে, সেটাও অজান্তে হয় কি? কারণ, সেই সমন্বয় কিভাবে যেন হয়ে ওঠে, অজান্তে।

বেরুলো ১৫ আগষ্ট এর উদ্দেশ্যে। প্রকাশ ২০২১ সালে। ইউটুবে দেড় হাজার পেরিয়ে যায়। ফেসবুকে প্রায় কুড়ি হাজার কাছাকাছি সম্ভবত ছিল। এই যুগে একটি আধুনিক দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের এই জনপ্রিয়তা অবস্যই দীর্ঘ দিগন্ত অতিক্রম করে। তাও আবার পাশ্চিমবঙ্গ থেকে বেরিয়েছে। এবং সেটা এগিয়ে চলেছে। এক গীতিকারের প্রথম রেকর্ডিং কাজ।

এই গানের সফলতায় কোম্পানীর খুব দায়বদ্ধ গীতিকার হলেন ওয়াহিদা। নিয়মিত ঐ কোম্পানী সহ নানা সঙ্গীত সংস্থা ও নানা গায়ককে গান লিখে দিতে থাকেন। যদিওবা সেই সফলতায় আত্মতৃপ্তি না নিয়ে দিন রাত মিলে প্রাক্টিশ করতে থাকেন তিনি। পরপর আরো সফলতার দিকে। ২০২৩ সালে “ভয়” পূর্ণ দৈর্ঘের সিনেমা দুটি গান বেরোয় তাঁর। মুক্তি পায় এপ্রিলে। এখান থেকেই সিনেমায় গান লেখা শুরু।যদিওবা একে-একে ভিন্ন ধারার সঙ্গীত রচনায় ওয়াহিদা একজন খুব পরিচিত গীতিকার হয়ে উঠেছেন।

কিংবা, সুন্দরবনের উপরে লেখা এই ওয়াহিদা খাতুনের “বাদাবনের কান্না” কবিতাটি ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে ঘটনাক্রমে খুঁজে পেয়েছিলেন ওয়াহিদার অপরিচিত আবৃত্তিকার ফিয়োনা পারভিন। সেটি অনেক অভ্যেস করেন দায়িত্বশীল অবৃত্তিকার হিসেবে। তাঁর “Phiona Parvin” ইউটুব চ্যানেলে এটি প্রকাশ করেন, কপিরাইটের নিয়ম মেনেই। এটি শিক্ষামূলক ইউটুব চ্যানেল।

এটি প্রকাশ পাবার পরে, অনেক মাস পরে, এটি পাই ইউটুব চ্যানেলে। চমকে উঠি। এই কবিতার আবৃত্তি করার জন্য যেন ফিয়োনা জন্মেছিলেন। একজন স্কুল ছাত্রীর কী range! সব চেয়ে বড় কথা সুন্দরবন নিয়ে অসম্ভব সুন্দর কবিতা আছে নানা কবির। আমার তো অনেক কবিতা আছে সুন্দরবন নিয়ে ইংরেজি ও বাংলাভাষায়। কিন্তু, “বাদাবনের কান্না” কবিতার মেরুদন্ড অন্যরকম। চিত্রকল্প দিয়ে, কত রকম ধারার ছন্দ দিয়ে কত কবি দুরন্ত কবিতা ছড়া লিখেছেন। সেগুলির তুলনা নেই। কিন্তু, চিত্রকল্প না দিয়েও এই কবিতার ভিতর যে দূরুহতা আনা হয়েছে, সেটার তুলনা নেই।

ফিয়োনার আবৃত্তি শুনে তখন আমি ঐ ইউটুবের কমেন্টস বাক্সে মতামত দিই যে এই আবৃত্তি সুন্দরবন দপ্তরে প্রদর্শিত করলে এর সঠিক মূল্যায়ন হতে পারে। এটা সেই মাপের কাজ। এটির অন্য ভবিষ্যত আছে। এইরকম কোনো কথাগুলি বলেছিলাম।

তারপর কয়েক মাস পরে ভিডিওতে জানতে পারি কবিতাটি ফিয়োনা সুন্দরবন উৎসবে ২০২৩ সালে ডিসেম্বরে একদিন আবৃত্তি করেন ঐ “সুন্দরবন উৎসব” এর মঞ্চে সুন্দরবন মন্ত্রী মাননীয় বঙ্কিম হাজরার উপস্থিতিতে। এবং তারপরে মন্ত্রী মশাই কবিতাটির কবির নামে প্রসংসা করেন লেখনির জন্য, এবং আবৃত্তি শিল্পীকেও সমভাবে। এবং পুরস্কার সম্মান তুলে দেন ফিয়োনার হাতে।

এখানে উল্লেখ করি, কবি ওয়াহিদা খাতুন কখন কবিতাটি লেখেন সেটা আলোচ্য নাও হতে পারে, আলোচ্য হল ফিয়োনা ঘটনাক্রমে কবিতাটি ইন্টারনেট পাবার জন্য এই কবিতার সঠিক মুক্তি হল এবং ফিয়োনার হল উপযুক্ত মূল্যায়ন। তাঁর মূল্যায়ন আরো কতভাবে হবে, সেটা তো অবস্যই। কিন্তু এই রাজ সম্মান দিয়ে শুরু তাঁর জয়যাত্রা।

আসুন, আমরা খোলা মনে চারপাশে দেখি। যাঁদের দেখিনি তাঁদের নিয়ে ক্লাসিক সমালোচনা করে বিদগ্ধ হই। কিন্তু, সম সময়ের সঠিক সৎ কৃতিদের নিয়ে মুক্ত কন্ঠে কথা বলতে পারিনা। কেন? অন্যের বলে যাওয়া কথাগুলিকে অন্ধ অনুকরণকারী হয়ে স্বীকার করি ও ঘুরিয়ে সেই কথাগুলি লিখে বিদগ্ধ হই, কিন্তু নিজের সময়ের কথা বলতে পারি না। চোখের আইনে একে বলে “+ Power”, মানে, কাছের জিনিস সঠিক দেখতে পাইনা। দূরের জিনিস দেখতে পাই। এই “Optical + power” এর সাহিত্য সমালোচনায় আমাদের দেশ চলছে। তাই, আমাদের সাহিত্যের হাঁটাচলা একান্তই আঞ্চলিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।

যাইহোক, ফিয়োনার কাজ নিয়ে আমার ভবিষ্যত বানী সত্য হওয়া দেখে মুগ্ধ হলাম। এই রকম প্রমাণ আরো আছে, সেগুলির উল্লেখ এখানে উচিত হবে না।

[ ৬ ]
কিংবা, কাঁচা বাদামের গান। ভুবন বাদ্যিকরকে নিয়ে যে যতই বিরূপ মতামত দিন, তাঁর সফলতাকে তো কেউ অস্বীকার করতে পারিনা। পরে তিনি তাঁর সরলতার জন্য কার কাছে কী করে বিপন্ন হলেন বা নীরব হয়েছিলেন, সেটার সাথে তাঁর সফল কাজের গৌরব কমে না নিশ্চয়। তিনি কোথাও বলেননি যে তিনি সঙ্গীতের শিক্ষক। তিনি তাঁর মতো কিছু একটা রচনা করেছিলেন, এবং সেটির ফলাফল হিসেবে তিনি পান বিশ্বজোড়া পরিচিতি। এবং এটা ভালো কাজের জন্যই। তাঁর জীবন চর্চার সততা ও জীবনকে অনুভব করার গভীরতা এই সৃষ্টি করিয়েছিল।

ফুটপাত থেকে উঠে আসা গায়িকা রানু মন্ডলের কথাও এই তালিকায় পড়ে। কিন্তু অবুঝ আচরণ তাঁকে উচ্চ পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে দেয়। তাঁকে যিনি ফেসবুকে ভাইরাল করিয়ে বিশ্ব খ্যাতি দেন, সেই মহান যুবকের প্রতি পরে রানু মন্ডলের কিছু পীড়াদায়ক মতামত তাঁর নেমে আসার জন্য দায়ী। আসলে এটা তাঁর গর্ব নয়, অজ্ঞতা। তিনি যে রকম পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছেন ও পরে ফুটপাতে জীবন কাটিয়েছেন, সেই বিচারে তাঁর ঐ রকম ভুল আচরন স্বাভাবিক। তাই, এই জন্য তাঁর প্রতি কোনো রাগ না করে আমাদের উচিত তাঁর কাজের সফলতার প্রতি নম্র হয়ে থাকা। ও সেই যুবকটির প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। তিনিও হলেন ইতিহাস। রানু মন্ডল নিজের ভুল আচরণের জন্য পুরানো পরিসরে ফিরে এলেও তাঁর সফলতা তো সফলতাই। তবে তাঁর জীবন থেকে অনেক শিক্ষা নেবার আছে। সেটা যে রকমভাবেই হোক। রানু মন্ডলকে যিনি প্রথম ভাইরাল করেন সেই ভাই বা দাদার নাম এই মুহুর্তে মনে করতে পারছিনা। এতে আমি লজ্জিত। কারণ তিনিই নায়ক। তাঁর একটি মুহুর্তের ভাবনা ও কাজ ইতিহাস গড়ে দিল। এই নিবন্ধে তিনিও সম অধিকারে গুণী। আমি তাঁর নাম ভুলে যাওয়ায় তাঁর কাছে ক্ষমা চাইছি। তবে গ্রন্থ রচনায় তাঁর নাম দেবো, আমারই রচনার পূর্ণতা দেবার জন্য। তাঁর জীবন বোধ আমাদের অনেক কিছু শেখায়।

