“বেকার ভাতার ভোম্বল”
রম্যরচনা

অরবিন্দ সরকার
বহরমপুর,মুর্শিদাবাদ।
দেশে মেয়ের ঘাটতি। তাছাড়া কাজ না করলে বা আয় না করলে তার বিয়ে হওয়া মুশকিল। মেয়েরা সমানতালে পড়াশোনা করে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরতা। ভোম্বল পাঁচ বছর আগে টেনেটুনে মাধ্যমিক পাশ করেছে। তারপরে আর পড়ার সাহস হয়নি,কারণ সে জানে তার বুদ্ধির জোর। যেহেতু পাশ ফেল নাই, পরীক্ষায় বসলেই পাশ। এই পাশ করেছে বলেই ভোম্বল বেকার ভাতা প্রকল্পে আবেদনের অধিকারী।
রেশনে চাল গম পায়, এবার বেকার ভাতা পেলে তার আর ভাবতে হবে না। এমনিতেই দুবিঘা জমি আছে তার। ধান যা হয় ওতেই সারাবছরের চাল হয়, ধানের পরে জমিতে আলু হয়। ভোম্বল দিব্যি আলু সেদ্ধ ভাত খেয়ে দিন কাটায়।
একা সংসারে তবুও কেউ বিয়ে দিতে আসে না। কতো আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে তার দেখা হয়, তাদের মেয়ে আছে,তার জন্য পাত্র খুঁজছে কিন্তু ভুলেও কেউ ভোম্বলকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়না।
বেকার ভাতা পাঁচ বছরের জন্য দেড়হাজার টাকা।
ভোম্বল মনোনীত হয়েছে বেকার ভাতা পাবে এই মাস থেকেই। খাতা কলম নিয়ে হিসাব করতে লাগলো খরচের। আপাতত একটি নেমপ্লেটে তার নাম এবং প্রসাধনী ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি ক্রীম মুখশ্রীর জন্য। হতশ্রী চেহারায় চুলের স্যাম্পু, গায়ের দুর্গন্ধ ঢাকতে শ্রীপাউডার,নিমের ডাল ছেড়ে টুথপেস্ট ও টুথব্রাশ। দাঁতের উজ্জ্বলতা বাড়াতে দরকার। দামী ব্র্যান্ডের সিগারেট এক প্যাকেট। ভেতরে বিড়ি বাইরে লোকের সামনে সিগারেট। সিগারেট না খেলে নাকি মেয়েরা তাকাই না। আভিজাত্যর বড়াই সুখটানে।
দেড়হাজার টাকা নিয়ে ফর্দ দোকানে দিয়ে টাকায় কুলোচ্ছে না। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা। যাই হোক নেমপ্লেটের বায়না দিয়ে এলো। সামনের মাসের টাকায় বসানো হবে এই তার পরিকল্পনা।
নেমপ্লেটে নামের পরে তার যোগ্যতা থাকে। ভোম্বল লিখে দিলো T.T.M.P.
পরের মাসে বাড়ীর দরজা ঢুকতে একটি কলিং বেল ও ওখানেই নেমপ্লেট বসানো হলো।
স্মার্ট যুগে স্মার্টফোন দরকার, ভোম্বলের মান্ধাতার আমলের ছোটো ফোন নোকিয়া কোম্পানির আছে। এক বিঘা জমি বাঁধা রেখে একটি স্মার্টফোন কিনলো। ফেসবুকে কতশত মেয়ের নাম দেখে আলাপের জন্য কয়েকটি টিপে বন্ধুত্বের আবেদন জানালো। মোবাইলে সব মেয়েই সুন্দরী। একটি মেয়ে তাকে ম্যাসেজ দিলো,কি করেন, কোথায় থাকেন, পড়াশোনা কতদূর ইত্যাদি। ভোম্বল লিখলো T.T.M.P. বাড়ি তার আধা শহরে। ভোম্বল লিখলো – আমার বললাম এবার তোমার বলো।
মেয়েটি বললো আমার নাম শ্রেয়সী গোপ।বি,এ পাশ করেছি।
ভোম্বল লিখলো- তুমি ছেলে না মেয়ে?
শ্রেয়সী – কেন?
ভোম্বল – তোমার গোঁফ আছে তাই বললাম।ভাগ্যিস দাড়ি গজায় নি!
শ্রেয়সী – গোঁফ নয় গোপ! এটা আমার পদবী। তোমার পদবী কি?
ভোম্বল – বংশ পরম্পরায় দাস লিখি। কেউ ভাবে আমি নাপিত,কেউ ভাবে মুচি, আবার কেউ ভাবে বৈরাগী। কিন্তু আমরা যতদূর জানি কায়স্থ!
শ্রেয়সী- তোমার এডমিড কার্ড ও শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র পাঠাও।
ভোম্বল পাঠিয়ে দিলো তার ফেসবুকে।
শ্রেয়সী – এতো তুমি মাধ্যমিক পাশ,তাও আবার টেনে টুনে। আমি বি,এ পাশ। তোমার সঙ্গে আমার হবে না।
ভোম্বল – আমি সৎপাত্র। মিথ্যা লিখি বা বলিনা। তুমি বললে টেনে টুনে পাশ , সেজন্যই তো T,T,M,P বললাম। আর বি,এ পাশ,এ তো বিয়ে করলেই অর্জন করা যায়।
অতো কথা কিসের? জমি আছে, রেশনের চাল গম আছে আর বেকার ভাতা আছে। কতো জন আমার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। তোমার বাবাকে দাও কথা বলি। উনি বুঝবেন সুপাত্র কাকে বলে?
শ্রেয়সী – দেখতো বাবা কোন্ বিয়ে পাগলা কথা বলছে?
শ্রেয়সীর বাবা অতুল বাবু – হ্যালো বলো বাবা ! কি বলছো?
ভোম্বল – এই তো সম্বোধন! কি সুন্দর আপনি! একদিন এসে আমার বাড়ি দেখে যান। দামী চা, সিগারেট, বিড়ি সব থাকে আমার বাড়ীতে। প্রত্যেক জিনিসের মান পরীক্ষা করে মানুষ জনকে দিই।
অতুল বাবু – তুমি বিড়ি সিগারেট ফুঁকো,তাও আবার বড়াই করে বলছো?
ভোম্বল – আমি কিছু গোপন করিনা। গোপনে গোপনে সবাই খায় কিন্তু তারা ভান করে এমন যে ধূমপান করেনা।
ঠিক আছে শ্বশুর মশাই এবার থেকে সব কিছুই গোপন করবো! স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া গোপন করবো। বেশি মাত্রায় ঝগড়া ঝাঁটি, ঝাঁটা পেটাপেটি বলবো না আর আপনাকে। এই কান ধরলাম,আপনার মেয়েকে মেরে ফেললেও বলবো না। একবার ক্ষমা করুন আর দ্বিতীয়বার ভুল হবে না। ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।
দেরি করবেন না আসতে?
নইলে এমন পাত্র হাতছাড়া হ’য়ে যাবে। নেমপ্লেটের গোড়ায় মানুষের কানাকানি। সুযোগ বারবার আসে না। হ্যালো হ্যাঁ না বলুন। নেটওয়ার্ক চ’লে গেলো মনে হয়!
এদিকে অতুল বাবু একেবারেই ব্লক করেই দিয়েছেন। ভোম্বলের শ্রেয়সী এখন নাগালের বাইরে।
ভোম্বল – নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো – ” এক দুয়ার বন্ধ তো হাজার দুয়ার খোলা”। সোজা কথা ব্যাঁকা বলা ভালো। ইনিয়ে বিনিয়ে যে যতো বলবে আর শুনবে ততো ফাঁদে পড়বে। কে শুনছে আর আমার কথা? এ ভোম্বল হারার পাত্র নয়। সোজা আঙুলে না হ’লে আঙুল বেঁকাতে হয়। পরের ঘরে সিঁধ কেটে নিয়ে আসবো ঘরণী। ঘর ফাঁকা রাখবো না।
—————————-
লেখক: অরবিন্দ সরকার

অসাধারণ ও মানসম্মত এ পত্রিকাটির উত্তরোত্তর উৎকর্ষতা ও প্রচার বৃদ্ধি হোক।
Very nice composition. L
অশেষ ধন্যবাদ
খুব সুন্দর। কবিতা গুল নতুন ভাবের।
খুব সুন্দর লেখা