ধারাবাহিক পৌরাণিক কাব‍্য

★কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিন★ –Oct. 21

——– কৃষ্ণপদ ঘোষ।
উপস্থাপন– ২৩
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

।। ঘটোৎকচ বধপর্বাধ‍্যায়।।
১৫। সোমদত্ত – বাহ্লীক বধ।
: কৃপ–কর্ণ–অশ্বত্থামার কলহ :

আরম্ভিল রাত্রিযুদ্ধ অতি নিদারুণ।
বিকম্পিত ভীরুদল ত্রাসেতে দারুণ।।
হর্ষ উল্লাসে আপ্লুত যত বীরগণ।
বধিতে শত্রু তাদের পুলকিত মন।।
পাণ্ডব পাঞ্চাল আর যত মিত্রগণ ।
দ্রোণ সনে করে যুদ্ধ অতীব ভীষণ।।
রুষ্ট ভূরিশ্রবা-পিতা সাত‍্যকিরে কন,
“দস‍্যু বৃত্তি কেন তুমি করিলে গ্রহণ।।
ত‍্যাজিয়া ক্ষত্রিয়ধর্ম দস‍্যু ধর্মে রত।
বৃষ্ণি বংশের তুমি বীর মহারথ।।
হইল এরূপ কেন তব মন দীন।
বধিলে সন্তানে মোর ডানবাহু হীন।।
শোন তুমি আমি আজ করিলাম পণ।
রাত্রিকালেই তোমারে করিব হনন।।
নচেৎ হইব আমি মিথ‍্যাবাদী অতি।
নিকৃষ্ট নরকে মোর হইবেক গতি”।।

তুমুল যুদ্ধে তিনি হইলেন রত।
মূর্ছা যান শরাঘাতে হইয়া আহত।।
হেরিয়া সারথি তাঁর ভয়ে হলো ভীত।
তাঁহারে তুলিয়া রথে হলো পলাইত।।

ঘটোৎকচ তনয় অঞ্জনপর্বা নাম।
অশ্বত্থামা-শরাঘাতে গমে যম-ধাম।।
অতি ক্রোধে ঘটোৎকচ কহেন তখন।
দ্রোণ-পুত্র, রক্ষা তব নাহিক এখন।।
ঘটোৎকচ মায়াযুদ্ধে হইলেন রত।
তথাপি হত রাক্ষস কত শত শত।।
ভূরিশ্রবা-পিতা যুদ্ধে রত পুনর্বার।
সাত‍্যকি-বাণে মরণ হইল তাঁহার।।
বাহ্লীক-রাজ তাহায় হন ক্রুদ্ধ অতি।
ধাবেন সাত‍্যকি আর ভীমসেন প্রতি।।
সক্রোধে করেন দোঁহে তিনি আক্রমণ।
গদাঘাতে ভীম তাঁরে করেন হনন।।
*
“শত্রুসেনা মোর সেনা করিছে বেষ্টন।
কর রক্ষা কর্ণ তুমি,” কহে দুর্যোধন।।
“না হইও চিন্তিত হে বন্ধু দুর্যোধন”।
কহেন কর্ণ, “জীবিত আমি যতক্ষণ।।
সমগ্ৰ পাণ্ডবে আমি লবো করি জয়।
তাই বলি বন্ধু তব নাই কোন ভয়”।।
কৃপাচার্য কন তাঁরে করি মৃদু হাস‍্য,
“কর্ণ তুমি দিলে আজি অতি বড় ভাষ‍্য।।
কার্যসিদ্ধ নাহি হয় মুখের ভাষণে।