[ ৭ ]
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের নওদার সৈয়দ শীষ মহাম্মদের কথা বলি। পিতা সৈয়দ আহাসান আলী বাঁশ ব্যাবসা করতেন।কলকাতায় বাঁশ নিয়ে যেতেন। নদীতে বাঁশের চাঙাড়ি ভাসিয়ে সেটার উপরে বসে কবিতা লিখতেন। এইভাবে পৌঁছে যেতেন কলকাতা। একই সাথে ছিলেন সমাজ সংস্কারক। গড়েছিলেন “দেশবন্ধু গ্রন্থাকার”। আমরা জানি “দেশবন্ধু” হলেন স্বদেশী আন্দোলনের চিত্তরঞ্জন দাশ। আহাসান আলী সম্পাদনা করতেন “নবারুণ” পত্রিকা স্থানীয় মানুষকে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য এবং নিজের জ্ঞান চর্চাকে সঞ্চারণশীল রাখার জন্য। বিশ্বাস করতেন ধর্মের নামে ভিন্ন ভাবনার চলাফেরা ভুল। তাঁর কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ আছে। উদ্বাস্তুদের সেবায় বিশ্বাসযোগ্যভাবে কাজ করার জন্য সরকারি আধিকারিকদের থেকে গুরুত্ব লাভ করেছিলেন। তাঁর সন্তানেরা সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক একজন সুস্থ উচ্চারিত নাগরিক। শীষমহাম্মদ তাঁদের মধ্যে একজন। পরলোকগত পিতার নামে দিয়ে চলেছেন “সৈয়দ আহাসান আলী পুরস্কার” এবং পিতার সম্পাদিত “নবারুণ” পত্রিকা সম্পাদনা করে চলেছেন। ১৯৫৮ সাল থেকে ত্রৈমাসিক “নবারুণ” পত্রিকা বেরুতো। নওদা বইমেলার ব্যাবস্থাপকদের মধ্যে একজন। ১৯৯৭ সালে পিতার মৃত্যুর পর সম্পাদনার কাজ নিজে নিয়েছেন। এ পর্যন্ত প্রকাশিত ২টি কাব্যগ্রন্থ, “জগৎ ঘর” ও “বেহালাটা বেজেই চলেছে”। তিনি ধর্ম আচরণে মুক্ত ও বিবিধ ধর্মের উৎসবে একজন ব্যাবস্থাপক।তিনি বিশ্বাস করেন জ্ঞানের মুক্ত পথ হল ধর্ম। আমি তাঁর অনুভূতি জানাচ্ছি মাত্র। “আনন্দবাজার পত্রিকা” দেখেছি, তাতে তাঁর বড় ছবি সহ তাঁর কিছু গুণের কথা ব্যাখ্যা করে লেখা আছে। এঁরা পুরো পরিবারে কেউ কবি, কেউ সম্পাদক, কেউ সমাজসেবী, কেউ শিক্ষক, কেউ নাটক, অভিনেতা, কেউ সিনেমার নায়ক। এঁরা বিশ্বাস করেন গুণের জন্য বাঁচার আনন্দ। তিনি ২০১৭ সালে শুরু করেন হোউয়াটসাপ গ্রুপ পত্রিকা “Potrika Nabarun”। অনেক কবি, অকবি, শিক্ষক, অধ্যাপক, পাঠক, এদের সবাইকে নিয়ে এই গ্রুপ পত্রিকায় সদস্য করেন। তখন এইসব কাজ কজন জানতো। আমরাও নতুন নিশানা পেলাম। আমি ছোটবেলা থেকে জ্ঞানের পথে পেশা নেবো বলে সেইভাবে চর্চা, শ্রম ও বেড়ে ওঠা। তাই অনেক আগে থেকেই আমার পেশা সাহিত্য ছিল। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে হোয়াটসাপ গ্রুপ পত্রিকা “Potrika Nabarun” আমাকে আরো দশ বছর এগিয়ে দিয়েছিল। এগুলি আমার বা তাঁর বিজ্ঞাপন নয়। এইসব মানুষদের আত্মত্যাগের সফলতা। একসাথে অনেকে একত্রে লেখা, সমালোচনা করার সুখ পেতাম “Potrika Nabarun” গ্রুপে। দিন রাত জেগে চলত এইসব কাজ। কবিদের লেখার হাত হল আরো দক্ষ। এবং দ্রুত চিন্তা করে দ্রুত লেখা ও দ্রুত সমালোচনা করার দক্ষতা জন্মালো আমাদের। এই গ্রুপ পত্রিকা থেকে আমরা আরো অনেক গ্রুপ পত্রিকা ও মুদ্রিত ও ওয়েবসাইট পত্রিকার যোগাযোগ পেলাম। আপনারা বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট দেখেন, সেই আনন্দ উল্লাস আমরা পেতে শুরু করেছিলাম ২০১৭ সাল থেকে প্রথম হোয়াটসাপ গ্রুপ পত্রিকাতে এসে। কবিরা যেমন হাত আরো পাকা ও দ্রুতগামী করলো, অকবিরাও হতে থাকলো কবি। কেউ বা পরে আলাদা করে খুললেন পত্রিকা, এবং তাতেও প্রতিষ্ঠা পেলেন দেশ ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে নানা দেশে। লেখক, সম্পাদক হবার স্বপ্ন দেখেননি যাঁরা তাঁরাও অনেকে আজ পরিচিত কবি ও দেশ বিশ্ব পরিচিত সম্পাদক, বাংলার সাথে ইংরেজি সহ। এই পত্রিকা নিয়ে বললে আরো অনেক কিছু বলা যায়।

কিন্তু, এই নিবন্ধে বিষয় ছিল, একটা মুহুর্তের কোনো সিদ্ধান্ত কত বিরাট সফলতা দিতে পারে বা পরিববর্তন আনতে পারে সমাজে সেই নিয়েই এই রচনা। এই শীষ মোহাম্মদ এর এইসব কাজ বাংলায় তথা বিশ্ব চিন্তায় অনেক শ্রীবৃদ্ধি করে চলেছে। তাই, দেখবার চোখ নিয়ে আমি দেখছি। অনেক মহানদের নিয়ে অন্যের লেখা দেখে সেটাই লিখে নিজের জ্ঞান প্রকাশ করতে চাইনা। কষ্ট পাই, আমাদের দেখার চোখ থেকেও নিজেদেরকে নিজেরা ফাঁকি দিই কেন? যাঁরা আমাদের সময়ে প্রমাণ সাপেক্ষ উন্নত চিন্তার মানুষ ও কাজের মানুষ, তাঁদেরকে এড়িয়ে গিয়ে আমরা কোন ভাবনাকে আধুনিক বলে গ্রহণ করতে পারি?

[ ৮ ]
এবার বলছি স্যার আলফ্রেড নোবেল নিয়ে। একটা কথা বলি, কবিদের মেধা নিয়ে গর্ব হবে, স্যার আলফ্রেড নোবেল ছিলেন একজন কবি। কবিতা লিখতেন নিয়মিত ছাত্রাবস্থায়। কিন্তু, পারিবারিক কারখানা চালানোর জন্য তাঁকে পিতা বিজ্ঞান পড়তে পাঠান। তারপর ঢুকলেন কারখানার কাজ ও আবিস্কারে। অনেক আবিস্কার করেছেন তিনি। কবিতায় ফিরে না এলেও কবিতার মেধা নিয়ে বিজ্ঞানী হলেন, এবং নোবেল প্রাইজ দেবার দলিল করে তিনি সারা বিশ্বে নতুন স্পন্দন নিয়ে আসেন। সারা বিশ্বকে জাগিয়ে তোলেন। এই যে বিশ্বের অসংখ্য গুণীদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ও দায়িত্ব, এটা প্রথম শুরু করেন নোবেল কমিটি। ১৯০১ সাল থেকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। প্রথমে টাকার পরিমান খুব কম ছিল। কারণ কমিটি সঞ্চিত অর্থকে সুদে খেলিয়ে বাড়িয়েছিলেন আগামিতে বেশি অর্থ দেবার জন্য। তবে, পুরস্কারের সম্মান বড়, টাকার পরিমান আলোচ্য নয়। আপনি পড়াশুনার পর সফলতার প্রমাণপত্র নেন, তার সাথে কি টাকা থাকে বা বাস্তু জমির দলিল থাকে বা গাড়ি, বাড়ি, সোনা ভর্তি বাক্স থাকে? নিশ্চয় নয়। হ্যাঁ, আলফ্রেড নোবেলের এক মুহুর্তের চিন্তা ছিল কী করে বিশ্বের কল্যান করা যাবে অতি আধুনিকতর পথে, সেটা ভাবতে গিয়ে নোবেল পুরস্কার এর প্রচলন করেন। এবং তিনি যেমন মানুষ চেনায় দক্ষ ছিলেন, তেমনি ভালো মানুষদের উপদেশ নিতেন কোনো রকম পদের ফারাক বিচার না করে। অনেক গুণ নিয়ে মানুষ বিশেষ স্থানে গিয়ে নিজের অস্তিত্বকে সম্মানীয় করে রাখে। শুধু ডিনামাইট আবিস্কার নয়, অনেক আবিস্কার করেন তিনি। ডিনামাইট আবিস্কারের আগে এই রাসায়নিকে নিজের এক ভাই শহীদ হয়। এর কারণ খুঁজতে গিয়েই ডিনামাইট আবিস্কার। এইসব কথা বলতে হচ্ছে, একটি সফলতার সাথে কত রকমের কাহিনী থাকে। বলতে রোমাঞ্চ লাগে। শুনতে রোমাঞ্চ লাগে। এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকও বটে।

[ ৯ ]
ডেনিয় বা Danish বিজ্ঞানী নীলস বোরের ( Niels Bohr) গল্প বলি। পরমানুর গঠন নিয়ে দিনরাত ভাবছেন। কোনো হদিস পাচ্ছেন না। একদিন গবেষনারত অবস্থায় পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, চেয়ারে বসেই টেবিলে মাথা রেখে। স্বপ্ন দেখেন, একটি সাপ গোল হয়ে আছে অনেকগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে, মধ্যে সাপের মাথা।

ঘুম থেকে উঠে ভাবলেন, আচ্ছা এটা নিয়ে কি কিছু করা যেতে পারে।

সেই মতন তিনি পরমানুর গঠন নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখলে এই পদ্ধতিতেই আসছে পরমানু গঠনের ছক। এবং সেটা মিলছে। সাপের মাথা হল কেন্দ্রিন। আর তার বাইরে ঘুরছে ইলেক্ট্রনগুলি, এক একটি আলাদা বলয় তৈরি করে।

সেই অজান্তে খুঁজে পাওয়া সূত্র থেকে আবিস্কার করে তিনি পেলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার ১৯২২ সালে। যখন তিনি মাত্র ৩৭ বছর।

[ ১০ ]
একই সাথে বলি, সমালোচকদের কত গুরুত্ব। পৃথিবীতে শুধু সাহিত্য নয়, সব কাজে যে পুরস্কার, উপাধী, সম্মান বা মেডেল বা টাকা দেওয়া হয়, সেগুলি বিচার করার সময় আগে সমালোচকদের সমালোচনা খতিয়ে দেখা হয়। তারপর সামগ্রিক বিচার করে কাজের মান মাপ হয়। তারপর পুরস্কার।

তাই, সমালোচকদেরকে সম্মান দেবেন প্রতিটি লেখক, নিজেদের সৃষ্টির চেয়েও বেশি। সমালোচনার বিরুদ্ধে প্রতি সমালোচনা হলে সেটা আরো উচ্চ প্রবনতা নিয়ে আসে। চিন্তার ভিন্ন মত থাকতে পারে। সবটা নিয়েই সমালোচনা।

তখনি সমালোচনা হয় পূর্ণ।

এগুলি বুঝে আমাদের সামগ্রিক ভাবনায় এগুতে হবে।

[ ১১ ]
সাম্প্রতিক কালে নিউজিল্যান্ডে নাগরিক বাঙালি রক্ত মাইকেল তরুন, অস্ট্রেলিয়ার চাকরি করতে গিয়ে এবং ঘটনাক্রমে কিছুদিন কাজ হারিয়ে থাকার সময় বিশ্বের সমস্যা দূরীকরণ নিয়ে যে সূত্র ও পথ আবিস্কার করেন সেটাই “স্থায়ী বিশ্বশান্তি সূত্র” বলে বিশ্বপরিচিত। সেই কারণে তিনি পেয়েছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এর সরকার সহ রাষ্ট্রসংঘের থেকে লিখিত সমর্থন পান। পেয়েছেন বহু সংস্থা ও ব্যাক্তির থেকে লিখিত সমর্থন। এমনকি শান্তিতে নোবেলজয়ী HIS HOLINESS দলাই লামার থেকেও এসেছে আশির্বাদ ও এই কাজকে ছড়িয়ে দেবার নির্দেশ। কলকাতার মাননীয় মেয়র সাহেবও দিয়েছেন সমর্থন। বিষয়টি বিশ্ব শান্তির জন্য ও নিয়ত হাওয়ায় উড়ছে, তাই এটা নিয়ে সব জানতে ইউটুব খুলুন “Art Mother Earth Foundation”. পরপর সব দেখুন, বুঝুন, অনুভব করুন। একটা মুক্তির স্বাদ পাবেন।

কেউ কারোর সাথে তুলনীয় নয়। প্রত্যেকের কাজের ধারা ও অস্তিত্ব আলাদা। মুক্ত ভাবনায় এটা গ্রহণ করতে হবে।

কিংবা, এক্সরে রশ্মির আবিস্কার এই রকম। বিজ্ঞানী রোয়েন্টজেনের এই আবিস্কারের কাহিনী সবাই জানি। হঠাৎ আবিস্কার। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার দেবার প্রথম বছরে তিনি পদার্থবিদ্যায় এই জন্য নোবেল পুরস্কার পান।

কেতলির ফুটন্ত জলের প্রতিক্রিয়া দেখে আবিস্কার হল স্টিম ইঞ্জিন। আবিস্কারক জেমস ওয়াট।

মহৎ মন নিয়ে নিজেকে সমর্পণ করলে কখন কী পাওয়া যায় কেউ জানে না।

[ ১২ ]
“বন্দেমাতরম” সঙ্গীত এইরকম এক ঘটনা। “বঙ্গদর্শন” পত্রিকায় একটি গদ্যের শেষ পৃষ্ঠায় বড় অংশ ফাঁক ছিল। সেটা পুরনের জন্য প্রুফ রিডার পন্ডিত মশাই বঙ্কিম বাবুকে একটি কবিতা লিখে সেই ফাঁক পুরন করতে বলেন। বঙ্কিম বাবু কয়েক দিন পরে একটা কবিতা লিখে নিয়ে গিয়ে প্রুফ রিডারের হাতে দিয়ে বলেন, “কেমন হয়েছে। হবে কি?”

প্রুফ রিডার বলেন, ” মন্দ হয়নি।”

বঙ্কিম বাবু, দ্রুত কিছু আন্দাজ করে বলেন, “মন্দ হয়েছে কী কেমন হয়েছে, সেটা বলতে হবে না, তবে এই লেখা যেদিন কাজে লাগবে সেদিন আমি পৃথিবীতে থাকবো না।”

উহ, চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসছে, তাই না? কী অনুভূতি, কী হিসেব, কী আত্মবিশ্বাস, সেই সব মানুষদের।

আসুন চোখের জল মুছে চোখ রাখি আরেক দিকে। না, সেদিকে যাবার আগে আমাদের রবিঠাকুর নিয়ে কিছু না বললে কি মন শান্তি পায়।

[ ১৩ ]
ভারতে রাজা পঞ্চম জর্জের আগমনকে সম্মানীত করতে রবিঠাকুরকে দিয়ে লেখানো হয় একটি গীতিকবিতা। সেটি ৩০ পংক্তির। কবি নিজে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। সেটাই পরে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহীত হয়। চিন্তা করুন কোন কাজের জন্য কী লেখা হলো, এবং সেটার সুদূর ফলাফল কোথায় গিয়ে ঠেকলো। একটু স্থির হয়ে ভাবুন, মাথা ঝাঁকানি দেবে।

[ ১৪ ]
জার্মানীর সাহিত্যিক, পেইন্টার, নাট্যকার, ভাস্কর, গ্রাফিক ডিজাইনার গ্রুন্টারগ্রাস, বারুইপুরে ছিলেন স্বামী স্ত্রী। বিখ্যাত একটি সংবাদপত্রে বেরুলো — বিদেশে যারা নাম পায় না তারা ভারতে এসে চমক দিয়ে প্রতিষ্ঠা চায়।

এই রকম কঠোর ভাষায় ছিল তাঁকে নিয়ে সমালোচনা।

আসলে তিনি লুঙ্গি পরে শিয়ালদায় যেতেন। নানা জনের সাথে আড্ডা দিয়ে গভীর রাত্রে সব্জী ব্যাবসায়ীদের কারোর ফাঁকা ঝুড়িতে কুঁজে বসে শুয়ে বারুইপুর ফিরতেন। এইভাবে নানাভাবে ভারতীয়দের সাথে মিশে তিনি অনেক কিছু বুঝে একদিন কাগজে একটি শামুকের ছবি এঁকে বারুইপুরে একটি পানের দোকানের দোকানদারকে দেখিয়ে বলেন — ভারতের উন্নতি এই শামুকের গতির মত।

সত্যি, এই বুঝবার ক্ষমতাই বুঝিয়ে দেয় তিনি নোবেল পাবার যোগ্য।

এর পর ১৯৯৯ সালে পেলেন সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ।

এখানে একটা কথা বলি, গুন্টার গ্রাস অনেক আগে নাকি নোবেল পেতেন। কিন্তু জার্মানীর এক বিখ্যাত সমালোচকের সাথে তাঁর মনোমালিন্য হয়। এবং সেই সমালোচকের সাথে সেই সময়কালীন কয়েক বছর পদে থাকা নোবেল কমিটির সভাপতির সাথে পরিচয় ছিল। অবস্যই সেই সভাপতি সাহিত্য বিভাগের ছিলেন, আলাদা করে বলার কারণ নেই।

তাঁদের দুজনের বন্ধুত্ব ছিল। এবং তাই সেই সমালোচকের ক্ষোভের কারণে তাঁর ইঙ্গিতে নোবেল কমিটির সভাপতি গুন্টার গ্রাসকে নোবেল দেননি। এই কারণে অনেক বছর পরে গুন্টার গ্রাস নোবেল পান।

বোঝাতে চাইছি, সমালোচকদের গুরুত্ব ও ক্ষমতা কতটা সুদূরপ্রসারী।

[ ১৫ ]
এবার আসি আর একটি বিষয়ে, সেটিও অজান্তে ভারত তথা বিশ্ব আন্দোলন, এবং দেশ ও পৃথিবীকে সতেজ করা ও জ্ঞানের উত্তোরণে জীবন বিকাশের পথ বা আরেক আবিস্কার।

আমরা জানি, নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে অনৈনিকভাবে যুদ্ধে হারিয়ে রবার্ট ক্লাইভ ভারতে প্রথম ইংরেজদের উপনিবেশ গড়ে তোলে। ১৭৫৭ সালে ২৩শে জুন সেই পলাসীর যুদ্ধে এই ফলাফল হয়। তারপর বাংলার নবাব হন ইংরেজদের অধীনে মিরজাফর। পরে তাঁর জামাই মিরকাশিম। এবং মিরকাশিম বাংলার নবাব থাকা কালীন হয় বক্সার যুদ্ধ। ভারত সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম, অযোধ্যার নবার সুজাউদ্দৌলা ও বাংলার নবাব মিরকাশিম, এই ত্রয়ী শক্তি মিলে ২২ অক্টোবর ১৭৬৪ সালে বক্সারে হয় যুদ্ধ। আমরা জিতে যাচ্ছিলাম। সেখানেও বিশ্বাসঘাতক দ্বারা হেরে গেলেন। সেখানে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মুনরো। আগে রবার্ট ক্লাইভের অধীনে বাংলা দখল করে ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। তখন বাংলা মানে ছিল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ সহ পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উড়িষ্যা। কত বড় রাজ্যের নবাব ছিলেন সিরাজ।

নবাব সিরাজকে হারিয়ে দিয়ে ইংরেজরা ভারতে থাকার অধিকার লাভ করে। তারপর সেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বাকি ভারত দখল করে বক্সার যুদ্ধে। তারপর ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হয়। যদিওবা অখন্ড ভারতের স্বাধীন প্রধানমন্ত্রী হন নেতাজী সুভাষ বোস। ১৯৪২ সালে ২১শে অক্টোবর আজাদ হিন্দ ফৌজের দ্বারা স্বাধীনতা ঘোষনা। এবং সরকারি নিয়মে বিভিন্ন বিভাগীয় মন্ত্রীত্ব দেওয়া হয় অনেকেই। ছয়টি দেশ সমর্থন দিয়েছিল এই নতুন ভারত সরকারকে। এবার সেটা পেরিয়ে এলে ভারত খন্ড হয়ে স্বাধীনতা পায় ১৯৪৭ সালে। তাহলে স্বাধীনতা পাবার আগে পরাধীন হয়েছিল পলাসীর যুদ্ধ থেকে। তাহলে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সব গুণী, বিপ্লবী ও শহীদদের তালিকায় প্রথম নাম শাসক হিসেবে নবাব সিরাজ, এবং ক্যাপ্টেন ও যোদ্ধা হিসেবে মিরমদন সহ কয়েকজন ক্যাপ্টেন ও কিছু সৈনিক। তাহলে তাঁদের ইতিহাসকে আড়াল করে কিকরে আমরা স্বাধীনতার ইতিহাসকে সম্মান দিতে পারি? এবং তাহলে কিকরে অন্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্মান দিতে পারি? সেই কারণকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদে “হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলন”, “খোসবাগ যত্ন করার দাবী”, “নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ”। এসব নিয়ে ব্যাখ্যা এখানে না করলেও হবে, ইউটুব চ্যানেলগুলিতে ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমগুলি সব মুদ্রন মাধ্যমগুলি নিয়মিত কাজ করছেন এই বিপ্লবকে সহায়তা করার জন্য। বাংলাদেশ থেকে আসছেন অনেক গুণী মানুষ, অনেক পেশার মানুষ। আসছেন অনেক সাংবাদিক। তাছাড়া বিশ্বের নানা দেশের চিন্তনশীল মানুষেরা আসছেন, এই বিপ্লবের দ্বারা নবাব সিরাজের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে কী কী কাজ হচ্ছে ও কত রকমের জ্ঞান ও চিন্তা প্রকাশিত হচ্ছে।

এই যে বললাম, সমর্পিতা দত্ত। ইনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, যাদবপুর থেকে স্নাতকোত্তর তুলনামূলক সাহিত্যে, তারপর পর্দায় অভিনেত্রীর পেশার সাথে “কলকাতা দূরদর্শন” এর একজন সংবাদ ঘোষিকা হন। এবং নৃত্য, সঙ্গীত সহ নানা বিদ্যায় আলাদা পড়াশুনা করে পারদর্শিতা লাভ করেন। ছোটবেলা থেকে নবাব সিরাজের গল্প শুনলে তার মনে হতো সে নবাবের খুব ঘনিষ্ঠা। তারপর সেটা আবছা হতে থাকে কাজের ব্যাস্ততায়। ২০১৬ সালে মেয়েটি মুর্শিদাবাদে আসে স্যুটিং করতে। এখানে এসেই সে বিবর্ণ হয়ে থাকা নবাব সিরাজের ইতিহাসের প্রতি নিজের অনুভবে দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। পরপর নিয়মিত আসতে থাকে। গবেষনা করতে শুরু করে এই ইতিহাস নিয়ে এবং অসম্ভব রকমের যুক্তিতে প্রমাণ করতে থাকে নবাব সিরাজকে নিয়ে সাজানো অনেক মিথ্যাগুলি।

প্রত্নতত্ব দপ্তরে গিয়ে নিজের বহুমুখি যোগ্যতা ও ইচ্ছে নিয়ে আবেদন করে। মঞ্জুর হয় আবেদন। এরপর সে কলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদে নিয়মিত আসা যাওয়া করতে থাকে। সে প্রমাণ করে ভাগীরথী নদীর পূর্বে অবস্থিত “হাজার দুয়ারি” নবাব সিরাজের প্রাসাদ নয়। এই প্রসাদ আছে ভাগীরথীর পশ্চিমে। ভাগীরথীর পশিমে খোসবাগ ও হীরাঝিল। খোসবাগে নবাব সহ আত্মিয়দের কবর। এই পশিমে কিছু দূরে আছে মন্সুরগঞ্জ। এখানে ছিল নবাব সিরাজের প্রাসাদ। কিছু দূরে ছিল হীরাঝিল নামের একটি ঝিল। তাই সে এই জায়গার নাম দেয় “হীরাঝিল”। যদিওবা সেই ঝিল আজকে নদীতে মিশেছে। নবাব প্রাসাদের স্মৃতি বিজড়িত “হীরাঝিল” স্থানে প্রাসাদ নদীতে চলে গেছে। কিছু ইট, ভাঙা দেওয়াল ডাঙায় আছে।অনেক বছর আগে এইসব অপব্যাবহার করা জায়গা নানা ঘটনার মাধ্যমে সরকার পদবীর লোকেদের অধিকারে আসে। তারমধ্যে অনেকটা এলাকা ছিল উজ্জ্বল সরকারের নামে, ভাই নিখিল সরকার ও তাঁদের মায়ের নামে।

এই পর্যন্ত জানার পর এবার ফিরে যাবো সমর্পিতার কাছে। এবার ওকে আপনি বলছি। উনি নবাবের কবরে স্নান করানো ও ফুল দিয়ে সাজাতেন। এখানে একটি স্কুল করেন “নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুক্ত বিদ্যালয় খোসবাগ”, সব বয়সের জন্য মুক্ত চিন্তার প্রসারে বহু রকম পড়াশুনো নিয়ে এই শিক্ষাধারা।

এইসব কাহিনী ঘটনাক্রমে কানে আসে, সাংবাদিক মানস সিনহার কানে। ২০২০ সাল থেকে সমর্পিতাকে অনুরোধ করে আসছিলেন একটি সাক্ষাতকারের জন্য। সমর্পিতা রাজি ছিলেন না এই কারণে যে, নবাব সিরাজকে নিয়ে তাঁর ইচ্ছে ও কাজগুলি নিভৃতের সুখ। তাছাড়া এগুলি সংবাদ করেই বা কী হবে? পরে চিন্তা করা যাবে।

কিন্তু, মানস সিনহা সমর্পিতার নিঃসঙ্কোচ সরল মতামতের প্রতি দায়িত্ব রেখেই সমর্পিতাকে বুঝালেন যে সব ভালো কাজের প্রকাশ ও প্রচার দরকার। তাহলে সেই কাজের পরের স্তর নিয়ে ভাবনার সুবিধে হয়।

এরপর এক সময় তাঁরা ২০২১ সালে প্রথমের দিকে একটি সাক্ষাতকার বের করেন “Manas Bangla” ইউটুব চ্যানেলে।

এঁদের তখন ধারণা ছিল এই সাক্ষাতকার স্বাভাবিক নিয়মে অনেকে দেখতে পারে। তবে কাজটা ভালো। তাই এই সাক্ষাতকার প্রকাশ। সেটার link ছিল “লুৎফুন্নিসার কি পুনর্জন্ম হয়েছিল / Was Lutfunnisa re-born?”.

সেটি তাঁদের চমকে দিয়ে চার মাসের মধ্যে হল দশ লাখ বা এক মিলিয়ন ভিউয়ার। এবং ২০২৪ এর ফেব্রুয়ারী অবধি প্রায় তিরিশ লাখ বা তিন মিলিয়ন।

শুরু হল জন জাগরণ। পাশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, একসাথে সারা ভারত ও বাইরে নানা দেশ থেকে প্রচুর মানুষ আগ্রহী হল। পরপর অনেক ইউটুব চ্যানেল ও মুদ্রিত পত্রিকা আসতে থাকে। ২০২১ সালে ৫ ডিসেম্বর হয় দুচাকা ও তিন চাকায় ভরে আসা মানুষদের উপস্থিতিতে “হীরাঝিল বাঁচাও আন্দোলন” হয়। তাতে সমর্পিতার তৈরি শ্লোগানে জেগে ওঠে চারদিক।

ইতিহাসে গরমিল,
জেগে ওঠো হীরাঝিল।

বাংলাদেশ থেকে প্রথম এসে এই বিপ্লব নিয়ে কাজ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর সালাহুদ্দিন সুমন। তাঁর “Salahuddin Sumon” চ্যানেলে অনেক কাজ করেন তিনি। পরপর আসতে থাকেন বাংলাদেশ থেকে অনেক সাংবাদিক ও চ্যানেল।

এখানে একটা কথা বলি, বিভিন্ন সাংবাদিক নিজের মত গবেষনা করে নতুন ধারার চিন্তায় সংবাদ করেন, ও নানা বিষয়ের নানা বিষয় আবিস্কার করেন। এই আন্দোলনে সহায়তা করে “হীরাঝিল বাচাঁও কমিটি”। গড়ে ওঠে “নবাব সিরাজুদ্দৌলা স্মৃতি সুরক্ষা ট্রাস্ট”। এদের নিজস্ব দিবস হিসেবে পালন করেন প্রতি ২৩ জুন পলাসী যুদ্ধ দিবস। ৩রা জুলাই নবাবের মৃত্যু দিন। এগুলি চলে আসছে ২০২২ সাল থেকে। এবং বছরের অন্য একটি দিন “হীরাঝিল উৎসব”। এই দিনে দেওয়া হয় আন্তর্জাতিক “সবুজ সেনা সম্মান”। ভারত ও ভারতের বাইরের দেশের গুণীদের দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন নবাব সিরাজের নবম বংশধর সৈয়দা মেহমুদা, তনভীর এবং মুর্শিদাবাদের প্রাসাদ থেকে নবাব মিরজাফরের বংশধর তথা ভারত সরকার দ্বারা “Nawab Of Murshidabad” এর পরিবারের ছোটে নবাব রেজা আলী মির্জা।

এই দুই রাজ পরিবার থেকেও স্বীকৃত হল এই আন্দোলন। ডাহাপাড়া অঞ্চল, বিডিও, এম-এল-এ, এম-পি, মহকুমাশাসক, জেলাশাসক, প্রত্নতত্ব বিভাগের জেলা দপ্তর ও ভারতীয় দপ্তর, মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী, মাননীয় রাজ্যপাল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, সকলকে পত্র দিয়ে জানিয়ে এই আন্দোলন চলছে। ইতিহাস চিন্তার দ্বারা মানুষের সামগ্রিক মেধার বিকাশ ও ধৈর্য বাড়ে। চিন্তার সুক্ষ্মতা বাড়ে। এইগুলি মানবজাতীকে সুস্থ করবে। একই সাথে নবাব সিরাজ এমন এক নাম যাঁর পিছন থেকে মধ্যযুগ ও প্রাচীন যুগ। সামনে থেকে আধুনিক যুগ। এঁদের আছে ওয়েবসাইট “www.sirajsmriti.in”, বাংলায় ফেসবুক “হীরাঝিল বাঁচাও”, পত্রিকা “হীরাঝিল বাঁচাও,”। ইংরেজি ফেসবুক “Nawab Sirajuddaulah Smriti Sirakha Trust.”

এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও বিপ্লবে রয়েছে নিজস্ব theme songs. এঁদেরই নিজস্ব সৃষ্টি।

এবার এই সময় একটা কথা বলি, নবাবের প্রাসাদের এলাকার দখলে থাকা বিরাট অংশ দলিল করে দান করেছেন উজ্জ্বল সরকারের পরিবার। সেখানে গড়ে ওঠে “সিরাজ উদ্যান”। নবাবের উপরে গবেষনা করতে আসছেন অনেকে। “Barasat Academy of Culture” প্রথম কোনো সংস্থা হিসেবে যুগ্মভাবে এই বিপ্লবের কাজে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন। গরমে খোসবাগে রাস্তায় বসে জলসত্র। স্প্যানিশ দেশের মতো গুছিয়ে সুন্দর করে হয় জলসত্র। বেঞ্চিতে বড়-বড় কলসিতে লাল কাপড় জড়িয়ে জল রাখা হয়। সমস্ত এলাকায় লাখ-লাখ মানুষ এই বিষয়ে খুব আগ্রহী। এবং অনেকে সক্রিয়ভাবে কাজে ও অন্য নানাভাবে সহায়তা করছেন। নবাবের নামে সব বয়সের আন্তর্জাতিক স্কুল চলে দাওয়ায়, পথেঘাটে। তাতেই সবাই আগ্রহী। স্কুলবাড়ি তৈরির জন্য জায়গার সন্ধান চলছে। এ এমন অবস্থান, মনে হবে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার জ্ঞানীদের ধারা বা ইউরোপের কোনো নিয়মানুবর্তী এলাকা। নবাবের নামের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বলে “নাইট”, ইংরেজির বানান “Knight”. এর মানে চিন্তাশীল সাহসী সৈনিক। অনেক ছাত্রছাত্রী। প্রত্নতত্ব বিভাগের এক অফিসার জানিয়েছেন যে তিনি অবসর নেবার পর এই স্কুলে পড়াতে আসবেন।

এই স্কুলে সবাইকে নিয়ে সামগ্রিক ভাবনা ও বহুগুণের পথে এগিয়ে যাওয়া হয়। এখানে শিশুরাও সামগ্রিক দিকে উন্নত, চিন্তা ও আচরণে পরিপূর্ণ। এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাত্রী ও প্রধানা সমর্পিতা দত্ত। আগে বলেছি ইনার গুণগুলি। সেই গুণগুলির সাথে তিনি কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়িকা।

সরকার থেকে বিভিন্ন অফিসারদের পাঠানো হয় এখানে কেমন কাজ হচ্ছে সেগুলি দেখার জন্য। আমি এত কথা বললাম, এগুলি খুব সংক্ষেপে। বিস্তার জানতে নানা চ্যানেলের ইউটুব খুলুন। ভারতের ইতিহাস পেল নতুন স্বাদ। বিশ্ব ইতিহাসের অধিকার পেল বা পাচ্ছে সঠিক সম্মান। কত স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী আসছে।

এই সবের পিছনে কী আছে বলুন তো। সঠিক সিদ্ধান্ত।

(১) সমর্পিতার আসা ও চুপচাপ কাজ। এটি একক সিদ্ধান্তে ছিল খাঁটি। ২০১৬ সালে স্যুটিং করতে এসে গোপনে নবাব সিরাজের কবরকে যত্ন করার ভাবনা তাঁকে কত মুগ্ধকর পরিস্থিতিতে এনে দিল।

(২) সাংবাদিক মানস সিনহার দ্বারা সেই সাক্ষাতকার। যুগ্ম সিদ্ধান্তে ছিল খাঁটি। সেই এক মুহুর্তের সিদ্ধান্ত, সমন্বয় এই কাজকে কত সুদূরপ্রসারী করলো।

(৩) হীরাঝিল বাঁচাও কমিটির সহায়তা ও সেই অনুভবে অসংখ্য জনগনের সমর্থন। সমন্বয় হবার সিদ্ধান্তে ছিল খাঁটি। এবং একসাথে হয়েছিলেন সঠিক চিন্তার নাগরিকগন। যাঁদের ভিতর কাজ করেছিল বহু দূর দেখার দৃষ্টি।

(৪) নবাব সিরাজের বংশধর ও নবাব মিরজাফরের বংশধরদের সমর্থন। এই দুই রাজ পরিবারের মনে চরিত্রে ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার মানসিকতা।

(৫) বিভিন্ন সাংবাদিক, আইনবিদ, ব্যাবসায়ী, সমাজসেবী, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, গবেষকদের নানাবিধ সহায়তা। এদের ভিতর ছিল মুক্ত জ্ঞান ও মুক্ত হৃদয়ের উজ্জলতা।

আমি বলতে চেয়েছি অজান্তে হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত ও কাজ, সেটা আন্তরিকতায় সৎ হলে ও সেই মানুষগুলোর ভিতরের মনুষ্য নিয়ম ঠিক থাকলে সেই কাজের সফলতা কতভাবে কত দিকে ছড়িয়ে পড়ে, এটাও একটা প্রমাণ।

এখানে একটা কথা বলি, বাইরের কোনো পত্রিকা হিসেবে নবাব সিরাজের ইতিহাস রক্ষার আন্দোলন নিয়ে প্রথম রচনা গুচ্ছ বের করে মুর্শিদাবাদের “উর্বরমন” পত্রিকা, এবং সেটা প্রকাশিত হয় উপযুক্তভাবে। অনেক লেখা ও ছবি নিয়ে এই সংস্করণ। সম্পাদক রেজাউল করিম। তাঁর পাশে ছিলেন কিছু সঠিক সহ কর্মী। এই পত্রিকা বেরিয়েছে মুর্শিদাবাদের ডোমকল থেকে। তিনি ২৩ জুন ২০২৩ সালে, পলাসী যুদ্ধ দিবসে হীরাঝিলে আসেন হীরাঝিল নিয়ে প্রকাশিত এক ব্যাগ পত্রিকা সংস্করণ সাথে। এই কাজ প্রথম তিনি করলেন। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অজান্তে নবাব সিরাজ কেন্দ্রিক ইতিহাসে জায়গা করে দিল। এটা খ্যাতির বিজ্ঞাপন নয়। এটি হল সুস্থ চিন্তা নিয়ে জ্ঞান চর্চার সফলতা। তা বলে যাঁরা এটা করেননি তাঁরা সাধারণ সম্পাদক নন। তাঁরাও কোনো না কোনো দিকে দিগন্ত উন্মোচন করেছেন নানা বিষয়ে, দেশে বিশ্বে। আমি এখানে একটা প্রকরণের বিষয়ে আলোচনা করছি মাত্র। এই রেজাউল করিম এই ইতিহাসের উপরে আরো নানা সংস্করণ বের করার উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রকাশনায় সহায়তা সাংবাদিক বদরুদ্দোজা।

[ ১৬ ]
কিংবা, বিশ্বের সব চেয়ে বড় কবিতা সংকলন সম্পাদনা করছেন শ্রী প্রবীর কুমার বিশ্বাস। তেমন লক্ষ্য নিয়েই কাজে নেমেছেন। দুই হাজার পাঁচ কবি নিয়ে ২০৩২ পৃষ্ঠার কবিতা সংকলন। সেই সিদ্ধান্তেই কাজ চলছে। কলিকাতার একটি দায়িত্বশীল প্রকাশনী থেকে বেরুচ্ছে। বড় আয়তনের মহাকাব্যের মত দৈর্ঘ ও প্রস্থ, উচ্চতা দ্বিগুণ। সারা বিশ্ব থেকে বাংলা কবিতার কাজ সঞ্চয় করার চেষ্টা করছেন এই আয়তনে যতটা সম্ভব। তিনি ও তাঁর সহযোগীদের এক মুহুর্তের চিন্তা কত বড় কাজে সফলতা দিতে চলেছে। এটি উদ্বোধন করবেন, মানে সেইভাবে আমন্ত্রিত ও সম্মত মাননীয় রাজ্যপাল, আসছেন শিক্ষামন্ত্রী সহ দেশ বিশ্বের আরো অনেক গুণী। আমন্ত্রিত। জানা গেল বাংলাদেশের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর উচ্ছসিত মতামত জানাবেন। গিনেস রেকর্ড এর জন্য এটি কাজ চলছে শুধু নয়, কবিতা জিনিসটার বিশ্ব গৌরব ও বাংলা কবিতার বিশ্ব মর্যাদার দায়িত্ব পালন করতে এই মহাগ্রন্থ বেরুচ্ছে।

কেউ বলবেন, এই কাজ তো বাস্তবে সফলতা পায়নি। পাবে। যদি কোনো কারণে সেটা প্রকাশ না পায়?

সেই উত্তরে বলি, সফলতা দুই রকম, চিন্তার সফলতা, কাজের সফলতা।

চিন্তায় উনি সফল, তাই বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার-হাজার কবি তাঁদের জীবনী ও লেখা পাঠাচ্ছেন। যেগুলি নির্বাচিত হচ্ছে সেগুলো সাজানো হচ্ছে। এবং এই নিয়ে দুইটি হোয়াটসাপ গ্রুপ করা হয়েছে। প্রায় দুই হাজার কবি নিয়ে দুটি গ্রুপ। সেখানে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে অনেক কবি, এর বাইরেও অন্য অনেক দেশ থেকে আসছে বাংলা কবিতা। এত জনের প্রত্যক্ষ্যতায় তাঁর কাজ সত্য এবং চলমান। তাই এই আমার বানানো গল্প নয়। এরপর বাস্তবে প্রকাশিত হলে সেটা পরের সফলতা। কেউ বলবেন, কল্পনা করা হোক, কোনো কারণে বেরুলো না এই মহাগ্রন্থ। তখন?

তাতেও তাঁর নাম ইতিহাস হয়ে থাকবে, তাঁর এই প্রচেষ্টার জন্য।

বুঝলে তো। বিচার শব্দটা খুব জটিল সত্য। তাছাড়া, সফল হবার জন্যই বড় কাজ। সেই ধরণের মানুষদের নিয়েই এর সংযোগ ও সমন্বয়।

[ ১৭ ]
এবার একটু ফিরে যাই একটু আগে নবাব সিরাজ নিয়ে বলছিলাম।তবে সেটার মাঝে আরো অনেক কথা বলেছি, কারণ নবাব সিরাজ ছিলেন শিল্প সংস্কৃতি নিয়ে প্রাণবন্ত মানুষ। চিত্রশিল্পীদের বলতেন,”শিল্প করতে হলে মুক্ত হতে হবে। ভয় বা লজ্জা না নিয়ে মহিলা মহলে প্রবেশ করে ছবি আঁকুন।” সেই সময়ে ধর্মের বিচিত্র গোঁড়ামির যুগেও তিনি ছিলেন এত সাহসী উদার। অনেক মিথ্যা দোষ তাঁর উপরে চাপানো হয়েছিল। সেগুলি প্রমাণ হচ্ছে। আবার বেশ কিছু দোষ তাঁর ছিল, সেগুলি পারিবারিক অভ্যেসের সূত্রে ও খারাপ বন্ধুদের জন্য ঘটেছিল। তাই পরপর তিনি নিজের ভুল কাজগুলি থেকে সতর্ক হয়ে প্রিয় বান্ধবী ও বুদ্ধিমতি জনদরদী স্ত্রী লুৎফুন্নিসার সহায়তায় জীবনকে নতুন করে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। এটাই রাগের কারণ হয় বিপরীত চরিত্রের লোকদের কাছে। অন্য স্ত্রী আলেয়াও অনেক আত্মত্যাগ করেন নবাব সিরাজের শাসন চালানোর ক্ষেত্রে। সেসব কাহিনী অনেক বড়।

কেউ বলবেন, নবাব সিরাজকে নিয়ে এইসব এত কথা ও এত বক্তব্য না বললে কি হতো না?

[ ১৮ ]
সেই পাঠককে আমি বলি, তাহলে এখানে কোন বাক্য বাদ দিয়ে বা কার কোন কথা বাদ দিয়ে কিভাবে লেখা যায়, সেটা আপনি লিখে দিন।

আর একটা কথা কী জানেন বন্ধু, আমার দেশের স্বাধীনতার সূত্র ইতিহাসকে গুরুত্ব না দিয়ে নিজেকে স্বাধীন দেশের নাগরিক বলে বিশ্বাস করবো কিকরে? এবং স্বাধীন কথা বলার ক্ষমতা পাবো কিকরে?

আমাদের বুঝতে হবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর “বর্ণপরিচয়” থেকে আমাদের শিক্ষা শুরু। তেমনি স্বাধীনতার শিক্ষা শুরু নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাসের প্রতি গুরুত্ব, চর্চা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।

আমাদের ভাবতে হবে, আমরা যে স্বাধীনতার পতাকা ওড়াই, সেই পতাকায় বোনা প্রথম সুতো কার? নবাব সিরাজউদ্দৌলার? এত বড় নিরীহ সত্য ছিল আড়ালে। সেই আড়ালে থাকা গৌরবকে যে বিপ্লব বা পদ্ধতি বের করে এনে আমাদের নতুন জ্ঞানের আলো হাওয়ায় নিয়ে এলো, সেই বিপ্লবের চর্চা করা কি অনুচিত কাজ?

[ ১৯ ]
ভুলতে পারিনা কেউ কবি যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর “হাট’ কবিতা। রবিঠাকুরের “হাট” কবিতা আছে। দুটোর স্বাদ আলাদা। সেই ব্যাখ্যা এখানে দেবার সুযোগ নেই। ১৮৮৭ সালে ২৬ জুন জন্ম নদীয়ার শান্তিপুরে। ১৯১১ সালে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে স্নাতক হন। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন ও নদীয়া জেলা বোর্ডে ও কাশিমবাজার স্টেটে ওভারসীয়ারের কাজ করতেন। প্রথম জীবনে কবিতা বিষয়টাকে বিদ্রুপ করতে-করতে কবিতায় লিখতেন বিদ্রুপের কবিতা। এটাই করতে গিয়ে অজান্তে পেলেন কবিতা লেখার হাত। এবং সাইকেল নিয়ে ঘুরতেন গ্রাম বাংলার জলাজঙ্গল, হাট, এইসব জায়গা। এভাবেই কোনো এক সময় মাথায় জাগে “হাট” কবিতা।

“দূরে-দূরে গ্রাম দশ-বারোখানি,
মাঝে একখানি হাট,
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলেনা প্রদীপ,
প্রভাতে পড়েনা ঝাঁট।…”

ছত্রিশ পংক্তির কবিতাটি হাটের চিরন্তন মজা দিয়ে যায় আজও।

[ ২০ ]
কিছু প্রাসঙ্গিক কথা এলো মূল বিষয়ের সাথে। স্বাদে পূর্ণতা দিতে। এই গম্ভীর বিষয়ে এসে আবার আসছি আরেক কাহিনীতে। শেষে হাসবেন জানি। কিন্তু কিছু করার নেই।

হেসে গড়িয়ে যাবেন। গুন্টার গ্রাস নোবেল পাবার কয়েক বছর আগে জার্মানীতে ফিরে গিয়েছিলেন।

কিন্তু, যেই বাড়িতে ছিলেন পেয়িং গেষ্ট হিসেবে কয়েক বছর, সেই বাড়ির শিশু তখন ১৮ বছর হয়। তাই সেই সদ্য যুবক এর বাবা মা জার্মানীতে গুন্টার গ্রাসের কাছে চিঠি লেখেন —

স্যার,
আমাদের বাড়িতে আপনি ছিলেন। মনে পড়ে, ভারতে, বারুইপুরে। আমাদের ছেলে বয়েস এখন ১৮। আপনি নোবেল পেলেন। ভারত সরকারকে আপনি বললে আমাদের সন্তানের চাকরি হবে।

বিনীত,
আপনার প্রিয়
সেই পরিবার।
বারুইপুর,

চিঠির বিষয় ছিল এটা। ভাষা এমন ছিলনা।

তবে এর নামও বাঙালী।

এর জন্য আমি কষ্ট পাই না, কারণ, এভাবেই আমরা চলেছি। হয় তো সেই ছেলে বড় হয়ে নিজস্ব অনুভবে বিশেষ কিছু কাজে হয়ে উঠতে পারে একজন বিশেষ নাগরিক। কেন, হবেনা। তার বাড়িতেই এসে ছিলেন বিশ্বের এক উজ্জ্বল জ্ঞানী ও কর্তব্য পরায়ণ ব্যাক্তিত্ব স্ত্রী সহ।

এই কাহিনী বলে কোনো পরিবারকে অপমান করছি না। এটি আমাদের দেশের পরিবারগুলোর ছবি। কোনো এক অসহায়তায় আমরা অনেকে সরল নিয়মে নিজেকে বা নিজেদেরকে হারিয়ে ফেলি। আচ্ছা, এমন ভাবলে কি আমার ধারবা ভুল হবে? জিজ্ঞেস করি। ভুল হলেই তো সেটা আমাদের গর্ব।

এবার কেউ বলবেন, আচ্ছা, গুন্টার গ্রাসকে এখানে জুড়লেন কেন? তিনি অজান্তে কী এমন কাজ করলেন যেটা তাঁকে বিশ্বের সেরাদের তালিকায় পৌঁছে দিল?

দেখুন, গুন্টার গ্রাস, পুরস্কার পাওয়া না পাওয়ার ঊর্ধ্বে এক ব্যাক্তি। কিন্তু, নোবেল পুরস্কার পাবার জন্য তাঁর পূর্ণতাকে আমরা অনুভব করতে চাই।

এখানে তাঁর হঠাৎ সিদ্ধান্ত বা অজান্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া কাজ হল তিনি ভারতে এসেছিলেন ও কলকাতার শহরতলীতে কাটিয়েছেন কয়েক বছর। তিনি যে নোবেল পাবার জন্য এসেছিলেন, এমন নয়। কোনো বিদেশি লেখক ভারতে আসার জন্য তো নোবেল দেবার রীতি নেই। তবে, তাঁর এই ইচ্ছে তাঁর অজান্তে তাঁকে সামগ্রিকে প্রতিষ্ঠা দিল।

[ ২১ ]
এই নিবন্ধ কোনখানে দাঁড় করাবো। আসুন, শৈশবের গল্পে ঢুকি। বিশ্বের সবাই জানে “Twinkle twinkle little star” ছড়া। এটি কুড়ি পংক্তির ছড়া। যদিও আমরা মাত্র চার পংক্তি জানি। এটি খেলার ছলে বা গল্পের সময় দুই বোন মিলে লিখেছিল। তারা Jane Taylor এবং Sister Ann. মূলত Jane লিখলেও দুজনের আলোচনায় লেখা হয় এটা, এমনটাই জানা গেছে। এটি যে বইতে বেরিয়েছিল নাম “A rhymes for the nursery,” a collection by Jane Taylor and her sister Ann. প্রকাশ কাল ১৮০৬।
চিন্তা করুন, কত বছর আগে দুই বোন মিলে ছড়া লিখেছিল, সেটি শত বছর পেরিয়েও লাখ-লাখ ছড়াকে টপকে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ও ব্যাবহৃত।

ওই যে বলেছিলাম, কোন মুহুর্তের কী কাজ কিভাবে জয় নিয়ে আপ্লুত করে মানব জাতীকে সেটা সহজ হিসেবে মেলে না।

শৈশব থেকেই তো শিক্ষা শুরু। এই পৃথিবী জয়ী ছড়াকে আমি পুরোটা লিখে দিলাম, সকলের চোখে আসার জন্য। ছড়াটি ছিল :–

The Star
—————————

Twinkle Twinkle, little star,
How I wonder what you are,
Up above the world so high,
Like a diamond in the sky.

When the blazing sun is gone,
When he nothing shines uopn,
Then you show your little light,
Twinkle twinkle all the night.

Then the trav’ller in the dark,
Thanks you for your tiny spark,
He could not see which way to go,
If you did not twinkle so.

In the dark blue sky you keep,
And often thro’ my curtains peep,
For you never shut your eye,
Till the sun is in the sky.

‘Tis your bright and tiny spark,
Lights the trav’ller in the dark,
Tho’ I know not what you are,
Twinkle Twinkle, little star.

By Jane Taylor ( and sister Ann) || Courtesy : Google.

আমি বলেছিলাম, অজান্তে নিজের নিয়মে কোনো কাজ কিভাবে কাউকে প্রতিষ্ঠার দূর উচ্চতায় তুলে দেয়, বা তাঁর ভিতরের পূর্ণতাকে উজ্জ্বল করে, সেটাই আশা করি এই নিবন্ধে বুঝাতে পেরেছি।

[ ২২ ]
এখানে যাঁদের কথা বলেছি, এই রকম কাহিনী পৃথিবীতে হাজার-হাজার আছে, কিন্তু তাঁদের সবাইকে নিয়ে তো লেখা যায় না একটা মানুষের হাতে। তাই আমি লিখেছি কয়েকজনকে নিয়ে। অন্যদের নিয়ে লিখুন আরো অনেক লেখক। আমি আসলে বিষয়টা বুঝাতে চেয়েছি, হঠাৎ কোনো ঘটনা বা আবিস্কার কী করে অজান্তে কাউকে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে নিয়ে আসে।

আবার আমরা জানি, অনেকের অনেক চমকে দেওয়া কাজ বা মুহুর্ত অনেক দূর প্রকাশ হওয়া দরকার। কিন্তু কী এক কারণে সেই সব কৃতিত্ব কোথায় যেন আবছা হয়ে যায়। সেগুলি আমাদের চোখের সামনে এলে আমরা উপকৃত হই।

এইভাবে কারোর প্রকাশ বা প্রকাশ না হওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। ভাবছি, ভাবছি না। বুঝছি, বুঝছি না। এভাবেই হেঁটে চলেছি নিজের মতন।

এগুলি ভাবনার ব্যাপার আছে। তাই নয় কি?

[ ২৩ ]
এসব লেখা শেষ হতে চায় না। মুহুর্তের ঠিক কাজ যেমন একজনকে বা একাধিক জনকে বিরাট কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়, তেমনি সামান্য ভুলে কত বিরাট ক্ষতি হয়, সেই প্রমাণ দিচ্ছি।

প্রাচীন রোম নগরীর তিন ভাগের এক ভাগ পুড়ে ছাই হয়েছিল। কী করে জানেন? একজন লোক ছোট্ট একটা লন্ঠন, মানে তখনকার সময়ের লন্ঠন, সেটা নিয়ে হাঁটছিল একজন। কোনো অন্যমনস্কতায় একটি খড়ের গাদায় আগুন লাগে। সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিরাট রোম নগরীর তিন ভাগের এক ভাগ পুড়ে ছাই হয়।

আর, নবাব সিরাজ ছদ্মবেশ ধারণ করে নিখুঁতভাবে বেরিয়ে গিয়েছিলেন ও ২৫ জুন থেকে ১ জুলাই ধরা পড়েননি। কিন্তু তাঁর পায়ের জুতা বদল করতে ভুলেগিয়েছিলেন। তাই কয়েক দিন সেটা অনেকের চোখকে ফাঁকি দিলেও মাঝি দানেশ ফকিরের চোখে খেয়াল হয়। তারপরের ঘটনা সবাই জানি।

তাই মুহুর্তের ঠিক সিদ্ধান্ত যেমন সাপ-সিঁড়ি-লুডো খেলার মতো সিঁড়িতে উঠে ঊর্ধ্বে ওঠা যায়, তেমনি উপরে উঠেও সাপের মুখে পড়লে একদম নিচে নেমে আসতে হয়, এক মুহুর্তের ভুল চিন্তায় বা গোঁয়ার সিদ্ধান্তে বা ভুল কাজে বা ভুল কথা বা ভুল ইংগীতের কারণে। আর, শত্রু, জটিল মানুষ, সে যে কোথায় লুকিয়ে থাকে কে জানে! ঘরের ভিতর, বাইরে, কোথায় থাকে মন্দ উদ্দেশ্যের হাওয়া ভূত, তারা নানা চালাকিতে বিপন্ন করে উন্নত হৃদয়ের জীবন, কে জানে! খারাপ মানুষ কোনো সম্পর্কের মধ্যে থেমে থাকে না। তারা সবাইকে শিকার হিসেবে দেখে। এই সত্য না বুঝতে পারলে একজন উন্নত চিন্তার মানুষ বিপাকে পড়বেই। এগুলি নিরপেক্ষ জ্ঞান। জ্ঞানের চেয়ে তো পারিবারিক আবেগ বড় নয়। পরিবারের লোকজন, বন্ধু, আত্মিয়, ধর্ম, কেউই নিরপেক্ষ জ্ঞানের চেয়ে বড় নয়। সেই বিপন্নতার মধ্যে থেকে কেউ-কেউ আমাদের দিশা দেন, নতুন সুখের আলোয়, সেই রকম হাজার-হাজার উজ্জ্বল শান্তির উৎস থেকে পরপর কয়েকজনকে নিয়ে লিখলাম।

আসলে কী জানেন, বড় কাজ ও নিজস্ব উন্নত মানব গঠনকে এগিয়ে যাওয়া হয় কিভাবে, সেটা আমরা বুঝি যারা স্বচ্ছতা নিয়ে এগুতে চাই।

কত মানুষ তাদের স্বচ্ছ মন নিয়ে আটকে পড়ে আছে, বা কোনো চাপে আছে, কেউ জানে না।

জীবনকে বুঝতে হয়। আর সেই মত সঠিক ও সৎ চিন্তায় এগিয়ে যেতে হয় সতর্কতা নিয়ে। কারণ, এই সমাজে ভালো চিন্তার বাধা অনেক।

তবু আমাদের দায়িত্ব ভালো চিন্তা করা। কারণ ভালো চিন্তাই শান্তি দেয়। নিজেকে ও অন্যকে। আবার ভালো চিন্তার বিপরীতে যারা চিন্তা করে তাদেরকেও বুঝে নেবার চেষ্টা করতে হয় অনুভূতির গভীরে অতি বিনয়ের সাথে, নইলে ভালো চিন্তার কাজকে নিয়ে এগুতে পারা যায় না। এ যে বড় অসহায় সত্য।

এর নাম জীবন। হেঁটে যাওয়া দূর দিগন্তে।

পৃথিবীটাই আমাদের বাড়ি। যারা আত্ম নিয়মে উন্নত তারা ভালোর আপন, বাকিরা শত্রু। এই “শত্রু” শব্দকে কেউ অন্যভাবে নেবেন না। তবে এটা তো বলতে পারি, ভালো শব্দটি খারাপের মুখোমুখি হয় কিভাবে!

তবু, আমাদের এগুতে হবে। নইলে জীবনের সুখ কোথায়!





বিদ্র:- ঋদেনদিক মিত্রো ( Ridendick Mitro) , পেশায় ইংরেজি ও বাংলাভাষায় কবি-উপন্যাসিক-গীতিকার-কলামিষ্ট। কলকাতা। ভারত।

3 thoughts on “অনেকের অজান্তে হওয়া সিদ্ধান্ত বা সৃষ্টিগুলির মুগ্ধকর সফলতা, চমকে যাবেন। পড়ুন। প্লিজ। [ A Bengali Column causing Unknowingly creations or findings how brought bigger success without measure, written by Ridendick Mitro ] || লেখার ভিতরে স্থানে-স্থানে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে। এটা ভালো। কিন্তু, পাঠক পড়বেন রচনার একদম নিচে গিয়ে দেখুন এর শেষ কোথায়। কোথাও বিজ্ঞাপন দেখে ভাববেন না যেন সেখানেই লেখাটা শেষ। যার লেখাই পড়ুন, এই বিষয়ে খেয়াল রেখে পড়বেন। তাহলে পড়ার ইচ্ছে পূর্ণতা পাবে।|| ঋদেনদিক মিত্রো ( ভারত )”
    1. সমাজ সচেতনতায় কলম চালিয়েছেন লেখক শংকর হালদার শৈলবালা। তাঁর থেকে বহু মাত্রিক লেখা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *