করোনা পরবর্তী সমাজের রীতিনীতি ও বাস্তবতা- লিখেছেন ছাব্বির আহমেদ


 করোনা পরবর্তী সমাজের রীতিনীতি ও বাস্তবতা

কলমে-ছাব্বির আহমেদ

বিশ্বজুড়ে আজ সবার মুখে একটাই আতঙ্কের নাম করোনা। দিন দিন এই মারণ ব্যাধি সারা পৃথিবীকে গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা সকল আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব এমনকি পরিবারের মানুষকেও যেন দূরে ঠেলে দিচ্ছি, শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য। তবে কি এ পৃথিবী হেরে যাবে? এই মুহূর্তে হয়তো এর উত্তর হ্যাঁ হবে কেননা এখনো পর্যন্ত সারা পৃথিবী কোনো বিজ্ঞানী এর মহাঔষধ আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি। তবে পাখির চোখে তাকিয়ে আছে সারা পৃথিবী। কোনো চ্যানেলে কিমবা কোনো সামাজিক মাধ্যমে অথবা কোনো খবরের পোর্টালে এই ঔষধ আবিষ্কারের সুখবরটা শুনবে বলে।

এবার আসি করোনার গোড়ার কথায়, সারা পৃথিবীর মানুষের বেশ কিছুদিন ধরে একটা ভয়ভীতি কাজ করছিল, এই বিজ্ঞানের যুগে এত তথ্য প্রযুক্তি এত উন্নত পরিকাঠামো ইন্টারনেট ইত্যাদির জন্য হাইড্রোজেন বোমা পরমাণু বোমা ইত্যাদি দিয়ে তো এক এক দেশের এক এক রকম শক্তি প্রকাশ করেছে, এবার কিছুটা জৈব শক্তি দিয়ে ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাক আর তারই ফলস্বরুপ বেরিয়ে পড়লো মারন ভাইরাস করোনা। সেই করোনা এখন হয়ে উঠেছে তুরুপের তাস যাকে পাচ্ছে তাকেই গ্রাস করছে এর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। ছেলে বুড়ো পুরুষ মহিলা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যাকেই ছুঁয়েছে তাকেই ধরেছে, এমনকি এখনো ধরছে।

বেশ কয়েকমাস হয়েছে আমরা করোনার ভয়ের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছি। তবু জীবনের গতিপথ তো থেমে নেই। এরই মাঝে বদলে গেছে পৃথিবীর চেহারা। পুরো মানব জাতি আজ সংকটের মুখে। করোনা-পরবর্তী সময়ে কেমন হবে বিশ্ব, তা নিয়ে গবেষকরা দিচ্ছেন নানা মত। অনেকে মনে করছেন ভবিষ্যতে নাগরিকদের কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা হতে পারে। শুধু আপনি কী করছেন তা-ই নয়। এমনকি আপনার শারীরিক অবস্থার সম্পূর্ণ তথ্য থাকবে সরকারের কাছে। একদিন এমন সময় আসবে সবকিছুই রোবট করবে আমরা উপমা মাত্র। এই করোনাভাইরাসের কারণে সরকারের ফোকাসটাও সরে গেছে অন্যদিকে। এখন সরকার জানতে চায়, আপনার দেহের তাপমাত্রা কত, ত্বকের নিচে আপনার রক্তের চাপ কত।

তবে এই আতঙ্কের মাঝে আমরা কিছুটা হলেও খুশির খবর পেয়েছি বা পাচ্ছি এমনকি ভবিষ্যতে আরও ভালো খবর পাবো বলে আশা করছি। এতো মৃত্যুপুরী, এতো সংক্রমনের মাঝেও আমরা করোনা কে জয়ী করে উঠছি আর জয়ী তো আমাদের হতেই হবে কেননা  আমরাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, আমাদের কারণেই পৃথিবীতে এখনো প্রাণ আছে, না হলে তো পৃথিবী সৃষ্টিই বৃথা হয়ে যেত। বর্তমানে বিভিন্ন করোনা হাসপাতালে যতটা সংক্রমিত রোগী ঢুকছে তার থেকে করোনা জয়ী হয়ে বেরিয়ে আসার সংখ্যায় প্রায় বেশি।

তবুও আমাদের মনে একটা প্যানিক থেকেই যাচ্ছে এই বুঝি  আমি  সংক্রমণ হলাম , এই বুঝি আমার পাড়ার কেউ হলো। একজন করোনা জয়ী যখন বাড়ি ফিরে আসছে তখন আমরা তাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছি, মনে হচ্ছে যেন সে একটা সমাজের বোঝা তারই জন্য পাড়ার সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। এই বিজ্ঞানের যুগে স্মার্টফোনের যুগে এটাকে আমরা আজও বিশ্বাস করি? না এটা মানা অসম্ভব যেহেতু সে করোনা কে জয় করে এসেছে, তার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে , তাকে নিয়ে কোনো সমস্যা হতে পারেনা। তাকে দূরে ঠেলে না দিয়ে  বরঞ্চ সহানুভূতি জানানো উচিত, কেননা একজন মানুষ যখন করোনা আক্রান্ত হয় তখন সে কিরকম মানসিক ভাবে আঘাত পায়, ভেঙে পড়ে একমাত্র করোনা জয়ী ব্যক্তি নিজেই জানে। এই নিয়ে আমার সঙ্গে এক করোনা জয়ীর কথা হয়েছে সে করোনা আক্রান্তের পর কিরকম মানসিক আঘাত পেয়েছিল এমন কি করোনা কে জয় করে ফিরে আসার পর প্রতিবেশী রা তাঁর সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করেছে সেসব  আলোচনা আসি-

সে একজন  করোনা যোদ্ধা(স্বাস্থ্যকর্মী), তার নামটা আমি জানাতে পারছিনা গোপনীয়তার কারনে, তাঁর কথায়, – ‘ আমার সহকর্মীদের করোনা পজিটিভ এসেছিল তাই আমিও যখন করোনা টেস্ট করাই তারপর আমারও রিপোর্ট পজিটিভ আসে অথচ আমার শরীরে কোনো সিনটোম ছিল না তাই আমি হোম আইসলেশনে ছিলাম এবং সেখানেই চিকিৎসা করাচ্ছিলাম, ওই সময় আমি পুরোপুরি ভাবে ভেঙে পড়েছিলাম আমার বন্ধু বান্ধব তো দূরের কথা আমার বাড়ির লোকও কিছুটা দূরে চলেগিয়েছিল। ওই সময় আমার মনে হচ্ছিলো আমিও বোধ হয় পৃথিবীর একমাত্র অপরাধী যে কিনা কোনো অপরাধ না করেও মানসিক জেল খাটছি। হ্যাঁ আমার একটাই অপরাধ ছিল আমি করোনা পজিটিভ। এরপর যখন আমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম তবুও আমার সেই অপরাধের দাগটা থেকেই গেলো পাড়া প্রতিবেশী কারো মুখে দিকে তাকাতে পারছিলাম না সবাই যেনো কেমন দূর দূর করছিল। ওদের চোখে আমি যেন একটা পচা গন্ধ যুক্ত বস্তু। আমার সুস্থ হওয়া বেশ কয়েক মাস পার হয়েছে তবু যেন সেই কলঙ্কের দাগটা আমার মাথায় থেকেই গেছে। অথচ দেখুন আমরা স্বাস্থ্যকর্মী , আমাদেরকে মানুষ যদি এই ভাবে দূরে সরিয়ে রাখে তাহলে পৃথিবীতে থেকে করোনা মুক্তির যুদ্ধে নামবো কি করে?’

এই হচ্ছে আমাদের সমাজ, সব জেনে বুঝেও আমরা খারাপ কাজ গুলো আগে করি আর যে ভালো কাজ করে তাকে আমরা অপরাধীর চোখে দেখি। ২০২০ তে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয় কারও  সামান্য জ্ঞান টুকু নেই এরকম মানুষ বিরল। তাহলে করোনা সম্পর্কে আমরা সবকিছু তথ্য জানি সব কিছু বুঝি তবুও আমরা এই বিষয়টা নিয়ে এতো অজ্ঞ কেনো? পাড়ায় যদি কারোও করোনা সংক্রমন হয় আর আমরা যদি ঘরে জানলা দরজা বন্ধ করে বসে থাকি তাহলে তার মানসিক অবস্থাটা কি হতে পারে? এটা আমাদের ভাবতে হবে। না আমি বলছিনা যে তার কাছে গিয়ে সব কিছু করতে অন্তত একবার তাকে ফোন করে খোঁজ নেয়াই যায়। ফোনে তাকে পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়ায় যায়, কিছুটা হলেও সে মানসিক জোর পাবে। আপনার এই পাশে থাকা টুকুই সারাজীবন মনে রাখবে। উপরওয়ালা না করুক কাল যদি আপনার বাড়ির কেউ সংক্রমন হয়?  

মানুষ সামাজিক প্রাণী তাই সমাজ বদ্ধ ভাবে বাঁচতে শিখতে হবে আমাদের। কথায় আছে দশের লাঠি একের বোঝা, তাই আমাদের দশে মিলে কাজ করতে হবে  কোনো জৈব শক্তি কেনো , পৃথিবীর কোনো শক্তিই মানুষকে হারাতে পারবে না, আর মানুষ কোনোদিন হার মানবেও না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.