ব‍্যর্থ কেন হলে তবে সেনার রক্ষণে।।
পাণ্ডব হস্তে সদাই হও পরাজিত।
ত‍্যাজিয়া গর্জন তব হও যুদ্ধরত”।।
কহিলেন কর্ণ কৃপে হয়ে ক্রুদ্ধ অতি,
“বাৎসল‍্য দেখি তব পাণ্ডবের প্রতি।।
বিদ‍্যুৎ বেষ্টিত ঘন গর্জে ঘন ঘন।
বারি দানে নয় তার নিষ্ফল গর্জন।।
বিনাশিতে অরিকুলে সদা বীরগণ,
বীরদর্পে তাঁরা সবে করেন গর্জন।।
গর্জি আমি যদি তবে পাণ্ডব হত‍্যায়,
আপনার ক্ষতি এতে কিবা হয় তায়।।
গর্জনের ফল সবে দেখিবে অচিরে।
নিষ্কণ্টক রাজ‍্য দেব বধিয়া শত্রুরে”।।
কৃপ কন,”কেন কহ প্রলাপ বচন।
কৃষ্ণার্জুনে জয় করা অসাধ‍্য সাধন”।।
সহাস্যে কহেন কর্ণ, “শুনুন ব্রাহ্মণ,
ব‍্যঙ্গ করেন আপনি কেন অকারণ।।
ইন্দ্রদত্ত শক্তি অস্ত্র আছে মোর পাশে।
তাহাই সহায় মোর অর্জুন বিনাশে।।
বৃদ্ধ আপনি অক্ষম ত্বরিত গমনে।
হেন বচন পাণ্ডব স্নেহ পরায়নে।।
দুর্মতি ব্রাহ্মণ আজি করুন শ্রবণ,
নাহি শুনি যেন কভু এরূপ বচন।।
খড়্গ দ্বারা জিহ্বা তব করিব ছেদন।
আর যদি শুনি কভু অপ্রিয় বচন।।
কুরুসেনা হবে ভীত তারা মনে প্রাণে।
পাণ্ডবের স্তুতি নয় কোন গুণ গানে”।।
কর্ণ দ্বারা হইছেন মামা ভর্ৎসিত।
হেরি তাই অশ্বত্থামা তথা উপস্থিত।।
দুর্যোধন আছে তবু কন,” নরাধম,
বীরত্বের দর্পে তুমি পশুর অধম।।
অন‍্য বীরে তুমি কভু না দিলে সম্মান।
গুরুতুল‍্য কৃপাচার্যে কর অপমান।।
অর্জুনের হাতে তুমি হলে পরাজিত।
অতঃপর অর্জুন বধে জয়দ্রথ।।
কোথা ছিল তব এই বীরত্ব তখন।
কোথায় ছিল বা তব অস্ত্রের ঝঞ্ঝন।।
মিথ্যা নহে যথার্থই মাতুল বচন।
করিব আমি তোমার মস্তক ছেদন”।।
হেন কহি অশ্বত্থামা করেন ধাবন।
দুর্যোধন কৃপাচার্য করে নিবারণ।।
“হও স্থির অশ্বত্থামা”, কন দুর্যোধন।
সূতপুত্রে তুমি ক্ষমা করহ এখন।।
কর্ণ, কৃপ, দ্রোণ, শল‍্য আর তব ‘পরে,
রয়েছে মহৎ ভার কার্য সাধিবারে।।
তাই কহি কলহ না করিও কদাপি।
মতভেদ ঘটিলেও কখনো তথাপি”।।
“করিলাম ক্ষমা কর্ণ”, কহিলেন কৃপ।
“তবে পার্থ হস্তে হবে চূর্ণ তব দর্প”।।

তারপর দুর্যোধন হন যুদ্ধ রত।
অশ্বত্থামা দুর্যোধনে করেন বিরত।।
কহিলেন,”না হইও ব‍্যস্ত অকারণ।
আমি আছি করিবারে পার্থে নিবারণ”।।
দুর্যোধন কহিলেন তাঁহারে তখন।
“তব পিতা পাণ্ডুপুত্রে স্নেহ পরায়ণ।।
পুত্রসম স্নেহ পায় পাণ্ডব সকল।
তুমিও তাদের প্রতি হয়েছ দুর্বল”।।
“মিথ্যা নয় সত্য কথা করিনু স্বীকার।
পাণ্ডুপুত্র প্রিয় তারা আমার পিতার।।
রণ মাঝে প্রিয় কিন্তু কদাপিও নয়।
যুদ্ধ করি যথা শক্তি ত‍্যাজি মোর ভয়”।।
দুর্যোধনে দিয়ে তোষ করেন গমন।
বিপক্ষ সেনায় তিনি করেন পীড়ন।।

১৬। কৃষ্ণার্জুন ও ঘটোৎকচ।

চলে যুদ্ধ রাত্রিকালে গভীর আঁধারে।
বিমূঢ় সেনারা সব হানে পরস্পরে।।
হেরি হেন দুর্যোধন বিচলিত মন।
লইতে হস্তে প্রদীপ পদাতিরে কন।।
লইল হস্তে প্রদীপ যতেক পদাতি।
প্রদীপের আলো মুছে ঘন কালো রাতি।।
হস্তী প্রতি সাত দীপ রথ প্রতি দশ।
অশ্ব প্রতি চার দীপে হয় রাতি বশ।।
নিদারুন রাত্রিযুদ্ধ ঘোর কলরব।
কভু বিজিত পাণ্ডব কভুও কৌরব।।
অর্জুন করেন তীব্র শর বরষণ।
ভীত কুরুসেনা কত করে পলায়ন।।
হেরি হেন দুর্যোধন বিচলিত মন।
দ্রোণাচার্য কর্ণে তিনি কহেন তখন।।
“বিনাশিতে ধনঞ্জয়ে আজিকে তখন,
রাত্রিযুদ্ধ আপনারা করেন ঘোষণ।।
পাণ্ডবসেনা মোদের করিছে সংহার।
আপনারা ভীরু সব দর্শক তাহার।।
ইচ্ছা ছিল যদি মোরে ত‍্যাগ করিবার।
আশ্বাস দিলেন কেন তবে বারবার।।
জানিলে পূর্বে এরূপ মনের বাসনা,
রাত্রিযুদ্ধ দিতাম না করিতে ঘোষণা।।
যদি নাহি থাকে ইচ্ছা মোরে ত‍্যাজিবার,
মহাবিক্রমে করুন শত্রু সংহার”।।
বাক‍্যবাণে পদাহত ক্ষিপ্ত সর্প যথা।
কর্ণ দ্রোণ মত্ত রণে ক্রুদ্ধ ব‍্যাঘ্র তথা।।
পাণ্ডবসেনা সকল ভয়েতে আকুল।
ত‍্যাজিবারে রণাঙ্গন সকলে ব‍্যাকুল।।
যুধিষ্ঠির কহিলেন তখন অর্জুনে।
“আমাদের সেনা সব ব‍্যস্ত পলায়নে।।
কর্ণ আজ করে যুদ্ধ অতীব ভীষণ।
নাহি অবকাশ শর সন্ধান-মোচন।।
শম্পা সম গতি তার সন্ধান মোচনে।
নাই সংশয় নিশ্চিত পাণ্ডব হননে।।
নাশিবারে কর্ণে কর ঠিক যাহা হয়।
যথাশীঘ্র কর তাহা তুমি ধনঞ্জয়”।।
হেন বচন শ্রবণে অর্জুন তখন,
উচাটন হ’য়ে কন,”হে মধুসূদন,
কর্ণ সকাশে ত্বরিতে করহ গমন‌।
আজ তারে নিশ্চিয়ই করিব হনন।।
মোর শরাঘাতে তার হইবে মরণ।
নচেৎ আমিই স্বর্গে করিব গমন।।
কেশব কহেন,”পার্থ, করহ শ্রবণ।
উচিৎ নয় তোমার এ যুদ্ধ এখন।।
ইন্দ্রদত্ত শক্তি-অস্ত্র সদা কর্ণ পাশে।
রাখিয়াছে যত্ন করি তোমার বিনাশে।।
ঘটোৎকচ শ্রেয় কর্ণে করিতে সংহার।
অস্ত্র আছে তার পাশে সকল প্রকার।।
দৈব রাক্ষস আসুর আছে নানা অস্ত্র।
আর আছে জানা তার নানা মায়া মন্ত্র।।
কর্ণে সে অতি সহজে নেবে ক’রে জয়।
এই নিয়ে নাই মোর কোন সংশয়”।।
এত কহি ঘটোৎকচে করেন স্মরণ।
পলকে ঘটোৎকচের হয় আগমন।।
কুণ্ডল উজ্জ্বল তার গাত্র ঘন শ‍্যাম।
কৃষ্ণ স্মরণে আসিয়া করিল প্রণাম।।
কহেন কেশব তারে,”শোন অভিলাষ।
করিবে আজিকে তুমি বিক্রম প্রকাশ।।
বিপদ সাগর মাঝে যত মিত্রগণ।
উদ্ধারিতে করিলাম তোমায় স্মরণ।।
কর্ণ, পাণ্ডবসেনায় করিছে পীড়ন।
যতেক ক্ষত্রিয়বীরে করিছে হনন।।
কর্ণ-বিক্রমে পাঞ্চাল ভয়ে পলাইত।
পলাইত যথা মৃগ ব‍্যাঘ্র ভয়ে ভীত।।
আছে তব নানা অস্ত্র রাক্ষসের মায়া।
কর্ণপ্রাণ যাবে তায় ছাড়ি তার কায়া।।
কর্ণ সাথে কর তুমি সমর দ্বৈরথ।
সাত‍্যকি রক্ষক হবে সেই মহারথ”।।
কহিল ঘটোৎকচ, “নাই কোন ভয়।
একাই করিব আমি কর্ণ দ্রোণে জয়।।
এক্ষণে করিব হেন যুদ্ধ কর্ণ সনে,
সর্বকালে সর্বলোক রাখিবে তা মনে।।
কোন শত্রুর আজিকে নাই পরিত্রাণ।
জোড় হস্তে যদি আসে তবু যাবে প্রাণ”।।
এই কহি ঘটোৎকচ হইল ধাবিত।
হুঙ্কারে তার ভুবন হইল কম্পিত।।
★★★
                ( চলবে )

Spread the Kabyapot

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *