:ধারাবাহিক পৌরাণিক কাব‍্য:

  • কুরুক্ষেত্রে আঠারো দিন *

—— কৃষ্ণপদ ঘোষ।
উপস্থাপন–১৫
( পূর্ব প্রকাশিতের পর )

★অভিমন্যু বধ পর্বাধ‍্যায়★
একাদশ দিনের যুদ্ধ
:: ৬। অভিমন্যু বধ ::

ক্ষুন্ন ক্ষুব্ধ দুর্যোধন কহিলেন দ্রোণে,
“আমরা বধের যোগ্য করিলেন মনে।।
নিকটে পাইয়া তারে কেন যুধিষ্ঠিরে,
রণক্ষেত্রে মুক্তি দেন দেখি নত শিরে।।
আপনি দিলেন বর করিবারে হিত,
কার্যকালে কার্য দেখি হয় বিপরীত।।
ভক্ত-আশা পূর্ণ করে যত সাধুজন।
কিন্তু মম আশা নাহি পূরিল এখন”।।
কহিলেন দ্রোণাচার্য তাঁরে অতি লাজে,
“দৃঢ় আমি থাকি সদা কথা আর কাজে।।
কিন্তু তুমি দিব‍্য বাক্য নাহি রাখ মনে।
ভগবান কৃষ্ণ তিনি পাণ্ডবের সনে।।
পাণ্ডবসেনানী তাঁর অর্জুন অজেয়।
পাণ্ডবে তাই জিনিতে পারিবে না কেহ।।
তব কাছে কহি আমি এ সত্য কথন।
কোন মহারথে আজ করিব হনন।।
আমি দৃঢ় ব‍্যূহ এক করিব রচন।
দেবগণের অসাধ‍্য করিতে ভেদন।।
কাজ যাহা বলি আমি রাখিবে অন্তরে।
কৌশলে অর্জুনে লয়ে যেও স্থানান্তরে।।

পরদিন ডান পাশে করি অবস্থান,
সংশপ্তকগণ পার্থে করে আহ্বান।।
অর্জুনের সাথে যুদ্ধ লাগিল ভীষণ।
শত্রুদলে ধনঞ্জয় করেন দলন।।

চক্রব‍্যূহ দ্রোণ এক করেন রচন।
বীরগণে যথাস্থানে করেন স্থাপন।।
লোহিত ভূষণে তাঁরা ভূষিত সকলে।
অগুরু রক্তচন্দন চর্চিত কপালে।।
রক্ত মালিকা শোভিত সবাকার গলে।
রক্ত বসনে শোভিত লোহিত সকলে।।
মহারথ বধিবার ইচ্ছা মনে জাগে।
দুর্যোধন পুত্র চলে সর্ব পুরোভাগে।।
দুর্যোধন, কর্ণ, কৃপ আর দুঃশাসন,
মধ‍্যভাগে রহিলেন এই চারিজন।।
সম্মুখে তার শকুনি, জয়দ্রথ, দ্রোণ।
ধৃতরাষ্ট্রপুত্র আছে আরো ত্রিশ জন।।
অশ্বত্থামা, ভুরিশ্রবা এঁরা যান মাঝে।
সকলে চলেন যুদ্ধে রক্ত রাঙা সাজে।।

করিতে নারিবে দ্রোণে আজ কেহ রোধ।
যুধিষ্ঠিরের মনে আজ এই হইল বোধ।।
অভিমন্যু ‘পরে দেন এক গুরুভার।
দ্রোণ রচা চক্রব‍্যূহ ভেদ করিবার।।
অভিমুন‍্যে কহিলেন রাজা যুধিষ্ঠির।
সর্বদিক চিন্তা করি করি মনস্থির।।
“বৎস, এরূপ কার্য করহ সাধন।
পার্থ ফিরে নাহি কয় নিন্দার বচন।।
কৃষ্ণ, পার্থ আর মাত্র প্রদ‍্যুম্ন তোমার,
আছে জ্ঞান চক্রব‍্যূহ ভেদ করিবার।।
পাণ্ডবগণ সকলে করিছে প্রার্থনা।
চক্রব‍্যূহ ভেদিবার করিছে কামনা”।।
অভিমন‍্যু কহে,”বেশ, হোক তবে তাই।
প্রবেশিব চক্রব‍্যূহে কোন চিন্তা নাই।
কিন্তু আমি জানি মাত্র পথ ভেদিবার।
নাহি জানি পথ তার বাহিরে আসার।।
পিতৃদেব শেখালেন প্রবেশ করিতে।
শিক্ষা তিনি দেন নাই ব‍্যূহ বাহিরিতে।।
ব‍্যূহ মাঝারে বিপদে পড়ি যদি কভু,
ভেদিয়া ব‍্যূহ আসিতে পারিব না তবু”।।
যুধিষ্ঠির কন তারে, “কর ব‍্যূহ দ্বার।
প্রবেশিয়া মোরা সাথে রহিব তোমার”।।
কহেন ভীম তাহারে, “মহারথ যত,
মোদের হস্তে সকলে হইবেন হত”।।
অভিমন্যু কহিলেন, “প্রবেশিব তথা,
প্রজ্বলিত অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গেরা যথা।।
যদিও বালক মোরে দেখিবে সকলে।
শত্রুসেনা ধ্বংস করি নাশিব সকলে”।।
প্রণমিলা অভিমন্যু সব গুরুজনে।
বিদায় দিলেন সবে আশীষ বচনে।।
অতঃপর অভিমন্যু সারথিরে কন,
“দ্রোণাচার্য প্রতি রথ করহ চালন”।।
কহেন সারথি অতি দুঃখিত মনে,
“সাধিবেন গুরুভার এ কার্য কেমনে।।
দ্রোণাচার্য তিনি অতি অস্ত্রবিশারদ।
কেহ নাহি তাঁরে কভু করিবারে রদ।।
আপনি বালক সুখে লালিত পালিত।
কিরূপে জিনিবেন শত্রুসেনা যত”।।
সহাস্যে কহেন অভি সারথিরে তাঁর,
“কোন যুদ্ধে কোন ভয় নাহিক আমার।।
স্বয়ং ইন্দ্র যদি কভু আসেন সমরে
তাঁর সাথে যুদ্ধে মোর হৃদি নাহি ডরে
পিতা কিম্বা মাতুলেও নাহি আমি ডরি,
মরি যদি সেও ভালো তবু যুদ্ধ করি।
অতএব নহে দেরী করহ গমন।
দ্রোণ প্রতি রথ তুমি করহ চালন”।।
সারথি সুমিত্র তাই অপ্রসন্ন মন।
চক্রব‍্যূহ প্রতি রথ করেন চালন।।
পিছে পিছে চলে তার পাণ্ডব সকল।
চলে সব চক্রব‍্যূহে আশঙ্কা প্রবল।।
ধাবিলেন অভিমন্যু দ্রোণ ব‍্যূহে সেথা,
হস্তিদল প্রতি ধাবে সিংহ শিশু যথা।
সহজেই অভি ব‍্যূহ করেন ভেদন।
শত্রুসেনা ধ্বংসিতে নিয়োজিত মন।।
অভিমুন‍্যে রোধিবারে তথা দুর্যোধন।
দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ করে শর বরষণ।।
একা যুদ্ধ করে অভি সবাকার সনে।
আহত শল‍্য মূর্ছিত শর বরষণে।
শল‍্যভ্রাতা করে রণ অভিমন্যু সাথে।
অচিরেই হত তিনি অভিমন্যু হাতে।।
কৃপাচার্যে দ্রোণ কন প্রফুল্ল নয়ন।
“দানিবে আনন্দ সবে সুভদ্রা নন্দন।।
এ অতীব ধনুর্ধর তুলনা বিহীন।
মোদের সেনা নিধন এর ইচ্ছাধীন”।।
হেন বচনে অতীব ক্রুদ্ধ দুর্যোধন।
মহারথগণে তিনি কহেন তখন।।
“দ্রোণ ইচ্ছা নয় কভু অভিরে হনন।
শিষ্যপুত্র লাগি তাঁর মন উচাটন।।
অভিমুন‍্যে কর বধ শোন বীরগণ।
উত্তম সময় ইহা করিতে নিধন”।।
যম দ্বারে দিব তারে কহে দুঃশাসন।
অচিরেই তারে আমি করিব নিধন।।
ক্রুদ্ধ অভি দুঃশাসনে কহেন তখন,
“ভাগ্য ক্রমে কূটভাষী করি দরশন।।
দ‍্যূতসভায় কুকার্য করিলে পালন।
মৃত‍্যুই উচিত শাস্তি তোমার এখন।।
কর্মফল ভোগ তুমি করিবে এবার।
বধিব তোমারে আমি সম্মুখে সবার।।
সঠিক সময় ইহা তোমার নিধন।
সেই পুণ্য কার্য আমি করিব সাধন”।।
এত কহি অভি করে শর বরষণ।
শরাঘাতে মূর্ছা যান তথা দুঃশাসন।।
সারথি তাঁরে সত্বর করে উত্তোলন।
অতঃপর লয়ে রথ করে পলায়ন।।
পাণ্ডবপক্ষের সেনা করে সিংহনাদ।
কুরুসেনা সবে ভীত গণিল প্রমাদ।।
কর্ণ সনে অভিমন্যু রণিছে ভীষণ।
কর্ণভ্রাতার শিরশ্ছেদে হইল মরণ।।
নিপীড়িত কর্ণ কত অভি শরাঘাতে।
রক্ষিতে নিজেরে কর্ণ গমেন তফাতে।।
কুরুসেনা ভীত সবে সেই মহা রণে।
বালক বীরের ভয়ে ব‍্যস্ত পলায়নে।।
অবশেষে বহু সেনা করে পলায়ন।
রণক্ষেত্রে জয়দ্রথ রণেন ভীষণ।।
নিপীড়িত জয়দ্রথ অভিমন্যু শরে।
ব‍্যূহদ্বার রুদ্ধ তিনি করিলেন পরে।।
পাণ্ডবসেনা ব‍্যূহ ভেদে করিল প্রয়াস।
ব‍্যর্থ হইয়া শেষে তারা হইল নিরাশ।।
কুরুসেনা মাঝে অভি একা বেষ্টিত।
করিছেন যুদ্ধ ঘোর তিনি অবিরত।।
শল‍্যপুত্র রুক্মরথে করেন নিধন।
দুর্যোধনপুত্রে পরে করেন হনন।।
হত কত শত শত রথী মহারথ।
হস্তি অশ্ব খোঁজে সব পলায়ন পথ।।
পুত্র নাশে হয়ে অতি ক্রুদ্ধ দুর্যোধন,
নিজ দল বীরগণে উচ্চ রবে কন,
“অবিলম্বে অভিমুন‍্যে করহ নিধন।
মম আদেশ ত্বরায় করহ পালন”।।
বৃহদ্বল, দ্রোণ, কৃপ কর্ণ, অশ্বত্থামা,
আইলেন সেথা সবে সাথে কৃতবর্মা।।
আইলেন ছুটে এই ছয় মহারথী।
ঘিরে ধরে অভিমুন‍্য নাহি তার গতি।।
বৃহদ্বল হন হত অভিমন্যু বাণে।
যোদ্ধা কত হলো হত সেই মহারণে।।
হেরি রণ মহারণ কহিলেন দ্রোণ,
“পিতৃতুল্য অভিমন্যু করে বিচরণ।।
ক্ষিপ্র হস্তে দ্রুত করে শরের সন্ধান।
ত্বরিতে মোচন তার লইবারে প্রাণ।।
চক্রাকার ধনু তার দৃষ্টির গোচর।
পলক ফেলিতে ঘটে সব অগোচর।।
যদি প্রাণ সংশয় কভু তার বাণে,
তবুও আনন্দ ঘোর আজি মোর প্রাণে।।
অভিমন্যু নিপুন সে শর নিক্ষেপনে।
অর্জুনের সমতুল নাই ভেদ এক্ষণে”।।
শরাহত কর্ণ দুখে কহিলেন দ্রোণে,
কর্তব‍্য সাধিতে শুধু আছি এই রণে।।
কহিলেন দ্রোণ তারে মৃদু হাসি মুখে,
“অভিমন্যু বধ ফন্দি কহি মনোদুখে।।
অভিমন্যু কবচ সে অতি বলশালী।
শেখানু পিতারে তার ধারণ প্রণালী।।
রথাশ্ব সারথি অগ্রে বধ কর তার।
অতঃপর পশ্চাতে করহ প্রহার।।
হেনরূপে অভিমন্যু হইবে নিধন।
সেই মতো চেষ্টা সবে করহ এখন।।
দ্রোণ বাক‍্যে কর্ণ হন পুলকিত অতি।
পশ্চাত হতে বধিলা রথাশ্ব সারথি।।
অতঃপর দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, শকুনি,
অশ্বত্থামা, দুর্যোধন, করেন বেষ্টনী।।
বালকে ধরেন ঘিরে ছয় মহারথী।
এক প্রতি ছয়জন ভঙ্গ যুদ্ধ রীতি।।
সবে মিলি করে তারা শর বরষণ।
খড়্গ লয়ে অভিমন্যু করে আক্রমণ।।
খুরপ্র অস্ত্রে খড়্গ ভূতলে পতিত।
চক্র হস্তে অভিমন্যু সবেগে ধাবিত।।
সেই চক্র নষ্ট হলো শর বরষণে।
অতঃপর ল’য়ে গদা উদ‍্যত রণে।
দুঃশাসনের পুত্র হেন কালে হায়,
পশ্চাতে তার হানিল আঘাত মাথায়।।
সূর্য অস্তগামী যথা তাপিয়া ভুবন ।
অভি প্রাণহীন শত্রু করিয়া দলন।।
হেরি তা পাণ্ডবসেনা সবে অতি ভীত।
শত শত সেনা সব ভয়ে পলাইত।।
বিচলিত যুধিষ্ঠির কহিলেন সবে,
“পলায়নপর কেন স্থির হও সবে।।
যুদ্ধ কর পুন সবে ত‍্যজি সব ভয়।
জিনিব এ শত্রুসেনা মোরা নিশ্চয়।।
দশ সহস্র সেনা সে করিল হনন।
অতঃপর ইন্দ্রলোকে করিল গমন।।
তার লাগি শোক সবে নাহি কর আর।
বধিবারে শত্রু যুদ্ধ করহ আবার”।।
ক্ষণপরে সূর্যাস্ত ঘোষিত অবহার।
ত‍্যজি রণ গমিলেন শিবিরে যে যার।।
*
ধৃতরাষ্ট্রে অভি বধ করিয়া বর্ণন,
কুরুপতিরে সঞ্জয় কহেন তখন,
“বধিল বালক মিলি ছয় মহারথী।
যুদ্ধরীতি ভঙ্গ তায়, এ অধর্ম অতি”।।
★★★
(চলবে)

Spread the Kabyapot