গল্প: চুল কাটবি, মাথা খাটাবি✓তপন তরফদার

Spread the love

চুল কাটবি, মাথা খাটাবি।

তপন তরফদার

FB IMG 1764957685712
খুব বেশি যুগের আগের কথা নয় তবে পুরানো দিনের কথা। হরিদাসের  জন্ম লগ্নতেই মাতৃহারা হয়ে মামাবাড়িতে থেকে মানুষ হতে হয়। মানুষ হয়েছে কিনা পরে জানা যাবে। মামারা জাতে নাপিত, ওই  ক্ষৌরকর্মাদির কাজকর্ম করেই গ্রাসাচ্ছাদন হয়ে থাকে। হরিদাস  ওই গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নির্ধারিত বছরগুলি কাটিয়ে কেশেয়িড়ায়ির  হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছে। মামার বাড়ির ছত্রছায়ায় সে বড়ো হচ্ছে। কালের নিয়মে দাদু- দিদা পরলোকে গমন করলো। মাথার ছাতা সরে যায়। ছাতা সরে গেলে যা হয়, রোদ, বৃষ্টি সরাসরি গায়ে লাগতে শুরু  করলো। গোদের উপর বিষ ফোঁড়া হলো যখন  মামারা তাকে আলাদা করে দিল। একটি চালা যুক্ত মাটির ঘর তার দাদু আগেই লিখে দিয়েছে।

      তখনকার দিনে ফসল দিয়ে সব কিছু হতো।যাকে বলে বিনিময় প্রথা। হরিদাস গ্রামের লোকপিছু তিন আড়ি ধান পেতো চুল নখ কাটার জন্য। বিয়ে ও শ্রাদ্ধে আলাদা পয়সা জুটতো। মামারা হরিদাসকে  একটি পাড়া দিয়েছে গ্রামের চুল কাটার জন্য। হরিদাস দেখতে দেখতে সুন্দর নরসুন্দর হয়েছে। সব বন্ধুদের বিয়ে হচ্ছে হরিদাসের হচ্ছে না। হবে কি করে  কেউ ওর জন্যতো মেয়ে খোঁজে না। বড় মামা যে হরিদাস কে আলদা করতে বেশি উদ্যোগ নিয়ে ছিল, সেই বড়মামার ছেলের বিয়ে হয়ে গেল। রোগা পটকা তালপাতার সেপাই মেজ ছেলে পাঁচুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।  হরিদাসের মন খারাপ, ওর বিয়ে নিয়ে কেউ ভাবেনা। হরিদাসের মায়ের প্রাণের বান্ধবী ফুলু মাসি বিধবা হয়েই এই গ্রামেই থাকে। হরিদাসের দুঃখ বুঝতে পেরে বলে, তোর বিয়ের জন্য একটা প্যাঁচ কষতে হবে। কানে কানে ফুসমন্ত্র দিয়ে দিল।

     পাঁচু বিয়ে করতে যাচ্ছে। ফুলু মাসি শরবতের গ্লাস এগিয়ে দেয়। বর মি্স্টি মুখ করে মায়ের জন্য দাসি আনতে যাচ্ছে। কেউ জানতে পারলনা শরবতে সিদ্ধি-ভাঙ মিশিয়ে দিয়েছে। বিয়ের বাসরে বর হঠাৎ টলতে টলতে উল্টো পাল্টা বকতে লাগল। বিয়ের আসরে ডামাডোল। এতো বর নয় বর্বর। এই বর্বরের সঙ্গে বিয়ে হবে কি করে। কে যেন কথাটা ভাসিয়ে দিল  পাঁচু, মাঝে মাঝেই পাগল হয়ে যায়। কথাটা কনে টেঁপির কানে চলে যায়। টেঁপি গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি পাগলকে বিয়ে করবোনা। টেঁপির বাবা মদনের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, পাগল নয়রে ওই একটু নেশা করে ভাঙ খেয়েছে। টেঁপি টাট্টু ঘোড়ার মতো লাফিয়ে উঠে বলে ওই নেদুকাকু নেশা করে সংসারের কি হাল করেছে পাড়ার সবাই জানে, নেশা করে হাটে-বাজারে গড়াগড়ি যায়। ওর সঙ্গে বিয়ে দিলে আমি গায়ে আগুন দেবো। মদন বলে, খুকি আমি ও চাইনা জেনে শুনে ওর সঙ্গে বিয়ে দিতে, কিন্তু  কি করবো, তোকে তো লগ্নভ্রষ্টা করতে পারিনা।  আমি মুখ দেখাবো কি করে।

            বিয়ে বাড়িতে বাজ পড়তে চলেছে। তবে কথায় আছেনা, যত গর্জায় তত বর্ষায় না।  টেঁপির মা নিজের বর, মদনকে ডেকে বলে ওই বরযাত্রীদের সঙ্গে  ওর ভাই এসেছে। দেখতে বেশ ভালো। ভদ্র শান্ত প্রকৃতির। ওর ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে লাগিয়ে দিতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এক জাতির, দেনা পাওনা বাড়বেনা,  সর্বপোরি মেয়ে আমাদের লগ্নভ্রষ্টা হবেনা।

      মামা প্যাঁচে পড়ে গেছে। ছেলেটাকে কে যে ওই ছাই পাঁশ খাইয়ে দিয়েছে কে জানে। বেশি কথা বলতে গেলে আমার নেশার কথাও প্রকাশ্যে চলে আসবে। হরিদাসের কানে কানে বলে বাক্স পেঁটরার ভাগ আমাদের দিশ। সব তোর ঘরে তুলিসনা। হরিদাস লম্বা জিভ বার করে বলে, নিচ্চয় বড়মামা। নিচ্চয়।

      বউকে বরণ করতে এসে ফুলু মাসি হরিদাসকে বলে ঠিক করে চুল কাটবি আর সঠিক সময়ে মাথা খাটাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *