প্রবন্ধ : শচীদুলাল পাল


স্মৃতি


শচীদুলাল পাল( কোন্নগর)

প্রথমতঃ স্মৃতি এক প্রাচীণ হিন্দু শাস্ত্র  গ্রন্থ।বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় গ্রন্থের এক বিশাল সংকলন।মুখে মুখে প্রচারিত নানান বিষয়কে লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল ‘স্মৃতি ‘ গ্রন্থে।মূলত তার মধ্যে স্থান পেয়েছে  ছয় বেদাঙ্গ,রামায়ণ, মহাভারত, ধর্মশাস্ত্র, অর্থশাস্ত্র, পুরান, কাব্য,বিভিন্ন গ্রন্থের পর্য্যালোচনা ও মন্তব্য, সাহিত্য,নীতিশাস্ত্র,রাজনীতি, সংস্কৃতি, শিল্প ও সমাজ সমন্ধীয় বিস্তারিত ইত্যাদি।  যা বার বার সংশোধন করা হয়েছিল। এক অবাধ গ্রন্থ। ১৮ জন পন্ডিত যারা স্মৃতি শাস্ত্র লিখেছিলেন। আবার ভাষাগত দিক থেকে শ্লোকের একপ্রকার ছন্দের নাম স্মৃতি। পুরান মতে ধর্ম ও মেধার কন্যা স্মৃতি। সংস্কৃতে স্মৃতি মানে মস্তিষ্কে  ধরে রাখা। ছান্দ্যোপনিষদে বলা হয়েছে মনের কথা বলা,  স্মৃতিচারন বা মনের মধ্যে ধরে রাখায় স্মৃতি।
         বিজ্ঞানভিত্তিক মনস্তাত্ত্বিক  পর্য্যালোচনা করলে দেখা যায় স্মৃতি এক অন্তর্নিহিত শক্তি।
অনেকে মনে করেন স্মৃতি শক্তি জন্মগত এক গুন। তাই কেউ কেউ  মেধাবী হয়। ব্রাহ্মীশাক বা ব্রাহ্মী শাকের নির্য্যাস থেকে তৈরি  ওষুধে স্মৃতি শক্তির বৃদ্ধি করে। সিনেমায় আমরা দেখেছি স্মৃতি বিলুপ্ত হয়েছে এমন ব্যাক্তির মাথায় আঘাত লেগে পুনরায় স্মৃতি শক্তি ফিরে এসেছে। ( সন্ন্যাসী রাজায় উত্তম কুমার) নিজের লোকজনকে চিনতে পারছে। পুরানো সব কথা তার মনে পড়ছে।ভাওয়াল সন্ন্যাসীর এই কাহিনি সত্য ঘটনা অবলম্বনে।
স্মৃতি আর মেধা একে অপরের পরিপূরক নয়।
     শৈশবে আমরা অনেক বড়ো বড়ো  কবিতা মুখস্ত করে দিতাম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই স্মৃতি শক্তি কমতে থাকে। অবশ্য স্মৃতি শক্তি বাড়াবার জন্য অনেক টিপস আছে। তার মধ্যে ধ্যান সর্বশ্রেষ্ঠ।আইনস্টাইন সহ বিভিন্ন মেধাবী ব্যাক্তির মস্তিষ্ক সংরক্ষিত আছে।বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন গ্লিয়া নামে এক স্নায়ুকোষ আছে তারই অবদান হলো এই মেধাশক্তি। নিউরনের ঘনত্ত্ব বাড়লেই স্মৃতি শক্তি বাড়বে এর কোনো মানে নেই।
    প্রত্যেকটা ভাবনা মস্তিষ্কে ছাপ ফেলে। ঠিকপথে গেলে সেই স্মৃতি কে তুলে আনা যায়। হারানো স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনার জন্য ইলেক্ট্রিক শক বা সম্মোহন বহুকাল থেকে প্রচলিত। 
    স্মৃতি বিলোপের কথা প্রসঙ্গে—- যা প্রায় সব মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় তাহলো সর্ট টার্ম মেমোরি লস। অর্থাৎ অনেক পুরানো স্মৃতি তার মনে থাকে কিন্তু এই মুহুর্তের অনেক কাজে ভুল করে বসে।বিজ্ঞানী নিউটন ঘড়ি ধরে হাফ বয়েল ডিম সেদ্ধ করছিল।
কিছুক্ষন পরে সে দেখলো হাতে  ডিমটি ধরা আছে আর ফুটন্ত জলে ঘড়িটি ফুটছে।
   সচরাচর অনেকেই কোথায় কি রেখেছে মনে করতে পারেনা।মোবাইল, চাবি,ব্যাগ বিশেষ করে ছাতা বাইরে কোথাও গিয়ে রেখে আর মনে করতে পারেনা। হারিয়েও যায়।
ছাতা যাতে না হারায় সে  বিষয়ে একটা কথা মনে পড়লো,। “শীতের কাঁথা,বর্ষার ছাতা আর ফুলসজ্জার বউ কখনো হাত ছাড়া করতে নেই।”
    বয়স্কদের ডিমেনশিয়া থেকে আলঝাইমার্স  ভুলে যাওয়া রোগ সৃষ্টি হয়।
     কোনো একটা কিছু খুঁজতে রান্না ঘরে গেলো সেখানে গিয়ে সে মনে করতে পারেনা কিজন্যে সে এসেছিল।
     আর্কেমিডিস চৌবাচ্চার জলে স্নান করতে গিয়ে তার থিয়োরি খুঁজে পেয়ে নগ্ন অবস্থায়  ইউরেকা ইউরেকা বলতে বলতে একেবারে রাজসভায় হাজির হয়েছিল।
   ঈশ্বর দর্শন করলেও বাহ্যিক জ্ঞান শূণ্য হয়। সেইসব মহাপুরুষদের আমরা পাগল বলি।
       এবার কিছু বাস্তব ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরি।
অতীতের সব ঘটনা আমাদের স্মৃতি পটে থাকেনা। কয়েকটি বিশেষ ঘটনা যেমন ভ্রমণ, মনোরম দৃশ্য,আনদঘন মুহুর্ত, দুর্ঘটনা, প্রিয়জনের মৃত্যু ইত্যাদি বিশেষ বিশেষ ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী থেকে যায়।আমি তখন বাইশ। একবার প্রয়াগ গিয়েছিলাম ত্রিবেণীতে যমুনা থেকে মাঝনদীতে এক নৌকা ভাড়া করে তীর্থযাত্রীদের সাথে।গঙ্গা যমুনা সরস্বতীর সঙ্গম।মাঝ নদীতে যমুনা থেকে দিলাম এক ঝাঁপ গঙ্গায়। যমুনার জল বড়ো স্থির কিন্তু গঙ্গার তীব্র স্রোতে আমি ভেসে গিয়েছিলাম অনেকটা। সাঁতারে অনেক দূর গিয়ে অন্য নৌকায় উঠে ছিলাম।  এমনি স্নান কেউ করে করে কিনা জানা নেই। আমার উদেশ্য ছিলো যমুনা সরস্বতী যেখানে গঙ্গার সাথে মিশেছে সেখানে স্নান করা।
এই স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
    পুরিতে সুর্যোদয়ের অপরূপ দৃশ্য, নুলিয়ার সাথে ঢেউয়ের ওপারে স্থির জলে চলে যাওয়া,
বিশাল বিশাল ঢেউ এর মধ্যে ফিরে আসা এক দুঃ সাহসিক অভিযান।
বালিকার প্রথম প্রেমের স্মৃতি চির অক্ষুন্ন থাকে।ফুলসজ্জা বা প্রথম মিলনের স্মৃতি মনের মণিকোঠায় থেকে যায়।
   স্মৃতি নিয়ে এক মজার ঘটনা। তখন আমাদের পাড়ায় চুল কাটার সেলুন ছিলনা। ইটের উপর বসে চুল কাটতে হতো।মজা করে বলতাম ইটালিয়ান সেলুন। আমার এক বন্ধু তেমনি এক নাপিতের কাছে গিয়ে বললো ওই যে দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার দেখছেন ওই আর্টে চুল কেটে দাও।সেখানে ছিল উত্তম কুমারের স্মৃতি টুকু থাক সিনেমার পোস্টার। নাপিতের কাছে কোনো আয়না ছিলনা। বন্ধুটি চুল কেটে বাড়ি গিয়ে আয়নায় দেখে এত ছোট করে কেটেছে প্রায় মুন্ডনের মত।আর একটা টিকি রেখে দিয়েছে। বন্ধুটি রেগে আগুন। নাপিতের কাছে গিয়ে বললো এমনি কেন কেটেছো? ধূর্ত নাপিত বলল তুমিই ত বলেছিলে পোস্টারের  দিকে আগুল দেখিয়ে। ওখানে ত ” স্মৃতি টুকু থাক ” লেখা আছে। তাই ছোট করে কেটে টিকি রেখে দিয়েছি।
  প্রকৃতি যে কত মনোরোম এখনো চোখ বুঝে মনকে সেইসব স্থানে নিয়ে গেলে উপলব্ধি করি।
মারাত্মক দূর্ঘটনা ছিন্নভিন্ন দেহাংশ
ইত্যাদি দেখলে সেই সব ভয়ংকর স্মৃতি মনে থেকে যায়।
    প্রিয়জন বিয়োগ ব্যাথায় বেশি করে মনে পড়ে।মনে পড়ে বাবা মায়ের স্নেহের সান্নিধ্য। জ্বর হলে মায়ের সেবা শুশ্রূষা, শয্যা পাশে রাত্রি জাগরণ। 
  শৈশব থেকে আজ অবদি নানান আনন্দ, দুঃখ, বেদনা ইত্যাদির স্মৃতি মনে পড়ে।মনে পড়ে বিভিন্ন মানুষ অকপটে যখন তাদের অন্তরের অত্যন্ত গোপন কথা, দুঃখের কথা বলে সেইসব কথা গুলির স্মৃতি। তারা যখন  আমার দ্বারা উপকৃত হয় তাদের সমস্যার সমাধান হয়েছে  সংবাদ দেয় ও ধন্যবাদ জানাই সেই সব স্মৃতি মনে পড়ে।
   ঈর্ষান্বিত এই সমাজ।যখন কেউ অপমান করে আঘাত দিয়ে কথা বলে তখন স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে মনিষীদের জীবন কাহিনি আর বাণী। ” যে সয় সে রয়,যে না সয় সে নাশ হয়”। “তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেনো”।”কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়, তাবলে কুকুরে কামড়ানো কী মানুষের শোভা পায়।” ইত্যাদি,ইত্যাদি।
     
   

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.